সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নীলখাতার শহর-কিশোর গল্প

 

শরতের শেষের দিকের এক বিকেল। আকাশে তখন মেঘ ছিল না, কিন্তু বাতাসে ছিল মেঘের পূর্বাভাস, এক ধরনের হালকা, অনিশ্চিত গন্ধ, যেন দূরের নদী তার নিজের নাম ভুলে গিয়ে নতুন করে উচ্চারণ করতে চাইছে। কাশীপুর নামের সঙ্গে কাশফুলের কোনো মিল ছিল কি না, তা নিয়ে কেউ আর মাথা ঘামাত না; তবু শরতের শেষে যখন ধুলোমাখা বাতাস স্কুলের মাঠ পেরিয়ে যেত, তখন কিছু একরকম সাদা সাদা আঁচল বাতাসের কাঁধে জড়িয়ে কাশীপুর একটু নরম, একটু মনখারাপি করে তুলত। এই শহরে চৌদ্দ বছরের একটি ছেলে থাকত, নাম রাফি। সে খুব উচ্চস্বরে কথা বলত না, খুব দ্রুত হাঁটতও না, আবার খুব ধীরও না। তার অভ্যাস ছিল বইয়ের ভাঁজের মধ্যে ছোট ছোট কাগজ গুঁজে রাখা, যেসব কাগজে অদ্ভুত অদ্ভুত কথা লেখা থাকত। যেমন, ‘একজন মানুষ নদীর মতো; তাকে দূর থেকে শান্ত মনে হয়, কিন্তু ভেতরে কত স্রোত, কে জানে?’ কিংবা ‘যে জিনিস ভাঙে, তা সবসময় কাঁচ নয়; কখনো আত্মবিশ্বাসও।’ রাফি এইসব কথা কোথায় পেত, সে নিজেও ঠিক বলতে পারত না। স্কুলের বাংলা বই, পুরোনো খবরের কাগজ, মামার বইয়ের তাক, আর নিজের মাথার ভেতরের অগোছালো চিন্তা, এই চারটে জায়গা থেকেই হয়তো। রাফির বাবা ছিলেন স্থানীয় পোস্ট অফিসের কর্মচারী। মা স্কুলের সহকারী শিক্ষিকা। ছোট দুই বোন, সংসার, পরীক্ষা, টিউশন, সব মিলিয়ে তাদের জীবন ছিল চলমান ঘড়ির মতো; মাঝেমধ্যে কাঁটা আটকে গেলেও ঘর থামত না। রাফির সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল শহরের পুরোনো পাঠাগার, ‘কাশীপুর পাবলিক লাইব্রেরি’। লাইব্রেরিটি খুব বড় ছিল না, কিন্তু তার দেয়ালে এমন এক নীরবতা ছিল, যা শব্দকে শোনার মতো করে তুলত। সেখানে কাঠের পুরোনো আলমারিতে ধুলার আস্তরণ, জানালায় জালের সূচিকর্ম, আর মেঝের ওপর সূর্যের ছেঁড়া পাতার মতো আলো, সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন কারও হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির ভেতর দাঁড়িয়ে আছে।

রাফি সেখানে প্রায়ই যেত। বই ধার করত, বই ফেরত দিত, কখনো লাইব্রেরিয়ানের পাশে বসে পুরোনো রেজিস্টার খাতার পাতাগুলো উল্টে দেখত। লাইব্রেরিয়ান, হাবিব স্যার, খুব বৃদ্ধ নন, কিন্তু তার চোখে সবসময়ই একটি ধীর আলো থাকত। যেন তিনি কথা না বললেও মনে মনে বইয়ের সাথে আলাপ করেন।

একদিন বিকেলে রাফি লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখল ভেতরে অস্বাভাবিক নীরবতা। শেলফের সামনে তিনজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। উপজেলা অফিস থেকে কেউ এসেছে, নাকি ঠিকাদারের লোক, রাফি বুঝতে পারল না। টেবিলে কিছু কাগজ, আর এক কোণে হাবিব স্যার খুব শান্ত গলায় কথা বলছেন, কিন্তু তার কণ্ঠে এমন এক জেদ ছিল, যা ভাঙতে চায় না।

রাফি কাছে গিয়ে শুনল, শহরের নতুন ‘উন্নয়ন প্রকল্প’ অনুযায়ী লাইব্রেরির পুরোনো ভবন ভেঙে সেখানে একটি বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স তৈরি করা হবে। লাইব্রেরির বইগুলো নাকি অন্য কোথাও স্থানান্তরিত হবে। ‘স্থানান্তরিত’ শব্দটি রাফির কানে এমন লাগল যেন কারও বুকে হাত রেখে তাকে অচেনা দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

সে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার, লাইব্রেরি কি সত্যিই ভেঙে ফেলবে?’

হাবিব স্যার একটু চুপ করলেন। তারপর বললেন, ‘কাগজে তাই লেখা আছে।’

‘কিন্তু বইগুলো?’

‘বইগুলোকে বাঁচানো সহজ,’ তিনি ধীরে বললেন। ‘কিন্তু বই রাখার জায়গা বাঁচানো কঠিন।’

সেদিন রাফি বাড়ি ফেরার পথে কোনো শব্দ ঠিকমতো শুনতে পেল না। রিকশার ঘণ্টি, দোকানের ডাক, মসজিদের মাইকের অর্ধেক ঘোষণা, সব যেন দূরের কুয়াশার ভেতর দিয়ে আসছে। তার মাথায় শুধু একটাই বাক্য ঘুরছিল: ‘বই রাখার জায়গা বাঁচানো কঠিন।’

পরদিন স্কুলে সে তার বন্ধুদের বলল। তার বন্ধুদের মধ্যে সোহেল সবচেয়ে তেজি, মিতু সবচেয়ে তীক্ষ্ণ, আর তানভীর সবচেয়ে চুপচাপ, চুপচাপ বলেই সে অনেক সময় সবচেয়ে বেশি দেখে ফেলে। সোহেল প্রথমে রেগে গেল। ‘এটা হতে দেওয়া যাবে না,’ সে বলল। ‘লাইব্রেরি ভাঙা মানে শহরের মগজ ভাঙা।’

মিতু একটু হাসল। ‘তুই আবার কবিতা শুরু করলি?’

‘কবিতা না, সত্যি বলছি।’

তানভীর নীচু স্বরে বলল, ‘একটা কাজ করতে হবে। শুধু রাগলে হবে না।’

রাফি তাদের তিনজনকে তার পুরোনো খাতায় লেখা কিছু লাইন দেখাল। তারপর বলল, ‘আমাদের কিছু করতে হবে। কিন্তু কীভাবে?’

সেই প্রশ্নের উত্তর সহজ ছিল না। তারা স্কুলের লাইব্রেরিতে গিয়ে রেফারেন্স বই ঘেঁটল। পুরোনো পত্রিকার কাটিং দেখল। জানতে পারল, শহরের ওই লাইব্রেরিটি স্বাধীনতার আগের সময় থেকে চলছে। সেখানে কেবল বই নয়, এমন সব সভা হয়েছে যেখান থেকে কয়েকজন শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক আর সাধারণ মানুষ শহরের প্রথম গণপাঠচক্রের সূচনা করেছিলেন। লাইব্রেরি ছিল কাশীপুরের স্মৃতির একটি গোপন খুঁটি। তা ভাঙা মানে শুধু ইটপাথর সরানো নয়; ইতিহাসের একটি নীরব দরজা বন্ধ করে দেওয়া।

রাফির মাথায় ধীরে ধীরে একটা পরিকল্পনা জন্ম নিল। সে খুব জটিল কিছু ভাবল না। সে জানত, বড় বড় কথা খুব দ্রুত ভেঙে পড়ে, কিন্তু ছোট ছোট কাজ পাথরের মতো শক্ত হয়। প্রথমে তারা একটি প্রস্তাবপত্র লিখবে। তারপর শহরের মানুষদের স্বাক্ষর নেবে। এরপর লাইব্রেরির ইতিহাস আর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে একটি প্রদর্শনী করবে। স্কুলের শিক্ষকদের সাহায্যে একটি গণস্বাক্ষর অভিযানের আয়োজন করবে। আর সবচেয়ে দরকার হলে উপজেলা পরিষদে গিয়ে প্রশ্ন তুলবে, এত পুরোনো, এত প্রয়োজনীয় একটি প্রতিষ্ঠান ভাঙার সিদ্ধান্ত কীভাবে হলো?

সবাই রাজি হলো। কাজ শুরু হলো।

পরদিন থেকেই তারা লাইব্রেরির সামনে, বাজারের মোড়ে, স্কুলের গেটে, হাটের দিনে, যেখানেই মানুষ জড়ো হয়, সেখানেই স্বাক্ষর নিতে লাগল। রাফিরা প্রথম দিকে লজ্জা পেত। অপরিচিত মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে কিছু বলা সহজ ছিল না। কিন্তু মিতু খুবই সাহসী ছিল। সে একচুলও না কেঁপে মানুষকে বোঝাত, ‘ল্যাব না থাকলে বাঁচা যাবে, কিন্তু লাইব্রেরি না থাকলে মাথা শুকিয়ে যায়।’ সোহেল বারবার এমন এক উত্তেজিত ভাষায় কথা বলত যে কেউ কেউ হেসে ফেলত, আবার কেউ কেউ থেমে শুনত। তানভীর পোস্টার বানাল। তার আঁকা হাতে শহরের পুরোনো লাইব্রেরির ছবি এমন জীবন্ত হয়ে উঠল যে মনে হচ্ছিল, ভবনটি নিজেই বাঁচার জন্য তার গলা তুলেছে।

রাফি লেখা লিখল। সে ‘কাশবপুর পাবলিক লাইব্রেরির প্রয়োজনীয়তা’ শিরোনামে একটি সংক্ষিপ্ত, জোরালো বক্তব্য তৈরি করল। তাতে ছিল না কোনো বড় শব্দের প্রদর্শন, ছিল কেবল সত্য। বই মানে জ্ঞান। জ্ঞান মানে প্রশ্ন করার ক্ষমতা। প্রশ্ন করার ক্ষমতা ছাড়া সমাজ হাঁটে, কিন্তু দেখে না। সে লিখেছিল, ‘একটি শহর কতটা উন্নত, তা তার মার্কেটের উঁচু দালান দিয়ে নয়; তার পাঠাগারের নীরবতা দিয়ে বোঝা যায়।’

এই লাইনটি পরে শহরের অনেকের মুখে মুখে ফিরতে লাগল।

তবে সবাই যে তাদের পক্ষে ছিল, তা নয়। কিছু লোক বলল, ‘পুরোনো জিনিস ভেঙে নতুন হওয়াই তো উন্নয়ন।’ কেউ বলল, ‘বই পড়ার লোক এখন আছে নাকি?’ আবার কেউ বলল, ‘এত আবেগের দরকার কী? সরকারি সিদ্ধান্ত, সরকারি কাজ।’

রাফি এইসব কথায় কষ্ট পেল। কিন্তু হাবিব স্যার তাকে একদিন বললেন, ‘মানুষের মধ্যে তিন ধরনের শব্দ থাকে, এক, যেগুলো সে বিশ্বাস করে; দুই, যেগুলো সে অন্যকে ভয় দেখাতে বলে; আর তিন, যেগুলো সে নিজের অজ্ঞতা ঢাকতে বলে। এই তিন ধরনের শব্দের সাথে একসাথে লড়তে হয় না। শুধু বিশ্বাসের ভাষা, ধৈর্যের ভাষা, আর সত্যের ভাষা ধরে রাখতে হয়।’

সেইদিন রাফি বুঝল, রাগ দিয়ে সব যুদ্ধ জেতা যায় না। কিছু যুদ্ধ ধৈর্যের জন্য বানানো হয়।

কয়েক দিনের মধ্যে স্বাক্ষরসংগ্রহে এক হাজারেরও বেশি নাম জমা পড়ল। স্কুলের প্রধান শিক্ষক লিখিত সমর্থন দিলেন। দুজন স্থানীয় লেখক এলেন। একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারকও বললেন, ‘এই লাইব্রেরি ভাঙা উচিত নয়।’ শহরের কিছু যুবক, যারা সাধারণত সন্ধ্যায় চায়ের দোকানে ক্রিকেট আর রাজনীতি নিয়ে তর্ক করত, তারাও এবার সাহায্য করতে এগিয়ে এল। লাইব্রেরির সামনের মাঠে একটি ছোট সমাবেশ হলো। সেখানে রাফি মাইকে কথা বলল।

তার গলা প্রথমে একটু কাঁপছিল। কিন্তু তারপর, যেমন করে নদীতে ঢেউ ওঠে আর নিজেই নিজের ভর তৈরি করে নেয়, তেমন করেই তার কণ্ঠ শক্ত হলো।

‘আমরা নতুন ভবন চাই,’ সে বলল, ‘কিন্তু পুরোনো স্মৃতিকে মুছে দিয়ে নয়। আমরা চাকচিক্য চাই, কিন্তু শিকড় কেটে নয়। লাইব্রেরি শুধু বইয়ের ঘর না, এটা আমাদের প্রশ্ন করার জায়গা, স্বপ্ন শেখার জায়গা, আর নিজেদের মানুষ বানানোর জায়গা।’

মানুষ হাততালি দিল। কেউ কেউ ‘ঠিক কথা’ বলে উঠল।

কিন্তু এরই মধ্যে আরেকটি সমস্যা দেখা দিল। বর্ষার শেষজলের মতো শহরের নিচু অংশে জল জমতে শুরু করল। লাইব্রেরির দক্ষিণ দেয়ালের কাছে ফাটল ধরা পুরোনো নালা দিয়ে পানি উঠে আসছিল। দেয়ালের ভেতর স্যাঁতসেঁতে দাগ, ছাদের কোণে কালো ফাঙ্গাস, আর মেঝের নিচে নরম মাটি, সব মিলিয়ে লাইব্রেরি যেন ভেতর থেকেই কাঁপছিল। হাবিব স্যার চিন্তিত হয়ে পড়লেন। উপজেলা থেকে যদি সংস্কার না আসে, তবে ইটপাথরের ভাঙার অপেক্ষা না করেই ভবনটি ভেঙে পড়তে পারে।

এবার লড়াইয়ের ধরন বদলে গেল। শুধু ভাঙা ঠেকানো নয়, লাইব্রেরি বাঁচানোর জন্য সংস্কারও চাই। রাফি বুঝল, মানুষের সামনে শুধু ‘না’ বললে হয় না; ‘কীভাবে’ বলতেও হয়। সে আর তার বন্ধুরা লাইব্রেরির প্রাথমিক মেরামতের জন্য স্বেচ্ছাশ্রমের পরিকল্পনা করল। ইট, বালু, প্লাস্টার, টিনের চাঁদা, সব মিলিয়ে তারা একটি ছোট তহবিল গড়ে তুলল। কিছু লোক হাসল, ‘এই ছেলেমেয়েদের পাগলামি কতদূর যাবে?’ কিন্তু কয়েকজন ব্যবসায়ী এগিয়ে এলেন। একজন ঠিকাদার পুরোনো দামে কিছু কাঠ দিলেন। একজন ইমাম শুক্রবারের খুতবার পরে বললেন, জ্ঞানাগার রক্ষা করা একটি নৈতিক দায়িত্ব।

এর মধ্যে রাফির জীবনে আরেকটি ঘটনা ঘটল, যা তার ভিতরের মানুষটিকে বদলে দিল। সে লাইব্রেরির পেছনের পুরোনো গুদামঘরে কিছু কাগজপত্র সাজাচ্ছিল। সেখানে ধুলোর স্তূপের নিচে একটি জংধরা টিনের বাক্স পেল। বাক্সের ভিতরে পুরোনো ছবির অ্যালবাম, হলদে হয়ে যাওয়া চিঠি, আর একটি নীল খাতা। খাতাটি খুবই অদ্ভুত। তাতে প্রতিটি পাতায় একেকজন মানুষের হাতে লেখা মন্তব্য, পাঠ তালিকা, এবং ছোট ছোট প্রশ্ন ছিল। প্রথম পাতায় লেখা, ‘যে দিন আমরা বই পড়া বন্ধ করব, সে দিন আমরা নিজেদের ভাষা ভুলে যাব।’ তারপর নিচে স্বাক্ষর। তারিখ দেখে বোঝা গেল, বহু বছর আগে লাইব্রেরির একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের লেখা।

রাফি নীল খাতাটি নিয়ে হাবিব স্যারের কাছে গেল। হাবিব স্যার খাতাটি দেখে চুপ হয়ে গেলেন। তার চোখে জল চলে এল। তিনি বললেন, ‘এটা তো আমার বাবার লেখা!’

রাফি অবাক হয়ে গেল। ‘আপনার বাবার?’

‘হ্যাঁ,’ হাবিব স্যার নরম গলায় বললেন। ‘তিনি ছিলেন এ লাইব্রেরির প্রথম সদস্যদের একজন। ছোটবেলায় আমি এখানে ঘুমিয়েছি, এখানে কাগজে ছবি এঁকেছি, এখানেই প্রথম ‘মানুষ কাকে বলে’ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি।’

রাফি নীল খাতাটি হাতে নিয়ে বুঝল, এটা শুধু একটি পুরোনো জিনিস নয়, এটা একটি উত্তরাধিকার। সে রাতে সে খুব দেরি পর্যন্ত জেগে রইল। শহর ঘুমিয়ে পড়েছিল, কিন্তু তার ভিতরে আরেকটি শহর জেগে উঠেছিল, একটি নগর, যেখানে মানুষ বইকে বাঁচাতে পারে, কথা দিয়ে দেয়াল তুলতে পারে, আর নীরবতাকে সম্মান দিয়ে ইতিহাসকে ফিরিয়ে আনতে পারে।

কিছুদিন পরে উপজেলা অফিস থেকে প্রতিনিধি এল। তারা স্বাক্ষরপত্র, সংবাদপত্রের কাটিং, স্কুলের চিঠি, আর লাইব্রেরির ঐতিহাসিক দলিল দেখল। এরপর তারা মেরামতের জন্য একটি প্রকল্প অনুমোদনের আশ্বাস দিল। নতুন কমপ্লেক্সের পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত হলো। একে কেউ পুরো জয় বলল, কেউ আংশিক জয়। কিন্তু রাফির কাছে তা ছিল অন্য কিছু, এটা ছিল প্রমাণ যে একটি শহরের কিশোর-কিশোরীরাও কেবল দর্শক নয়, তারা রক্ষকও হতে পারে।

লাইব্রেরির সংস্কার শুরু হলো। ভাঙা অংশগুলো মেরামত করা হলো। ছাদে নতুন টিন লাগল। মেঝে শুকিয়ে নতুন করে পালিশ হলো। পুরোনো শেলফগুলো মেরামত করে আবার দাঁড় করানো হলো। কাচের জানালায় নতুন কাঁচ বসানো হলো, তবে জানালার পুরোনো কাঠের ফ্রেম রেখে দেওয়া হলো, যেন পুরোনো আর নতুনের মধ্যে বন্ধন হয়, কোনো বিবাদ নয়।

উদ্বোধনের দিন স্কুল, শহর আর আশপাশের গ্রামের মানুষ ভিড় করল। ব্যানারে লেখা ছিল, ‘লাইব্রেরি বাঁচুক, শহর বাঁচুক।’ মঞ্চে প্রধান অতিথি ছিলেন কেউ না, কারণ হাবিব স্যার বলেছিলেন, ‘এই দিনে প্রধান অতিথি হলো বই।’ সবাই হেসেছিল, কিন্তু কথাটা সত্য। শিশু, শিক্ষক, দোকানি, চাকুরিজীবী সবাই বই হাতে নিয়ে দাঁড়াল। কেউ কেউ নতুন বই দিল, কেউ পুরোনো বই। কেউ কবিতার বই, কেউ গণিত, কেউ ইতিহাস, কেউ কৃষি, কেউ শিশুতোষ গল্প। রাফি একটি ছোট্ট বক্তৃতা দিল। এবার তার ভয় ছিল না। সে বলল, ‘আজ আমরা শুধু একটি ঘর খুলি নি। আমরা নিজেদের ভিতরে একটা দরজা খুলেছি।’

তখন সন্ধ্যার আলো লাইব্রেরির ভেতর দিয়ে ঢুকে বইয়ের মলাটে, মানুষের চোখে, ধুলোহীন টেবিলে, আর নীল খাতার পাতায় পড়ে ছিল। সেই আলো এমন শান্ত, এমন উজ্জ্বল ছিল যে মনে হচ্ছিল, শহরটি বহুদিন পরে নিজের শ্বাস ফিরে পেল।

কিন্তু গল্পটি এখানেই শেষ হয়ে যায় না। বরং এখান থেকেই তার আসল শুরু। কারণ যে শহর বই বাঁচায়, সে শহর মানুষ বাঁচাতে শেখে। আর যে কিশোর প্রশ্ন করতে শেখে, সে একদিন কেবল ছাত্র থাকে না; সে সাক্ষী হয়, নির্মাতা হয়, কখনো কখনো প্রতিরোধের নামও হয়ে ওঠে।

কয়েক মাস পরে রাফি আবার লাইব্রেরিতে বসে ছিল। সামনে খোলা একটি বই, পাশে চায়ের কাপের উষ্ণতা, আর দেয়ালে টাঙানো পুরোনো ছবির নিচে একটি নতুন ফলক, ‘এই লাইব্রেরি শহরের মানুষের উদ্যোগে সংরক্ষিত।’ রাফি জানালার বাইরে তাকাল। মাঠে কয়েকজন ছোট ছেলে ক্রিকেট খেলছে। দূরে নদীর বাঁকে সন্ধ্যা নেমে আসছে। বাতাসে কাশফুলের মতো ধুলা উড়ছে।

রাফি তার নীল খাতা খুলল। নতুন পাতায় সে লিখল,

‘সব যুদ্ধের অস্ত্র এক রকম নয়। কখনো তা স্বাক্ষর, কখনো পোস্টার, কখনো নীরব অধ্যবসায়, কখনো এক মুঠো ইট, কখনো একটি বই। আর সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো, ভালোবাসা না, বরং দায়িত্ববোধ।’

লেখা শেষ করে সে হাসল। তারপর খাতাটি বন্ধ করে বুকের কাছে রাখল। তার মনে হলো, কাশীপুর আজ শুধু একটি শহর নয়; একটি শিখে নেওয়া বাক্য। এই বাক্য বলে, কিছু জিনিস সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয়, কিন্তু মূল্য হারায় না। কিছু জায়গা ইট দিয়ে তৈরি, কিন্তু তাদের ভিতরে মানুষের স্বপ্ন থাকে। আর কিছু কিশোর, যারা শুরুতে শুধু নীরব থাকে, তারাই একদিন শহরের সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠ হয়ে ওঠে।

রাত নামল। লাইব্রেরির আলো জ্বলল। আর সেই আলোয়, রাফির নীল খাতার পাতার মতো, শহরের ভবিষ্যৎ একটুখানি নরম, একটুখানি উজ্জ্বল, আর অনেকখানি আশাবাদী হয়ে উঠল।

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...