সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আমার কৈশোরঃ ‘হারানো এক রোদনের স্মৃতি’

 

আমার কৈশোরটা কিভাবে এসেছিল ? সে কি এসেছিল মেঘে ভর ক’রে কালো রঙে সম্পূর্ণ আকাশটা কেঁপে-কেঁপে;  না, এসেছিল সাদা আকাশের বু’কে নীল রঙ মাখিয়ে। সে রঙ কি ছড়িয়ে দিবে তার মতো ক’রে আমার বুকেও ! আমার রৌদ্রজ্জ্বল বুকের গভীরে, সে-কি জমে রবে আরও নিবিড় আর হিমশীতল হ’য়ে। অনেকগুলো সকালই এসেছিল আমার কৈশোর জীবনে। আমি কি মনে রেখেছি আমার কৈশোর জীবনের সবগুলো সকালের কথা ? সব সকাল কি একইভাবে এসেছিল আমার ওই ক্ষুদ্র জীবনে ! তারা কি একই ভাবে নাড়া দিয়েছিল আমাকে ! আমি, আমার কৈশোরের সব সকালের কথা মনে করতে পারি না; সব সকালের কথা আমার মনে পড়ে না। আমি বেঁড়ে উঠতে থাকি ক্রমান্বয়ে; কৈশোরকে পিছে ফেলে আমি এগিয়ে যাই আরও সামনের দিকে। অনেকগুলো দিন আর সকাল-সন্ধ্যা জড়িয়ে পড়ে আমার জীবনের সাথে। বৈশাখ, আষাঢ় শ্রাবণ গেঁথে থাকে তার অভ্যন্তরে। যেগুলো গেঁথে রয়েছে আমার আঁখিকোণে; তার স্মৃতি আর গভীর সৌন্দর্য, মাঝে মাঝে বিহ্বল ক’রে তোলে আমাকে। আমি কৈশোরে বেঁড়ে উঠি অনেকগুলো অপার সৌন্দর্যের মধ্যে দিয়ে। মাঘের বাতাস থেকেও বেশি কাঁপন জাগায় আমার মধ্যে, সেই কৈশোরে হারানো স্মৃতিগুলো। তাই মাঝে মধ্যে আমি যখন একা থাকি ফিরে যাই মিষ্টি মধুর সেই স্মৃতির কাছে। আমি চোখ খোলা রেখে সেই সব দৃশ্য দেখতে পাই; আমি চোখ বন্ধ করে তা আরও বেশি দেখতে পাই। আমার অনুভূতিতে তা গেঁথে থাকে আমার হয়ে। আমার হারানো স্মৃতিগুলো খেলা ক’রে যায় তার আপন মনে। আমার কৈশোরের সেই স্মৃতি আর সৌন্দর্যগুলো অনেক অনেক মূল্যবান হ’য়ে উঠে আমার কাছে; আমার মস্তিষ্কে আর গভীর হৃদয়ে। তখনও আমি সৌন্দর্যের খুব গভীরে নামতে শিখিনি; মাত্র অনুভব করতে শিখেছি সকাল আর সন্ধ্যার মতোআমার চতুর্দিকে যা-ই আমি দেখিনা কেন তাই আমার ভালোলাগে। সকাল, বিকাল ,সন্ধ্যা, নদী, খাল , বিল , প্রকৃতি সবই আমার কাছে অন্যরকম হ’য়ে দেখা দেয়। আমি চোখ দিয়ে তা গভীর ভাবে দেখি; তার থেকেও খুব বেশি দেখি আমার একটি মন দিয়ে, আমার একটি অনুভূতি দিয়ে। হয়তো তার জন্য আমার সব কিছু মনে পড়ে। অনেকের কাছে যা খুব সামান্য; মূল্যহীন, তা অনেক বেশি  মূল্যবান হ’য়ে উঠে আমার কাছে। আমি আমার সেই স্মৃতির সাথে মিশে থাকি; ভালোবাসি তাকে। আমি যদি আমার সেই সৌন্দর্যময় স্মৃতিকে ভালো না বাসতাম তা-কি হারিয়ে যেতো না আমার বুক থেকে ! আমার স্মৃতি থেকে ! আমার বুকটা ভ’রে যেতো না  নষ্টভ্রষ্ট পচা আবর্জনায় ? হয়তো কোনো এক সময় সেখান থেকে আর কোনো স্মৃতিই  জেগে উঠত না আমার মধ্যেই হারিয়ে যেতো আমার স্মৃতিগুলো; আমার মধুর আর সুখকর স্মৃতিগুলো, ফেলে আসা অতীত স্মৃতিগুলো। কিন্তু আমি আমার ওই চমৎকার স্মৃতিগুলো লুকিয়ে রাখি আমার বুকের গভীরে ; মনে, মস্তিষ্কে আমার বুকের গভীরে বেঁচে থাকে কচুরি ফুল, রক্তজবা, হাসনাহেনা ,কামিনী, গন্ধরাজ, শিমুল, শিউলি, টগর, কদম আরও কতো কি! এই ফুলগুলো আমি দেখে আসছি সেই শৈশব থেকে। এখনও মাঝে মাঝে দেখি, কখনো স্বপ্নে, বা কখনো বাস্তবেসব ফুল আজকাল আর দেখা যায় না; ফুলগুলো যেনো হারিয়ে গেছে আমাদের চারপাশ থেকে। আরও বেশি হারিয়ে গেছে আমাদের মন থেকে। আমি সবচেয়ে বেশি দেখেছি কচুরি ফুল। কচুরি ফুলের জন্য কোনো বাগান দরকার হয় না, পরিচর্যার দরকার নেই, তাই মালি-ও লাগে না এ ফুলের জন্য। শৈশবে আমি যখন গৃহ  থেকে বের হতাম তার আসে পাশের জরাজীর্ণ ডোবা, পুকুরগুলোতে সাদা আর হালকা নীল বর্ণের ফুলগুলোতে চারিদিক ভ’রে যেতো। মনে হতো সাড়া পৃথিবী যেন এ ফুলে ডুবে আছে। তখন ফুল বলেই ভালো লাগতোঅন্য ফুলগুলো যেমন রাজকীয়ভাবে প্রস্ফুটিত হতো ; তার থেকে অনেক পৃথক ছিল কচুরি ফুল। খুব ভোরে চোখ মেলে দেখা যেতো আমার এ প্রিয় ফুলটি। আলো বাড়ার সাথে সাথে সে যেন ম্লান হ’য়ে যেতো। হারিয়ে যেতো দিনের অন্য সময়ে, সূর্যের আলোয়। হাতের কাছে যতটা পাওয়া যেত; সেটাই খেলার উপকরণ হ’য়ে উঠতো আমাদের কাছে। আমাদের কৈশোরে কচুরি ফুলের সহজ লভ্যতা ছিল অনেক বেশি। এখন ইচ্ছা করলেও সেই পূর্বের ন্যায় আর দেখা যায় না আমার এ প্রিয় ফুলটি। গাঁদাকে দেখেছি দ্বিতীয় প্রিয় ফুল হিশেবে। হলুদ গাঁদা ফুল প্রিয় ছিল আমার সমবয়সী সকলের। হলুদ গাঁদা থেকে হালকা কাঁচা হলুদের রঙের গাঁদা আমার প্রিয়। জলে যেমন দেখা যেতো কচুরি ফূল; স্থলে ছিল গাঁদা। ফুলগুলো যেনো দেখা দিত জল আর স্থলের হ’য়ে। যার গৃহে হয়তো কিছুই ছিল না; কিন্তু ছোটো এক কর্নারে দেখা যেতো গাঁদা ফুলের বাগান। গাঁদা ফুলের বাগানটি সম্পূর্ণরুপে যেনো সাজিয়ে রাখতো জীর্ণ গৃহটিকে। গাঁদা ফুলের দিকে চোখ থেকেও বেশি অগ্রগামী হতো হাতটি। কখন যেনো কয়েকটি হাতের মধ্যে নিয়ে নিয়েছি সেদিকে কোনো খেয়ালই ছিল না। শাপলাও প্রিয় ফুল; হিজল ফুলের মতো। বাড়ির আশেপাশেই দেখা যেতো আরও কতো ফুল !                     

 

আমাদের বাড়িটি ছিল দু’টি অংশে বিভক্তএকটি পূর্বের অংশ; অপরটি পশ্চিমের। দোতলা কাঠের বিশাল ঘরটি ছিল অন্যান্য ঘর থেকে উঁচুতে দাঁড়িয়ে পূর্বে আমি ছিলাম পূর্বের। পশ্চিমের অংশের পুকুর পাড়ে ছিল সারি সারি খেজুর আর আম গাছ। গাছগুলো দাড়িয়ে ছিল দীর্ঘকায় হ’য়ে। আপন মহিমা জানানোই যেন তাদের একমাত্র কাজ। সেই খেজুর বাগানে ছিল মিষ্টি একটি গন্ধ। সব গাছ সমান ভাবে রস দিতো না। কোনটি দিতো খুব বেশি; কোনটি দিতোই না। কোন কোন গাছগুলো বেশি রস দিতো আমরা তা চিহ্নিত করে রাখতাম। সেই সব গাছের দিকেই আমাদের লক্ষ্য ছিল বেশি। কলসি ভরে উপচে পড়তো রস, সূর্যোদয়ের পূর্বেই। পুকুর পাড়ের বামদিকের তৃতীয় বা চতুর্থ গাছটি প্রথম হ’য়ে থাকতো সব সময়। কলসি থেকে সর্বদা রস মাটিতে পড়ে যেতো। মাটিটা সাদা হ’য়ে থাকতো রসের সাদা ফেনায়। সেই মাটিতে নাক নিলেও মিষ্টি গন্ধে ভ’রে যেত সব ইন্দ্রিয়। গাছটির শরীর জু’ড়ে একটি রেখা অঙ্কিত হ’য়ে থাকতো। রসের ফোঁটায় ফোঁটায় এটি তৈরি হয়ে যায়। এই বাগানে আর একটি গাছ ছিল; সে হতো দ্বিতীয়। অন্য গাছগুলো রসের পূর্ণতায় কখনোও তাদের সাথে পেরে উঠতো না। যিনি গাছ ঝোরেন তাকে ‘গাছি’ বলে; যিনি আমাদের ওই সব গাছ ঝুরতেন তাকে আমরা চাচা বলতাম। ওই শব্দের আবিধানিক অর্থ তখনও বুঝে উঠতে পারি নি। ওই চাচার বাড়িতে সারাদিন রস জ্বালানো হতো। বাড়িটির আশে-পাশে, সব সময় বাতাসে মিষ্টি একটি গন্ধ পাওয়া যেতো। গুড় থেকেও জ্বালানো রসের ঘ্রান আমাকে বিহ্বল ক’রে তুলতো। আমার নাক এখনও যেন সেই ঘ্রানে ভ’রে উঠেআমি মনে-মনে সেই বাড়িটির নাম দিয়েছিলাম ‘মিষ্টিবাড়ি’রসের দু’টো নাম ছিল। ‘কাঁচা রস’ আর ‘পাকা রস’; জ্বালানো রসকে ‘পাকা রস’ বলা হতো। যে রস থেকে তৈরি হয় গুড়। জ্বালানো রসের মতো এতো মিষ্টি গন্ধ আমি অন্য কিছুতে আজও পাইনি। মিষ্টি গন্ধ যে কতো তীব্র সুখকর হ’য়ে দেখা দিতে পারে আমি এখান থেকে তা বুঝে উঠতে পারি। তার ঘ্রান নিই নাক জুড়ে; ইন্দ্রিয়গুলো ভরিয়ে তুলি মিষ্টি একটি গন্ধ দিয়ে, তা হয়তো পৌঁছে যায় আমার মন ও মস্তিষ্কে পর্যন্ত। এতো মিষ্টি, সুখকর ঘ্রাণ আজও আমি অন্যকিছুতে পাই নই; নাক বন্ধ করলে আমি আজও সেই মিষ্টি গন্ধ পাই।           

 আমাদের সম্পূর্ণ বাড়িটি যেমন বিভক্ত ছিল পূর্ব আর পশ্চিমে; তেমনি দু’টো বড়ো পুকুর ছিল দু’পক্ষেই, যা আজও বিদ্যমান। পশ্চিমে থাকা পুকুরটি ছিল একান্ত পারিবারিক ভাবে সংরক্ষিতখুব বেশি মানুষের আনাগোনা ছিল না সেখানে। এক প্রকার নীরবতা বিরাজ করতো সর্বদা সেখানে। সারাদিন ওই পুকুরে কতোজন গোসল করেছে তা জানতো বাড়ির সবাই। যদিও সেই সংখ্যা খুব বেশি হতো না, চার বা পাঁচ; কখনো এসংখ্যাও হতো না। পশ্চিমাংশে বসোবাসকারী আমার এক চাচা ছিল এ পুকুরের নিয়মিয়ত স্নানার্থী। তিনি যখন ওই পুকুরে নামতেন, ভাসমান উপরের অংশ দু’হাত দিয়ে সরানোর চেষ্টা করতেন কয়েকশো বার। যেন পৃথিবীর সব আবর্জনা এই পুকুরে এসে জমা হয়েছে। তিনি পারলে হয়তো পৃথিবীর সব পুকুরের জমা শেওলা এভাবে সরিয়ে দিতেন। স্নানের পূর্বেই এ কাজে কেটে যেতো ঘণ্টা খানেক সময়। সম্পূর্ণ স্নানে মোট ঘণ্টা দু’য়েক সময় লাগতো। পূর্ব পাশের পুকুরটি ছিল সর্ব সাধারণের জন্য; আমরা ছিলাম এই পুকুরের স্নানার্থী। বাড়িতে প্রবেশের পথেই একটি কাচারি ঘর; ঘরটির সামনেই পূর্ব-পুকুর; আমরা ‘পূর্ব পাশের পুকুর’ বলতাম। পূর্ব পাশের পুকুর থেকেই আমরা জানতে পারতাম আজ কে বা কারা কারা পশ্চিমের পুকুরে গোসল করেছে। পূর্ব পাশের পুকুরে গোসল করার রয়েছে এক মজার ঘটনা। আমার বড়ো চাচা; বাড়ির ভিতরের ঘর থেকে পূর্ব পাশের মসজিদের পাশের একটি ঘরে থাকতেন বেশির ভাগ সময়। দিনের বেশির ভাগ সময় এই ঘরেই থাকতেন; রাতে তো থাকতেনই। আমাদের এই বৃহৎ বাড়িতে মানুষের আনাগোনা সর্বদা লেগেই থাকতো। কি সকাল, কি বিকাল বা কি রাত্রি। আমার চাচাদের নামগুলো বেশ অদ্ভুত ছিলকারো নাম ‘ভুনু’; কারো নাম ‘বাদশা’ আবার কারো নাম ‘বকু’, কারো নাম ‘পাখি’, আবার কারো নাম ‘কাজল’আমি আজ অবধি কারো নাম এ রকম শুনিনি। যাক ভালো হয়েছে ; এ নামগুলো কারো হ’লে তাকে হয়তো আমার ‘চাচা’ বলে সম্বোধন করতে হতো। ভুনু চাচা ছিলেন অদ্ভুত এক মানুষ। তিনি শব্দ সংখ্যায় বেশ সংযমী ছিলেন। সারা দিন তিনি হয়তো পাঁচটি বাক্য ব্যয় করতেন না। বোবাদের থেকেও তিনি  কম কথা বলতেন। বোবারাও তার থেকে বেশি কথা বলতো। আমার এই চাচাকে ভয় পেত না সম্পূর্ণ বাড়িতে; এমন মানুষ আমি একটিও দেখিনি। তিনি খুব ভয়ঙ্কর বা বীভৎস ছিলেন তা-ও নয়। পূর্বের পুকুরে তিনি গোসল করতেন সবার আগে বা সবার পরে। তিনি যখন গোসল করতেন পুরো পুকুরটি খালি হ’য়ে থাকতো। অন্যরা কখনো সেই পুকুরের নিকট আসার সাহস পেত না। বাড়ির সামনের রাস্তাটি পর্যন্ত নীরব হ’য়ে যেতো। এই চাচা অনেকটা গৃহবন্দী অবস্থায় দিন কাটাতেন। মানুষের সঙ্গ থেকে তিনি একাকী থাকতে পছন্দ করতেন। মসজিদ, পুকুর আর বাড়ি-এর মধ্যই আবদ্ধ ছিল চাচার জীবন। আমি কখনো এই চাচাকে কারো সাথে কথা বলতে বা হাঁটাহাঁটি করতে দেখিনি। যখনই দেখেছি, তখনই ওই গৃহে। সবচেয়ে অদ্ভুত একটি ব্যাপার ছিল, আমাদের মতো ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েরা যখন খুব দুষ্টমি করতো তখন যদি বলা হতো ‘ডাক দিবো’ তাহ’লে আমাদের বুঝতে বাকী থাকতো না কার কথা বলা হচ্ছে ! আমরা তখন এই চাচার ভয়ে বরফের মতো ঠাণ্ডা হ’য়ে যেতাম। হয়তো এই ভয় ছিল কোনো এক প্রকার শ্রদ্ধা, বিনম্র আর ভালোবাসার। 

 

বাড়ির পিছনের দিকে ছিল বিল আর বিল। বর্ষার মৌসুমে শুধু পানি আর পানি ছাড়া কিছুই দেখা যেতো না। ছোটো ছোটো ডিঙ্গি নৌকাগুলো সারি সারি ভাবে বাধা থাকতো আমাদের বাড়ির পশ্চিমের দিকে। এ ঘাটে এসে থামতো বড়ো বড়ো নৌকা, পাটের নৌকা। গ্রামের সমস্ত পাট এই সময় ব্যাপারীরা এসে ক্রয় করতেন। যোগাযোগের মাধ্যম হিশেবে নৌপথ-ই তখন এক মাত্র সম্বলপ্রয়োজনে কয়েকদিন তাঁরা এক ঘাটেই অবস্থান করেন। মাছ আর বিলের শাপলা তখন অনেক সহজলভ্য হ’য়ে উঠতো। বাইলা, বাতাসি, পুঁটি, মাগুর, শিং, টেংরা, তিতপুঁটি, চিতল, ফলি, কৈ, খোলিশা, চান্দা, শৌল, শরপুঁটি, টাকি ইত্যাদি মাছে আমাদের বাড়ির উঠানগুলো ভ’রে যেতো। মাছের মধ্যে চিংড়ি আর চান্দার গুড়ো শুকিয়ে বস্তা বন্দী করা হতো সারা বছরের জন্য। হিন্দু বাড়ির বড়ো সাকোর কাছে ভেসালের (বাঁশের সাথে জাল লাগিয়ে মাছ ধরার এক প্রকার প্রক্রিয়া বিশেষ) মাছ ছিল সবার জন্য উন্মুখতো। মধ্যেরাত থেকে শুরু হতো সেখানে অপেক্ষার তালিকা। বাড়ির কাছেই হাঁট থাকাতে অন্য সকলদের যেতে হতো আমাদের বাড়ির রাস্তা ধরে। সপ্তাহে দু’দিন বসতো বাগেরহাঁট রবি আর বুধবার। রেল লাইনের পাশ দিয়েই আমাদের যেতে হতো হাঁটে। অনেক উচু এখানকার ভূমিটা; তাই যতোই বর্ষা হোক না কেন পানি এখান পর্যন্ত কখনো পৌঁছত না। যারা হাঁটে আসতো, অনেক দূর দুরান্ত থেকে, এই বর্ষার সময় তাঁদের অনেক সুবিধা হতো। অন্য ঋতুতে তাঁদের পায়ে হেঁটে আসতো হতো; বর্ষার সময় নৌকাই হ’য়ে উঠতো তাঁদের একমাত্র বাহন। বিলের পানির প্রবাহটা হিন্দুবাড়ি পর্যন্ত আবদ্ধ থাকতো; তাই আমাদের কোনো ভয় ছিল না বর্ষা ঋতুতে। হাঁটের দিনে সমস্ত নৌকোগুলো হিন্দুবাড়ির চতুর্দিকে সারি সারি ভাবে বাঁধা থাকতো। আমাদের পশ্চিম পাড়ির রাস্তা ধ’রে তাঁদের যেতে হতো হাঁটে। শুধু হাঁটে নয়; তাঁদের যাতায়াতের একমাত্র পথই ছিল এটা। অন্য ঋতুতে অনেক দূর দূরান্ত থেকে তারা হেঁটে হেঁটে এ পথ দিয়েই বেড়িয়ে যেতো। আমার মনে পরে, আমি যখন অনেক ছোটো,  তাঁদের হাত ধরেই, হাঁট শেষে আমাদের বাড়ি পর্যন্ত আসতাম; যেহেতু তারা আমাদের বাড়ির রাস্তা দিয়েই যেতো। তাঁদের হেঁটে হেঁটে আরও অনেক দূর পর্যন্ত যেতে হতো। কখনো অনেক রাত হ’লে কয়েকজন মিলে উচ্চ স্বরে কথা বলতে বলতে বাড়ির দিকে পৌঁছে যেত। উচ্চ স্বরে কথা বলার একটা অর্থ ছিল; এতো গভীর অন্ধকার নেমে আসতো যে, একজন থেকে অপরজনের মুখটি পর্যন্ত দেখা যেতো না। এই সব পরিবেশে ভয় বা ভৃতি মন থেকে দূর করার জন্য প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক হাজারো আলোচনা করতে থাকতো পুরো রাস্তা জুড়ে। আমি যাদের হাত ধরে থাকতাম তাঁদের বেশির ভাগই থাকতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ি। কেনাকাটা শেষে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতাম; কে আমাদের বাড়ির রাস্তা ধরে যাবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ি হওয়ার কারণে তাঁদেরকে বেশ কিছুটা রাত করেই হাঁট থেকে বের হ’তে  হতো। বাড়ির বেশ কাছাকাছি এসে দু’দিকে দু’টো পথ ছিল। আমাকে যেতে হতো ডানদিকে আর তাঁদের সোজা। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর একটা ব্যপার ছিল এখানে। যেখান থেকেই পথটা পৃথক হতো সেখানে ছিল অনেক বড়ো একটা বাঁশ বাগান। ঠিক সেই বাঁশ বাগানের নিকট এসেই পথটা পৃথক হতো। সামান্য বাতাসেই বাঁশ বাগান থেকে একটি শব্দ ভেসে আসতো, চিক..চিক...চিকচিক...চিক..চিক। বাঁশ বাগানে এ রকম শব্দ সব সময় হ’য়ে থাকে; কিন্তু আমার মনে হলো  রাত্রে যেন আরও বেশি হ’য়ে থাকে। মনে মনে ভাবতাম বাঁশ বাগানটা আরও পিছে হলে কি হতো !    

 

বাড়ির খুব কাছেই ছিল বারাশিয়া নদী। এই নদীটা দেখতে অনেকটা জরাজীর্ণ ছিল। খুব করুন চেহারা ফুটে থাকতো নদীটার। তার দিকে তাকালে মনে হতো তাকে পরিপূর্ণ ভাবে বেড়ে উঠতে দেওয়া হয়নি; কেড়ে নেওয়া হয়েছে তার গতিময় প্রবাহকে। এটা যে একটা নদী, তা ভেবে আমি অনেক কষ্ট পেতাম। আমি ভাবতাম এটা বড়ো একটা খাল। নদীর যে রুপ থাকে তার কোনো কিছুই বিদ্যমান ছিল না বারাশিয়া নদীতে। অনেক দূর পর্যন্ত প্রবাহিত ছিল তার ধারা। অনেক দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে নদীটা চলে গেছে আমাদের চোখের সামনে দিয়ে, আমার হৃদয়ের ভিতর দিয়ে। জয়নগর, কাশিয়ানী, আলফাডাঙ্গা, সহস্রাইল, সাতৈর , বোয়ালমারী হ’য়ে আরও অনেক দূর পর্যন্ত সে চলে গিয়েছে। চলে গেছে একে-বেঁকে আমাদের গ্রাম, শহর, উপশহর দিয়ে আরও অনেক অনেক দূরে। যখনই কোনো না কোনো কাজে আলফাডাঙ্গা বাজারের দিকে গিয়েছি মহিষারঘোপের পথ ধরে; তাকিয়ে দেখেছি নদীটাকে। যতোটা না ভালো লাগতো তাকে দেখে; তার থেকে অনেক খারাপ লাগতো; কষ্ট লাগতো নদীটার জন্যআলফাডাঙ্গা ছিল ফরিদপুরের শেষ থানা, এর পরেই গোপালগঞ্জের অবস্থান। আমাদের রাস্তা থেকেই শুরু হয়েছে জেলা শহরের রাস্তা, একটা জেলার শুরু। দু’টো জেলাকেই আমরা পেয়েছি আপন ক’রে। যখন যাকে প্রয়োজন লেগেছে, ছুটে গেছি তার দিকেই। আমাদের দু’টো পা যেন দু’দিকেই ছিল। পৃথক হয়ে পরেনি তারা। গোপালপুর থেকে খুব বেশি দূরে ছিল না মধুমতি নদী। মধুমতিকে দেখা যেতো সব দিক থেকে। উত্তরে ফরিদপুর, পশ্চিমে নড়াইল জেলা। মধ্যেখানে জেগে আছি আমরা; কিংবদন্তী আর বিখ্যাত হ’য়ে। দাঁড়িয়ে আছি মাথা উঁচু ক’রে অন্যান্য সকল জেলা থেকে। শুধু মধুমতিই ছিল না এখানে, আরও ছিল বাঘিয়ার ,ঘাঘর, পুরাতন কুমার, কালিগঙ্গা, টঙ্গীখাল, দিগনার, বাগদা, কুশিয়ারা, মধুপুর, শৈলদহ, ছন্দা নদী ; যা অনেকটা গেঁথে ছিল স্বপ্নের সাথে ; জীবনের গভীরেমধুমতি আমাদের খুব কাছের নদী; প্রতিবেশীর মতো, তাই তার দিকেই এগিয়ে গেছি সবচেয়ে বেশি। দেখেছি তাকে দু’চোখ মেলে। মধুমতির চরে হেঁটেছি কৈশোরে অনেকবার; তার বুক জুড়ে শুধু বালু আর বালু। তাকিয়েছি চোখ মেলে যতদূর সীমানা যায়। তার বুক থেকে তুলে নিয়েছি গুচ্ছ গুচ্ছ বাদাম। মধুমতির বুকজুড়ে এতো পরিমাণ বালু থাকতো যেন এটা একটা মরুভূমি। প্রখর রোদে সে বালুর উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া অনেক কষ্টকর ব্যাপার ছিল। মধুমতিকে খুব একটা সুস্থ নদী মনে হতো না। মনে হতো সে মারা যাচ্ছে; কৃত্রিম ভাবে তাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। কিছুক্ষণ পরেই হয়তো মারা যাবে; কিন্তু মধুমতি মারা যায় না। দশকের পর দশক ধরে সে বেঁচে থাকে অসুস্থভাবে। মধুমতি কি বেঁচে আছে সুস্থ আর স্বাভাবিকভাবে ? আমার মধুমতি কি ভালো আছে অন্যসকল নদীগুলো থেকে ? তার ঢেউ আর চ্ছল চ্ছল শব্দ কি কাপিয়ে দিবে না আমার বুকটা !

আমি কি কেঁপে উঠবো তার গভীর আর নিঃসঙ্গ শব্দের তরঙ্গে ! একই সাথে কেঁপে যাবে আমার সমস্ত শরীর মন আর হৃদয়চিত্ত গভীর ঘুমের মধ্যে আমি কি শুনতে পাবো তার প্রবাহমান ধারার শব্দ ?

মধুমতি আমাদের কাছে শুধু নদী ছিল না; ছিল আমাদের স্বপ্ন, বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা। সে মিশে  ছিল জীবনের গভীরে, ভালবাসায়। বিশাল দু’টো ভূখণ্ডকে পৃথক করেছিল এ নদীটি। কিন্তু থেমে থাকেনি জীবনের গতিময়ধারা। সড়ক বা মহাসড়ক অতিক্রম করেনি তাকে। দাঁড়িয়ে আছে স্থির আর অবিচল হ’য়ে। ওপারে মামা বাড়ি আর এপাড়ে আছি আমরা। ছুটে গেছি তার দিকে; কখনো দিনে, কখনো সন্ধ্যায়, কখনো বা গভীর রাতে , কখনো বা আষাঢ়ের প্রবল ধারায়। উৎসবে বা গভীর দুঃখে গিয়েছি তার উপর দিয়ে। স্থির হ’য়ে তাকিয়েছি; ব্যথিত আর শূন্য মনে। মাঘের কুয়াশা ঢেকে দিয়েছে তার সব কিছুকে, গাঢ় সাদা চাদরের মতো আমাদের সম্মুখে। তারপরও তাকে চিনে নিয়েছি আপন আর প্রিয় বলে। দেখেছি তাকে প্রখর রোদে আর বর্ষার অজস্র জলধারে।  

খুব বেশি বিনোদন ছিল না আমার কৈশোরে। নিয়মিত মেলা বসতো বাড়ীর থেকে একটু দূরে। ওটাই ছিল সারা বছরের একমাত্র বিনোদন। পাগল হ’য়ে থাকতাম তার জন্য। কৈশোরে অনেক ক্ষুদ্র জিনিসকে অনেক বৃহৎ মনে হতো; আর এখন অনেক বৃহৎ বৃহৎ জিনিস বা ঘটনাকে অনেক তুচ্ছ বলে মনে হয় আমার নিকট। কৈশোর অনেক সুন্দর আর আনন্দদায়ক; কৈশোরের জন্য। তার স্মৃতি অনেক আবেগ আপ্লুত করে তোলে আমাকে। ভাসিয়ে নিয়ে যায় কোনো এক অজানা স্বপ্নভূমিতে, যেখানে গেঁথে রয়েছে অনেক অনেক স্বপ্ন, রাশি রাশি স্বপ্ন। আমি তার মধ্যে বেঁচে থাকি। খোঁজার চেষ্টা করি আমার এক রোদনের স্মৃতি ! আমি কি খুজে পাই তাকে যা আমি হারিয়েছি গত তিন দশক বয়সে ! আমি কি ফিরে যাব সেখানে ; যেখানে রয়েছে আমার এক মায়াভরা স্মৃতি আর গভীর কষ্টের চিহ্ন; যা আমি বহন করছি আমার মনে, স্বপ্নে আর তার বাস্তবতায়। কেউ কি ফিরে পায়, যা সে হারায় বা পিছে ফেলে আসে ? আমি যেমন ফেলে এসেছি আমার কৈশোরকে। তা কি আর ধরা দিবে না আমার হ’য়ে ! আমি কি ভুলে যাইনি তার কষ্ট আর না পাওয়ার অনেক অনেক বেদনাকে। আমি কি একাত্ম হয়ে গেঁথে আছি সেই হারানো সুর আর অম্লান স্মৃতির সাথে। জীবনের সব স্মৃতি কি গেঁথে থাকে টুকরো টুকরো হ’য়ে জীবনেরই সাথে। সোনালি ফুলের গুচ্ছ গুচ্ছ স্মৃতি কি আমার রক্তের স্পন্দনে হিমবাহ জাগিয়েছে ! সূর্যের আলোয় কি মুছে যায়নি আমার শিশিরের জমানো বিন্দু বিন্দু জলের কণাগুলো ! হেমন্তের সন্ধ্যায় আমি যে বিস্তৃত মাঠ দেখেছিলাম তা-কি আজোও দেখতে পাই রোদ, ছায়া আর গভীর অরণ্যের ভিতর ? আমার দু’চোখ তাকে হয়তো আর খুঁজে নিবে না, শিশির আর জলের গভীর শব্দ থেকে। হিম, স্তব্ধতা  আর ধূসরতা কি ঢেউ জাগিয়েছিল আমার কৈশোরে ! আমার কৈশোরে কি দক্ষিনের হাওয়ায় ভেসে যায়নি আমার দীর্ঘ চিন্তা আর তার জ্যোতির্ময় নীলিমায়। কৈশোরে, বিস্ময়ের চোখে তাকিয়েছি হলুদ বন আর জ্যোৎস্নার দিকে। পিতৃপুরুষের সব আয়োজন যেন আমার হাত ধরেই অতীত হ’য়ে গিয়েছিল। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আমারই সুর বাজিয়েছে আমার কণ্ঠে, এক ফোঁটা বৃষ্টিও কাঁপিয়েছে আমার স্থির বুকটাকে।         

আমার কৈশোর কি বেঁচে আছে সেই পূর্বের ন্যায় ? যা আমি ধারণ করেছিলাম আমার বুকের গভীরে ভালোবেসে। তা-কি ম্লান হ’য়ে পড়েনি গত কয়েক দশক সময়ে ! আমি কি বেঁচে আছি আমার স্বপ্নের গভীরে, আমার স্বপ্ন কি বেঁচে আছে আমার হ’য়ে; হয়তো তা-আমি জানি, হয়তো তা-আমি কিছুই জানি না। তবুও তা জমে থাক আমার বুকের গভীরে স্মৃতি, সত্তা আর ভালবাসায়।   


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...