সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

তুমিহীন এই জ্যামিতিক দহন


১.

হয়তো কোনো এক মধ্যরাতে বিষণ্ণতার দীর্ঘ নখরে
বিদ্ধ হবে তোমার এই দুধসাদা গ্রীবা;
সেদিন মনে পড়বে আমি তোমাকে কোনো স্বর্গীয় পারিজাত দিতে চাইনি,
বরং দিতে চেয়েছিলাম এই নশ্বর পৃথিবীর সবচেয়ে গাঢ় অন্ধকার
কারণ আমি জানি, আলো কেবল মুখোশ পরায়,
আর অন্ধকারই আমাদের উলঙ্গ ক’রে দেখায় আমরা কতোটা একা

২.
মানুষ যাকে প্রেম বলে, আমি তাকে বলি এক প্রাগৈতিহাসিক ব্যাধি,
যা রক্তকণিকায় মিশে গিয়ে বদলে দেয় নিউরনের সকল ব্যাকরণ
আমি যখন তোমার নাভির হ্রদে আমার তৃষ্ণা বিসর্জন দেই,
তখন সেখানে কোনো ঐশ্বরিক মহিমা থাকে না;
থাকে কেবল মাংসের আর্তনাদ আর হাড়ের ভেতরে লুকানো এক প্রাচীন হাহাকার
তুমি সুন্দরী, কারণ তোমার কোষে কোষে এখনো ধ্বংসের বীজ বোনা হয়নি,
অথচ আমার প্রতিটি নিশ্বাসে এখন তীব্র আকর্ষণের গন্ধ

৩.
আমাদের বিচ্ছেদ কোনো ট্র্যাজেডি নয়, এ হলো এক গাণিতিক অপ্রয়োজনীয়তা
তুমি চেয়েছিলে একশো একটি নীলপদ্ম, অথচ আমি চেয়েছিলাম তোমাকে  
তোমার মগজের নির্জন প্রকোষ্ঠে এক একটা কুঠার চালিয়ে দিতে,
যাতে তুমি ভুলে যাও কীভাবে নিজেকে রূপান্তর ঘটাতে হয়

আমি তোমাকে মুক্তি দিতে চেয়েছিলাম তোমার সৌন্দর্য থেকে,
কারণ সৌন্দর্য হলো এক ধরণের পচনশীল জড়তা;
আমি চেয়েছিলাম তুমি হও আগুনের মতো অশুচি ও অবিনাশী

৪.
এখন চারিদিকে বসন্তের ন্যাকামি, কোকিলের অশ্লীল চিৎকার,
লোকেরা কবিতার নামে পদ্য লিখছে, প্রেমের নামে করছে ন্যাকামি

কিন্তু আমি জানি, আমাদের এই শরীরী জ্যামিতির ভেতরে
কোনো শাশ্বত মিল নেই, আছে কেবল ঘর্ষণের ফলে উৎপন্ন হওয়া এক চিলতে স্ফুলিঙ্গ
সেই আগুনে পুড়েই আমি আজ নিঃসঙ্গ, এক দাঁড়িয়ে আছি তোমার সামনে
তোমার প্রতি আমার কোনো ঘৃণা নেই, এমনকি প্রেমও নেই;
আছে কেবল এক অদ্ভুত ও ভয়াবহ গাঢ় বিষাদের ছায়া

 

 

৫.
যদি কোনোদিন পুনরায় দেখা হয় কোনো জনাকীর্ণ পলিমাটিতে

তবে চিনতে ভুল করো না আমাকে, আমি তোমার প্রথম প্রেম,
আমি সেই মানুষ, যে তোমার চোখের ভেতরে স্বপ্ন নয়, শ্যাওলা দেখতে চেয়েছিল
আমি সেই মানুষ, যে তোমাকে ভালোবাসার নামে
তোমার সমস্ত নিরাপদ বিশ্বাসের খুঁটি উপড়ে ফেলেছিল
প্রেম তো আসলে এক ধরণের নির্জন কারাগার,
আর আমি সেই কয়েদি, যে দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসার নেশায়
বারবার তোমার ওই পাথুরে হৃদয়ে কপাল ঠুকেছি একটু মুক্তির জন্য

৬.
বিদায়, হে আমার ব্যক্তিগত ধ্বংসাবশেষ!
তুমি ভালো থেকো তোমার নিজস্ব বেড়ে উঠা ভূমিতে
আমি চললাম, যেখানে কোনো ফুল ফোটে না,
যেখানে কেবল নষ্ট আর আবর্জনায় রচিত হয় জীবনের মহাকাব্য

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

আমাদের ব্যর্থতাগুলো

  বাংলাদেশের গল্প কেবল সাফল্যের গল্প নয়; এ গল্পের ভেতরে অসংখ্য অপূর্ণতার দীর্ঘ ছায়াও মিশে আছে। একটি দেশ যখন যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে নিজের পরিচয় নির্মাণ করে, তখন তার প্রতিটি অগ্রগতি যেমন গর্বের, তেমনি প্রতিটি ব্যর্থতাও আত্মসমালোচনার দাবি রাখে। আমরা স্বাধীনতার পর বহু পথ পেরিয়েছি   অর্থনীতি বেড়েছে, নগরায়ণ হয়েছে, শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, অবকাঠামো বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু উন্নয়নের দৃশ্যমান ভবনের আড়ালে এমন কিছু ভাঙাচোরা জায়গা রয়ে গেছে, যেখানে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে হয়   আমরা কি সত্যিই এগিয়েছি, নাকি কেবল এগিয়ে যাওয়ার চেহারাটি নির্মাণ করেছি? আমাদের ব্যর্থতাগুলো তাই কেবল কোনো সরকারের, কোনো প্রতিষ্ঠানের কিংবা কোনো ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়; এগুলো আমাদের সামষ্টিক চরিত্র, রাষ্ট্রচিন্তা, সামাজিক অভ্যাস এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের আয়না। সর্বোপরি এগুলো আমাদের নিজস্ব ব্যর্থতা। আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হয়তো এই যে, আমরা অনেক সময় সমস্যাকে সমাধান করার চেয়ে সমস্যার সঙ্গে বসবাস করতে শিখে যাই। রাস্তায় যানজট, নদীতে দূষণ, ফুটপাতে দখল, ঘুষ, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, বিচার পেতে...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...