শহরটার নাম ছিল কালিকাপুর, কিন্তু লোকজন তাকে ডাকত ভাঙা
সেতুর শহর; কারণ নদীর উপর এক পুরোনো সেতু ছিল, যার মাঝখানে একখানা বাঁক, আর সেই বাঁকেই
দাঁড়িয়ে বিকেলের আলো সবচেয়ে বেশি থমকে যেত, যেন জল আর
আকাশের মাঝখানে কেউ একখানা অদৃশ্য হাত ধ’রে রেখেছে। সেই
সেতুর নিচ দিয়ে যে নদী ব’য়ে যেত, তার নাম ছিল মধুমতী, কিন্তু নামের সঙ্গে নদীর
চরিত্রের খুব কম মিল ছিল; মধুমতী ছিল কাব্যের মতো নরম নয়,
বরং ছিল ঋতুভেদে রঙ বদলানো এক রুখে-যাওয়া চরিত্র, কখনো কাদামাখা, কখনো স্বচ্ছ, কখনো ফুলে-ফেঁপে ওঠা, কখনো এমন শান্ত যে তার
বুকে চাঁদ নামলে মনে হতো, জল নয়, কোনো প্রাচীন কাচের পাতের উপর আলো রাখা হয়েছে। এই নদীর পাড়েই পুরোনো
ডাকঘরের পাশে ছিল একটি বইয়ের দোকান, আর সেই বইয়ের দোকানের
শাটার খুলত সকাল দশটায়, বন্ধ হতো রাত আটটায়; দোকানটা ছোট, ধুলিধূসর, জানলার কাঁচে সবসময় হালকা কুয়াশার মতো এক স্তর জমে থাকত, আর ভেতরে ঢুকলে কাগজ, আঠা, পুরোনো মলাট ও শুকনো কাঠের গন্ধ একসঙ্গে মিশে এমন এক নীরবতার জন্ম দিত,
যেখানে নিজের শ্বাসও অন্য কারও স্মৃতি বলে মনে হতো। ওই দোকানের
মালিক ছিল তৌফিক, বয়স পঁয়ত্রিশের কোঠায়, মুখে এমন এক শান্ত বিষণ্নতা যা হেসে ফেললেও পুরোপুরি সরে না; সে বই বাঁধাই করত, পুরোনো পৃষ্ঠার ফাটা কোণ
জোড়া দিত, আর সন্ধ্যা হ’লে
জানলার পাশে বসে জলপাই রঙের চশমা খুলে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকত। মানুষের সঙ্গে তার
কথা কম, কিন্তু কাগজের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল দীর্ঘ;
সে মনে করত, কিছু মানুষ শব্দের ভেতর
দিয়ে বাঁচে, আর কিছু মানুষ নীরবতার ভেতর দিয়ে। তৌফিক,
ছিল দ্বিতীয় দলের মানুষ। একদিন বর্ষার শেষে, যখন আকাশের রং ছিল ধূসর নীল আর বাতাসে ভিজে মাটির গন্ধের সঙ্গে কাঁচা
আমপাতার মিষ্টি তিক্ততা মিশে ছিল, তখন দোকানের দরজার
ঘণ্টি বেজে উঠল। সে মাথা তুলল না প্রথমে, কারণ দুপুরের এই
সময়টায় খুব কম লোকই বই কিনতে আসে; কিন্তু ঘণ্টি আবার বাজল,
এবারের সুরে ছিল দ্বিধা। তৌফিক তাকাল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে এক
তরুণী, গায়ের রঙ এমন নয় যে তাকে কেবল রঙ দিয়ে মনে রাখা
যায়, বরং তার চোখের দৃষ্টি, কাঁধের
একটু ঝুঁকে থাকা ভঙ্গি, আর ভিজে চুলের পাশে লেগে থাকা
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তাকে এমনভাবে আলাদা করছিল যেন সে হঠাৎ কারও দীর্ঘদিনের স্বপ্ন
থেকে নেমে এসেছে।
তার নাম মেঘলা।
সে হাতের ভেজা ব্যাগটা বুকে চেপে ধরল,
তারপর নরম গলায় বলল, ‘আপনাদের কাছে কি পুরোনো পত্রিকার সংখ্যা আছে?
বিশেষ করে সাহিত্য-সাময়িকী?’ তৌফিক একটু
অবাক হল। এমন প্রশ্ন খুব কম শোনা যায়।
সে কাচঘেরা তাকের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কোনো নির্দিষ্ট বছর?’
মেয়েটি হাসল;
সেই হাসিতে তাড়াহুড়ো ছিল না, যেন হাসিটা
আগে থেকেই মুখে জমে ছিল, এখন শুধু প্রকাশ পেল।
‘জানি না,’ সে বলল, ‘যে বছর মানুষ কম লিখত, কিন্তু বেশি ভাবত।’
তৌফিক প্রথমবারের মতো সত্যিই তাকাল তার দিকে। এমন
প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়, কিন্তু প্রশ্নটিই এমন যে উত্তর খুঁজতে গিয়ে মানুষের ভিতরের দরজা খুলে
যায়। সে পুরোনো আলমারির ভেতর থেকে কয়েকটা সাময়িকী বের করে সামনে রাখল। মেয়েটি কাগজ
উল্টে দেখছিল, যেন সে বই নয়, কারও
শিরদাঁড়া ছুঁয়ে দেখছে। কিছুক্ষণ পর সে এক কপি নিয়ে থামল। প্রচ্ছদে একটি ছোট কবিতা
ছাপা, ভেতরে একটা অসম্পূর্ণ গল্প, আর পেছনের পাতায় ছিঁড়ে যাওয়া দামের স্টিকার।
মেয়েটি বলল,
‘এটা নেব।’
তৌফিক দাম
বলল।
মেয়েটি ব্যাগ থেকে কিছু টাকা বের করল, কিন্তু ঠিক তখনই দরজা দিয়ে
হাওয়া ঢুকে তার নোটগুলোকে একটু কাঁপিয়ে দিল; একটি নোট
মেঝেতে পড়ে গেল।
তৌফিক নোটটা তুলতে গিয়ে লক্ষ্য করল, তার হাতে নদীর পানির মতোই
একধরনের শীতলতা লেগে আছে, আর মেয়েটি হঠাৎ বলল, ‘দাঁড়ান, আপনি কি জানেন,
এই শহরে সবচেয়ে সুন্দর জিনিস কী?’
তৌফিক বলল, ‘নদী?’
মেঘলা মাথা নেড়ে বলল, ‘না। মানুষের অপেক্ষা।’
তারপর সে বই হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেল। তৌফিক তার চলে
যাওয়ার শব্দ শুনল, দরজার
ঘণ্টির ঝংকার শুনল, এবং আশ্চর্যভাবে দেখল, বুকের ভেতরে এমন এক ঘড়ি নড়ে উঠেছে যার কাঁটা এতদিন থেমে ছিল। সেই
বিকেলেই সে বুঝেছিল, কিছু মানুষ দোকানে বই কিনতে আসে না,
তারা আসে নিজেদের জন্য একখানা দরজা খুঁজতে। পরদিনও মেঘলা এল।
তারপর আরও তিন দিন। কখনো কবিতার বই, কখনো পুরোনো প্রবন্ধ
সংকলন, কখনো রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ, কখনো নিছকই শিরোনামহীন খাতা। প্রতিবারই সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বইয়ের গন্ধ
নিত, তারপর এমন কিছু প্রশ্ন করত যার সহজ উত্তর নেই। ‘মানুষ কি সবসময় ঠিক সময়ে কাঁদে?’ ‘একটি স্মৃতি
কি বারবার একই রকম মনে হয়?’ ‘ভালোবাসা কি সবসময় পাওয়া আর
হারানোর গল্প?’ তৌফিক শুরুতে উত্তর দিত, তারপর
দেখল উত্তর দিতে গিয়ে সে নিজেই বদলে যাচ্ছে। মেঘলা ছিল বাংলা সাহিত্যের
স্নাতকোত্তর ছাত্রী, শহরের সরকারি স্কুলে অস্থায়ী
শিক্ষকতা করত, আর বাকি সময় কাটাত নদীর পাড়ে হাঁটতে,
পুরোনো বাড়ির ছায়া আঁকতে, কিংবা লাল
কালি দিয়ে নোটবইয়ের পৃষ্ঠা ভরতে। তার মা নেই; বাবা শহরের
বাইরে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে একা থাকতেন, আর মেঘলা
প্রায়ই বলত, ‘আমি আসলে কোথাও থাকি না, আমি শুধু কিছু জায়গায় ফিরে যাই।’ তৌফিকের
জীবনও ফিরতে জানত, কিন্তু কোথায় ফিরতে হবে, তা সে ভুলে গিয়েছিল। তার স্ত্রী বছর চারেক আগে মারা গেছে, কোনো নাটকীয় ঘটনা নয়, কেবল দীর্ঘ রোগ, ক্রমশ নিঃশেষ হ’য়ে যাওয়া শরীর, আর শেষে এমন এক নীরব বিদায় যা তৌফিকের জীবনে শব্দের চেয়ে ভারি হ’য়ে বসেছিল। তারপর থেকে সে বইয়ের দোকান, নদী,
আর সন্ধ্যার চা, এই তিনটির মধ্যে নিজের
দিনগুলোকে ধীরে ধীরে বন্দি রেখেছিল। মেঘলা যখন বইয়ের তাকের সামনে দাঁড়িয়ে আঙুল
বুলিয়ে দিত, তৌফিক দেখত, তার
মুখে জিজ্ঞাসার রেখাগুলো যেন কোনো পুরোনো চিত্রের আলোর মতো নরম। ধীরে ধীরে তারা
কথা বলতে শুরু করল। প্রথমে বই নিয়ে, তারপর শহর নিয়ে,
তারপর এমন সব জিনিস নিয়ে যা বইয়ের বাইরেও সাহিত্যের মতো লাগে,খালি প্ল্যাটফর্ম, ভেজা রাস্তা, ট্রেনের জানলার ধারে মুখ থুবড়ে থাকা সন্ধ্যা, মায়ের
হাতের রান্না, আর একলা মানুষ যে কেন দুপুরে বেশি একা
লাগে। তৌফিক একদিন বলল,
‘আপনি খুব অদ্ভুতভাবে কথা বলেন।’
মেঘলা হেসে উঠল।
‘আর আপনি খুব অদ্ভুতভাবে চুপ
থাকেন।’
‘চুপ থাকা আমার পুরোনো অভ্যাস।’
‘তারপর?’ ‘তারপর বই এসেছিল।’
মেঘলা মৃদু গলায় বলল, ‘আর আমি?’
তৌফিক উত্তর দিল না, কারণ সেই প্রশ্নের ভেতরে এমন এক ঝুঁকি ছিল যা সে
এখনো নিতে শেখেনি। শহরে বর্ষা তখনো থামেনি। কখনো গুঁড়িগুঁড়ি, কখনো ঝড়, কখনো এমন বৃষ্টি যে রাস্তার ধারের
নীল জবা গাছগুলোও ঝাঁকুনি খেত। দোকানের বাইরে দাঁড়ানো ছাতা, ভেজা সাইকেল, আর দূরের বাসস্ট্যান্ডের হর্ন,
সবকিছুর ভেতরে মেঘলা আর তৌফিকের দেখা হতে লাগল।
সে একদিন বলল,
‘চলুন নদীর পাড়ে যাই।’
তৌফিক কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘আমার দোকান বন্ধ থাকলে?’
‘দোকান তো বইয়ের জন্য, মানুষ বইয়ের জন্য নয়?’ সেই দিন তারা ভাঙা সেতু
পর্যন্ত হাঁটল।
জলের ধারে দাঁড়িয়ে মেঘলা বলল, ‘দেখুন, নদী কী করে?’
তৌফিক বলল, ‘চলে।’ ‘আর মানুষ?’ ‘থামে।’ ‘কেন?’
‘কারণ মানুষ নিজেকে বোঝে না।’
মেঘলা নদীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘না, মানুষ
থামে কারণ সে কোনো এক মুহূর্তে ভাবতে শেখে, এই জলে আমার
মুখ কতবার ভেঙেছে, এই আকাশে আমার কোন স্মৃতি র’য়ে গেছে, আর কার নাম আমি উচ্চারণ করিনি।’
তৌফিক তার কথা শুনে বুঝল, মেয়েটি কেবল
পড়া জানে না, সে অনুভবের অক্ষরও চেনে। তার শব্দে এমন এক
স্বচ্ছতা ছিল যে তৌফিক প্রায় ভয় পেত; কারণ স্বচ্ছতা অনেক
সময় আঘাতের চেয়ে বেশি পুড়িয়ে দেয়। একদিন সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করে সে নদীর পাড়ে
গিয়ে দেখল, মেঘলা সিঁড়ির উপর বসে আছে। তার পাশে খোলা খাতা,
হাতে কলম, চোখে অদ্ভুত ক্লান্তি।
তৌফিক জিজ্ঞেস করল, ‘এত বেলা এখানে?’
মেঘলা মাথা না তুলেই বলল, ‘আজ আমার বাবার সঙ্গে কথা
কাটাকাটি হয়েছে।’
তৌফিক নীরবে বসে পড়ল।
কিছুক্ষণ পর মেঘলা বলল, ‘তিনি বলেন, আমি নাকি অকারণে জীবনকে জটিল করি। আমি নাকি সহজভাবে বাঁচি না।’
আপনি কী বললেন?’ ‘কিছু না।’ ‘কেন?’
‘কারণ মানুষ যখন বাবার সামনে দাঁড়ায়, তখন
তার অনেক শব্দই শিশু হয়ে যায়।’ তৌফিক হালকা হাসল।
মেঘলা চুপ করে থাকল। নদীর উপর তখন গোধূলির শেষ আলো
পড়ে ছিল, যেন আকাশের
কারও সোনালি আঙুল জলের গায়ে ছুঁয়ে গেছে।
মেঘলা হঠাৎ বলল, ‘আপনার কি কখনো মনে হয়, কিছু
মানুষকে পেলে জীবন অন্যরকম হত?’
তৌফিক নদীর
দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল, ‘হয়তো।’
‘আপনি কি কাউকে হারিয়েছেন?’
তৌফিক একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ‘হারিয়েছি। তবে হারানো শব্দটা
সবসময় যথেষ্ট নয়।’ ‘তাহলে?’ ‘তাহলে
বলি, একসময় আমার জীবন ছিল। এখন স্মৃতির মতো করে চলি।’
মেঘলা তার দিকে তাকাল। ‘আর যদি কেউ এসে এই স্মৃতির মধ্যে
আলো ফেলে?’
তৌফিক তার চোখে চেয়ে রইল। তখন সে প্রথম বুঝতে পারল, প্রেম কেবল আবেশ নয়; কখনো কখনো প্রেম এমন একটি প্রশ্ন, যার উত্তর
দিতে গিয়ে মানুষ নিজের সমস্ত পুরোনো দেয়াল ভেঙে ফেলে। তারা আর ধীরে ধীরে প্রেমে
পড়েনি; তারা যেন জলে নামা ছায়ার মতো একে অন্যের ভিতরে
মিশে যেতে লাগল, অনুচ্চারিত, কিন্তু
অবধারিত। মেঘলা একদিন দোকানে এসে একটি খাতার পাতায় লিখে রাখল: ‘ভালোবাসা হচ্ছে সেই নদী, যা নিজের উৎস মনে
রাখে না, কিন্তু পথের প্রতিটি পাথরকে চেনে।’ তৌফিক সেই পাতাটা মুছে রাখল না;
সে সেটিকে পুরোনো সংবাদপত্রের আড়ালে সাবধানে রাখল, যেন সেটি কোনো মূল্যবান দলিল।
মেঘলা তার সঙ্গে সকালে চা খেত, দুপুরে বইয়ের ধুলো ঝাড়ত,
সন্ধ্যায় নদীর পাড়ে হাঁটত, আর মাঝেমধ্যে
তৌফিকের স্ত্রীর পুরোনো ছবির দিকে তাকিয়ে খুব মৃদু গলায় বলত, ‘তিনি নিশ্চয়ই ভালো মানুষ ছিলেন।’
তৌফিক বলত, ‘ছিলেন।’
‘আপনি কি তাকে এখনো ভালোবাসেন?’
এই প্রশ্নে তৌফিকের গলার ভেতর জট পাকত।
সে বলত,
‘ভালোবাসা কি শেষ হয়?’
মেঘলা উত্তর দিত না; কারণ সে জানত, কিছু উত্তর
সময়ের মধ্যে থাকে, মানুষের মুখে নয়। এক শীতে শহরের আকাশ
দীর্ঘদিন পরিষ্কার ছিল। রাতের তারাগুলো এমন নিখুঁতভাবে দেখা যেত যে মনে হতো কেউ কালো
সিল্কের উপর সাদা বিন্দু দিয়ে নকশা করেছে। সেই শীতে মেঘলা বারবার জ্বরে পড়ছিল।
প্রথমে তৌফিক গুরুত্ব দেয়নি; ভেবেছিল আবহাওয়ার পরিবর্তন,
ক্লান্তি, শিক্ষকতার চাপ। কিন্তু এক
রাতে সে যখন দোকান বন্ধ করে মেঘলার বাসার সামনে যায়, দরজা
খুলে দেয় মেঘলার ছোট ভাই, আর তার মুখে উদ্বেগের ছাপ দেখে তৌফিকের
বুকের ভেতরে এক অচেনা সিঁড়ি দেবে যায়।
মেঘলা জ্বরে অচেতন, ঠোঁটে শুকনো ভাঁজ, হাতের
আঙুলে নীলচে শীতলতা। ডাক্তার বললেন, পরীক্ষা করতে হবে।
কয়েকদিনের মধ্যে জানা গেল, তার শরীরে জটিল রোগের বাসা।
নামটা ভয়ংকর নয়, কিন্তু দীর্ঘ, ক্লান্তিকর,
আর অনিশ্চিত।
তৌফিক প্রথমে বিশ্বাসই করতে চাইল না। যে মেয়েটি
নদীর পাড়ে হাঁটত, কাচের
মতো স্বচ্ছ চোখে কথা বলত, যে মেয়েটির হাসি ভিজে রেললাইনকে
পর্যন্ত উজ্জ্বল করে তুলতে পারত, তাকে শরীরের ভিতরে এমন
এক অদৃশ্য শত্রু নিঃশব্দে খেয়ে ফেলছে,এই সত্য মেনে নেওয়া
তার পক্ষে কঠিন ছিল। সে মেঘলার পাশে বসে থাকত, হাসপাতালের
সাদা দেয়ালে চোখ রাখত, তার জন্য ফল কেটে দিত, ওষুধের সময় মনে করিয়ে দিত, আর মাঝেমধ্যে এমন
করেই হাত ধরত যেন হাত ধরলেই সময়কে থামিয়ে রাখা যাবে।
মেঘলা জেগে উঠলে বলত, ‘আপনি এভাবে বসে থাকবেন?’
তৌফিক বলত, ‘কেন?’
‘এখানে কি আপনার বইয়ের দোকান?’
‘না।’
‘তাহলে?’ ‘তাহলে আপনি আছেন।’
মেঘলা হাসত,
কিন্তু সেই হাসি আগের মতো সম্পূর্ণ থাকত না। তবু তার চোখে এক
অদ্ভুত আলো ছিল।
একদিন সে বলল,
‘আমি ভয় পাই না, তৌফিক ।’ ‘কিসের?’ ‘মরার।’ তৌফিক চুপ করে রইল।
‘আমি ভয় পাই,’ মেঘলা বলল, ‘অসমাপ্ত থাকাকে।’ ‘কী অসমাপ্ত?’ ‘আমাদের কথা।’
এই প্রথম সে ‘আমাদের’ বলল। তৌফিকের মনে হল, বুকের ভেতরে কেউ একটি পুরোনো জানলা খুলে দিয়েছে। সে ধীরে বলল, ‘কিছু অসমাপ্ত জিনিসই তো সবচেয়ে সত্যি।’
মেঘলা চোখ বন্ধ করে রইল। ‘না,’ সে
বলল, ‘সত্যি জিনিস সম্পূর্ণ হতে চায়।’
কয়েক মাস ধরে তারা হাসপাতাল, বাড়ি, দোকান,
আর নদীর পাড়ের মধ্যে যাতায়াত করল। শহরের মানুষ অল্প কিছু জানত,
আরও অল্প বুঝত। কেউ কেউ ভাবত, তৌফিক মেঘলার
শিক্ষক; কেউ ভাবত দূরসম্পর্কের আত্মীয়; কেউ বা শুধু দেখত, এক বয়স্ক বইওয়ালা আর এক
তরুণী সন্ধ্যাবেলায় নদীর দিকে হাঁটছে, আর তাদের হাঁটার
ভেতরে এক আশ্চর্য ঘনিষ্ঠতা। তৌফিক একদিন মেঘলাকে নিয়ে ভাঙা সেতুর ওপরে উঠল।
অনেকদিন পর সে নিজে নদীর দিকে তাকাল, আর মনে হল জল কখনো
কথা বলে না, তবু কত কথাই সে নিজের মধ্যে বয়ে নিয়ে যায়।
মেঘলা সেতুর রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমি যদি সুস্থ হই, আমি আবার পড়াব।’
‘হবে,’ তৌফিক
বলল, যদিও তার গলায় নির্ভরতা ছিল কম, প্রার্থনা ছিল বেশি।
‘আর আপনি?’ ‘আমি?’ ‘আপনি কি আবার কাউকে ভালোবাসবেন?’
তৌফিক চুপ
করে রইল।
তারপর বলল,
‘আমি কি এখন করছি না?’
মেঘলা তার দিকে তাকাল।
বৃষ্টির আগের মতো আকাশ হঠাৎ ভারী হ’য়ে উঠেছিল। বাতাস একটানা বইছিল।
নদীর জলে ছোট ছোট ঢেউ। মেঘলা খুব আস্তে বলল, ‘তৌফিক ,
আপনি ভয় পাবেন না?’ ‘কিসে?’ ‘আমার শেষটায়।’
তৌফিক প্রথমে কিছুই বলল না। তার ভেতরকার সমস্ত শব্দ
যেন গলার কাছে এসে জমে গিয়েছিল।
পরে ধীরে বলল,
‘তুমি যদি শেষ হও, তবু তুমি শেষ হবে না।
কিছু মানুষ শরীরের ভিতর দিয়ে যায় না; তারা থেকে যায় অভ্যাসে, আলোয়, আর অন্য কারও চুপচাপ বাঁচার ভঙ্গিতে।’
মেঘলার চোখ ভিজে উঠল। সে রেলিংয়ের উপর কপাল রেখে বলল, ‘আমি চাই না আপনি আমাকে স্মৃতিতে পরিণত করুন।’
তৌফিক কাছে এসে বলল, ‘আমি পারব না, মেঘলা। কারণ
তুমি তো এমনিই স্মৃতি হয়ে আমার মধ্যে ঢুকে পড়েছো।
আমি শুধু বাঁচিয়ে রাখব তোমার সব অনুচ্চারিত শব্দ।’
এরপর এলো বসন্ত। কদমফুল ফুটল না, কিন্তু কৃষ্ণচূড়ার রক্তমাখা
পাতা শহরটাকে একটু উন্মাদ ক’রে তুলল। মেঘলার শরীর কিছুটা
সাড়া দিচ্ছিল, কিছু দিন ভালো, কিছু
দিন খুব খারাপ।
এক সকালে সে তৌফিক কে বলল, ‘আমার একটা ইচ্ছে আছে।’
‘বলো।’ ‘আমাকে
নিয়ে নদীর ওপারের গ্রামে যাবেন?’
তৌফিক অবাক হয়ে গেল।
‘কেন?’ ‘আমার
ছোটবেলার বাড়ি ছিল সেখানে। মা বেঁচেছিলেন তখন। আমি যেতে পারিনি বহু বছর। এখন মনে
হয়, ফিরে গেলে বুঝব, আমি কোথা
থেকে এসেছি।’ তারা ট্রলারে নদী পার হল। গ্রামটা ছিল
চিরচেনা ও অচেনা, কাঁঠালগাছ, মাটির
বাড়ি, ধানক্ষেত, কচুরিপানার জল,
আর দূরে এক ফিকে ঘণ্টা। মেঘলা ভাঙা পথ ধরে হাঁটছিল, মাঝে মাঝে থামছিল।
সে একটি পুরোনো আমগাছের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এই গাছের নিচে আমার মা আমাকে
ঘুম পাড়াতেন।’ তৌফিক কিছু বলল না।
সে শুধু দেখল,
মেঘলার চোখের ভিতর দিয়ে একটি সম্পূর্ণ অতীত হেঁটে যাচ্ছে,যা তার নিজের নয়, কিন্তু এখন থেকে তারও। বিকেল
নাগাদ তারা গ্রামের পুকুরপাড়ে বসে।
মেঘলা বলল,
‘জানেন, আমি ছোটবেলায় ভাবতাম মানুষ মরে
গেলে মাটি হয়ে যায়।’ ‘এখন?’ ‘এখন
মনে হয় মানুষ মরে গেলে অন্য কারও ভিতরে জল হয়ে যায়। ছুঁলে বোঝা যায় না, কিন্তু তৃষ্ণায় বোঝা যায়।’
তৌফিক তার
দিকে তাকাল।
‘তুমি এমন কথা কোথায় শিখলে?’
‘কোথাও না।
হয়তো বাঁচতে বাঁচতে।’ সন্ধ্যার আগে ফেরার সময় মেঘলা হঠাৎ হাঁপিয়ে উঠল। তৌফিক
তাকে ধরে বসিয়ে দিল। তার ঠোঁটে রক্তমাখা কাশি, চোখে
আতঙ্ক। তৌফিক তাকে শক্ত ক’রে ধরে রইল, আর সেই মুহূর্তে বুঝল, প্রেমের সবচেয়ে তীব্র
রূপ হচ্ছে ভয়, কারণ যাকে ভালোবাসো, তাকে হারানোর সম্ভাবনাই ভালবাসাকে সবচেয়ে বাস্তব করে তোলে। হাসপাতালে
আবার দিন কাটল। সময়ের সাদা চাদরে ছায়া পড়তে লাগল।
মেঘলা কিছুদিন কথা বলল না, শুধু জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকল।
এক রাতে সে তৌফিক কে ডাকল। গলার স্বর শুকনো।
‘আমি একটা চিঠি লিখেছি,’ সে বলল। তৌফিক বিস্মিত হল।
‘কাকে?’ ‘আমাকে। মানে, পরে আমাকে পড়বেন।’
‘পরে?’ মেঘলা
হাসল।
‘হ্যাঁ, যখন
আমি আর নিজেকে বুঝে উঠতে পারব না।’
তৌফিক সেই চিঠি নেয়নি তখন। সে শুধু কপালে হাত রাখল।
পরদিন ভোরে মেঘলার শরীর আরও খারাপ হলো। ডাক্তার, নার্স, আলো, দৌড়ঝাঁপ, ওষুধ,সবকিছুর
মাঝখানে তৌফিক যেন এক নিরেট পাথর হ’য়ে দাঁড়িয়ে রইল।
দুপুরে মেঘলা একটু চোখ মেলে তাকাল। তার চোখে আগের সেই পরিষ্কার দীপ্তি নেই,
কিন্তু একটা গভীর শান্তি আছে, যেন সে
কোনো দূরের বাগানে পৌঁছে গেছে।
সে ফিসফিস করে বলল, ‘তৌফিক ।’ ‘আছি।’
‘আমাকে ভয় পেও না।’ ‘আমি পিচ্ছিল হয়ে যাচ্ছি,’
তৌফিক বলল,
‘তুমি কেমন করে বলো ভয় পেতে না?’
মেঘলা খুব ক্ষীণ হাসল।
‘তাহলে আমাকে ধরে রাখো।’
তৌফিক তার হাত ধরল। সেই হাতে তখন আর আগের উষ্ণতা
নেই; ছিল এক ধরনের
ক্রমশ সরে যাওয়া আলো। কিছুক্ষণ পরে মেঘলা চোখ বন্ধ করল।
তৌফিক মনে করল, জানালার বাইরে হয়তো হঠাৎ পাখি উড়ছে, ট্রেন যাচ্ছে, নদী চলেছে, কিন্তু এই ঘরের ভেতর সময় একেবারে থেমে গেছে। মেঘলা মারা গেল খুব
চুপচাপ। কোনো নাটকীয় উচ্চারণ, কোনো শেষ অনুরোধ, কোনো বড়ো বিদায় নয়; শুধু একখানা দীর্ঘ
নিঃশ্বাস, তারপর এমন নীরবতা, যা
শোনার জন্য মানুষের জীবনটা যথেষ্ট বড়ো নয়। তৌফিক কাঁদল না প্রথম ঘণ্টায়, প্রথম দিনেও না। সে কেবল বসে রইল, তার হাতের
মধ্যে মেঘলার হাতের স্মৃতি, চোখের সামনে হাসপাতালের সাদা
দেয়াল, আর মনে মনে একটানা একটি শব্দ বাজতে লাগল,অসমাপ্ত, অসমাপ্ত, অসমাপ্ত।
পরে যখন কাঁদল, তখন আর চোখ দিয়ে নয়, পুরো শরীর দিয়ে কাঁদল, যেন তার সমস্ত বুকের
ভিতর থেকে নদীর মতো জল বেরিয়ে আসছে। শহরে ফিরতে ফিরতে তার মনে হল, ভাঙা সেতু আজও দাঁড়িয়ে আছে, নদী আজও বয়ে চলেছে,
দোকানের শাটার হয়তো সে নিজেই খুলবে, বইয়ের
ধুলো হয়তো তার আঙুলে লাগবে, কিন্তু কিছু একটা চিরতরে বদলে
গেছে। মেঘলার চিঠি সে বহুদিন পরে খুলল। পাতায় লেখা ছিল: ‘যদি
আমি না থাকি, তাহলে আমার জন্য দুঃখ কোরো না। দুঃখ মানুষকে
ছোট করে, আর আমি চাইনি আমার চলে যাওয়া তোমাকে ছোট করুক।
আমি চেয়েছিলাম তুমি একদিন আবার জানলার পাশে বসে নদীর দিকে তাকাও, আর বোঝো, ভালোবাসা মানে কারও দেহের কাছে থাকা
নয়, ভালোবাসা মানে কারও অনুপস্থিতিকেও সম্মানের সঙ্গে বয়ে
নিয়ে যাওয়া। তুমি যদি আমাকে মনে রেখো, দয়া করে আমাকে
বেদনার মতো রেখো না; আমাকে রেখো বিকেলের আলোয়ের মতো,
যেটা শেষ হয়ে গেলেও ঘরটাকে একটু গরম করে রেখে যায়। আমি তোমাকে
ভালোবেসেছি, তৌফিক, এমন এক
প্রেমে নয় যা সবকিছু দাবি করে, বরং এমন প্রেমে যা কিছুই
দাবি না করে শুধু পাশে বসে থাকে। আমার জীবনে যদি আবার জন্ম হয়, আমি আবারও তোমার দোকানের দরজায় দাঁড়াব, আর বলব,
‘আপনাদের কাছে কি পুরোনো পত্রিকা আছে?’’ এই চিঠি পড়ে তৌফিক অনেকক্ষণ
নীরব ছিল। তারপর সে চিঠিটা বইয়ের ভেতর ভাঁজ করে রাখল, যেখানে
পুরোনো সাময়িকী, ভাঙা বুকমার্ক, আর
একমুঠো শুকনো কদমফুল ছিল। সময় এগোল। দোকানের নাম আর বদলাল না। তৌফিক প্রতিদিন দোকান খোলত, বই
বাঁধাই করত, নদীর দিকে তাকাত, আর
মাঝে মাঝে দোকানের সামনের ছোট টেবিলে মেঘলার পছন্দের লেখকদের নাম লিখে রাখত। লোকজন
ভাবত, সে আগের মতোই আছে। কিন্তু যারা মন দিয়ে দেখত,
তারা বুঝত, তার চোখে একধরনের গভীরতা
এসেছে, যেন সে এখন আর কেবল বইয়ের গল্প জানে না, জলের কথাও শিখে গেছে।
এক বর্ষার দুপুরে, যখন বাইরে আবার সেই পুরোনো বৃষ্টি শুরু হয়েছিল,
একটি তরুণ ছেলে দোকানে ঢুকে জিজ্ঞেস করল, ‘কেউ কি আছে, যিনি পুরোনো সাহিত্য-সাময়িকী সংগ্রহ করেন?’ তৌফিক
তাকাল।
ছেলেটির হাতে ভেজা ছাতা, চোখে বিস্ময়।
তৌফিক হালকা হেসে বলল, ‘একজন ছিল।’ ছেলেটি অবাক
হয়ে গেল।
‘ছিল?’ তৌফিক
জানালার বাইরে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ।
কিন্তু এখনো আছে। মানুষ সবসময় চলে যায় না। কিছু
মানুষ কথার ভিতরে, কিছু
মানুষ নদীর জলে, আর কিছু মানুষ যে-মানুষকে তারা
ভালোবেসেছিল, তার চুপচাপ বেঁচে থাকার অভ্যাসে থেকে যায়।’
তারপর সে পুরোনো আলমারির চাবি খুলে ছেলেটির হাতে কয়েকটি সাময়িকী
দিল। বাইরে বৃষ্টি ক্রমে নরম হলো, সন্ধ্যা নামে-নামে থেমে
এলো। ভাঙা সেতুর ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে তৌফিক দূরে নদীর দিকে তাকাল, আর মনে হল জলরাশির উপর চাঁদের মুখ ভেসে আছে, একটি
মুখ, যা কখনো পুরোপুরি ধরা যায় না, কিন্তু না-ধরার মধ্যেও তার সৌন্দর্য শেষ হয়ে যায় না। সে দাঁড়িয়ে রইল,
হাতের তালুতে ঠান্ডা বাতাস, বুকের মধ্যে
বহুদিনের এক শূন্যতা, কিন্তু সেই শূন্যতার গভীরে অদ্ভুত
এক উষ্ণতা। কারণ সে বুঝে গিয়েছিল, কিছু প্রেম মানুষকে
মালিক করে না, মানুষকে সাক্ষী বানায়; কিছু প্রেম চিরকাল একসঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি দেয় না, বরং বিচ্ছেদের মধ্যেও আলো জ্বালিয়ে রাখে; আর
কিছু প্রেম, ঠিক মেঘলার মতো, অল্পদিনের
জন্য এসে গোটা জীবনের ভাষা বদলে দিয়ে যায়। তৌফিক সেদিন সেতুর রেলিংয়ে হাত রেখে খুব
আস্তে বলল, যেন নদী শুনতে পায়, ‘তুমি
চলে গেছো, তবু আমি তোমাকে হারাইনি।’ তারপর সে হাঁটতে হাঁটতে ফিরে এলো, আর শহরটার
পুরোনো বাতাসে কোথাও যেন কাগজ, জল, আর ভালোবাসার এক অবিনাশী গন্ধ রয়ে গেল।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন