শীতের শেষভাগ। শহরের বুকের ভেতরেও তখন একধরনের ধূসর
কুয়াশা লেগে থাকে, যেন
আকাশও ঠিকমতো জেগে উঠতে চায় না। ভোরের আলো জানালার কাচে এসে পড়ে, তারপরও ঘরকে উষ্ণ করতে পারে না। এমন এক ভোরে, পুরোনো
নীলচে ব্যাগটি কাঁধে তুলে নিল রায়হান। তার হাতে ছিল কয়েকটি বই, একটি খাতা, আর অনেক দিনের নীরবতা।
ঢাকার এক প্রান্তে, বুড়িগঙ্গার কাছাকাছি পুরোনো
লাইব্রেরিটির নাম ছিল ‘অন্বেষা পাঠাগার’। নামের মতোই সেটি ছিল এক ধরনের খোঁজের জায়গা, কেউ জ্ঞানের খোঁজে আসত, কেউ একাকিত্বের,
আর কেউ হারানো কিছুর। রায়হান সেখানে কাজ করত। কাজ বললেও সত্যিটা
একটু অন্যরকম; বই সাজানো, পুরোনো
পাণ্ডুলিপি গুছিয়ে রাখা, লাইব্রেরির নথি ঠিক রাখা,এসবের ভেতর সে যেন নিজের জীবনকে খুব সতর্কভাবে ভাঁজ করে রাখত।
রায়হানের জীবন খুব
বড় ছিল না, কিন্তু
খুব ছোটও ছিল না; বরং ছিল অসম্পূর্ণতার এক নিখুঁত রূপ।
তার বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। মুখে দাড়ির পাতলা রেখা, চোখে
এক ধরনের ক্লান্ত কোমলতা, আর কথায় অল্পতা। যারা তাকে
চেনেনি, তারা ভাবত সে নিশ্চয়ই স্বভাবতই গম্ভীর। কিন্তু
যারা তাকে জানত, তারা বুঝত, সে
গম্ভীর নয়, ভাঙা।
কারণ তার জীবনে
একবার একটি নাম এসে সব শব্দের অর্থ বদলে দিয়েছিল: নীরা।
নীরা ছিল বৃষ্টির
মতো, হঠাৎ এসে পড়ত,
চারপাশ ভিজিয়ে দিত, তারপর এমনভাবে
মিলিয়ে যেত যেন সে ছিলই না। রায়হানের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের
দিনগুলোতে, একই সাহিত্যসভায়। নীরা কবিতা পড়ত না শুধু,
কবিতার ভেতর দিয়ে হাঁটত। তার কথা বলার ভঙ্গি ছিল অদ্ভুতভাবে
মৃদু, কিন্তু তার চোখে এমন এক দীপ্তি ছিল, যাতে মনে হতো সে যা দেখছে, অন্যরা তা দেখছে
না। লোকেরা যখন প্রেমের কথা বলত, রায়হান প্রথমে হাসত।
প্রেমকে সে বড়লোকদের অবসর-সময় মনে করত, অথবা বইয়ের
পাতায় আটকে থাকা কোনো রোমান্টিক কল্পনা। কিন্তু নীরা তাকে শেখায়, প্রেম কখনোই সময়সূচি মেনে আসে না; সে আসে ঠিক
তখনই, যখন মানুষ সবচেয়ে অপ্রস্তুত।
তাদের প্রেম ছিল
নিঃশব্দ। না ছিল জাঁকজমক, না ছিল সামাজিক ঘোষণা। ছিল লাইব্রেরির পুরোনো জানালার পাশে বসে বিকেলের
আলো দেখা, ছিল চায়ের কাপের ওপরে ভেসে থাকা বাষ্প, ছিল কবিতার বইয়ে আঙুলের হালকা স্পর্শ, ছিল
হাঁটতে হাঁটতে অপ্রয়োজনীয় সব বিষয়ে কথা বলা। তারা দুজনেই খুব বেশি স্বপ্নবান
ছিল না; তারা শুধু জানত, একসঙ্গে
থাকা মানে পৃথিবীর অনর্থক কোলাহল থেকে সামান্য দূরে দাঁড়ানো।
কিন্তু জীবনের নকশা
মানুষের প্রেমের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।
নীরা একদিন হঠাৎ
বলে, ‘আমি চলে
যাচ্ছি।’
রায়হান প্রথমে
বুঝতে পারেনি। ‘কোথায়?’
‘চট্টগ্রামে,’
নীরা জবাব দিয়েছিল, ‘আমার মামার কাছে।
মা অসুস্থ। ওখানেই কিছুদিন থাকতে হবে।’
‘কবে ফিরবে?’
নীরা কিছুক্ষণ চুপ
করে ছিল। তারপর বলেছিল, ‘ফিরব কি না, সেটা এখনও জানি না।’
সেই বাক্যটি
রায়হানের বুকের মধ্যে একটা ছোট, অদৃশ্য পেরেকের মতো বিঁধে যায়। সে অনেক প্রশ্ন করতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি। প্রেমের অনেক অমোঘ ক্ষতি কথার আগেই ঘটে যায়; বাকি প্রশ্নগুলো পরে শুধু বাতাসে ভাসে।
নীরা চলে গেল।
প্রথমে চিঠি আসত, তারপর
চিঠি কমে গেল, তারপর চিঠি একেবারেই বন্ধ হ’য়ে গেল। রায়হান কল করত, ফোন বন্ধ পেত। খুঁজে
খুঁজে চট্টগ্রামের ঠিকানায় গিয়েছিল একবার, কিন্তু
সেখানে নীরাকে পেল না। মামা বললেন, ‘ওরা চলে গেছে। কোথায়
গেছে, জানি না।’ নীরার মায়ের
অসুস্থতার কথাও আর কেউ স্পষ্ট ক’রে বলল না। একটা
অসম্পূর্ণ বিদায়, এক অদ্ভুত শূন্যতা, এই ছিল তার সব প্রাপ্তি।
তারপর সাত বছর কেটে যায়।
বই, মানুষ, রাস্তা, ট্রেন, সিগন্যালের
আলো, সবকিছু চলতে থাকে। শুধু রায়হানের ভেতরে একটা নির্জন
ঘর থেকে যায়, যেখানে নীরার নাম ধুলোয় ঢাকা পড়ে থাকে।
সে আর প্রেমের কথাও বিশ্বাস করতে চায় না। তার কাছে প্রেম হ’য়ে ওঠে এমন এক জিনিস, যা সুন্দর, কিন্তু নির্ভরযোগ্য নয়। নীরার চলে যাওয়ার পর সে নিজেকে বোঝায়,
‘এটাই স্বাভাবিক। যা টেকে না, তা-ই
হয়তো সত্য ছিল না।’
কিন্তু সত্যির
সবগুলো রূপ তো চোখে দেখা যায় না।
একটি বর্ষামুখর
দুপুরে, যখন শহরের
আকাশ সীসার মতো ভারী, তখন ‘অন্বেষা
পাঠাগার’-এ এক নতুন পাঠিকা এল। সে খুব বেশি আলাদা
দেখাচ্ছিল না, সাদামাটা শাড়ি, কাঁধে
কাপড়ের ব্যাগ, চুল খোঁপায় বাঁধা, মুখে খুব মৃদু ক্লান্তি। কিন্তু তার হাঁটার ভঙ্গিতে এমন এক স্থিরতা ছিল,
যেন সে বহু দূর পেরিয়ে এসেছে, এবং আর
কোথাও তাড়াহুড়ো নেই। লাইব্রেরির রেজিস্টারে সে নিজের নাম লেখাল: তিথি
সে পুরোনো সাহিত্য, বিশেষ করে চিঠিপত্র আর
স্মৃতিকথা পড়তে চাইত। সপ্তাহে দু-তিনবার আসত। চুপচাপ বসে নোট নিত, কখনো বাইরে বৃষ্টি দেখত। রায়হান শুরুতে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি।
কিন্তু মানুষ যখন কোনো একাকিত্বকে অনেকদিন বহন ক’রে,
তখন অন্য কারো একাকিত্বও সে শনাক্ত করতে পারে। তিথির চোখেও ছিল
সেরকম কিছু, নিস্তব্ধ অথচ গভীর এক শূন্যতা।
একদিন তিথি জিজ্ঞেস
করল, ‘আপনাদের এখানে
কি পুরোনো পত্রিকা বা ব্যক্তিগত চিঠির সংগ্রহ আছে?’
রায়হান বলল, ‘অল্প কিছু আছে। আপনি কী খুঁজছেন?’
‘জানি না,’
তিথি হাসল, ‘হয়তো হারিয়ে যাওয়া কারো
শব্দ।’
এই উত্তরটি
রায়হানকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। যেন কেউ হঠাৎ তার বুকের ভিতরের অন্ধকার ঘরে আলো
ফেলেছে। সে তিথিকে পুরোনো আলমারির দিকে নিয়ে গেল। সেদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যা
পর্যন্ত তারা দুজন পাশাপাশি বসে কিছু চিঠি,
কিছু নোট পড়ল। কথার ভিড় ছিল না। কিন্তু নীরবতার মধ্যে একটা
সখ্য জন্ম নিল।
কয়েকদিন পর তিথি
বলল, ‘আপনি কি
বিশ্বাস করেন, কিছু মানুষ চলে গিয়েও থেকে যায়?’
রায়হান একটু থেমে
উত্তর দিল, ‘বিশ্বাস
করি। কিন্তু সেটা ভালোবাসার কারণে নয়। অভ্যাসের কারণে।’
তিথি মৃদু হাসল। ‘দুটোর মধ্যে সীমারেখা খুব পাতলা।’
সেই কথার পর থেকেই
তাদের দেখা বাড়তে লাগল। কখনো লাইব্রেরি বন্ধের পর, কখনো শ্যামবাজারের ভাজা চায়ের দোকানে, কখনো নদীর ধারে হাঁটতে হাঁটতে। তিথি ছিল স্কুলশিক্ষিকা। তিনি শিশুদের
পড়াতেন, কিন্তু নিজের জীবনের বিষয়ে খুব কম বলতেন।
রায়হান ধীরে ধীরে জানল, তিথিরও একটি অতীত আছে, একটি অসম্পূর্ণ বিয়ে, ভেঙে যাওয়া একটি
প্রতিশ্রুতি, এবং এমন একটি শহর যেখানে সে আর থাকতে
চায়নি। দু’জনের ইতিহাস ভিন্ন হলেও বেদনার ভাষা প্রায়
একই ছিল।
এদের সম্পর্ক
প্রথমে বন্ধুত্ব, পরে
নির্ভরতা, তারপর এমন এক কোমল ঘনিষ্ঠতা হয়ে উঠল, যেটি মুখে প্রকাশ না করলেও বাতাসে টের পাওয়া যায়। তিথি, রায়হানের বইয়ের তাক গোছাতে সাহায্য করত। রায়হান তিথির জন্য ধুলো পড়া
কবিতার সংকলন খুঁজে আনত। তারা একে অন্যকে ‘আপনি’ বলেই কথা বলত, অদ্ভুতভাবে, সেই দূরত্বই যেন কাছে আসার সেতু ছিল।
এক সন্ধ্যায়
বৃষ্টি নামল প্রচণ্ডভাবে। লাইব্রেরির ছাদে টুপটাপ শব্দে পানি পড়তে লাগল। বিদ্যুৎ
চলে গেল। অন্ধকারে শুধু জানালার পাশের রাস্তার আলো এসে পড়ছিল। তিথি বলল, ‘এই অন্ধকারে মানুষ সাধারণত কী
ভাবেন?’
রায়হান বলল, ‘যা হারিয়েছে।’
‘আর কী পেতে
চায়?’
‘যা
হারিয়েছে, সেটিকেই।’
তিথি চুপ করে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল, ‘আমি একবার খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, আর
কাউকে বিশ্বাস করব না।’
‘এখন?’
‘এখনও
পুরোপুরি পারিনি,’ তিথি বলল। ‘কিন্তু
কিছু মানুষ এমনভাবে কাছে আসে, যেন পুরোনো ক্ষতের ওপর নতুন
ব্যথা দেয় না, বরং একটু উষ্ণ হাত রাখে।’
রায়হান কিছু বলল
না। তার বুকের ভেতর কোথাও একটা বহুদিনের স্তব্ধ দরজা নড়ে উঠল।
সে রাতে বাড়ি ফিরে
রায়হান অনেকক্ষণ ঘুমোতে পারল না। নীরার মুখ,
তিথির কণ্ঠ, লাইব্রেরির ভেজা গন্ধ,
বৃষ্টির শব্দ, সব একত্র হ’য়ে তার ভিতরে এক অচেনা যুদ্ধ তৈরি করল। সে বুঝতে পারছিল, তার ভেতরে দু’টি অনুভূতি পাশাপাশি বাস করছে।
একদিকে অতীতের প্রতি একধরনের নিষ্ঠুর আনুগত্য, অন্যদিকে
নতুন ক’রে বাঁচার অজ্ঞাত আকুলতা।
কিছুদিন পর তিথি
হঠাৎ দু’দিনের জন্য
লাইব্রেরিতে এল না। তৃতীয় দিনে এসে সে আরও চুপচাপ ছিল। রায়হান জিজ্ঞেস করল,
‘কিছু হয়েছে?’
তিথি দীর্ঘশ্বাস
ফেলল। ‘আমার ভাই
এসেছে শহরে। বলেছে, আমি নাকি বেশি একা হ’য়ে যাচ্ছি। বাড়ি ফেরার কথা বলছে।’
‘আপনি যাবেন?’
‘জানি না,’
তিথি বলল। ‘বাড়ি কি সবসময় ফিরে
যাওয়ার জায়গা?’
রায়হান উত্তর দিতে
পারল না। কারণ সেই প্রশ্নের উত্তর সে নিজেও জানত না। তিথি বিদায় নিয়ে চলে গেল।
কিন্তু তার অনুপস্থিতি এমন ছিল যেন কেউ লাইব্রেরির ভিতর থেকে হঠাৎ একটা মোমবাতি
নিভিয়ে দিয়েছে। আলো থাকে, কিন্তু উষ্ণতা হারায়।
সেই রাতে রায়হান
পুরোনো নথিপত্রের আলমারি গুছাতে গিয়ে একটা বাদামি খাম পেল। খামের গায়ে কোনো নাম
নেই, শুধু হাতে লেখা
একটি তারিখ, সাত বছর আগের এক শীত সন্ধ্যা। কৌতূহলবশে খামটি খুলল। ভিতরে একটি চিঠি।
চিঠির হাতের লেখা
চেনা।
এত চেনা যে
রায়হানের হাত কেঁপে গেল।
নীরা।
সে পড়তে শুরু করল:
‘রায়হান,
যদি এই চিঠি তোমার
হাতে পৌঁছায়, তার
মানে আমি আর নিজেই পৌঁছাতে পারিনি। তোমাকে না বলে চলে যাওয়ার জন্য ক্ষমা চাইছি।
আমি তোমাকে ছেড়ে যাইনি; আমি লুকিয়ে গিয়েছিলাম। আমার মা
সত্যিই অসুস্থ ছিল, কিন্তু তার চেয়েও অসুস্থ ছিল আমাদের
ঘরের দেনা, বাবার পুরোনো ঋণ, আর
সেই ভয়, যা আমাকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দিত, আমি যাকে ভালোবাসি, তার জীবন আমি অন্ধকারের
দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারি।
আমার মামা আমাকে পুরনো এক ছোট শহরে নিয়ে
গিয়েছিলেন। সেখানে আমি কাজ করেছি, পড়িয়েছি, আর বেঁচে থাকার অভিনয় করেছি। তোমাকে লিখিনি, কারণ
জানতাম, একবার লিখলে ফিরে আসার সাহস আর থাকবে না। আমি
ভেবেছিলাম, দূরত্ব তোমাকে বাঁচাবে। কিন্তু অনেক বছর পরে
বুঝলাম, কিছু মানুষকে দূরে সরিয়ে নয়, সত্য বলে বাঁচাতে হয়।
এই চিঠি যদি তুমি
পড়ো, আমাকে ক্ষমা
করো না-ও পারো। আমি তার যোগ্য নই। শুধু জানো, তোমাকে আমি
ভুলিনি। তোমাকে ভুলে থাকা আমার সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল।
আরেকটি কথা বলতে
চাই। আমার এই শহরে আসা এক শিক্ষিকা আছে,
নাম তিথি। সে একসময় আমার পাশের বাড়িতে থাকত, পরে জীবনের পথে হারিয়ে যায়। হয়তো সে-ই কোনোভাবে তোমার কাছে পৌঁছে
গেছে। আমি তাকে তোমার কথা বলতাম না, কিন্তু হয়তো ভাগ্যই
আমাদের অপূর্ণ জায়গাগুলোকে জোড়া দিতে চেয়েছে।
,নীরা’
রায়হান চিঠিটা পড়ে
শেষ করল। তারপর অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। তার ভেতরে ক্রোধ এল না প্রথমে; এল বিস্ময়, তারপর বেদনায় মিশে থাকা দীর্ঘশ্বাস। সে অনুভব করল, তার ভিতরের যে অংশটি নীরাকে ঘৃণা ক’রে এতদিন
বেঁচে ছিল, সেটি হঠাৎ পাথরের মতো ভারী হ’য়ে গেছে। কারণ সে বুঝতে পারল, নীরার
অনুপস্থিতি ছিল অবহেলা নয়; ছিল ভয়। আর ভয় অনেক সময়
এমন মানুষকে দিয়েই সিদ্ধান্ত নেয়, যে ভালোবাসে সবচেয়ে
বেশি।
কিন্তু গল্প এখানেই
শেষ হয় না। মানুষ যখন দীর্ঘদিন কোনো ব্যথার সঙ্গে থাকে, তখন সত্য তার কাছে অনেকটা
দেরিতে আসে। আর দেরিতে আসা সত্য অনেকটা শীতের রোদ্দুরের মতো, আঁচ আছে, কিন্তু উষ্ণতা কম।
পরের দিন রায়হান
চিঠি নিয়ে তিথির খোঁজ করল। সে লাইব্রেরিতে এল না। স্কুলেও ছুটি বলে খবর এল। দু’দিন পরে রায়হান তিথির দেওয়া
ঠিকানায় গেল। একটি পুরোনো বাড়ি, উঠোনে ফুলের গাছ,
বারান্দায় শুকোতে দেওয়া কাপড়, আর একরকম
নীরবতা। দরজা খুলে তিথির ভাই বেরিয়ে এল। রায়হান চিঠির কথা বলল না। শুধু জিজ্ঞেস
করল, ‘তিথি কোথায়?’
ভাই কিছুক্ষণ
তাকিয়ে থেকে বলল, ‘ও
চট্টগ্রামে গেছে। মায়ের অসুখ বেড়েছে।’
চট্টগ্রাম।
শব্দটি রায়হানের
বুকের ভেতরে যেন পুরোনো কোনো দরজায় আবার আঘাত করল। সে বুঝতে পারছিল, জীবন কখনো কখনো একই শহরের নাম
দিয়ে আলাদা আলাদা ক্ষত তৈরি ক’রে।
সে পরদিনই
চট্টগ্রাম গেল। ট্রেনের জানালায় বাইরের গাছপালা, মাঠ, জল, মানুষ, সব ভেসে যেতে লাগল। পথের মধ্য দিয়ে
যেন তার ভেতরের সময়ও চলে যাচ্ছিল। চট্টগ্রাম স্টেশনে নেমে সে নীরার চিঠির কথা ভাবল,
তিথির সম্ভাব্য উপস্থিতির কথা ভাবল, আর
ভাবল, মানুষ কি বারবার একই জায়গায় হারাতে আসে?
তিথির মায়ের
বাড়ির ঠিকানা সে পেয়েছিল কষ্টে। সন্ধ্যার দিকে সেখানে পৌঁছে দেখল, উঠোনে আলো জ্বলছে। কিন্তু ভেতরে
এক অদ্ভুত শোকের ঘ্রাণ। তিথি বারান্দায় বসে ছিল, মুখে
নিঃস্বতার ছায়া।
রায়হান দাঁড়িয়ে
বলল, ‘আপনি চলে
গেলেন কেন?’
তিথি মাথা তুলল।
তাকে দেখে চমকাল না। যেন সে জানত, এই প্রশ্নের উত্তর একদিন আসবে।
‘মা খুব
অসুস্থ,’ তিথি বলল।
‘আমি সেটা
বুঝি। কিন্তু… আপনি বললেনও না।’
‘কারণ,’
তিথি গলা নামিয়ে বলল, ‘কিছু মানুষকে
বিদায় জানাতে গিয়েও মনে হয়, আর একবার বললে হয়তো
অন্যসব সত্যও বেরিয়ে পড়বে।’
রায়হান তার হাতে
থাকা বাদামি খামটা বাড়িয়ে দিল। ‘এটা আপনার?’
তিথি খামটা দেখে
যেন কেঁপে উঠল। সে চিঠি খুলে পড়ল। পড়তে পড়তে তার চোখের কোণে পানি জমল। শেষমেশ
সে বলল, ‘নীরা আমার
শৈশবের বন্ধু ছিল। সে খুব ভয় পেত। যে ভয় মানুষকে ভুল করতে শেখায়, সেই ভয়। আমি জানতাম সে আপনাকে ভালোবাসে। জানতাম, আপনাকে ছাড়া তার বাঁচা কঠিন হবে। কিন্তু তার নিজের জীবনও এক সময় আটকে
গিয়েছিল। সে আমাকে বলত, ‘আমি ফেরার মতো মানুষ না।’
আমি ভাবতাম, সময় একদিন তাকে ফিরিয়ে
আনবে।’
রায়হান চুপ।
তিথি বলল, ‘আমারও একটি সম্পর্ক ভেঙেছিল।
তখন নীরা পাশে ছিল। পরে আমি চলে যাই। আমরা দুজনেই পালিয়ে বেড়িয়েছি। কেউ কারো
কাছে সত্যি ক’রে ফিরতে পারিনি।’
রায়হান খুব আস্তে
জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে
আপনি আমাকে কেন কাছে আসতে দিলেন?’
তিথির চোখে এবার
কোনো নাটকীয়তা ছিল না, ছিল খোলা, নগ্ন সত্য।
‘কারণ আপনি
এমন একজন মানুষ ছিলেন,’ সে বলল, ‘যার ভেতর ব্যথা ছিল, কিন্তু নিষ্ঠুরতা ছিল না।’
সেই রাতে মা
ঘুমিয়ে গেলে তারা বারান্দায় বসে রইল। দূরে সমুদ্রের হাওয়া, মাঝে মাঝে ট্রেনের শব্দ,
আর আকাশে নরম চাঁদ। রায়হান জানত, সে যে
উত্তর খুঁজতে এসেছে, তা সম্পূর্ণ নয়। নীরা কোথায়,তার উত্তর পেয়েছে। কিন্তু কেন সে ফিরে এলো না, তা পুরোপুরি জানার উপায় নেই। তবু অদ্ভুতভাবে রায়হানের বুকের ভেতর থেকে
একটা দীর্ঘদিনের শীত নামতে লাগল।
তিথি বলল, ‘আপনি কি এখনও তাকে ভালোবাসেন?’
রায়হান অনেকক্ষণ
চুপ করে থেকে বলল, ‘জানি
না। হয়তো ভালোবাসা আর ব্যথা এতদিন একসঙ্গে থেকেছে যে তাদের আলাদা করতে পারছি না।’
‘আমি বুঝি,’
তিথি বলল।
‘আর আপনি?’
তিথি হাসল, কিন্তু সেই হাসি খুব নরম। ‘আমি কি করি জানেন? আমি মানুষের অসমাপ্ত
জায়গাগুলোকে সম্মান করতে শিখেছি।’
সকালের আগে আকাশ
একটু ফ্যাকাশে হল। তখন তিথি ধীরে ধীরে রায়হানের দিকে ফিরে বলল, ‘আমি আপনাকে একটা কথা বলি?’
‘বলুন।’
‘কিছু
মানুষকে জীবন প্রেমের জন্য পাঠায় না,’ সে বলল, ‘তাদের পাঠায় ক্ষত চিনতে শেখার জন্য। আর কিছু মানুষ আসে, যেন আপনি বুঝতে পারেন,কষ্টের পরও হৃদয়
সম্পূর্ণ পাথর হয়ে যায় না।’
রায়হানের চোখে জল
এল না, কিন্তু বুকের
ভিতর যেন এক নতুন আলো জ্বলে উঠল।
তিনি ফিরে এলেন
ঢাকায়। লাইব্রেরিতে আবার আগের মতো বই সাজাতে লাগলেন। কিন্তু সব কিছু আগের মতো রইল
না। পুরোনো নীরবতার ভেতরে এবার অন্যরকম শব্দ ছিল, হয়তো ক্ষমার, হয়তো মেনে
নেওয়ার। কিছুদিন পর নীরার আরেকটি চিঠি এলো, সে কোথাও
একটি ছোট স্কুলে পড়ায়। চিঠির শেষে শুধু লেখা ছিল: ‘আমাকে ক্ষমা না করলেও চলবে। শুধু জানো, আমি বেঁচে আছি। আর কেউ যদি বাঁচে, সেটা অনেক।’,নীরা
রায়হান সেই চিঠিটা
বুকের কাছে কিছুক্ষণ ধরে রাখল। তারপর জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে বিকেলের
আলো। রাস্তায় মানুষ চলেছে। গাড়ি যাচ্ছে। এক দোকানে কাচের গ্লাসে চা ঢালা হচ্ছে।
জীবন তার সাধারণ ভঙ্গিতে এগিয়ে চলেছে।
আর ঠিক তখন, তার ফোনে একটি বার্তা এলো।
তিথি: ‘লাইব্রেরির পুরোনো জানালার পাশের গাছটায় আজ কুঁড়ি এসেছে। আপনি
দেখেছেন?’
রায়হান জানালার
দিকে তাকাল। সত্যিই, টবের মাটির ভিতর থেকে একটি ছোট সবুজ কুঁড়ি জেগে উঠেছে। সে মৃদু হাসল।
তারপর লিখল:
‘দেখেছি। ফুল ফুটলে জানাবেন।’
সেই রাতে সে আর
পুরোনো ব্যথার সঙ্গে লড়েনি। সে বুঝতে পেরেছিল, প্রেমের সবচেয়ে বড় সার্থকতা হয়তো একসঙ্গে থাকা
নয়; বরং এমনভাবে অন্য একজনের জীবনে উপস্থিত হওয়া,
যাতে তার ভেতরের শীত কিছুটা কমে। কখনো মানুষ একে বিয়ে বলে,
কখনো বন্ধুত্ব বলে, কখনো নিঃশব্দ
সহযাত্রীতা। নাম কী, সেটা পরে। আগে দরকার উষ্ণতা।
বছর শেষে অন্বেষা
পাঠাগারের সামনে একটিমাত্র বকুলফুল পড়ে ছিল। রায়হান সেটি তুলে নিয়ে ভেতরে রেখে
দিল। তার মনে হল, কিছু
সৌন্দর্য জমা রাখা যায় না; তাকে স্মৃতির মতো বয়ে
বেড়াতে হয়।
তিথি একদিন বলেছিল, ‘কিছু মানুষ চলে গিয়েও থেকে
যায়।’
এখন রায়হান জানে, সেটা ঠিক। কিন্তু আরও একটি সত্য
সে শিখেছে: কিছু মানুষ আবার ফিরে আসে না বলেও, তাদের রেখে
যাওয়া সত্যের ভেতর দিয়ে আমরা নতুন ক’রে বাঁচতে শিখি।
আর প্রেম?
প্রেম হয়তো সেই
নদীর মতো, যা বারবার
নিজের পথ বদলায়, অথচ জল একই থাকে। সে কখনো ফিরে আসে
নীরার চিঠিতে, কখনো তিথির নীরব কণ্ঠে, কখনো পুরোনো লাইব্রেরির ধুলো পড়া শেলফে, কখনো
চায়ের কাপে ওঠা ভাপের মধ্যে। কিন্তু সবশেষে সে একটি সহজ কথা শেখায়,
ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়া নয়; হারিয়েও
মানুষ হওয়া।
একটি প্রেমের গল্প, যা একবার ভেঙেছিল, আবার অন্যভাবে জোড়া লেগেছিল, পুরোনো ক্ষত,
নতুন আলো, আর নদীর ওপারে থেমে থাকা একটি
নাম নিয়ে।
আর যদি খুব মন
দিয়ে শোনেন, শীতের
শেষে হালকা বাতাসে এখনও সেই নাম ভেসে আসে,
নীরা।
কিন্তু তার পাশে, একই বাতাসে, আরেকটি নামও ধীরে ধীরে জেগে ওঠে,
তিথি।
দুটি নাম, দুটি সময়, দুটি ভিন্ন বিদায়।
আর মাঝখানে, এক মানুষ, যে শেষ পর্যন্ত শিখেছিল, প্রেমের আসল রং হলো
ধৈর্যের মতো গভীর, আর ক্ষমার মতো নরম।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন