বর্ষার শেষে যে-শহরটাকে দেখে মনে হয়, সে যেন নিজেরই
ছায়া নিয়ে হাঁটছে, সেই শহরের এক কোণে ছিল একটি পুরোনো বটগাছ। গাছটা এত বড় যে তার
নিচে দাঁড়ালে আকাশকে আর সম্পূর্ণ আকাশ মনে হতো না; পাতার ফাঁকে ফাঁকে টুকরো টুকরো
নীল, আর সেই নীলের মধ্যে ধূসর মেঘের চলাফেরা। গাছটার গোড়ায় বসে প্রায়ই ছেলেরা
খেলত, কেউ সাইকেলের চেন মেরামত করত, কেউ আবার অকারণেই আকাশের দিকে চেয়ে থাকত।
তানিম প্রায় প্রতিদিনই ওই গাছের নিচ দিয়ে স্কুলে যেত। তার চোখে সবসময় একটা অদ্ভুত
অস্থিরতা ছিল, যেন সে যা দেখছে, তার ভেতরেই আরও কিছু দেখার জন্য সে অপেক্ষা করছে।
তানিমের বাবা ছিল রেলওয়ের মেকানিক, মা স্কুলে সেলাই
শেখাতেন। সংসার বলতে এক ছোট্ট ঘর, লোহার খাট, এক কোণে পুরোনো আলমারি, আর দেয়ালে
ঝোলানো এক অচেনা ভুবনের মানচিত্র। সেই মানচিত্রটা কে দিয়েছিল তানিম জানত না। তার
জন্মেরও আগে নাকি সেটি ঘরে এসেছিল। মায়ের মতে, কোনো দূর দেশের রেলস্টেশনে কাজ করা
এক আত্মীয় পাঠিয়েছিল। কিন্তু তানিমের ধারণা ছিল, মানচিত্রটা আসলে অন্য কোনো জীবনের
দরজা। সে প্রায়ই আঙুল দিয়ে অজানা দেশগুলোর নাম ছুঁয়ে দেখত এবং মনে মনে ভাবত, এসব
জায়গায় বাতাসের শব্দ কেমন হয়, রাত কেমন নামে, মানুষ কীভাবে ঘুমায়, তাদের স্বপ্নগুলো
কেমন হয়, তাদের হাসি কেমন ইত্যাদি।
তানিমের একটি স্বভাব ছিল, সে মানুষের মুখের বদলে
চোখের দিকে বেশি তাকাত। চোখে সে ভরসা খুঁজত, ভয় খুঁজত, মিথ্যা খুঁজত, আবার এমন
কিছু খুঁজত যার নাম সে জানত না। সহপাঠীরা বলত, ‘তোর দিকে তাকালে মনে হয়, তুই ভিতর
দিয়ে কিছু শুনে ফেলিস।’ তানিম হেসে উড়িয়ে দিত। কিন্তু কথাটা একেবারে মিথ্যে ছিল
না। সে সত্যিই শব্দের ভেতর দিয়ে অনুভব করত। কারও জোরে বন্ধ হওয়া দরজা তাকে ক্ষুব্ধ
করত, কারও চাপা দীর্ঘশ্বাস তার ভিতরটা নরম করে দিত। সে কারণেই হয়তো কেউ তার খুব
বেশি কাছাকাছি আসত না; কারণ তার চোখ ছিল আয়নার মতো, কিন্তু সে আয়না নিজের মুখ
দেখাত না, দেখাত মানুষের অস্বস্তি।
একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে একটি শিশুকে কাঁদতে
দেখল। ছেলেটির বয়স বড়জোর দশ-এগারো। হাতে একটি ফাটা নীল ব্যাগ, চোখ জলে ভরা। তানিম
কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে?’
ছেলেটি উত্তর দিল না। শুধু ব্যাগের চেন খুলে দেখাল।
ভেতরে ছিল দুটো খাতা, একখানা ভাঙা পেন্সিল, আর একটি লাল রঙের বাঁধানো খাতা, যার
পাতার কোণ কুঁচকে গেছে। ছেলেটি ফিসফিস করে বলল, ‘এটা হারিয়ে গেলে বাবা রাগ করবে।’
‘কার জিনিস?’ তানিম জিজ্ঞেস করল।
‘আমার। আমি নিজেই লিখি।’
তানিম খেয়াল করল, ছেলেটির হাতে কালি লেগে আছে। সে
খুব নিচু স্বরে বলল, ‘আমি নাম লিখে রেখে গিয়েছিলাম স্কুলের ঘরে। পরে আর পাইনি। এখন
বাড়ি গেলে ওরা ভাববে আমি মিথ্যা বলেছি।’
তানিম তাকে বসিয়ে দিল। নাম জিজ্ঞেস করলে বলল, ‘রুবেল।’
‘তুই কী লেখিস?’
রুবেল চোখ তুলে তাকাল। ‘যা দেখি। যা শুনি। কখনো
কখনো যা বুঝি।’
তানিম হেসে ফেলল। ‘তাই নাকি?’
রুবেল মাথা নাড়ল। ‘একদিন আমি লিখেছিলাম, বৃষ্টির
ভেতর লুকোনো শব্দও ভিজে যায় না। স্যার পড়ে বলেছিলেন, এটা অদ্ভুত। আমি বুঝতে
পারিনি, অদ্ভুত মানে ভালো না খারাপ।’
তানিমের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক নরম সুর উঠল। সে
বুঝল, এই ছেলেটার মধ্যে তার নিজেরই কোনো পুরোনো ছায়া আছে। সে ব্যাগটা ঠিক করে দিয়ে
বলল, ‘চল, আমি তোকে স্কুলের দিকেই নামিয়ে দিই।’
সেইদিন থেকে রুবেল তার জীবনে ঢুকে গেল। রুবেল ছিল
ছোট, কিন্তু তার চোখে ভেতরের জগৎটা বিস্তৃত। সে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে বাতাসের দিক
দেখে আন্দাজ করতে পারত কোনদিকে বৃষ্টি নামবে, ডাক শুনে বলতে পারত আশপাশে কেউ এসেছে
কি না, আর মানুষের হাঁটার গতি দেখে বুঝে যেত সে খুশি না বিরক্ত। তানিম তাকে নিজের
মতোই একটা সঙ্গী মনে করতে লাগল। তারা দুজন স্কুল শেষে কখনো পুকুরপাড়ে বসত, কখনো
পুরোনো বাসস্ট্যান্ডের ছাউনিতে, কখনো বটগাছের নিচে। রুবেল কথা বলত কম, কিন্তু যখন
বলত, তানিম যেন অন্য এক জগতের দরজা খুলে ফেলত।
এক বিকেলে, আকাশ হঠাৎ অদ্ভুত রকম কালো হয়ে এলো।
বৃষ্টি নামলও না, নামবে বলেও মনে হলো না। বাতাস ভারী হয়ে উঠল। তানিম আর রুবেল তখন
শহরের পুরোনো বাজারের পেছনের সরু গলিতে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ রুবেল এক জায়গায় থমকে
গেল।
‘এখানে কিছু আছে,’ সে বলল।
‘কী?’
‘শুনে দেখ।’
তানিম কান পাতল। প্রথমে কিছুই পেল না। তারপর টের
পেল, দেয়ালের ভেতর থেকে খুব ক্ষীণ এক শব্দ আসছে। যেন কোনো ধাতব বস্তু বারবার খুব
আস্তে আঘাত পাচ্ছে। দু’জনেই গলির শেষ প্রান্তে এগোল। সেখানে ছিল এক জীর্ণ বাড়ি,
একসময় যা ডাকঘরের মতো ছিল বলে অনেকে বলত। এখন তার ফাটলধরা দেয়ালে লতাপাতা, ভাঙা
জানালা, আর দরজায় মরচে ধরা তালা। বাড়িটার পেছনের দিকে মাটি একটু বসে গিয়েছিল।
রুবেল নিচু হয়ে দেয়ালের একটি ইট চাপ দিল। তানিম বিস্ময়ে দেখল, ভেতর থেকে একটা
ফাঁপা শব্দ এল।
পরদিন তারা আবার এলো। এবার সঙ্গে ছিল একটি পুরোনো
লোহার স্ক্রু-ড্রাইভার। বহু কষ্টে একটুখানি ঢিলা ইট সরাতেই দেখা গেল ভেতরে ছোট্ট
একটা ফাঁক। সেখান থেকে পোকামাকড় আর স্যাঁতসেঁতে মাটির গন্ধ বেরোল। রুবেল চোখ কপালে
তুলে বলল, ‘এখানে কোনো কক্ষ আছে।’
তানিমের বুক ধুকধুক করতে লাগল। তার মনে হলো, সে যেন
কোনো নিষিদ্ধ গল্পের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তারা ওই ফাঁকটা আর বড় করল না, কারণ সন্ধ্যা
নেমে এসেছিল, আর দূরে কারও ছায়া নড়ছিল। কিন্তু পরের কয়েকদিন দুজনেই আরেকটু এগোবার
অস্থিরতায় ছটফট করতে লাগল।
সপ্তাহের শেষে তারা আবার গেল। এবার রুবেল সঙ্গে
এনেছিল একটি পুরোনো টর্চ, যার আলো দুর্বল হলেও কাজে আসল। দেয়ালের ভাঙা অংশ দিয়ে সে
মাথা ঢুকিয়ে বলল, ‘আয়।’
তানিম প্রথমে ভয় পেল। তারপর শরীরটা কুঁকিয়ে ভেতরে
ঢুকে পড়ল। ওর সামনে ক্ষুদ্র এক ঘর। ধুলো, মাকড়সার জাল, আর ছাদের এক ফাঁক দিয়ে পড়া
সরু আলো। ঘরের এক পাশে কাঠের আলমারি, তার সামনে মেঝেতে ছড়িয়ে আছে শুকিয়ে যাওয়া
কাগজের বান্ডিল। দেয়ালের গায়ে পেরেক মারা অবস্থায় ছিল কয়েকটি ফিকে ছবির ফ্রেম। সব
মিলিয়ে ঘরটা যেন বহু বছর আগে হঠাৎ থেমে যাওয়া একটি নিঃশ্বাস।
রুবেল ফিসফিস করল, ‘এটা কী জায়গা?’
তানিম একটা কাগজ তুলে নিল। তাতে ছিল হাতের লেখা,
কিন্তু অনেকটাই ঝাপসা। কোনো চেনা নাম নেই। কোনো তারিখও পরিষ্কার নয়। কাগজে লেখা
ছিল, ‘যদি কেউ পড়ে, জেনে রাখো, এই শহরের গোপন শব্দগুলো এখানেই জমা হয়েছে।’
তানিম থমকে গেল। ‘গোপন শব্দ?’
রুবেল চোখ বড় করে বলল, ‘মানে?’
তানিম আরেকটি কাগজ তুলল। সেখানে ছোট ছোট কয়েকটি
বাক্য: ‘রাতের শেষ ট্রেনের শব্দটা কেমন একা শোনায়’, ‘নদীর পাড়ে শিশুর কান্না
বাতাসে ভেসে যায়’, ‘মানুষের ভেতরের দরজাটা বাইরে থেকে দেখা যায় না’। তানিম অনুভব
করল, তার শরীর শীতল হয়ে যাচ্ছে। যেন ঘরটির ভেতরে কোনো অদৃশ্য কেউ বহুদিন ধরে বসে
এসব লিখে রেখে গেছে।
সেই রাতেই তারা ঘরে যা পেয়েছিল, তা নিয়ে তানিমের
ঘুম উড়ে গেল। পরদিন স্কুলে মন বসল না। দুপুরে সে রুবেলকে নিয়ে আবার সেখানে গেল।
তখন এক অদ্ভুত কাজ করল তারা। কাগজের বান্ডিল গুনে দেখল, এগুলো কোনো সাধারণ কাগজ
নয়। কিছু ছিল শহরের পুরোনো নকশা, কিছু ছিল কবিতার মতো, কিছু ছিল রেললাইনের শব্দ
নিয়ে পর্যবেক্ষণ, কিছু ছিল বৃষ্টির সময়কার রাস্তার মাপ, কিছু ছিল মানুষের মুখের
রেখা নিয়ে অদ্ভুত নোট। সবশেষে একটি খাতায় লেখা ছিল, ‘এই শহরের মানুষরা যা প্রকাশ
করে না, তা দেয়ালে, ইটের ফাঁকে, পানির স্তরে, গাছের শিকড়ে রেখে যায়। কোনো একদিন
যদি কেউ সেগুলো বুঝতে পারে, তবে শহর নিজের আসল নাম বলবে।’
তানিমের মনে হলো, এই লেখাগুলো হয়তো কারও একার কাজ
নয়। হয়তো বহু বছর ধরে নানা মানুষ এখানে এসেছে, অল্প অল্প লিখে রেখে গেছে, আর সেই
ঘরটা হয়ে উঠেছে শহরের গোপন স্মৃতির ভাঁড়ার।
পরবর্তী এক মাসে তানিম আর রুবেল সেই ঘরটাকে নিজেদের
মতো করে গুছিয়ে নিল। তারা ধুলো পরিষ্কার করল, কিছু কাগজ লেপটে রাখা কাঠের বাক্সে
রাখল, ঘরের দেয়ালে নতুন করে পেরেক মারল, জানালার ফাঁক বন্ধ করল। স্কুল শেষে তারা
সেখানে বসে লেখা পড়ত, নতুন করে লিখত, আর শব্দ নিয়ে কথা বলত। কোনো দিন রুবেল নদীর
শব্দ নকল করে শুনাত, তানিম সেটাকে লেখায় বাঁধত। কোনো দিন তানিম ছাদের টিনে বৃষ্টির
শব্দ শুনে বলত, ‘এটা ঝিম ধরা একধরনের ঢোল।’ রুবেল হাসত। তাদের হাসি অনেক সময় ধুলো
উড়িয়ে দিত, আর ধুলোর মধ্যে যেন অন্য একটি আলো জেগে উঠত।
কিন্তু এই শান্তি বেশিদিন থাকল না।
একদিন এলাকার এক লোক সেই ভাঙা বাড়িটা ভাঙার
পরিকল্পনা করল। সেখানে নাকি নতুন দোকানঘর হবে। লোকজন জড়ো হতে লাগল। দেয়ালে লাল দাগ
পড়ল। এক সকালেই দেখা গেল, শ্রমিকরা এসেছে। হাতুড়ি, শাবল, আর রশি নিয়ে তারা ঘর
ভাঙার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তানিম দৌড়ে গিয়ে বলল, ‘এখানে ভেতরে একটা
গুরুত্বপূর্ণ ঘর আছে।’
লোকটি হাসল। ‘পুরোনো জিনিসে কী হবে? ভাঙা জায়গা
ভেঙে ফেলাই ভালো।’
রুবেল দাঁতে দাঁত চেপে রইল। সেদিন সে কাঁদেনি,
কিন্তু তার চোখে যে আগুন জ্বলছিল, তা তানিম আগে দেখেনি। তারা দুইজন দৌড়ে বাড়িতে
ফিরে মাকে, বাবাকে, পাড়ার লোকজনকে বোঝাতে শুরু করল। কেউ বিশ্বাস করল, কেউ করল না।
কেউ বলল, ‘ছেলেমানুষি।’ কেউ বলল, ‘ওই ঘরে ভূত আছে নাকি?’ কেউ হেসে উড়িয়ে দিল।
কিন্তু তানিম জানত, বিষয়টা ভূতের নয়; বিষয়টা স্মৃতির। কোনো শহরকে শুধু রাস্তা আর
ইট দিয়ে মাপা যায় না। তার ভেতরে থাকে চাপা শব্দ, অপূর্ণ কথা, কুয়াশার মতো জমে থাকা
রাত, আর মানুষের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা অনুচ্চারিত সত্য।
সন্ধ্যার দিকে তানিম হঠাৎ শহরের পোস্ট অফিসের
পেছনের বারান্দায় বসে থাকা এক বৃদ্ধকে দেখল। বৃদ্ধটি ছিল অনেকদিন ধরে নিঃশব্দে চা
খেতে খেতে মানুষ দেখেন। তার চোখে অদ্ভুত স্থিরতা। তানিমের মনে পড়ল, কেউ বলেছিল এই
বৃদ্ধ একসময় সেই পুরোনো বাড়িতে কাজ করতেন। তানিম তাঁর কাছে গিয়ে সব খুলে বলল।
বৃদ্ধ চুপচাপ শুনলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘ওই ঘর আমার জানা। বহু বছর আগে
সেখানে এক মানচিত্রকার থাকত। সে মানুষের বলা কথা, না-বলা কথা, রাস্তার শব্দ, সব
লিখে রাখত। সে বলত, শহরের আসল চেহারা দেয়ালে নয়, লোকের ভেতরে।’
তানিম জিজ্ঞেস করল, ‘এখন কী করা যায়?’
বৃদ্ধ বললেন, ‘সবাইকে একসঙ্গে সেখানে নিয়ে যা। যদি
ওরা নিজের চোখে দেখে, তবেই বোঝে।’
সেই কথা ছড়িয়ে পড়ল পাড়ায়। পরদিন বিকেলে স্কুলের
কয়েকজন শিক্ষক, কিছু প্রতিবেশী, দুই-একজন সাংবাদিক, আর আশেপাশের বেশ কিছু মানুষ
এসে জড়ো হলো ভাঙা বাড়িটার সামনে। তানিম আর রুবেল প্রথমে দেয়ালের ফাঁক দিয়ে ভেতরে
ঢুকল। তারপর আলো জ্বালিয়ে সবাইকে দেখাল। ধুলো, লেখা, ছবি, নকশা, সবকিছু দেখে লোকজন
নির্বাক। এক শিক্ষিকা একটা কাগজ তুলে উচ্চস্বরে পড়লেন। বাক্যগুলো যত পড়া হচ্ছিল,
ততই যেন ঘরটা বড় হয়ে উঠছিল।
একজন বৃদ্ধ বললেন, ‘এই নোটে আমার বাবার কথা আছে...
সে রেলস্টেশনের কাছে হকারি করত।’
একজন মহিলা বললেন, ‘এই লাইনটা আমার মায়ের মতোই
শোনাচ্ছে...’
আরো কয়েকজন নিজেদের অচেনা স্মৃতি খুঁজে পেলেন। কারও
হাসি, কারও কান্না, কারও হারানো দিন। যারা আগে কেবল ভাঙা ইট দেখেছিল, তারা এখন
দেখছিল অদৃশ্য একটি শহর। লোকটি চুপ মেরে গেল। আর মাটির ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা
মানুষগুলো বুঝতে পারল, কিছু জিনিস ভাঙা যায় না। ভাঙলেও তা বেঁচে থাকে উচ্চারণে,
পাতায়, চোখে, আর স্মৃতিতে।
শেষে সিদ্ধান্ত হলো, পুরো বাড়ি না ভেঙে তার ওই
ভেতরের কক্ষটিকে রেখে দেওয়া হবে। তাকে ঘিরে নতুন করে একটি ছোট স্মৃতি-কেন্দ্র তৈরি
হবে, যেখানে স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা শহরের পুরোনো শব্দ, লেখা, ছবি, রেলওয়ের নকশা,
নদীর স্মৃতি, বৃষ্টির নোট, আর লোককথা রাখতে পারবে। মানুষ প্রথমে বলেছিল, ‘এতে কী
হবে?’ কিন্তু পরে দেখা গেল, সেই ঘরে আসা মানুষ বাড়ছে। তারা নিজেদের ছোট ছোট স্মৃতি
রেখে যাচ্ছে, কারও জুতোর ফিতা, কারও শৈশবের খাতার পাতা, কারও ভাঙা পেন্সিল, কারও
শহরের মানচিত্রে আঁকা নীল দাগ। যেন সবাই মিলে নিজের ভেতরের অদৃশ্য ঘরটাকে বাইরে
এনে রাখছে।
রুবেল তখন আর কাঁদে না। সে বড় হয়ে গেছে হঠাৎ না,
ধীরে ধীরে, যেমন নদীর জল চুপিচুপি সমুদ্রের দিকে যায়। তানিমও বদলেছে। তার চোখের
অস্থিরতা এখন আগের মতো নয়। সে মানুষকে শুধু চোখ দিয়ে দেখে না, শব্দ দিয়েও দেখে। সে
বুঝে গেছে, প্রত্যেকের চোখের ভেতরে একটা করে গোপন দেশ থাকে। কেউ তা দেখতে পায় না,
যদি না সে ধীরে কাছে আসে।
একদিন সন্ধ্যায়, যখন নতুন স্মৃতি-কেন্দ্রের ছোট ঘরে
স্কুলের কয়েকজন ছাত্রছাত্রী বসে লেখা কপি করছিল, তানিম জানালার পাশে দাঁড়াল। বাইরে
বটগাছটি বাতাসে ঝুঁকছে। আকাশে শেষ আলো। রুবেল পাশে এসে দাঁড়াল।
‘এই জায়গাটা কি এখন শেষ?’ রুবেল জিজ্ঞেস করল।
তানিম হাসল। ‘না। এখন শুরু।’
‘কী শুরু?’
তানিম জানালার কাঁচে চোখ রাখল। ‘মানুষের ভেতরের
শব্দ শোনার শুরু।’
রুবেল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল, ‘তোর
মনে হয় মানুষ সত্যিই নিজের ভেতরটা বাইরে আনতে পারে?’
তানিম মৃদু স্বরে উত্তর দিল, ‘যদি কেউ মন দিয়ে
শোনে, পারে।’
রুবেল জানালার কাঁচে হাত রাখল। ‘তাহলে একদিন সবাই
কি এমন একটা ঘর পাবে?’
‘পাবে,’ তানিম বলল। ‘কিন্তু সেই ঘরের দরজা বাইরে
নয়, ভেতরে।’
রাত নেমে এলো। শহরের রাস্তায় সাইকেলের ঘণ্টা,
রিকশার টুনটুন শব্দ, দূরের ট্রেনের লম্বা হুইসেল, সব মিলিয়ে বাতাস কেঁপে উঠল।
তানিমের মনে হলো, শহরটি যেন বহুদিন পর হালকা করে নিঃশ্বাস ফেলছে। সে আর রুবেল ঘর
থেকে বেরিয়ে বটগাছের নিচে দাঁড়াল। পাতার ফাঁকে ছড়িয়ে থাকা চাঁদের আলো তাদের মুখে
পড়ল। তানিম হঠাৎ অনুভব করল, এই আলো শুধু আকাশ থেকে আসে না। মানুষ একে অন্যের দিকে
তাকিয়ে থাকলেও আলো তৈরি হয়। কোনো এক অদৃশ্য ভেতর থেকে।
সে নরম স্বরে বলল, ‘এসো আমার চোখের ভেতর।’
রুবেল তাকাল। ‘কেন?’
‘দেখবি,’ তানিম বলল, ‘শুধু যা দেখা যায়, তা-ই সত্য
নয়। আমার চোখের ভেতরেও একটা শহর আছে। তোর চোখের ভেতরেও। আমাদের ভিতরে যে সব পথ,
ঘর, শব্দ, আর অপেক্ষা জমে থাকে, সেগুলো একদিন কারও না কারও সামনে খুলে যায়।’
রুবেল হাসল। ‘তাহলে চল, দেখি।’
দু’জনেই বটগাছের ছায়ায় আরও একটু দাঁড়িয়ে রইল। তাদের
ওপর দিয়ে উড়ে গেল এক ঝাঁক পাখি। দূরে ট্রেনের শব্দ মিলিয়ে গেল। আর সেই নরম, গভীর,
অনুচ্চারিত সন্ধ্যায় মনে হলো, পৃথিবীর সব হারানো জিনিস আসলে হারায় না। তারা শুধু
মানুষের চোখের ভেতরে গিয়ে বসে থাকে, একটু আলো, একটু সাহস, আর একটু মন দিয়ে শোনার
অপেক্ষায়।
আর ঠিক সেখানেই, শহরের ভেতর, ছেলেটি আর ছেলেটির
বন্ধুত্ব একটি নতুন ভাষা পেল, যে ভাষায় না ছিল হাহাকার, না ছিল সস্তা উচ্ছ্বাস;
ছিল শুধু দেখা, শোনা, আর বাঁচিয়ে রাখার অদৃশ্য দায়িত্ব।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন