সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পোস্টগুলি

শুধু তোমার জন্য

  তোমাকে যখন দেখি, মনে হয় পৃথিবীর সব ব্যাধি যেন হঠাৎ এই দেহে এসে জমেছে, আমার দেহে, তোমার স্পর্শের ক্ষুধায় কাঁপতে থাকে মাঘের হিমের মত   জমে থাকা এই রক্তে, প্রজ্বলিত শরীরে, বেড়ে উঠা স্বপ্নে; যেখানে তোমার অনুপস্থিতি, প্রতিদিন নতুন ক্ষতের সৃষ্টি সেখানে তোমাকে ভালোবাসা মানে আগুনে হাত রাখা; তা আমি জানি জানি, পুড়ে যাব, তবু হাত সরাতে পারি না, কিসের টান, তাও জানি না; কারণ তুমি সেই দহন, যা ছাড়া আমার রাত অসম্পূর্ণ,   তুমি সেই অমোঘ আকর্ষণ, যার দিকে টানতে টানতে আমি নিজের শরীরের সীমা ভুলে যাই তার নির্দিষ্ট কাঠামোতে, তোমার ঠোঁটের ছোঁয়া, কখনও মনে হয় ওখানে যুদ্ধ বাধাবো! আমি হেরে যেতে চাই, শুধু তোমার কাছে, তোমার শরীরে হেরে গিয়ে আবার নতুন ক’রে বাঁচবো তোমাতে ভর ক’রে,   একটি ক্লান্ত বর্ষার পাতা যেমন নরম কাদার স্পর্শে নিশ্চুপ হ’য়ে যায় তোমার চোখে যে অন্ধকার, তা নরম নয়; অজানা গন্তব্য আমার তার মধ্যে আছে কামনা, প্রশ্ন, নীরব সহিংসতা, যুদ্ধ যেখানে আমি বন্দি হ’য়েও মুক্তির স্বাদ পাই, যেন তুমি আমাকে ছিন্নভিন্ন করলেও আমার ভিতরেই জন্ম নেয় তোমার দিকে ফেরার আরেক আকুলতা রাতগুলো তোমার নাম...

চন্দ্রাবতী, আমার করুণ অশ্রুগাঁথা

  চন্দ্রাবতী, বাংলা সাহিত্য-ইতিহাসে এক অসাধারণ এবং গভীরতর রহস্যময় উপস্থিতি। যাঁর নাম উচ্চারণ করলেই মধ্যযুগীয় বাংলা কাব্যভুবনের নীরব অথচ দৃপ্ত এক নারী-কণ্ঠ খুলে যায়। এমন এক সময়ে, যখন নারীর লেখাকে শুধু অবজ্ঞাই নয়, প্রায় অসম্ভব বলেই ধরা হতো, সেই ঘন সামাজিক অন্ধকার ভেদ ক’রে চন্দ্রাবতী তাঁর কলমকে বিশ্বাস করেছিলেন নিজের একমাত্র সত্য আশ্রয় হিসেবে। ময়মনসিংহের শান্ত প্রকৃতি, নদী আর জনপদের সহজ-সরল জীবন যেন তাঁর অনুভূতিতে মিশে ছিল অবিচ্ছিন্নভাবে। সেই প্রকৃতির স্নিগ্ধতা ও একাকিত্ব তাঁর শব্দে, তাঁর উপমায়, তাঁর বেদনায় ক্রমে আকার পেতে থাকে। তাঁর জীবনকথার সঙ্গে প্রেমের ব্যথা এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে মনে হয়, ঠিক সেই ক্ষতই তাঁকে রচনা করেছে, তাঁকে গ’ড়ে তুলেছে ব্যতিক্রমী এক শিল্পীসত্তায়। প্রেমের প্রতারণায় বিধ্বস্ত মন যখন আশ্রয়হীন, তখন তিনি আশ্রয় নিলেন রচনার ভিতরে, এবং সেই রচনা পরিণত হলো বাংলার প্রথম নারী-দৃষ্টিকোণ থেকে রচিত মহাকাব্যিক আখ্যান, চন্দ্রাবতীর রামায়ণ । এই রামায়ণ অন্য যে কোনো সংস্করণের মতো নয়; এখানে রাম বীরত্বের প্রতীক হলেও তাঁর প্রতি আস্থা অন্ধ নয়, বরং মানবিক দৃষ্টিতে ব...

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’

  ‘ সোনার তরী '  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ( ১৮৬১ - ১৯৪১ ), একটি বিখ্যাত বাংলা কবিতা , এবং এটি তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত । কবিতাটি রবীন্দ্রনাথ রচনা করেন ১৮৯৪ সালে, যখন তার বয়স ৩৩ বছর। এই কবিতাটি জীবন ও কর্মের ক্ষণস্থায়ীত্বকে মহাকাল ও আত্মত্যাগের প্রেক্ষাপটে তু ’ লে ধরে , যেখানে কবি নিজের কাব্য-ফসল মহাকালের হাতে তুলে দিলেও স্থান পাননি , যা জীবনের নশ্বরতা ও মহাকালকে বোঝায়।   সোনার তরী ' কবিতায় কৃষক (সাধারণ মানুষ) , সোনার ধান (মানুষের কর্ম ও সৃষ্টি) , মহাকাল ও ' সোনার তরী ' ( মহাকাল বা ঈশ্বরের নৌকা) এগুলোর মাধ্যমে জীবন ও কর্মের ক্ষণস্থায়ীত্ব বোঝানো হয়েছে।   জীবনের ভোগ-বিলাস , ব্যক্তিগত অর্জন , সবকিছুই নশ্বর। মহাকাল সবকিছু গ্রহণ করলেও , মানুষের কর্ম বা শিল্পকর্মের স্থান শুধু ক্ষণিকের জন্য , শেষে সে রিক্ত হয়ে যায় , যা জীবনের এক গভীর দার্শনিক সত্যকে প্রকাশ করে।   রবীন্দ্রনাথের সোনার তরি যেন মানবজীবনের অন্তর্লোক থেকে উঠে আসা এক বিস্ময়মাখা প্রতীক , যার ভেতরে ভেসে থাকে আমাদের সব সংগ্রাম , আকাঙ্ক্ষা , প্রত্যাশা আর না-পাওয়ার দীর্ঘ নীরবতা ; এই তরিটি সোনা দ...

বাঙালি একটি জাতিগোষ্ঠী

  ‘বাঙালি একটি জাতিগোষ্ঠী’ এই বাক্যের ভিতর লুকিয়ে আছে এমন এক ইতিহাস, যার সূচনা অনির্দিষ্ট কালের অভ্যন্তরে; এমন এক সমাজজৈব বিবর্তন, যাকে শুধু ভূগোল নয়, ভাষা, সংস্কৃতি, স্বপ্ন, সংগ্রাম, বেদনা, সংগীত, দর্শন, সব মিলেই গ’ড়ে তুলেছে; মানুষের জাতিগত পরিচয়ের ইতিহাস সাধারণত যুদ্ধ, পরিযান, রক্তের মিশ্রণ, খাদ্যাভ্যাস, সামাজিক রীতি, ভূগোল, ঋতুচক্র, নদীর প্রবাহ, বনের বিস্তার, এসবের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়; কিন্তু বাঙালির পরিচয় এতটাই বিস্তৃত যে একে একক কোনো উৎসের সন্তান বলা যায় না; বরং বলা যায় সে বহু ধারার মিলিত সন্তান, পুরোনো সভ্যতার মাটিতে শিকড় গাড়া, বহু জাতির স্পর্শে গঠিত, বহু ভাষার শব্দে নির্মিত, বহু সংস্কৃতির ধ্বনিতে পরিণত এক সম্মিলিত মানবসত্তা। এই অঞ্চলে যে মানুষ প্রথম বসবাস শুরু ক’রে তারা ছিল প্রথম সন্তান, নদীর সন্তান, মাটির সন্তান; তারা বনের ছায়া, পাহাড়ের ঢাল, নদীর দুয়ারে আশ্রয় খুঁজতো; তাদের জীবন ছিল ঋতু ও প্রকৃতির উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল, খাদ্যসংগ্রহ, শিকার, মাছ ধরা, প্রাকৃতিক ফলমূল, এসব ছিল তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা; তাদের সৃষ্ট প্রথম গান ছিল বৃষ্টি নামার শব্দে, প্রথম নৃত্য ছিল নদীর তটে, প্রথ...

সৈয়দ শামসুল হক: ভাষা, জীবন ও সৃজনের উত্তরাধিকার

  বাংলা সাহিত্যের বিস্তীর্ণ অরণ্যে কিছু বৃক্ষ আছে যাদের ছায়া যুগ পেরিয়েও ঝ’রে না; যারা শব্দের শরীরে লুকিয়ে রাখেন মানুষের হৃদয়ের বহু শিকড়, বহু অন্ধকার, বহু জাগরণ। সেই বিরল বৃক্ষদের একজন ছিলেন সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬)। তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যে এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাকে কেবল কবি, কেবল ঔপন্যাসিক, কেবল নাট্যকার বা প্রাবন্ধিক বলে সীমাবদ্ধ করা যায় না; তিনি ছিলেন ভাষার বহু-মাত্রিক স্থপতি, যিনি শব্দকে মানুষ ক’রে তুলেছিলেন এবং মানুষের বুকে শব্দের সত্যকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর সৃষ্টির পরিধি বিস্তৃত,কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, চিত্রনাট্য, গীতিকবিতা, রাজনৈতিক ও মানবতাবাদী বক্তব্য, কোনো ক্ষেত্রেই তিনি অল্প পরিমাণে প্রবেশ করেননি; যা-ই স্পর্শ করেছেন, তা-ই হয়েছে গভীর, প্রগাঢ়, আত্মশক্তিতে দীপ্ত। সৈয়দ শামসুল হকের জন্ম ছিল কৃত্তিবিদ্যার নয়, ভাষার জ্যোতির্বিদ্যার। সেই জ্যোতির্বিদ্যা তাঁকে বুঝিয়েছিল শব্দের নক্ষত্ররা কিভাবে মানুষের ভাগ্যরেখা বদলে দেয়। তাঁর শৈশবের কুড়িগ্রামের আকাশ, তিস্তা নদীর লাবণ্য, শেষ বিকেলের নরম আলো,এসব তাঁর লেখনীতে লুকিয়ে আছে, কখনো ভীষণ স্পষ্টতায়, কখনো স্বপ্নের মত অস্পষ্ট রূপে। ...

কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুরহস্য

  কাদম্বরী দেবীর মৃত্যু বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনির্বচনীয় অন্ধকার, এমন এক রহস্য যার সূক্ষ্ম পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ঠাকুরবাড়ির অভ্যন্তরীণ সমাজব্যবস্থা, নারীবিদ্বেষী যুগের নিঃশব্দ প্রতিধ্বনি, সম্পর্কের অপ্রকাশ্য জটিল মানসিক বিন্যাস, এবং এক প্রতিভাময় নারীর জীবনের গভীর নিঃসঙ্গতার ছায়া; ১৮৫৯ সালে জন্ম নেওয়া কাদম্বরী খুব অল্প বয়সেই প্রবেশ করেছিলেন জোড়াসাঁকোর অন্দরমহলে, যেখানে রীতি-নীতি, আভিজাত্য, সাহিত্যচর্চা, কৌলীন্য, পারিবারিক রাজনীতি, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব,সব মিলিয়ে চলত এক জটিল সামাজিক দৃশ্যপট, যার মধ্যে কাদম্বরী হয়তো আলো হ’য়ে এসেছিলেন, কিন্তু সময়ের প্রবাহে সেই আলো নিভে যেতে যেতে পরিণত হয়েছিল অসহ্য অন্ধকারে; ঠাকুরবাড়ির ইতিহাসে এমন নারী খুব কমই আছেন যাঁরা কাদম্বরীর মতো একইসঙ্গে প্রভাবশালী, অন্তর্মুখী, বুদ্ধিমতী, সৃজনশীল এবং অগ্নিমেয়; তাঁর স্বামী জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন সংস্কৃতিমনস্ক, শিল্পমনস্ক, বহুমুখী প্রতিভাধর, কিন্তু সংসারের কাছে তিনি যেমন অনুপস্থিত থাকতেন, ঠিক তেমনই স্ত্রী কাদম্বরীর জটিল অন্তর্জগত বুঝে ওঠার অবকাশ তার ছিল না; আবার জোড়াসাঁকোর মতো বিশাল পরিবারে, যেখানে অনেকে একই...

রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইনের মধ্যকার কথোপকথন

  ১৯৩০ সালের ১৪ জুলাই আইনস্টাইন তাঁর বার্লিনের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথকে আমন্ত্রণ করেন। স্বাভাবিকভাবেই দুজন জ্ঞান নক্ষত্র যখন এক সাথে হয় , তখন গভীর আলোচনা হবেই। তাঁরাও আলোচনা করেছিলেন মানব ইতিহাসের গভীর ও জটিল কিছু বিষয় নিয়ে। আলোচনার বিষয় ছিলো সত্য , সুন্দর ও চেতনা নিয়ে। একজন জগত সেরা বিজ্ঞানী , আরেকজন অন্তর্জগত নিয়ে কাজ করার কবি। নিচে তা তুলে দেওয়া হল: রবীন্দ্রনাথ:   আপনি গণিত দিয়ে স্থাল-কাল ব্যাখ্যা করতে ব্যস্ত আছেন। আর আমি এ দেশে এসে চিরন্তন জগত ও বাস্তবতার জগত সম্বন্ধে লেকচার দিচ্ছি। আইনস্টাইন:   আপনি কি মনে করেন স্বর্গ পৃথিবী থেকে আলাদা কোনো বস্তু ? রবীন্দ্রনাথ:   না , আলাদা নয়। মানুষের আচরণেই মহাবিশ্বের রূপ ধরা পড়ে। এমন কিছু নেই যা মানুষ দিয়ে বোঝা যায় না। এ থেকে বোঝা যায় মানব সত্য মহাবিশ্বের সত্য এক। আমি এ ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করার জন্যে বিজ্ঞানের একটা দিক উদাহরণ হিসেবে নিয়েছি। বস্তু ইলেকট্রন-প্রোটন দিয়ে গঠিত। যদিও আপাতদৃষ্টিতে বস্তুকে কঠিন মনে হয় , এর ভেতরটা ফাঁকা। একইভাবে মানবতা এমন অনেক স্বতন্ত্র মানুষ দিয়ে তৈরি। কিন্তু তাদের মাঝে এক ধরণের ভেতরকার যোগসূত্র আছে , যা...