সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

অনুপস্থিতির নীল সৌন্দর্য

 

তুমি চলে যাওয়ার পর, আমি আবিষ্কার করেছি
মানুষের ভেতরেও একটি আবহাওয়া থাকে,
সেখানে হঠাৎ হঠাৎ বৃষ্টি নামে কোনো মেঘ ছাড়া
সেখানে বজ্রপাত হয় কিন্তু আকাশে কোনো শব্দ শোনা যায় না
সেখানে শীতকাল নেমে নামে এমনভাবে,
যেন একটি মৃত নক্ষত্র তার শেষ আলোটুকু ফিরিয়ে নিয়েছে

তুমি চলে যাওয়ার পর, আমার ঘরের দেয়ালগুলো অদ্ভুত হয়ে উঠেছে
রাতের বেলা আমার দিকে তাকিয়ে থাকে,
যেন তারা জেনে গেছে কতবার আমি তোমার নাম উচ্চারণ করি
তোমার নামের শব্দের চারপাশে ঘুরে বেড়াই

এখন আর আমি তোমাকে ডাকি না, কারণ ডাকলে যদি ফিরে আসতে,
তবে পৃথিবীর সমস্ত নদী শুধু উৎসের দিকেই ব’য়ে যেত

আমি শুধু তোমার অনুপস্থিতিকে ডাকি খুব নীরব আর শান্ত হ’য়ে
আমি আজকাল মানুষের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজেকে হারাই
কারণ, তোমাকে হারানোর পরনিজেকে খুঁজে পাওয়ার

আর কোনো প্রয়োজন বোধ করি না, কখনো কখনো গভীর রাতে
আমি জানালার পাশে বসে থাকি।
শহর তখন নিঃশব্দে গাঢ় ঘুমে মগ্ন
রাস্তার বাতিগুলো জেগে থাকে একদল ব্যর্থ কবির মতো
আর আমি ভাবি, তুমি কি কখনো হঠাৎ ঘুম ভেঙে
আমার কথা মনে করো?

মনে পড়ে কি সেইসব দিন, যখন পৃথিবী আমাদের কাছে
একটি ছোট্ট সবুজ দ্বীপের মতো ছিল? যেখানে সময় বয়ে যেত আপন হ’য়ে
আর বিকেলগুলো, আমাদের জন্য অতিরিক্ত কিছু আলো জমিয়ে রাখত?

আমি জানি মানুষের স্মৃতি বড় নিষ্ঠুর, সে অনেক কিছু বাঁচিয়ে রাখে,
আবার অনেক কিছু মুছেও দেয়,  হয়তো তুমিও মুছে ফেলেছো
আমার মুখ, আমার কণ্ঠস্বর, আমার ছোঁয়া, বাতাসের শব্দ
কিন্তু আমি পারিনি, আমি এখনও
তোমার রেখে যাওয়া নীরবতার মধ্যে বসবাস করি

তুমি জানো, বিরহ আসলে কোনো অনুভূতি নয়
এটি একটি দীর্ঘ শূন্যতা যেখানে প্রতিদিন
নিজেরই একটি মৃত সংস্করণকে কবর দিতে হয়,

আমি প্রতিদিন তা-ই করি, ভাবনা আর চেতনার সাথে,

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে একটু একটু করে
গতকালের আমিটাকে নিঃশেষ করি নিজের মত করে,

তারপর আবার বেঁচে উঠি, শুধু তোমাকে ভুলে যাওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টায়

কিন্তু তুমি এমনভাবে রয়ে গেছো আমার ভেতরের অন্ধকারে,
যেমন সমুদ্রের গভীরে ডুবে যাওয়া জাহাজের ধ্বংসাবশেষ,
অদৃশ্য, তবু চিরস্থায়ী, ভঙ্গুর কিন্তু শক্তিশালী

অনেকেই বলে, সময় নাকি সব ক্ষত এক সময় সারিয়ে দেয়

আমি তাদের বিশ্বাস করি না, সময় ক্ষত সারায় না, দীর্ঘজীবী করে তোলে,  
আমি এখনও তোমাকে ভালোবাসি কি না, এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই

কারণ ভালোবাসা আর বিরহ অনেক দূর গিয়ে একই নদীতে মিশে যায়

সেখানে আর আলাদা করা যায় না, কোনটি আকাঙ্ক্ষা আর কোনটি স্মৃতি,
তা কেবল একটি মৃত স্বপ্নের ছায়া ছাড়া আর কিছু নয়,

শুধু জানি, আজও কোনো কোনো সন্ধ্যায় সূর্য ডুবে গেলে
আমার মনে হয় পৃথিবী থেকে আরেকবার আলো কমে গেল

আজও কোনো কোনো রাতে চাঁদের দিকে তাকালে মনে হয়
সে যেন তোমার ঠিকানায় যাচ্ছে,

কিন্তু আমার কাছে ফিরে আসার সময় পথ ভুলে যায়,

আজও কোনো কোনো ভোরে আমি হঠাৎ ঘুম ভেঙে বুঝতে পারি,
তুমি আমার কাছে নেই, আর এই নেই শব্দটি আমার কাছে
একটি মহাদেশের চেয়েও অনেক বড়মনে হয়,

একটি সমুদ্রের চেয়েও গভীর, একটি মৃত্যুর চেয়েও দীর্ঘ

তাই আমি বেঁচে আছি, কিন্তু সম্পূর্ণ নই

হাঁটছি, কিন্তু কোথাও পৌঁছাচ্ছি না, নির্দিষ্ট কোন গন্তব্য আমার নেই

হাসছি, কিন্তু তার ভেতরে কোনো আলো নেই, শুধু শূন্যতার ছড়াছড়ি,

আমি যেন এক পরিত্যক্ত বাতিঘর, যার ভেতরে এখনও আগুন জ্বলে,
কিন্তু আর কোনো জাহাজ তার দিকে তাকায় না

আর তুমি, হয়তো বহুদূরের কোনো সুখের শহরে

নতুন আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আছো উজ্জ্বল দিনের অপেক্ষায়

তবু জেনে রেখো, এই পৃথিবীতে একজন মানুষ এখনও আছে,
যে প্রতিটি ঋতুর ভেতর তোমার অনুপস্থিতির শব্দ শুনতে পায়,

যে প্রতিটি বৃষ্টির ফোঁটায় একটি হারিয়ে যাওয়া নামের প্রতিধ্বনি খোঁজে

প্রতিটি রাতের শেষে যে ভোর নয়, সে তোমার অপেক্ষাতেই থাকে

আর কি আছে জানো, কিছু মানুষ কোনদিন ফিরে আসে না,
তবু তার জন্য অপেক্ষা করা মানুষের সবচেয়ে প্রাচীন, সবচেয়ে সুন্দর,
এবং সবচেয়ে মর্মান্তিক অভ্যাস, অনেকটা স্বপ্নের মত কিন্তু বাস্তব।

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

আমাদের ব্যর্থতাগুলো

  বাংলাদেশের গল্প কেবল সাফল্যের গল্প নয়; এ গল্পের ভেতরে অসংখ্য অপূর্ণতার দীর্ঘ ছায়াও মিশে আছে। একটি দেশ যখন যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে নিজের পরিচয় নির্মাণ করে, তখন তার প্রতিটি অগ্রগতি যেমন গর্বের, তেমনি প্রতিটি ব্যর্থতাও আত্মসমালোচনার দাবি রাখে। আমরা স্বাধীনতার পর বহু পথ পেরিয়েছি   অর্থনীতি বেড়েছে, নগরায়ণ হয়েছে, শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, অবকাঠামো বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু উন্নয়নের দৃশ্যমান ভবনের আড়ালে এমন কিছু ভাঙাচোরা জায়গা রয়ে গেছে, যেখানে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে হয়   আমরা কি সত্যিই এগিয়েছি, নাকি কেবল এগিয়ে যাওয়ার চেহারাটি নির্মাণ করেছি? আমাদের ব্যর্থতাগুলো তাই কেবল কোনো সরকারের, কোনো প্রতিষ্ঠানের কিংবা কোনো ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়; এগুলো আমাদের সামষ্টিক চরিত্র, রাষ্ট্রচিন্তা, সামাজিক অভ্যাস এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের আয়না। সর্বোপরি এগুলো আমাদের নিজস্ব ব্যর্থতা। আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হয়তো এই যে, আমরা অনেক সময় সমস্যাকে সমাধান করার চেয়ে সমস্যার সঙ্গে বসবাস করতে শিখে যাই। রাস্তায় যানজট, নদীতে দূষণ, ফুটপাতে দখল, ঘুষ, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, বিচার পেতে...