নদীর পাড়ে ছোট্ট শহর কাশিয়ানীর শেষ মাথায়, যেখানে
কাঁচা রাস্তা গিয়ে থেমেছে কাশফুলের ভেতর, সেখানে আমাদের স্কুলটা ছিল। স্কুলের নাম পুরোনো,
কিন্তু গাছগুলো বড়, মাঠটা বিস্তৃত, আর দুপুরের রোদে বারান্দার ধুলো এমন ঝিলমিল করত,
যেন কারও পুরোনো স্মৃতি এখনো সেখানে বেঁচে আছে।
আমি তখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। আমি রোহান। পড়াশোনায়
খুব খারাপ ছিলাম না, কিন্তু খুব ভালোও না। মাঝামাঝি ধরনের ছেলেদের যেমন হয়, না শিক্ষকরা
খুব আদর করে, না খুব বকাঝকা করে, আমিও তেমনই ছিলাম। আমার জীবনের সবচেয়ে কাছের দুইজন
ছিল তুষার আর নিলয়। তুষার ছিল চুপচাপ, বইপাগল, আর নিলয় ছিল উল্টো, হাসিখুশি, দৌড়ঝাঁপে
ভরা, আর সব কথায় এমন একটা উজ্জ্বলতা রাখত যে মন খারাপ থাকলেও তার পাশে গেলে খানিকটা
হালকা লাগত।
আমাদের তিনজনের বন্ধুত্বের একটা অদ্ভুত নিয়ম ছিল।
তুষার বলত, ‘আমি ভাবি।’
নিলয় বলত, ‘আমি করি।’
আর আমি বলতাম, ‘আমি দেখে নেই।’
এই তিনজনের মধ্যে কে যে বেশি জরুরি, সেটা আমরা কেউ
কখনো বলিনি। তবে সত্যি বলতে, আমরা তিনজনই ছিলাম একে অন্যের অসম্পূর্ণতা।
সেই বছরের বর্ষা একটু অদ্ভুত ছিল। বৃষ্টি নামত হঠাৎ,
আকাশ যেন হেডমাস্টারের মতো হুকুম দিত, এখনই ভিজে যাও! স্কুল ছুটির পর মাঠে পানি জমে
থাকত, আর আমরা ছাতা মাথায় নিয়ে নদীর ধার দিয়ে হাঁটতাম। আমাদের স্কুলের পেছনে একটা পুরোনো
তালগাছ ছিল, আর তার পাশেই ভাঙা ইটের দেয়াল। সেখানেই আমরা প্রায় প্রতিদিন বসতাম। তুষার
বই পড়ত, নিলয় গল্প করত, আর আমি মাঝেমধ্যে দুটোই শুনতাম।
একদিন বর্ষার শেষ বিকেলের দিকে আমাদের ক্লাসে নতুন
একজন ছাত্রী এলো। তার নাম সে, না, আসলেই ‘সে’ নামে কেউ ছিল না। কিন্তু প্রথম দিনেই
আমরা যে মেয়েটিকে দেখলাম, তাকে আমাদের চুপচাপ মনে হয়েছিল, যেন তার নিজের নামের চেয়েও
বড় কিছু সে বহন করছে। শিক্ষক তাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন, সায়রা। কিন্তু আমি, তুষার আর
নিলয়, প্রথম কয়েকদিন তাকে মনে মনে শুধু ‘সে’ বলেই ডাকতাম।
কেন?
কারণ, সে ছিল যেন দূরের এক রহস্য, চোখে মুখে অদ্ভুত ধরনের স্থিরতা, আর কথা কম, কিন্তু
তাকালে মনে হতো সে কোনো না কোনো কথা লুকিয়ে রেখেছে।
সে প্রথম বেঞ্চে বসত। ক্লাসে খুব কম কথা বলত। কারও
সঙ্গে হাসত না, তবে রাগও করত না। তার খাতার পাতা সবসময় খুব পরিপাটি, হাতের লেখা ঝরঝরে।
যে কেউ দেখে বুঝতে পারত, তার ভেতরে একটা নিয়ম আছে, একটা শৃঙ্খলা আছে, কিন্তু সেই শৃঙ্খলার
ভিতর কোথাও দুঃখও জমে আছে।
নিলয় প্রথম বলল, ‘ওর চোখে দেখেছ? মনে হয় কেউ ওকে খুব
রাগিয়ে দিয়েছে।’
তুষার বলল, ‘না, ওর চোখে রাগ না, অভিমান।’
আমি বললাম, ‘দুটোর মধ্যে তফাৎ কী?’
তুষার একটু হেসে বলল, ‘রাগ বাইরে পড়ে, অভিমান ভেতরে থেকে যায়।’
সেদিন কথাটা শুনে আমি অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলাম।
সায়রা আমাদের সঙ্গে তেমন মিশত না। তবে একদিন লাইব্রেরিতে
আমি একা বসে ছিলাম। বৃষ্টির কারণে বাইরে মাঠে যাওয়া যায়নি। পুরোনো বইয়ের ঘ্রাণে ভরা
সেই লাইব্রেরিতে হঠাৎ সে এসে দাঁড়াল। আমি দেখলাম, তার হাতে একটা ভিজে খাতা।
সে বলল, ‘তুমি কি এই খাতাটা শুকানোর জন্য কারও কাছে দেবে?’
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন?’
সে একটু নিচু স্বরে বলল, ‘ভাইয়ের লেখা আছে।’
তারপর আর কিছু না বলে সে খাতাটা টেবিলের ওপর রেখে
চলে গেল।
আমি খাতাটা খুলিনি। শুধু বুঝলাম, এই মেয়ে সাধারণ না।
পরদিন আমি, তুষার আর নিলয় মাঠের পাশে বসে খাতার কথা
আলোচনা করছিলাম। নিলয় বলল, ‘ভাইয়ের লেখা মানে কী? ভাই কি কবিতা লেখে?’
তুষার বলল, ‘হতে পারে। আর যদি কবিতা হয়, তবে ও লুকাচ্ছে কেন?’
আমি বললাম, ‘কারণ হয়তো সেটা শুধু কবিতা না।’
সেদিনই প্রথম আমরা বুঝলাম, সায়রার ভেতরের নীরবতা শুধু
লাজুকতার নয়। ওর নীরবতার ভেতরে একটা আড়াল ছিল।
কয়েকদিন পর স্কুলে এক বড় ঘটনা ঘটল। আমাদের বার্ষিক
প্রতিযোগিতা আসছে। বাংলা রচনা, আবৃত্তি, গান, বিতর্ক, সবকিছুর তালিকা দেওয়া হলো। আমাদের
ক্লাসের শিক্ষক বললেন, ‘এ বছর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যে সবচেয়ে ভালো রচনা লিখবে, তার
লেখাটা স্কুল ম্যাগাজিনে ছাপা হবে।’
নিলয় সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘রোহান লিখবে।’
আমি বললাম, ‘আমি পারব না।’
তুষার শান্তভাবে বলল, ‘পারবি। কিন্তু আগে ভাবতে হবে কী নিয়ে লিখবি।’
সেদিন বিকেলে আমি, তুষার আর নিলয় তালগাছের নিচে বসে
ছিলাম। মাঠের ওপাশে আকাশ লাল হ’য়ে আসছিল। নিলয়ের মাথায় হঠাৎ একটা খেয়াল এল।
‘আমরা তিনজন মিলে একটা গল্প লিখলে কেমন হয়?’
আমি হেসে বললাম, ‘তিনজন মিলে গল্প? গল্পে তো একটা লেখক থাকে।’
তুষার বলল, ‘কিন্তু জীবনেও তো একটা মানুষ একা হয় না। তার সঙ্গে থাকে আরেকজন, বা আরও
অনেকে। মানুষ একা লিখলেও তার লেখার মধ্যে অন্য মানুষের ছাপ থাকে।’
কথাটা আমার মনে গেঁথে গেল।
আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, স্কুল ম্যাগাজিনের জন্য একটা
গল্প লিখব। কিন্তু গল্পের বিষয় কী হবে?
নিলয় বলল, ‘সাহসী ছেলের গল্প।’
তুষার বলল, ‘না, হারানো জিনিস খোঁজার গল্প।’
আমি চুপ করে বসেছিলাম। হঠাৎ আমার মনে পড়ল সায়রার সেই ভেজা খাতা। আমি বললাম, ‘একজন মানুষ
আর তার লুকানো কষ্টের গল্প হলে কেমন হয়?’
তুষার মাথা নেড়ে বলল, ‘এটাই ভালো।’
নিলয় বলল, ‘কিন্তু সেটা আবার কার গল্প?’
আমি বললাম, ‘কারও না। সবার।’
আমাদের তিনজনের কাজ ভাগ হয়ে গেল। তুষার প্লট বানাল,
নিলয় চরিত্রদের নাম ঠিক করল, আর আমি ভাষা সাজালাম। কিন্তু যতই লিখি, ততই মনে হচ্ছিল
কিছু একটা নেই। গল্পে প্রাণ আসছে না। চরিত্র আছে, ঘটনা আছে, কিন্তু হৃদয় নেই।
ঠিক সেই সময় স্কুলের মাঠে একটা ঘটনা ঘটল, যা আমাদের
সবকিছুকে বদলে দিল।
স্কুলের পুরোনো লাইব্রেরিতে একজন নতুন শিক্ষক এসেছিলেন,
মিস কাজী। তিনি ছিলেন অল্পবয়সী, কিন্তু চোখে ছিল অনেক অভিজ্ঞতার নরম আলো। একদিন তিনি
আমাদের বললেন, ‘গল্প লিখতে হলে আগে মানুষের মুখ পড়তে শেখো। মানুষের মুখে শুধু হাসি
থাকে না, ভেতরের যুদ্ধও থাকে।’
সেদিন ক্লাস শেষে আমি সাহস করে সায়রাকে একটা প্রশ্ন
করলাম।
‘তুমি কি গল্প পড়ো?’
সে আমাকে দেখল। দীর্ঘক্ষণ দেখল। তারপর খুব আস্তে বলল, ‘আমি গল্প লিখি।’
আমি অবাক হয়ে গেলাম।
‘তাহলে তুমি খাতাটা…’
সে মাথা নিচু করে বলল, ‘ওটা আমার ভাইয়ের জন্য লেখা।’
‘ভাই কোথায়?’
সে বলল না। শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
পরের সপ্তাহে আমরা জানতে পারলাম, সায়রার বড় ভাই আরিফ।
দুর্ঘটনায় তার চলাফেরার ক্ষমতা নষ্ট হয়েছে। এখন সে বাড়িতেই থাকে, খুব কম কথা বলে, আর
কারও সঙ্গে দেখা করতে চায় না। সায়রা প্রতিদিন স্কুল শেষে বাড়ি ফিরে তার জন্য খাবার
নিয়ে যায়, বই পড়ে শোনায়, কিন্তু ভাই যেন নিজের ভেতরেই ডুবে যাচ্ছে।
সেদিন আমি বুঝলাম, তার ভেতরের নীরবতার নাম আসলে শোক।
আমি বিষয়টা তুষার আর নিলয়কে বললাম। নিলয় চুপ করে গেল।
তুষার অনেকক্ষণ কিছু বলল না। তারপর ধীরে বলল, ‘তাহলে আমাদের গল্প সায়রার থেকে ধার নিতে
হবে না। আমরা ওকে সাহায্য করতে পারি।’
কীভাবে?
নিলয় বলল, ‘তাকে বলব, আমাদের সঙ্গে লিখতে।’
তুষার বলল, ‘না। আগে ওকে বুঝতে হবে, আমরা ওর কষ্টকে গল্প বানাতে আসিনি।’
আমি বললাম, ‘তাহলে?’
তুষার উত্তর দিল, ‘তাহলে ওকে বলতে হবে, ওর ভাইয়ের জন্য একটা চিঠি লেখে, যেটা সবাই পড়তে
পারে।’
সেটা ছিল ভালো ধারণা।
বিকালে সায়রাকে আমরা শিমুল গাছের নিচে ডেকে আনলাম।
সে এসেছিল একটু সন্দেহ নিয়ে। নিলয় সরাসরি বলে ফেলল, ‘আমরা একটা গল্প লিখছি। কিন্তু
সেটা ঠিক হচ্ছে না। তুমি আমাদের সাহায্য করবে?’
সায়রা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আমি?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। কারণ গল্পটা যেন সত্যি হয়।’
তাহলে সে প্রথমে কিছুক্ষণ হাসল না। চোখে জলও এল না।
শুধু বলল, ‘আমি তো কাউকে গল্প শোনাই না।’
তুষার শান্তভাবে বলল, ‘কখনো কাউকে বলোনি বলেই হয়তো এখন বলা দরকার।’
সেদিনের পর থেকে সায়রা আমাদের সঙ্গে বসতে শুরু করল।
সে তার ভাই আরিফের কথা বলত। বলত, আরিফ আগে খুব ভালো বাঁশি বাজাত। স্কুলে নাটকে অভিনয়
করত। দুর্ঘটনার পর সে আর কিছুই করছে না, যেন নিজের শরীরের ভাঙন তার মনকেও ভেঙে দিয়েছে।
সায়রা বলত, ‘আমি ওকে বলি, তুমি আবার বাজাও। সে বলে,
এখন আর কোনো সুর বের হয় না।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কি রাগ করো?’
সে বলল, ‘রাগ করি না। ভয় পাই। ও যদি সত্যি সত্যি বিশ্বাস করে যে তার ভেতরে আর কিছু
নেই?’
তখন তুষার বলল, ‘তাহলে তোমার কাজ হলো তাকে মনে করিয়ে
দেওয়া, মানুষ ভেঙে গেলে শেষ হয়ে যায় না।’
সায়রা চুপ করে রইল। তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ
বলল, ‘তোমরা কি জানো, আমার ভাই একসময় একটা কবিতা লিখেছিল?’
নিলয় উৎকণ্ঠায় বলল, ‘কী কবিতা?’
সে মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘আমি, তুমি ও সে।’
আমরা তিনজন একসঙ্গে তাকিয়ে রইলাম।
সে বলল, ‘ও বলেছিল, মানুষ কখনো একা থাকে না। তার মধ্যে ‘আমি’ থাকে, পাশে থাকে ‘তুমি’,
আর দূরে দাঁড়িয়ে থাকে ‘সে’, যে সবসময় অপরিচিত মনে হয়, কিন্তু আসলে একদিন সেই-ই সবচেয়ে
কাছের হ’য়ে যায়।’
কথাটা শুনে আমি কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, ‘তাহলে আমাদের
গল্পের নাম এটাই হোক?’
সায়রা মাথা নেড়ে বলল, ‘হোক।’
সেই থেকে আমাদের গল্পের নাম হয়ে গেল ‘আমি, তুমি ও
সে’।
তুষার গল্পের ভিতর একটা ছেলেকে আনল, যে চুপচাপ ছিল। নিলয় আনল আরেক ছেলেকে, যে হাসত,
কিন্তু ভিতরে ভয় লুকিয়ে রাখত। আমি আনলাম একজন মেয়েকে, যে অন্যের জন্য বাঁচত। আর শেষে
আমরা বুঝলাম, গল্পের সেই ‘সে’ আসলে একজন আলাদা মানুষ নয়। ‘সে’ হলো মানুষের ভেতরের সেই
অংশ, যাকে আমরা চিনতে পারি না, যতক্ষণ না কেউ ধৈর্য ধরে পাশে বসে থাকে।
কিন্তু গল্প লেখা সহজ ছিল না। তাড়াহুড়োতে লেখা যায়
না এমন গল্প, যেখানে হৃদয় জড়ানো থাকে। আমরা প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে লিখলাম। কয়েকবার কেটেছি,
কয়েকবার নতুন করে লিখেছি। কখনো নিলয় বলে, ‘এখানে হাসি কম,’
তুষার বলে, ‘না, এখানে অনুভব কম।’
আমি বলতাম, ‘না, এখানে সত্যি কম।’
শেষ পর্যন্ত গল্পটা দাঁড়াল।
সে ছিল একটা ছেলে, যার নাম আরাফ। এক দুর্ঘটনায় তার হাঁটার ক্ষমতা চলে যায়। সে ভাবতে
থাকে, জীবন বুঝি থেমে গেছে। তার ছোট বোন নীরা তাকে রোজ নতুন গল্প শোনায়, কিন্তু আরাফ
শোনে না। একদিন নীরা তার হাতে একটা বাঁশি দেয়। আরাফ বাঁশি বাজাতে পারে না। সে বলে,
‘আমি পারি না।’
নীরা বলে, ‘আজ না পারলেও একদিন পারবে।’
তখন ছেলেটা প্রথম বুঝতে পারে, তার শরীর থেমেছে, কিন্তু তার স্বপ্ন থেমে যায়নি।
গল্পের শেষে আরাফ শুধু বাঁশি বাজায় না, গল্প লেখে,
আর নীরা তাকে বলে, ‘তুমি আবার শুরু করেছ।’
শেষ লাইনে আমরা লিখেছিলাম:
‘মানুষের জীবনে কখনো কখনো সে-ই সবচেয়ে আপন হয়, যে একদিন শুধুই ‘সে’ ছিল।’
স্কুল ম্যাগাজিনে গল্পটা ছাপা হলো। শিক্ষকরা প্রশংসা
করলেন। মিস কাজী বললেন, ‘তোমাদের লেখায় তাড়না আছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, মানবিকতা
আছে।’
তবে সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটল আরও পরে।
একদিন দুপুরে আমরা শুনলাম, সায়রার ভাই আরিফ স্কুলে
এসেছে। সবাই অবাক। সে খুব জড়তা নিয়ে হেঁটে এল। হাতে একটা পুরোনো বাঁশি। মুখে বহুদিন
পরের মতো একরকম শীতল সংকোচ।
সে সোজা আমাদের দিকে তাকাল না, প্রথমে সায়রার দিকে তাকাল।
তারপর বলল, ‘তুই কি এই গল্পটা লিখেছিস?’
সায়রা মাথা নিচু করে বলল, ‘আমি একা না।’
আরিফ হাসল। সেই হাসি ছিল দুর্বল, কিন্তু জীবন্ত।
সে বলল, ‘পড়ে শেষ করার পর মনে হলো, আমি এখনও শেষ হইনি।’
তারপর সে বাঁশিটা ঠোঁটে তুলল।
প্রথমে শব্দ এল না।
দ্বিতীয়বার এল খুব হালকা সুর।
তৃতীয়বার পুরো মাঠে ভেসে উঠল একটা কাঁপা, ভাঙা, কিন্তু অদ্ভুত সুন্দর সঙ্গীত।
আমরা কেউ কথা বলিনি।
নিলয় শুধু চোখ বড় করে তাকিয়ে ছিল।
তুষার চুপচাপ মাটির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসেছিল।
আর আমি?
আমি যেন প্রথমবার বুঝলাম, গল্প আসলে বইয়ের পাতায় থাকে না। গল্প থাকে মানুষের অন্ধকারে,
মানুষের পুনর্জাগরণে, মানুষের ফেরা-না-ফেরার মাঝখানে।
সায়রা বাঁশির সুরের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে তখন
আর আগের সেই ভয় ছিল না। সেখানে ছিল একটু আলো। অনেকটা দূরের, কিন্তু পরিষ্কার।
আরিফ বাজিয়ে গেল, আর আমরা জানলাম, কোনো ভাঙনই চূড়ান্ত নয়, যদি পাশে কেউ থাকে।
সেদিন স্কুল ছুটির পরে আমরা তিনজন, আমি, তুষার আর
নিলয়, আবার তালগাছের নিচে বসেছিলাম। কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না। দূরে নদীর পাড়ে সন্ধ্যার
আলো নামছিল।
নিলয় হঠাৎ বলল, ‘জানো, আজ মনে হচ্ছে আমরা সত্যি একটা গল্পের ভেতর ছিলাম।’
তুষার বলল, ‘ছিলাম না। আছি।’
আমি বললাম, ‘কীভাবে?’
তুষার আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যে গল্প মানুষকে বদলায়, সেটা শেষ হয়ে যায় না।’
আমি বুঝলাম, সে ঠিকই বলেছে।
কারণ সেদিন আমাদের বন্ধুত্ব আরেকটু বড় হল। শুধু তিনজনের
ছিলাম না আমরা। সায়রা এসে আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গেল। আরিফও হয়ে গেল। এমনকি মিস কাজী,
লাইব্রেরির পুরোনো বইগুলো, স্কুলের মাঠের ঘাস, বর্ষার বিকেল, সবাই যেন সেই গল্পের অদৃশ্য
চরিত্র হয়ে উঠল।
তখন বুঝলাম, ‘আমি’ কখনো একা হয় না। ‘তুমি’ ছাড়া সে
অসম্পূর্ণ। আর ‘সে’, যাকে আমরা অচেনা ভাবি, ঠিক সময় এলে সবচেয়ে আপন মানুষ হয়ে ওঠে।
বছর শেষে স্কুলের ম্যাগাজিন বের হলো। প্রথম পাতায়
আমাদের গল্প। নিচে তিনজনের নাম। কিন্তু সবার শেষে একটা আলাদা নাম ছাপা হয়েছিল, সায়রা।
তার ভাই আরিফ যখন সেটা দেখল, সে শুধু বলল, ‘লেখকের নামের চেয়ে বড় হলো, কে কার ভেতর
আলো জ্বালাল।’
সেদিন সন্ধ্যায় আমি বাড়ি ফিরছিলাম। নদীর পাশে দাঁড়িয়ে
শেষবারের মতো আকাশ দেখলাম। সূর্য অস্ত যাচ্ছে, কিন্তু তারকময় আলো এখনো বেঁচে আছে।
আমার মনে হলো, জীবনও এমনই। একবার ডুবে যায়, আবার ওঠে। একবার নীরব হয়, আবার সুর খুঁজে
পায়।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন