গ্রামের নাম ছিল নৈরাশপুর। নামের মতোই জায়গাটা যেন আশা-হীন,
নিঃশব্দ, আর ধূসর। বর্ষার শেষে সেখানে কুয়াশা নামে হঠাৎ, মাটির গন্ধ ওঠে, আর রাত নামলে
মনে হয় অন্ধকারটা শুধু আকাশ থেকে নয়, গাছের ফাঁকফোকর, কাঁচা রাস্তা, এমনকি মানুষের
বুকের ভেতর থেকেও বেরিয়ে আসে। অনেকটা সুনসান নিরাবতা।
নৈরাশপুরের শেষ প্রান্তে একটি পুরোনো দোতলা বাড়ি। সবাই
তাকে বলত ছায়া-ঘর। আসল নাম কেউ আর মনে রাখেনি। অনেক বছর আগে এক জমিদার এই বাড়ি তৈরি
করেছিলেন। পরে তার ছেলে, বউ, চাকর, খাজাঞ্চি, এক এক করে সবাই মারা যায়। তারপর বাড়িটা
খালি পড়ে থাকে। কেউ বলত, রাতে সেখানে বাতি জ্বলে। কেউ বলত, সিঁড়িতে এক অচেনা মেয়ের
পা-র শব্দ শোনা যায়। কেউ আবার বলত, বাড়ির পেছনের কুয়োর কাছে দাঁড়ালে নিজের নামটা নিজের
গলায় শোনা যায়। অনেক কালো ছায়া চারিদিকে ঘুরাঘুরি করে।
এই সব কথা শহর থেকে আসা লোকেরা হাসাহাসি ক’রে উড়িয়ে
দিত। কিন্তু গ্রামের মানুষ হাসত না। তারা পথ বদলাত, সন্ধ্যার পর ছায়া-ঘরের দিক তাকাত
না, আর বাচ্চাদের শাসন করত, ‘ওদিক যাস না।
শহরের ছেলে রবীন এসব বিশ্বাস করত না। তার নিজের উপর
খুব দৃঢ় বিশ্বাস ছিল।
রবীন ছিল ফটোগ্রাফার। পুরোনো বাড়ি, পরিত্যক্ত জায়গা,
ভাঙা মন্দির, মরচে ধরা সাইনবোর্ড, এসব তার খুব পছন্দ। তার ধারণা ছিল, ভুত বলে কিছু
নেই; আছে শুধু মানুষের ভয়, যা অন্ধকারে গিয়ে নিজের মুখ বদলায়। সে এক সপ্তাহের জন্য
নৈরাশপুরে এসেছিল এক বন্ধুর বিয়েতে। বিয়ের কোলাহল, মিষ্টির গন্ধ, আর গ্রামের মধ্যরাতের
নীরবতা, সব মিলিয়ে সে বিরক্ত হ’য়ে পড়েছিল। তখনই স্থানীয় এক লোক, শুকুর আলী, হেসে হেসে
বলল, ‘রবীন, ছবি তুলতে যদি নতুন কিছু চাও, ছায়া-ঘরে যাও। কিন্তু সন্ধ্যার আগে ফিরবা।’
রবীন হেসে ফেলল, ‘ভয় দেখাচ্ছেন?’
শুকুর আলী চোখ নামিয়ে বলল, ‘ভয় দেখাই না, মনে করাই।’
পরদিন বিকেলে রবীন তার ক্যামেরা আর টর্চ নিয়ে ছায়া-ঘরের
দিকে রওনা দিল। সঙ্গে তার বন্ধু তন্ময়ও যেতে চেয়েছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে মায়ের বারণে
পিছিয়ে যায়। ‘ওখানে গেলে নাকি মুখ নষ্ট হ’য়ে যায়,’ তন্ময় হেসে বলেছিল। রবীন তার কথায়
পাত্তা দেয়নি।
ছায়া-ঘর দূর থেকে খুবই সুন্দর লাগছিল। লতা-পাতায় ঢেকে
থাকা এক দোতলা বাড়ি, ভাঙা বারান্দা, খসে পড়া প্লাস্টার, আর জানালার কাঁচে ধূসর আলো।
কিন্তু কাছে যেতেই তার সৌন্দর্যটা বদলে গেল। দেয়ালের ভেজা গায়ে যেন কিছু কালো দাগ নড়ছে।
দরজার সামনে পাঁজর ভাঙা বিড়ালের কঙ্কাল পড়ে ছিল। বাতাসের মধ্যে এক ধরনের গন্ধ, পুরোনো
কাঠ, ভেজা মাটি, আর কিছু পচে যাওয়ার, রবীনের নাকে এসে লাগল।
সে ছবি তুলতে শুরু করল। প্রথমে বারান্দা, তারপর সিঁড়ি,
তারপর দরজার খিল। বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই তার টর্চের আলো ধুলোর মধ্যে সাদা রেখা বানাল।
নিচতলায় চারদিকে ছড়িয়ে ছিল ভাঙা চেয়ার, চুলার কালো পাথর, মাকড়সার জাল, আর একটা লম্বা
আয়না। আয়নাটা অদ্ভুতভাবে অক্ষত ছিল। ফ্রেমে খোদাই করা নকশা, কিন্তু কাঁচের ভেতরটা মেঘলা।
রবীন কাছে গিয়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখল, মুখে ধুলোর আভা, কাঁধে ব্যাগ, চোখে কৌতূহল।
তারপর হঠাৎ মনে হলো, ওর পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
সে ঘুরে তাকিয়ে দেখল, কেউ নেই।
হালকা হাসি নিয়ে সে নিজেকে বোঝাল, আলোর খেলা। কিন্তু
তখনই উপরের তলা থেকে খুব আস্তে, খুব স্পষ্ট করে, একটি মেয়ের হাসি ভেসে এল তার কানে।
রবীন অনেকটা নিস্তব্ধ হ’য়ে গেল।
হাসিটা আরেকবার এল, তারপর থেমে গেল। তার কানের ভেতর
কেবল নিজের শ্বাস আর ঘড়ির টিকটিক শব্দ।
সে টর্চ উঁচু ক’রে সিঁড়ির দিকে এগোল। সিঁড়ির কাঠ শুকনো,
কিন্তু প্রতিটি পায়ে যেন কেউ একটু আগে হাঁটছে এমন শব্দ হচ্ছিল। উপরে উঠতেই আরও ঠান্ডা
লাগল। ছাদ থেকে ঝুলে থাকা জালের ফাঁকে ফাঁকে আলো কাঁপছিল। একটি ঘরের দরজা আধখোলা। দরজার
ওপর কালো রঙে লেখা ছিল কিছু অক্ষর, কিন্তু ধুলোয় ঢাকা থাকায় বোঝা যাচ্ছিল না। রবীন
হাত দিয়ে মুছে পড়ল, ’শায়লা।’
নামটা দেখে সে থমকাল। নামটি যেন অনেকদিন আগে কোনো জীবন্ত
মুখের ছিল, এখন কেবল দেয়ালে শুকিয়ে থাকা এক দাগ।
ঘরের ভেতরে পুরোনো খাট, ছেঁড়া পর্দা, আর মেঝেতে বড় একটি
কালো দাগ। দাগটা শুকনো রক্তের মতো দেখালেও রবীন নিশ্চিত হতে পারল না। ঘরের কোণে রাখা
একটি ছোট কাঠের আলমারির ভেতর থেকে হঠাৎ কর্কশ আওয়াজ এল, ঠক...ঠক...ঠক...
কেউ ভিতর থেকে দরজা চাপছে।
রবীন পেছনে সরে এল। ক্যামেরাটা তুলে ছবি নিতে গেল, ঠিক
তখন আলমারির দরজা ধপ ক’রে খুলে গেল। ভেতরে কিছু নেই। তবে আলমারির তলায় একটি লাল কাপড়ের
পুতুল পড়ে ছিল। পুতুলটার এক চোখ নেই। গলায় পিতলের এক ছোট্ট ঘণ্টা বাঁধা।
রবীন নিঃশ্বাস আটকে ক্যামেরা ক্লিক করল।
ক্লিকের শব্দ শেষ হতেই পুতুলটা অনেকটা নড়ে উঠল।
সে বিশ্বাসই করতে পারল না। প্রথমে ভাবল, চোখের ভুল।
কিন্তু পুতুলটা খুব ধীরে, খুব অস্বাভাবিকভাবে, তার কাটা হাত দুটো মাটিতে রেখে বসে গেল।
তারপর সেই একচোখা মুখটা সামনের দিকে ঘুরল, সোজা রবীনের দিকে।
টর্চ হাত থেকে পড়ে গেল। সেই সাথে বড় একটা শব্দ।
রবীন দৌড়ে সিঁড়ির দিকে ছুটল। পেছনে কিছু একটা মেঝের
ওপর গড়িয়ে আসার শব্দ শুনল। সে তাড়াহুড়ো ক’রে নিচে নামল, প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। নিচে নামতেই
দেখল, বারান্দার বাতাস আরও ঠান্ডা। দরজা দিয়ে বেরোতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে সামনে
একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সে কি মেয়ে না কোন ছায়া, রবীন বুঝতে পারল না।
লম্বা সাদা জামা, ভেজা চুল মুখের ওপর, আর চোখদুটো এত
গভীর যে আলো সেখানে ডুবে যাচ্ছে। মেয়েটির পা নেই বলে মনে হলো, কিংবা থাকলেও মেঝের সঙ্গে
মিশে গেছে। সে খুব আস্তে বলল, ‘তুমি এসে গেছ।’
রবীনের গলা শুকিয়ে গেল। ‘কে...কে তুমি?’
‘আমি শায়লা,’ সে উত্তর দিল। ‘তুমি আমার ঘর নষ্ট করেছ।’
রবীন পেছাতে পেছাতে বলল, ‘আমি কিছুই করিনি। আমি শুধু...
ছবি তুলছিলাম।’
শায়লা হেসে উঠল, কিন্তু সেই হাসিতে উষ্ণতা ছিল না। ‘ছবি
তো সবাই তোলে। কেউ স্মৃতি তোলে, কেউ শাস্তি।’
ঠিক তখনই বাড়ির ভেতর থেকে আবার সেই শব্দ, ঠক ঠক ঠক,
আরও জোরে শুনতে পেল। যেন কোনো ভারী জিনিস সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। রবীন ঘুরে দেখল, উপরের তলা
থেকে কালো একটা ছায়া নামছে। মানুষের মতো আকৃতি, কিন্তু মুখ নেই, পায়ের আওয়াজ নেই। তবু
বাতাসের চাপ টের পাওয়া যাচ্ছিল।
শায়লা ফিসফিস করে বলল, ‘ও জেগে গেছে।’
রবীনের শরীর জমে পাথর হ’য়ে গেল। ছায়াটা নিচে নেমে এসে
হঠাৎ লম্বা হলো, তারপরে দেয়ালে সেঁটে গেল। দেয়ালে কোনো শরীর নেই, শুধু লম্বা কালো দাগ,
যা মানুষের মতো হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসছে।
রবীন দরজা ঠেলে বাইরে বেরোতে চাইলো, কিন্তু দরজাটা বন্ধ।
সে হ্যাঁচকা টান দিল, খিল নড়ল না। পেছনে শায়লার গলা আরও নিচু, আরও ভাঙা, ’ও তোমাকে
ছাড়বে না।’
‘কে? কে ছাড়বে না?’
শায়লা চোখ তুলে বলল, ‘বাড়ির মালিক। আমার বাবা।’
রবীন অবাক হ’য়ে তাকাল। তখনই মনে হলো, পুরোনো গল্পগুলোর
ভেতর কিছু সত্যি থাকে। সে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার বাবা?’
‘এই ঘরের ভেতরে তিনি মানুষ ছিলেন,’ শায়লা বলল। ‘বাইরে
তিনি আর মানুষ নন।’
তারপর ঘরের ভেতর থেকে একটি পুরুষের কণ্ঠ এল, ভারী, ঠান্ডা,
আর রুক্ষ। ‘শায়লা।’
এই একটিমাত্র শব্দেই বাড়ির দেওয়াল কেঁপে উঠল।
শায়লা মাথা নিচু করল, ‘ও ডাকছে।’
‘তুমি কে?’ রবীন ফিসফিস করল।
‘আমি যে পালাতে পারিনি।’
কথাটা শেষ হতেই বারান্দার কাঠ ফেটে গেল। রবীন দেখল,
দরজার ফাঁক দিয়ে একটি লম্বা হাত বেরিয়ে এসেছে। নখগুলো কালো, আঙুলগুলো অস্বাভাবিক লম্বা।
হাতটা খিলের ওপরে পড়ে থাকা কাপড়ের মতো শূন্যে ঝুলে রইল, যেন কিছু একটা বেরোতে চাইছে,
কিন্তু বেরোতে পারছে না।
রবীন পেছনে সরে গিয়ে হঠাৎ মেঝেতে পড়ে থাকা পুতুলটার
ওপর পা দিল। ঘণ্টাটা টুং করে বেজে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ঘরের ভেতর থেকে ভেসে এল এক দমকা
ঠান্ডা হাওয়া, আর শায়লা কাত হয়ে ফিসফিস করল, ‘ভুল করেছ।’
দরজার হাতটা এক ঝটকায় ভেতরে টেনে নেওয়া হল, কিন্তু মেঝের
নিচে যেন কোনো জিনিস সরে গেল। হঠাৎ পুরো বাড়িতে একটা দুর্বোধ্য গুঞ্জন শুরু হলো, শত
শত ফিসফিস, কান্না, আর না বলা শব্দ। জানালার কাঁচ কাঁপতে লাগল। ছাদের ফাঁকে নখের আঁচড়
পড়ার মতো শব্দ। দেয়ালের ভেতর থেকে যেন কেউ কাঁদছে।
রবীন প্রাণপণে দরজার খিল খুলল। দরজা খুলতেই বাইরে কুয়াশা।
কিন্তু কুয়াশার মধ্যে রাস্তা নেই। বাড়ির সামনে যেখানে কাঁচা পথ থাকার কথা, সেখানে এখন
শুধুই কালচে জল আর কালো ঘাস। সে বুঝতে পারল, সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেটা আর গ্রামের
জায়গা নয়। যেন বাড়িটা তাকে ভেতরে টেনে নিয়ে বাইরের দুনিয়ার দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।
শায়লা ধীরে ধীরে পেছাতে পেছাতে সিঁড়ির দিকে গেল। ‘শোনো,’
সে বলল। ‘যদি বেরোতে চাও, নিচের কুয়োর কাছে যাও। কিন্তু কাউকে ডেকো না।’
‘কুয়ো কোথায়?’
‘পেছনে।’
রবীন আর প্রশ্ন করেনি। এমনকি ভয়ও যেন এখন জিজ্ঞাসার
চেয়ে বড় ছিল না। সে বাড়ির পেছনের দরজা খুঁজে বের করল, খোলা ছিল না; তারপর একটা জানালার
কাচ ভেঙে বাইরে বেরিয়ে পড়ল। কাঁচ হাতে কেটে গেল। রক্ত পড়ল, কিন্তু ব্যথা সে অনুভব করল
না। পেছন দিকটা আগাগোড়া শ্যাওলা, কাঁটাঝোপ আর ভাঙা ইটের স্তূপে ভরা। মাঝখানে পুরোনো
কুয়ো। কুয়োটার মুখে লোহার জং ধরা চাকা। চারদিকে এমন নীরবতা, যেন পৃথিবী থেমে গেছে।
রবীন কুয়োর কাছে গেল, হঠাৎ তার পেছনে শ্বাসের শব্দ।
সে ঘুরে তাকিয়ে দেখল, শায়লা দাঁড়িয়ে আছে। এবার তার মুখের
ভেতর থেকে জল ঝরছে, যেন সে কুয়ো থেকে উঠে এসেছে। ‘তুমি একা নও,’ সে বলল। ‘আমার মা,
আমার দাদা, বাড়ির কাজের লোক, সবাই এখানে।’
‘এখানে?’
শায়লা কুয়োর দিকে ইশারা করল। ‘বাবা কাউকে যেতে দিত না।
যারা দেখেছে, তাদের সবাইকে কুয়োয় ফেলে দিয়েছে। তারপর রাতের বেলা নাম ডেকে ডেকে...’
সে হঠাৎ থেমে গেল, তার চোখ ভয়ে বড় হ’য়ে উঠল।
কুয়োর ভেতর থেকে কেউ নীচে, খুব নিচে, রবীনের নিজের গলায়
ডেকে উঠল, রবীন।
রবীন পিছিয়ে গেল। তার নাম কুয়ো থেকে বেরিয়ে আসছে, অথচ
সে কাউকে বলেনি।
তারপর আবার কণ্ঠ, এবার তার মায়ের গলায়, ‘বাবা, তুই কোথায়?’
তার বুকের ভেতর যেন বরফ ঢুকে গেল। সে কুয়োর ধারে গিয়ে
নিচে তাকাতেই দেখল অন্ধকারের মধ্যে অসংখ্য মুখ, ফ্যাকাশে, ভেজা, একে অন্যের ওপর গুঁজে
থাকা। কারও চোখ নেই, কারও মুখ সেলাই করা। তাদের মধ্যে একটি পুরুষ মুখ, কাঁধ পর্যন্ত
উঠে এসেছে, চোখদুটো রক্তাভ। সেই মুখেই শাসনের মতো শক্ত কণ্ঠ, ’আমার ঘরে এসেছিস কেন?’
রবীন ছিটকে পড়ে গেল। এখন সে বুঝতে পারছে, এই বাড়ি কেবল
ভুতুড়ে নয়; এটা একটা খাদ, যেখানে স্মৃতি গলে যায়, আর ভয় মানুষের কণ্ঠ নকল ক’রে। কুয়োর
ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো আরেকটি হাত, তারপর আরেকটি। নখময়, ঠান্ডা, ভেজা হাত। তারা রবীনের
পা ধরল।
সে চিৎকার করে উঠল।
শায়লা তাকে টেনে ধরল। ‘দৌড়াও!’
‘কোথায়?’
‘বারান্দায়, আলো জ্বলবে।’
‘কোন আলো?’
‘যেটা তুমি বিশ্বাস করলে।’
রবীন আর কিছু বোঝার চেষ্টা করল না। সে ছুটতে শুরু করল।
পেছনে বহু পায়ের শব্দ, বহু কণ্ঠস্বর, কুয়োর ভেতরের দমকা হাওয়া। সে বাড়ির বারান্দায়
ফিরে এলো, আর ঠিক তখনই দেখল ছাদ থেকে একটা হলুদ বাতি জ্বলে উঠেছে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে
একজন বৃদ্ধ, সাদা দাড়ি, চোখ দুটো অন্ধকারের মতো গভীর। হাতে কেরোসিনের লণ্ঠন। রবীন চমকে
উঠল।
বৃদ্ধ বললেন, ‘এবার তোকে দেখেছি।’
রবীন কাঁপা গলায় বলল, ‘আপনি কে?’
‘এই বাড়ির শেষ কেয়ারটেকার,’ বৃদ্ধ বললেন। ‘আমি এখানে
থাকি না, শুধু পাহারা দিই। যতজনকে পারি বাঁচাই। কিন্তু রাতের পরে কেউ শোনে না।’
‘বেরোনোর পথ কোথায়?’
বৃদ্ধ লণ্ঠনটা বাড়ির সামনের দরজার দিকে তু’লে ধরলেন।
‘দরজা আছে, কিন্তু বাড়ি ছাড়তে হবে নাম না নিয়ে। আর কিছু সঙ্গে নিতে পারবি না।’
রবীন তাকাল শায়লার দিকে। সে তখন বারান্দার কিনারে দাঁড়িয়ে।
তার শরীরের চারপাশে যেন বাতাস কাঁপছে। ‘আমার কী হবে?’ রবীন জিজ্ঞেস করল।
শায়লা শান্ত গলায় বলল, ‘আমি থাকব।’
‘কেন?’
‘কারণ আমি এই ঘরের ভেতরেই মরিনি। আমি এখানেই আটকে গেছি।’
‘তোমাকে কীভাবে মুক্ত করা যায়?’
শায়লা একটু হাসল। ‘আমার নাম ভুলে না গেলে, হয়তো কোনোদিন।’
কথাটা শেষ হতেই আবার কুয়োর দিক থেকে ভয়ংকর গর্জন উঠল।
এখন আর সেটা মানুষের কণ্ঠ নয়, বরং এক ধরনের পশুর মতো। বৃদ্ধ চিৎকার ক’রে বললেন, ‘দাঁড়াস
না। এখনই বেরিয়ে যা!’
রবীন সামনে দৌড় দিল। দরজার কাছে পৌঁছেই সে হঠাৎ বুঝল,
পকেটে ক্যামেরা। সব কিছু শুরু হয়েছে ওই ছবি তোলার সঙ্গে। সে একবার ঘুরে তাকাল শায়লার
দিকে। মেয়েটি এখন হাসছে না, কাঁদছে না, শুধু তাকিয়ে আছে। তার চোখে অদ্ভুত এক অনুরোধ।
রবীন হাত বাড়িয়ে বলল, ‘চলো আমার সঙ্গে।’
শায়লা মাথা নেড়ে বলল, ‘আমি পারব না।’
‘তাহলে আমি আবার আসব।’
‘না,’ সে ফিসফিস করল। ‘ফিরে এসো না।’
রবীন বাইরে দৌড় দিল।
পরের মুহূর্তেই সে নিজেকে গ্রামের রাস্তার উপর পেল।
তার পেছনে ছায়া-ঘর নেই। আছে শুধু পরিত্যক্ত এক জমি, কাঁটাঝোপ, আর কুয়াশা। আকাশে তখন
ভোরের হালকা আলো। সে হাঁপাতে হাঁপাতে প’ড়ে গেল মাটিতে। তার হাত-পা কাঁপছে। শুকুর আলীকে
পাওয়া গেল গ্রামের মাঠের পাশে। লোকজন জড়ো হলো। কেউ তাকে জল দিল, কেউ জিজ্ঞেস করল কী
হয়েছে। কিন্তু সে মুখ খুলতে পারল না।
সে শুধু বলল, ‘বাড়িটা...’
তারপর থেমে গেল। কারণ তার পকেটে থাকা ক্যামেরা আপনা-আপনি
টুং ক’রে উঠেছে।
রবীন ধীরে ধীরে ক্যামেরা বের করল। স্ক্রিন অন। ছবির
তালিকা খুলল।
প্রথম ছবিতে বাড়ির বারান্দা।
দ্বিতীয় ছবিতে সিঁড়ি।
তৃতীয় ছবিতে পুতুল।
চতুর্থ ছবিতে শায়লা।
পঞ্চম ছবিতে কুয়োর ধারে রবীনের নিজের পেছনে দাঁড়িয়ে
আছে এক লম্বা ছায়া।
সে থমকে গেল।
ষষ্ঠ ছবিতে, তার নিজের মুখের বদলে অন্য এক মুখ। অন্ধকার,
কাঁচা দাঁত, আর ভেজা চোখ।
রবীন হঠাৎ বুঝল, সে বাড়ি থেকে ফিরে এসেছে ঠিকই, কিন্তু
কিছু একটা তার সঙ্গে চলে এসেছে।
সেই রাত থেকেই রবীনের ঘরে সমস্যা শুরু হলো।
প্রথমে আয়নায় তার প্রতিচ্ছবি একটু দেরিতে নড়ত। তারপর
মাঝরাতে দরজার বাইরে নখের আঁচড়ের শব্দ শোনা যেত। সে কানে তুলো দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা
করত, কিন্তু তুলোর ভেতর থেকেও কেউ ফিসফিস করত, ’আমার নাম মনে রেখো।’
সে কাউকে কিছু বলেনি। তন্ময়কে শুধু বলল, ‘আমার অসুস্থ
লাগছে।‘
তন্ময় হাসল, ‘তোর মুখ এক সপ্তাহে এমন ফ্যাকাশে কেন?’
রবীন আর কোন উত্তর দিল না।
তৃতীয় রাতে সে স্বপ্ন দেখল, ছায়া-ঘরের কুয়োর ধারে শায়লা
দাঁড়িয়ে। চারদিকে অন্ধকার। সে বলছে, ‘তুমি নাম ভুলে যাচ্ছ।’ তারপর পেছন থেকে সেই পুরুষ
কণ্ঠ, ‘শায়লা।’ মেয়েটি কেঁপে উঠল। অন্ধকারে একটি হাত তার কাঁধে রাখল। সে চিৎকার ক’রে
উঠল, আর রবীন জেগে গেল।
তার ঘরের জানালা খোলা। অথচ সে জানালা বন্ধ করেছিল। জানালার
পাল্লায় কাদা লেগে আছে। মেঝেতে ভেজা পায়ের ছাপ, সোজা তার বিছানা পর্যন্ত এসে থেমেছে।
সে উঠে বসতেই নিজের ঘরের আয়নায় একটি নতুন লেখা দেখল,
কাঁচের গায়ে আঙুল দিয়ে আঁকা, ’ফিরে এসো।’
রবীন দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। রাত তখন প্রায় শেষ, কিন্তু
ভোরের আলোও যেন জন্মায়নি। সে ছুটল গ্রামের মসজিদের দিকে, যেখানে লোকজন জেগে নামাজে
যায়। সেখানে গিয়ে যদি কারও পাশে দাঁড়ায়, ভয় কমবে, এই ছিল তার আশা। কিন্তু মসজিদের উঠানে
পৌঁছে সে দেখল, সকলে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছে। সারি সারি মানুষ, মাথা নিচু, নিরাবেগ।
মাঝখানে ইমাম।
রবীন হাঁপাতে হাঁপাতে এগিয়ে গেল, তারপর ইমাম মুখ তুলে
তাকালেন।
সেই মুখ তার চেনা নয়। কিন্তু কণ্ঠ খুব চেনা।
‘রবীন,’ ইমাম বললেন, ‘তুমি কেন আমার ঘর থেকে পালালে?’
রবীনের বুক ফেটে যেতে চাইল।
সারি সারি মানুষ ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তাদের মুখ নেই।
কেবল শূন্যতা। আর সেই শূন্যতার মধ্যে কোথাও, অনেক দূরে, শায়লার একচোখা পুতুলের ঘণ্টা
মৃদু টুং ক’রে উঠল।
রবীন বুঝল, সে এখনো পুরোপুরি ফেরেনি।
অথবা, হয়তো কখনোই ফেরেনি।
তারপর থেকেই নৈরাশপুরের লোকেরা বলে, মাঝে মাঝে ভোরে
রাস্তার ধারে একজন তরুণকে দেখা যায়। তার হাতে ক্যামেরা, চোখে নিদ্রাহীন ভয়, আর সে বারবার
বলে, ‘শায়লা কোথায়?’ কিন্তু কেউ জবাব দেয় না। কারণ যার কানে এই নাম একবার ঢুকে যায়,
তার ভেতরেও নাকি একটা দরজা খুলে যায়।
আর ছায়া-ঘরের জানালায় আজও, অন্ধকার নামার পর, একটি সাদা
মুখ দাঁড়িয়ে থাকে। সে কারও জন্য অপেক্ষা ক’রে না। সে কেবল তাকিয়ে থাকে, যেন নতুন কারও
ভয়কে নিজের ক’রে নিতে চায়।
আর যদি কোনোদিন কুয়াশার রাতে নৈরাশপুরের শেষ প্রান্ত
দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দূরে লতা-ঢাকা সেই বাড়িটা দেখতে পাও, তাহলে থেমে যেয়ো না, ছবি তুলতে
যেয়ো না, আর দরজার কাছে গিয়ে নিজের নামও বলো না।
কারণ ছায়া-ঘর শব্দের অপেক্ষা ক’রে।
আর একবার যদি সে তোমার কণ্ঠ চিনে ফেলে, তাহলে তোমার
ঘরে ফিরে আসা আর তোমার হাতে থাকবে না।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন