সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

দক্ষিণের শেষ বাড়ি -কিশোর গল্প

 

রাতুল আর অর্কের গ্রামে এমন একটা জায়গা ছিল, যেখানে রাস্তা হঠাৎ নরম হয়ে যায়, বাতাসও একটু থেমে যায়, আর লোকজনের গলা অজান্তেই নিচু হয়ে আসে। গ্রামটার নাম সোনামুখী চর, কিন্তু সবাই তাকে চেনে নদীর ভাঙনের ভয়ে আর নতুন মাটির গন্ধে। গ্রামের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে, যেখানে কাঁচা রাস্তা শেষ হয়ে কাঁদামাটির সরু পথ নদীর ধারের দিকে ঢুকে গেছে, সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল এক পুরনো বাড়ি, দরজা সাদা রঙের, জানালার কাঠ একটু নড়বড়ে, বারান্দার এক কোণে শ্যাওলা, আর চৌকাঠের গায়ে বৃষ্টির দাগ শুকিয়ে শুকিয়ে কালচে হয়ে আছে। লোকজন তাকে বলত দক্ষিণের শেষ বাড়ি। কিন্তু এই নামটা শুধু জায়গার নয়, অনেকদিন ধরে একধরনের নীরবতারও নাম ছিল। রাতুল আর অর্ক ছোটবেলা থেকেই জানত, যেসব জায়গা নিয়ে লোকজন কম কথা বলে, সেসব জায়গার দিকে তাদের চোখ বেশি যায়। স্কুলের পরে তারা নদীর পাড়ে, পুকুরঘাটে, ধানক্ষেতে, এমনকি মাঝেমধ্যে স্কুলের পেছনের পরিত্যক্ত আমবাগানেও ঘুরত, কিন্তু দক্ষিণের শেষ বাড়ির সামনে গিয়ে একধরনের অদ্ভুত থমকে যাওয়া তাদের গ্রাস করত। কেউ বলত বাড়িটা একসময় সরকারি কর্মচারীর ছিল, কেউ বলত কোনো এক নারীর, যিনি নিজের সব সন্তানকে হারিয়ে একা থেকে গেছেন, আবার কেউ বলত বাড়ির উঠোনে রাতে পানির শব্দ শোনা যায়, যদিও সেখানে কোনো জলাধার নেই। এসব গুজবের ভেতর সত্যিটা ঠিক কী, তা কেউ জানত না, আর রাতুল ও অর্কও জানত না। শুধু জানত, বাড়িটা তাকিয়ে থাকে। যেমন পুরনো মানুষরা বলে, কিছু জায়গার চোখ থাকে। একদিন শ্রাবণের দুপুরে, যখন আকাশের নিচে আলোও ভেজা মনে হয়, তখন স্কুল থেকে ফেরার পথে অর্ক হঠাৎ থেমে গেল। সে বলল, ‘দেখ, বাড়িটার সামনে কেউ বসে আছে।’ রাতুল তাকিয়ে দেখল, উঠোনের ধারে একটি বৃদ্ধা কুড়িয়ে আনা শুকনো পাতা ভাজ করছিলেন। তার পায়ের কাছে একটা কুপো, পাশে পুরনো কাপড়ের ব্যাগ। এতদিনের জনশূন্য বাড়িতে মানুষ দেখে দুজনই চমকে উঠল। অর্ক ফিসফিস করে বলল, ‘চল, কাছে যাই।’ রাতুল একটু দ্বিধা করল, তারপর দু’জন ধীরে এগোল। বৃদ্ধা তাদের দেখে হাসলেন না, আবার ভয়ও দিলেন না; বরং এমনভাবে তাকালেন, যেন তিনি জানেন, তারা আসবে। তিনি বললেন, ‘তোমরা কি স্কুল থেকে ফিরছ?’ রাতুল মাথা নেড়ে বলল, ‘জি।’ অর্ক একটু সাহস করে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি এখানে একা থাকেন?’ বৃদ্ধা শুকনো পাতার গুচ্ছটা পাশে রেখে বললেন, ‘এখন তো একাই আছি। আগে ছিলাম না।’ তার গলায় কোনো করুণ নাটক ছিল না, ছিল শুধু টানটান ক্লান্তি, যেমন দীর্ঘদিনের বৃষ্টির পরে মাটি চুপ করে থাকে। তিনি নিজের নাম বললেন মমতাজ বেগম, আর জানালেন, কিছুদিনের জন্য তিনি এখানে থাকবেন। তাঁর ছেলের পরিবার শহরে কাজ খুঁজতে গেছে, বাড়ির অন্য অংশ ভেঙে পড়ার আগেই তিনি দক্ষিণের শেষ বাড়িতে এসে উঠেছেন। গ্রামের লোকজন যখন পুরনো খবরের মতো কিছু শুনে, তখন তার চারপাশে নতুন গল্প জন্ম নেয়; কেউ ভাবে তিনি আত্মীয়, কেউ ভাবে তদারককারী, কেউ ভাবে বাড়ি বেচে দেবেন। কিন্তু মমতাজ বেগমের কথায় সে ধরনের কোনো ইঙ্গিত ছিল না। তিনি শুধু বললেন, ‘বাড়িটা আমার শ্বশুরের নয়, আমারও নয়, তবু গত তিনদিন ধরে আমি এই উঠোনে দাঁড়িয়ে আছি। ঘরটা ফাঁকা থাকলে তারও যে কষ্ট হয়, সেটা এখন বুঝি।’ রাতুল আর অর্ক সেদিন আর বেশি কথা বলতে পারেনি। বাড়িটার ভেতরটা তারা দেখল না, কিন্তু বারান্দার একপাশে রাখা কাঠের আলমারির জংধরা হাতল, দেয়ালের ওপরে টাঙানো এক সাদামাটা ঘড়ি, আর মেঝেতে মাদুরের ওপর শোয়া একটি পুরনো কাথা তাদের চোখে পড়ল। সবকিছুতে একধরনের অস্থায়ী জীবন ছিল, যেন কেউ নিজের দুঃখ গোছাতে এসে ব্যাগ খুলে বসেছে। এরপর দিনগুলোতে তারা প্রায়ই ওই বাড়ির সামনে দিয়ে যেত। প্রথমে কৌতূহল, পরে একটা টান, তারপর অদ্ভুত এক দায়বদ্ধতা। বর্ষা বাড়তে বাড়তে গ্রামের রাস্তা ভেঙে দিচ্ছিল, স্কুলের পেছনের রাস্তা  প্রায় বন্ধ, আর দক্ষিণের মাঠে পানি জমে ছোট ছোট নীলচে জলে পথ খুলে যাচ্ছিল। সবাই জানত, এই বৃষ্টিতে সবচেয়ে আগে ভাঙে নালা, তারপর উঠোন, তারপর মানুষের ধৈর্য। এক বিকেলে অর্ক বলল, ‘বাড়িটার সামনে নালাটা দেখেছিস? ভেঙে গেছে। পানি উল্টো উঠোনে ঢুকছে।’ রাতুল দেখল, সত্যিই তাই। বৃষ্টির পানি জমে দক্ষিণের শেষ বাড়ির উঠোনে কাদা হয়ে আছে, আর উঠোনের মাঝখানে যে ছোট চারা গাছগুলো লাগানো ছিল, সেগুলো প্রায় ডুবে গেছে। মমতাজ বেগম বারান্দায় বসে একখানা প্লাস্টিকের পাখা দিয়ে নিজেকে বাতাস দিচ্ছিলেন। রাতুল সাহস করে বলল, ‘খালা, আমরা কিছু করতে পারি?’ তিনি তাদের দুজনকে কিছুক্ষণ দেখলেন, তারপর বললেন, ‘যদি তোমাদের হাতে কাদা লাগে, আপত্তি নেই?’ অর্ক হেসে ফেলল। ‘কাদা তো লাগবেই।’ সেদিন থেকেই শুরু হলো অন্যরকম এক কাজ। রাতুল আর অর্ক স্কুল থেকে ফিরে নালার মুখ পরিষ্কার করতে লাগল। প্রথমে দুজন, পরে আরও দুই-তিনজন বন্ধু, তারপর পাড়ার একজন বৃদ্ধ মিস্ত্রি, তারপর মমতাজ বেগম নিজেই। বাড়ির উঠোনে জমানো পানি বের করে দিতে দিতে তারা বুঝল, শুধু পানি নয়, অনেকদিনের অবহেলাও জমে ছিল এখানে। নালার মুখে পুরনো বোতল, ভাঙা টিন, কচুরিপানা, পলিথিন, আর শুকনো মাটির দলা আটকে ছিল। অর্ক কোদাল চালাতে চালাতে বলল, ‘দোস্ত, এমনভাবে লাগছে যেন বাড়িটা নিজেই হাঁপাচ্ছে।’ রাতুল মুখ না তুলে বলল, ‘হ্যাঁ, আর কেউ শোনেনি।’ মমতাজ বেগম তখন পাশে বসে বললেন, ‘শোনেনি না, শুনতে চায়নি। এ গ্রামে একসময় পানি নামার জায়গা ছিল, মানুষ মিলেমিশে পরিষ্কার করত। পরে যার যার কাজ, যার যার টান, তারপর সব আলগা হয়ে গেল।’ তাঁর কথায় একটা বিস্তৃত স্মৃতি ছিল, যেটা বাড়ির চেয়েও বড়। তিনি বললেন, এই বাড়ির পুরনো মালিক মারা যাওয়ার পর বেশ কিছু বছর কেউ থাকেনি, তারপর দক্ষিণের মাঠে বাঁধ ভাঙার ফলে ধীরে ধীরে জায়গাটা উপেক্ষিত হয়ে পড়ে। গ্রামের কেউ যখনই শহরমুখী বা জমিমুখী হয়ে যায়, তখন নিজের পেছনের পথটা আর দেখে না। এই বাড়িটাও তেমনই পড়ে ছিল, যেন একসময়ের ব্যবহৃত থালা, যা ধুয়ে তুলেও আলমারির পেছনে রেখে দেওয়া হয়। রাতুল তার কথা শুনে বলল, ‘তাহলে আমরা এটা ঠিক করব।’ মমতাজ বেগম হেসে বললেন, ‘তোমরা ঠিক করলেই যে সব ঠিক হবে, তা না। কিন্তু শুরুটা তো কেউ না কেউ করবে।’ এই কথা রাতুলের মাথায় গেঁথে গেল। শুরুটা। শুরু করা। এটাই তো কিশোর বয়সের সবচেয়ে বড় ক্ষমতা, কিছু না জেনেও শুরু করার সাহস। কয়েক দিনের মধ্যে তারা শুধু নালা পরিষ্কার করল না, বরং বাড়ির পাশের ভাঙা সীমানা, আগাছায় ঢেকে যাওয়া উঠোন, আর দেয়ালের ফাটলে জমে থাকা কাঁদা সরাতে লাগল। অর্ক একদিন পুরনো একটা টিনের ডিব্বা পেয়ে বলল, ‘দেখ, এটা বোধহয় বাচ্চাদের খেলনার ছিল।’ ভেতরে সত্যিই ছিল কয়েকটা মার্বেল, একটি বাঁশের গুলি, আর একটা রঙচটা ঘুড়ির কাঠি। রাতুল একটা মার্বেল তুলে নিয়ে বলল, ‘কারও শৈশব এখানে রয়ে গেছে।’ মমতাজ বেগম সেটা শুনে থেমে গেলেন। তারপর খুব ধীরে বললেন, ‘হ্যাঁ, শৈশবও কখনো কখনো ঘরের ভেতর পড়ে থাকে।’ বাড়ির একপাশের ছোট ঘরটা ঝাড়ু দিতে গিয়ে তারা একটা পুরনো আলমারির পেছনে দেয়ালের গায়ে আঁকা দুটি রেখা পেল। প্রথমে মনে হলো দাগ, পরে বুঝল, সেটা বাচ্চাদের উচ্চতার মাপ। একটি দাগের পাশে লেখা, কাঁপা হাতে ‘রাফি, আরেকটি ‘নাবিলা, অর্ক বলল, ‘এরা কারা?’ মমতাজ বেগম জানালেন, এরা তাঁর নাতি-নাতনি, যারা শহরে থাকে। একসময় তারা প্রতি গ্রীষ্মে আসত, উঠোনে দৌড়াত, চেঁচাত, মাছ ধরত, কাঁঠাল পাড়ত। তারপর স্কুল, টিউশন, শহরের ব্যস্ততা, সব মিলিয়ে আসা কমে গেল। ‘ছোটবেলার গন্ধ কি শহরে ধরে রাখা যায়?’ তিনি যেন নিজেকেই প্রশ্ন করলেন। রাতুলের মনে হলো, দক্ষিণের শেষ বাড়ি আসলে ভাঙা দেয়ালের গল্প না, বিচ্ছিন্নতার গল্প। মানুষ যখন যোগাযোগ হারায়, তখন ঘরও অচেনা হয়ে যায়। একদিন স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাদের খবর পেয়ে বাড়িটা দেখতে এলেন। তিনি উঠোনে দাঁড়িয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এখানে যদি একটু কাজের উদ্যোগ হয়, বাড়িটা শুধু বাসযোগ্যই না, গ্রামের কাজে লাগবে।’ সেই মুহূর্তে অর্কের মাথায় একটা আইডিয়া এলো। সে বলল, ‘স্যার, আমরা এটাকে একটা কমিউনিটি রুম বানাতে পারি। বাচ্চারা এখানে বসে পড়তে পারবে, বৃষ্টি এলে আশ্রয় নিতে পারবে, আর মহিলারা সেলাই বা হাতের কাজ করতে পারবেন।’ রাতুল সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল, ‘আর পুরনো জিনিসগুলোও রাখা যাবে, যেন গ্রামের স্মৃতি হারিয়ে না যায়।’ মমতাজ বেগম তাদের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে এমন এক আলো ছিল, যেন বহুদিন পরে কেউ পুরনো ঘরের জানালা খুলে দিয়েছে। তিনি বললেন, ‘আমি তো ভেবেছিলাম এখানে কেবল রাত কাটাব। কিন্তু তোমরা তো ঘর বানিয়ে দিচ্ছ।’ তারপরই শুরু হলো আসল সংগ্রাম। গ্রামে সব ভালো কাজের প্রথম শত্রু হয় সন্দেহ। কেউ বলল, ‘ছেলেগুলো বড় কিছু করবে বলে ভাবিস না, কয়দিন পর বাদ দেবে।’ কেউ বলল, ‘বাড়িটা ভেঙে ফেলে নতুন দোকান তুললে কী হয়?’ কেউ বলল, ‘সরকারি কাগজপত্র ছাড়া এসব চলবে না।’ কিন্তু রাতুল আর অর্ক হার মানল না। তারা স্কুলে একটি ছোট সভা ডাকল, প্রধান শিক্ষকের সাহায্যে ছেলেমেয়েদের, অভিভাবকদের, আর কয়েকজন বয়স্ক মানুষকে একসঙ্গে বসাল। সেখানে রাতুল খুব সোজা ভাষায় বলল, ‘আমাদের গ্রামে জায়গা আছে, কিন্তু জায়গাকে কাজে লাগানোর অভ্যাস নেই। দক্ষিণের শেষ বাড়িটা যদি মেরামত করা যায়, এটা শুধু একটা বাড়ি থাকবে না, সবাই মিলে বসার একটা ঘর হবে।’ অর্ক যোগ করল, ‘আমরা সব জানি না। কিন্তু শেখার জায়গা তো দরকার।’ তারপর মমতাজ বেগম উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর কণ্ঠ খুব উঁচু ছিল না, কিন্তু সবাই শুনল। তিনি বললেন, ‘আমি এই বাড়িতে এসে বুঝেছি, মানুষ একা থাকলে ঘরও একা হয়ে যায়। আর ঘরকে বাঁচাতে হলে শুধু ইট নয়, সম্পর্কও জোড়া লাগে।’ সেই সভার পর কয়েকজন সাহায্যের হাত বাড়াল। একজন রাজমিস্ত্রি পুরনো ফাটল মেরামত করতে এলেন, স্কুলের কয়েকজন ছেলেমেয়ে ঝাড়ু নিয়ে উঠোন পরিষ্কার করল, মেয়েরা জানালার পর্দা সেলাই করল, আর অর্কের বাবা বাঁশের কাঠামো দিয়ে ছাউনি মেরামতের ব্যবস্থা করলেন। দিনের শেষে যখন ধুলো মিশে ঘাম শুকিয়ে যেত, তখন বাড়িটা একটু একটু করে বদলাতে লাগল। পুরনো ঘড়িটা মেরামত হলো। ভাঙা চৌকাঠে নতুন পালিশ পড়ল। বারান্দার কোণে একটি বেঞ্চ রাখা হলো। আর উঠোনের একপাশে রং করা হলো, যেখানে লেখা হলো: ‘দক্ষিণের শেষ বাড়ি, সবার ঘর।’ এই নামটা লিখতে গিয়ে রাতুলের হাতে অদ্ভুত কাঁপুনি হয়েছিল। কারণ কয়েক মাস আগেও এটি ছিল তার চোখে রহস্যের জায়গা; এখন সেটা দায়িত্বের জায়গা। মমতাজ বেগম তখনও থাকলেন, তবে আর একা নন। তাঁর নাতি-নাতনি গ্রীষ্মের ছুটিতে এসে উঠোনে দৌড়াতে লাগল। ছোট রাফি একদিন বলল, ‘নানি, এই বাড়ি কি ভূতওয়ালা?’ সবাই হেসে উঠল। মমতাজ বেগম বললেন, ‘না রে, ভূত না। এটা স্মৃতিওয়ালা।’ রাফি মাথা কাত করে আবার প্রশ্ন করল, ‘স্মৃতি মানে?’ অর্ক সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল, ‘যা হারিয়ে গেলেও মানুষকে বদলে দেয়।’ বাচ্চাটা কিছু না বুঝলেও হেসে দৌড় দিল। রাতুল আর অর্কের ভিতরে তখন অন্যরকম শান্তি। তারা বুঝল, তাদের কাজ শেষ হয়নি, বরং শুরু হয়েছে। কারণ দক্ষিণের শেষ বাড়ি এখন শুধু বাসস্থানের গল্প না, অংশগ্রহণের গল্প। বর্ষা শেষ হয়ে যখন শরৎ এলো, গ্রামের বাতাস হালকা হলো। কাশফুল ফুটল রাস্তার ধারে। উঠোন শুকিয়ে উঠল। স্কুল থেকে ফেরার সময় বাচ্চারা আর বাড়িটাকে এড়িয়ে যেত না; উল্টো সেখানে থামত। কেউ দেখা করত, কেউ খেলত, কেউ বই নিয়ে বসত। একদিন স্কুলের লাইব্রেরি থেকে পুরনো বইয়ের কিছু কপি এনে সেখানে রাখা হলো। রাতুল একটি নোট লিখল কাগজে নয়, দেয়ালের ছোট বোর্ডে: ‘পড়ার জন্য, কথা বলার জন্য, থামার জন্য।’ অর্ক লিখল: ‘এখানে একা কেউ নয়।’ মমতাজ বেগম সেটা দেখে শুধু বললেন, ‘ভালো, খুব ভালো।’ সন্ধ্যাবেলায় যখন সূর্য নদীর জলে লাল হয়ে গড়িয়ে পড়ে, তখন বাড়ির বারান্দায় তিনজন বসে থাকে, একজন বৃদ্ধা আর দুই কিশোর। তারা কথা বলে, চুপ থাকে, আবার কথা বলে। কখনও মানুষের কথা, কখনও নদীর পানি, কখনও হারিয়ে যাওয়া ঘুড়ি, কখনও স্কুলের বন্ধুর ঝগড়া। কিন্তু সবচেয়ে বেশি তারা কথা বলে ভবিষ্যৎ নিয়ে। অর্ক একদিন বলল, ‘দোস্ত, আমি বড় হলে ইঞ্জিনিয়ার হব। এই গ্রামের পানি, নালা, বাঁধ, সব ঠিক করব।’ রাতুল বলল, ‘আর আমি যা লিখে রাখতে হয়, তা লিখব।’ মমতাজ বেগম হেসে বললেন, ‘একজন বানাবে, একজন মনে রাখবে, এই দুই কাজ একসঙ্গে হলে গ্রাম টিকে যায়।’ রাতুল তখন দক্ষিণের শেষ বাড়ির দিকে তাকাল। ভাঙা দেয়ালগুলো এখন নতুন রংয়ের নিচে নরম দেখাচ্ছে, আর বারান্দার পুরনো চেয়ারটার পাশে নতুন বেঞ্চ। বাইরে কাদা নেই, কেবল স্যাঁতসেঁতে মাটির গন্ধ। তার মনে হলো, জীবনে সব বড় পরিবর্তন আগুনের মতো আসে না; অনেক সময় তা আসে একজন বৃদ্ধার বসে থাকা, দুজন কিশোরের কাদা লাগা হাত, আর একটুখানি বিশ্বাস থেকে। দক্ষিণের শেষ বাড়ি তখন আর শেষ নয়। সেটি ছিল শুরু, ফিরে আসার জায়গা, শেখার জায়গা, আর নীরবতার ভিতর থেকে মানুষের কণ্ঠ খুঁজে পাওয়ার জায়গা। রাতুল ও অর্ক ঘরে ফেরার পথে কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটছিল, আর পেছনে থেকে যাচ্ছিল সেই বাড়ি, যেটা একদিন তাদের কাছে ছিল রহস্য, পরে দায়িত্ব, আর শেষে একধরনের উজ্জ্বল প্রতিজ্ঞা। আসন্ন সন্ধ্যার আলোয় বাড়িটা খুব শান্ত দেখাচ্ছিল, কিন্তু সেই শান্তির ভেতর এখন আর শূন্যতা নেই, ছিল জীবন, ছিল শব্দ, ছিল একফালি বাঁচিয়ে রাখার আনন্দ।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...