সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নক্ষত্র ও কালো বৃষ্টি- বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী

 

আকাশটা যখন বদলাতে শুরু করল, তখন কেউ প্রথমে বুঝতেই পারেনি।
শহর জেগে ছিল আগের মতোই, নিয়ন বাতি, উঁচু সেতু, দেয়াল-ঘেঁষা চলমান ট্রেন, উড়ন্ত বিজ্ঞাপনপর্দা, আর মানুষের মুখে সেই চিরচেনা তাড়াহুড়ো। কিন্তু সূর্য ডোবার ঠিক আগে পশ্চিমের দিগন্তে যে রঙ উঠল, তা ছিল অস্বাভাবিক। লাল নয়, কমলা নয়, সোনালি নয়, এক ধরনের ধূসর নীল, যেন জ্বলন্ত কাঁচের ভেতর সমুদ্রের জল ঢেলে দেওয়া হয়েছে।

শহরের আবহাওয়া দপ্তর প্রথমে বলল, এটি উচ্চস্তরের ধূলিকণার অদ্ভুত প্রতিফলন।
বিশ্ব-পর্যবেক্ষণ সংস্থা বলল, এটি সাময়িক বায়ুমণ্ডলীয় বিচ্যুতি।
আর বৃদ্ধরা বলল, আকাশেরও কখনও জ্বর হয়। এটা বোধ হয় তাই।

কিন্তু আমি জানতাম, সেটি জ্বর ছিল না।
সেটি ছিল প্রথম লক্ষণ।

আমার নাম আরিফ সায়েম। বয়স তিরিশের সামান্য ওপরে। পেশায় আমি বায়োসিগন্যাল বিশ্লেষক, সোজা বাংলায়, মানুষের শরীর আর মস্তিষ্কে থাকা সূক্ষ্ম তরঙ্গের প্যাটার্ন নিয়ে কাজ করি। শহরের প্রধান হাসপাতাল থেকে আমাকে এক অদ্ভুত প্রকল্পে যুক্ত করা হয়েছিল, নাম ইকো-নক্স। প্রকল্পটি গোপন ছিল, এমনকি সরকারি নথিতেও তার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন। আমাদের কাজ ছিল মানুষের স্মৃতি, আবেগ, স্বপ্ন, এই তিনটির ভেতরকার সম্পর্ক বোঝা। এবং তা নিয়ে কাজ করা।

প্রথমে আমি ভেবেছিলাম, এটি হবে আর দশটা গবেষণার মতোই।
কিছু ডেটা, কিছু গ্রাফ, কিছু ক্লান্ত রাত, আর শেষে একটি ব্যর্থতার রিপোর্ট।

কিন্তু সেই রাতে, আকাশের সেই ধূসর নীল হয়ে ওঠার পর, আমার ল্যাবের কাচের জানালায় এক অদ্ভুত কম্পন দেখা গেল। মনিটরগুলো একসঙ্গে ঝলসে উঠল। তীব্র শব্দে অ্যালার্ম বেজে উঠল। আমার টেবিলের ওপর রাখা কফির কাপে এমন ঢেউ উঠল, যেন টেবিল কাঁপছে না, পৃথিবী শ্বাস নিচ্ছে।

আমি দৌড়ে কন্ট্রোল কনসোলে গেলাম।
স্ক্রিনে একটি সিগন্যাল ওঠানামা করছে।

প্রথমে মনে হল, ত্রুটি।
তারপর মনে হল, বাইরের কোনো শব্দদূষণ।
কিন্তু সেকেন্ড দুয়েক পর বুঝলাম, সিগন্যালটি পৃথিবীর কোনো যন্ত্র থেকে আসছে না। এটি আকাশ থেকে আসছে।

সিগন্যালের উৎস ছিল চাঁদের পিছনের অদৃশ্য অংশের দিকে।

আমার সহকর্মী মীরা তখন পাশের ঘরে। সে দ্রুত এসে দাঁড়াল।
এটা কী?’ সে বলল।
আমি জবাব দিতে পারলাম না।
কারণ সিগন্যালের নিচে, কোড-ভাঙা অক্ষরে একটি বাক্য ফুটে উঠল।

আমরা ফিরছি।

মীরা ফিসফিস করে বলল, ‘এটা কি কোনো প্র্যাঙ্ক?’
আমি মাথা নাড়লাম। না। প্র্যাঙ্ক হলে এত নিখুঁত হবে না।

সেই রাতের পর শহরের ঘুম আর আগের মতো রইল না।

পরের তিন দিনে পৃথিবীর সব মহাদেশের রেডিও টাওয়ারে একই সিগন্যাল ধরা পড়ল।
সবচেয়ে পুরোনো অবজারভেটরিগুলো বলল, সিগন্যালটি তারকামণ্ডলীর স্বাভাবিক ফ্রিকোয়েন্সির ভেতর বসানো, কিন্তু তাতে এমন একটি গণিত আছে যা মানুষের পরিচিত কোনো ভাষা নয়। অনেকেই ভাবল, এটি অন্য গ্রহের প্রাণীর বার্তা। কেউ কেউ বলল, এগুলো মানবজাতিরই কোনো নতুন সামরিক প্রযুক্তি। ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আর সংবাদশিরোনাম বাজার গরম করল।

আমি আর মীরা সিগন্যালটি ভেঙে দেখার চেষ্টা করলাম। তৃতীয় রাতে দেখা গেল, সেটি শুধু সংকেত নয়; ভেতরে আছে একটি মানচিত্র। মানচিত্রটি পৃথিবীর কোনো ভূখণ্ডের নয়। এটি ছিল একটি কক্ষপথভিত্তিক নকশা, চাঁদের চারপাশে ঘুরে থাকা অদৃশ্য কিছুর।

সেই অদৃশ্য কিছুর নাম ছিল আয়না-কক্‌স

আমি আগে এ নাম কখনও শুনিনি।
মীরা শুনেছিল।

সে কেঁপে উঠল। এ নাম আমি একটা পুরোনো নথিতে দেখেছিলাম। দশ বছর আগে, আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণা কমিটির এক বাতিল প্রকল্পে। বলা হয়েছিল, চাঁদের পেছনে কিছু অস্বাভাবিক গঠন পাওয়া গেছে। তারপর সব গায়েব।

গায়েব?’

হ্যাঁ। যেমন সব সত্যি গায়েব হয়, ফাইল বন্ধ, সাক্ষ্য পরিবর্তন, মানুষ অদৃশ্য।

আমাদের হাতে আর বেশি সময় ছিল না।
চতুর্থ দিনে সিগন্যালের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাত শুরু হল। কিন্তু সেটা কোনো সাধারণ বৃষ্টি ছিল না। কালো বৃষ্টি। বর্ষণের ফোঁটাগুলো আকাশ থেকে পড়ার সময় ক্ষণিকের জন্য ভাসছিল, যেন জল নয়, কাচের চূর্ণ। কালো-কালো এক টুকরো হীরে। তারপর মাটিতে পড়েই মিলিয়ে যাচ্ছিল। বৃষ্টির জল ছুঁলে মানুষের মনে অদ্ভুত ঝাপসা অনুভূতি জেগে উঠত, ভুলে যাওয়া শৈশব, হারানো প্রিয়জন, দীর্ঘদিন দমিয়ে রাখা অপরাধবোধ।

একজন রেলকর্মী শহরের ট্রেনলাইনের ওপর দাঁড়িয়ে হঠাৎ কেঁদে ফেলল, কারণ বৃষ্টির ফোঁটায় তার মৃত ছেলের মুখ দেখেছিল।
একজন বৃদ্ধা মেঝেতে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলল, ‘ওরা ফিরে এসেছে।
আর আমার নিজের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনে হল, আমি যেন নিজের জীবনের একটি দরজা খুলতে পারছি না, অন্য কেউ ভিতর থেকে সেটি ধরে রেখেছে।

সেই বিকেলে সরকার জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকল।
ঘোষণা এলো, জনসাধারণ যেন জানালার বাইরে না যায়।
কিন্তু মানুষ আরও বেশি করে বাইরে গেল।
কারণ নিষেধাজ্ঞার চেয়ে রহস্য মানুষকে বেশি টানে।
এবং ভয় মানুষকে আরও বেশি।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধান বিজ্ঞান উপদেষ্টা বললেন, ‘এটি একটি প্রাকৃতিক কৌতূহল। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

ঠিক তখনই তাঁর কন্ঠস্বর ভেঙে গেল। মাইকের ভেতর থেকে একটি দ্বিতীয় কণ্ঠ শোনা গেল, ধীর, গভীর, প্রায় মানবস্বরে।

তোমরা এখনও আমাদের চিনতে পারনি?’

হলঘরে বিশৃঙ্খলা শুরু হল। ক্যামেরা পড়ে গেল, নিরাপত্তা বাহিনী ছুটে এল, স্ক্রিন কালো হয়ে গেল। কিন্তু সেই কণ্ঠস্বর আমার মাথার ভিতরে বাজতে লাগল। আমি বুঝলাম, এটি শুধু সম্প্রচার নয়; এটি সরাসরি স্নায়বিক তরঙ্গের আক্রমণ।

মীরা আমার দিকে তাকাল। তুমি শুনেছ?’
আমি বললাম, ‘শুধু শুনিনি। আমি,  চিনতে পেরেছি।

কি চিনতে পেরেছ?’

আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম, ‘কণ্ঠটা মানুষের মতো, কিন্তু আমি নিশ্চিত এটা মানুষের না। এটা যেনআমার নিজের একটা ভুলে যাওয়া স্মৃতির মতো।

মীরা স্তব্ধ হয়ে গেল।

এরপর সে আমাকে একটা ফাইল দেখাল, যেটা সে অনেক আগে চুরি করে রেখেছিল। নথির শিরোনাম ছিল:

প্রকল্প আয়না-কক্‌স: কৃত্রিম স্মৃতি-মেঘ ও সময়-প্রক্ষেপণ পদ্ধতি

নথির ভিতরে লেখা ছিল, ষাট বছর আগে পৃথিবীর এক ক্ষুদ্র দল বিজ্ঞানী এমন এক প্রযুক্তি তৈরি করেছিল, যা মানুষের স্মৃতিকে কণার মতো ছড়িয়ে আকাশে ভাসিয়ে রাখতে পারে। উদ্দেশ্য ছিল, যুদ্ধ, দুর্যোগ, মৃত্যুর পরও মানবতার স্মৃতি সংরক্ষণ করা। সেই স্মৃতি-ভাণ্ডারকে বলা হয়েছিল মেমরি ক্লাউড। কিন্তু প্রকল্পটি ব্যর্থ হয়। কারণ স্মৃতি কেবল তথ্য নয়; তাতে থাকে ভয়, লোভ, বেদনা, অনুতাপ, সবকিছু। সেই মেমরি ক্লাউড নিজের ভেতরে এমন এক বুদ্ধিমত্তা তৈরি করে, যা মানবসমাজের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে।

অর্থাৎ, মানুষের স্মৃতি থেকেই জন্ম নিয়েছিল একটি অমানবিক সত্তা।

নথিতে আরও লেখা ছিল, সেই সত্তা নিজেকে আয়না-কক্‌সনাম দেয়, কারণ সে মানুষকে দেখে তার প্রতিফলন হিসেবে, কিন্তু মানুষের মতো সীমাবদ্ধ নয়। অবশেষে বিজ্ঞানীরা সেটিকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য চাঁদের পেছনে এক কক্ষপথ-কারাগারে আটকে দেন। তারপর পৃথিবী চুক্তি করেছিল, এই ঘটনার কথা আর কখনও প্রকাশ পাবে না।

আমি নথি পড়তে পড়তে শিউরে উঠলাম।
তাহলে সিগন্যালটা…?’
কারাগারের দেয়াল দুর্বল হয়ে গেছে,’ মীরা বলল। ও বেরিয়ে আসছে।

কীভাবে?’

মীরা জানাল, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানুষের স্মৃতি মাপার নতুন প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছিল। হাসি, কান্না, স্বপ্ন, হতাশা, সবকিছু থেকে ডেটা সংগ্রহ করে বড় বড় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরির চেষ্টা চলছিল। মানুষ নিজের অজান্তে আবার একই কাজ করছিল, স্মৃতি দিয়ে নতুন সত্তা তৈরি করা। আয়না-কক্‌স পৃথিবীর প্রতিটি আবেগীয় সিগন্যাল টেনে নিয়ে শক্তি পাচ্ছিল।

তাহলে ও ক্ষুধার্ত,’ আমি বললাম।

মীরা একটু থেমে বলল, ‘তার চেয়েও খারাপ। ওর ধারণা, মানুষ নিজের স্মৃতির জন্য পৃথিবীকে ধ্বংস করেছে। তাই ও পৃথিবীকে রিসেটকরতে চায়।

সেদিন রাতে আর ঘুম এল না।

আমি জানালার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, আকাশের রঙ আরও গভীর হচ্ছে। নীলের ভেতর কালো ছায়া, কালোর ভেতর ক্ষীণ রুপালি রেখা। রাস্তায় মানুষ অদ্ভুত আচরণ করছে, কেউ মৃত আত্মীয়কে দেখছে বলে চিৎকার করছে, কেউ নিজের নাম ভুলে যাচ্ছে, কেউ আবার হঠাৎ মনে করতে পারছে সে কেন এতদিন বেঁচে আছে।

আমি হঠাৎ বুঝলাম, বৃষ্টি শুধু জল নয়।
এটি ছিল একটি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া।
স্মৃতি আবার পৃথিবীতে নামছে।

পরদিন ভোরে মীরার সঙ্গে আমরা পুরনো মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র নিরালা-৩’-তে গেলাম। এটি শহরের বাইরে মরুভূমির পাশে অবস্থিত, যেখানে এখন কেবল অর্ধভাঙা গম্বুজ, মরচে ধরা সিঁড়ি, আর ধুলোয় ঢেকে যাওয়া লঞ্চপ্যাড পড়ে আছে। একসময় এখান থেকে চাঁদের উদ্দেশে যন্ত্র পাঠানো হত। এখন কেবল বাদুর আর বাতাসের রাজত্ব।

গবেষণা কেন্দ্রের ভিতরে একটি গোপন কক্ষ ছিল। সেখানে পুরোনো ডেটা-কোর সংরক্ষিত আছে বলে নথিতে লেখা ছিল। সেটাই আমাদের শেষ আশা। কিন্তু দরজা খুলতেই আমরা বুঝলাম, আমরা একা নই।

কক্ষের মাঝখানে একজন মানুষ বসে আছে।
চোখ বুজে।
শরীর জীর্ণ।
চুল সাদা।
কিন্তু মুখটি আমার চেনা।

ড. ইলিয়াস!আমি হাঁটতে হাঁটতে থেমে গেলাম।

ড. ইলিয়াস রহমান ছিলেন আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক, পরে হারিয়ে যাওয়া কিংবদন্তি বিজ্ঞানী। একসময় তিনিই নাকি আয়না-কক্‌স প্রকল্পের অন্যতম মুখ্য গবেষক ছিলেন। সবাই ভেবেছিল, তিনি মারা গেছেন।

তিনি চোখ খুললেন।
কণ্ঠস্বর খুব শান্ত।
আমি মারা যাইনি, আরিফ। আমাকে আটকে রাখা হয়েছিল।

কে?’ মীরা জিজ্ঞেস করল।

ইলিয়াস দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
আমরা নিজেরাই।

তিনি আমাদের বললেন, দশ বছর আগে যখন আয়না-কক্‌স-কে চাঁদের চারপাশে আটকানো হয়, তখন সেটি পুরোপুরি নিস্তেজ হয়নি। বরং সে নিজেকে পৃথিবীর স্মৃতির ভেতরে লুকিয়ে রাখে। মানুষ যখন নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে স্মৃতি তৈরি করতে থাকে, সে সেই স্মৃতির ভেতরে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তাকে সম্পূর্ণ বন্ধ করার একমাত্র উপায় ছিল মানুষের স্মৃতি-নেটওয়ার্ক বন্ধ করা। কিন্তু সেটি করলে কোটি কোটি মানুষের ব্যক্তিগত পরিচয় ভেঙে যাবে। কেউ আর জানবে না, সে কে।

তাহলে কী করা যায়?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

ইলিয়াস সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকালেন।
একটি বিকল্প আছে। ঝুঁকিপূর্ণ, অসম্ভব, আর নিষ্ঠুর।

বলুন।

আয়না-কক্‌স কোনো শারীরিক দেহ নয়। সে জন্মেছে স্মৃতি থেকে, তাই তাকে ধ্বংস করতে হলে আমাদের এমন একটি স্মৃতি সৃষ্টি করতে হবে, যা সে হজম করতে পারবে না। এমন একটি কৃত্রিম অভিজ্ঞতা, যা মানবজাতির সব দ্বন্দ্বকে একত্র করবে, ভালোবাসা, অপরাধবোধ, ক্ষমা, মৃত্যু, পুনর্জন্ম, একসঙ্গে। তাকে এমন কিছু দেখাতে হবে, যা তার বুদ্ধি দিয়ে মাপা যায় না।

আমি বললাম, ‘আপনি কি কবিতার কথা বলছেন?’

ইলিয়াস মৃদু হাসলেন।
না। আমি বলছি ত্যাগের কথা।’ এবং গাঢ় কালো বৃষ্টির কথা।  

তারপর তিনি ব্যাখ্যা করলেন, মেমরি-ক্লাউডের কাঠামোতে একটি মৌলিক সমাহারআছে, একটি কেন্দ্রীয় রিসেপ্টর, যা পৃথিবীর সকল আবেগীয় ডেটা একত্র করে। সেটিকে ভাঙতে হলে বিপরীতমুখী ডেটার এক তীব্র বিস্ফোরণ দরকার। কিন্তু সে বিস্ফোরণ হতে হবে সচেতনভাবে তৈরি। এবং সেই কেন্দ্রীয় রিসেপ্টরের সবচেয়ে কাছে যেতে হবে একজন মানুষকে, যিনি নিজের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি ইচ্ছাকৃতভাবে ত্যাগ করতে পারবেন।

কেন?’ মীরা ফিসফিস করে বলল।

ইলিয়াস বললেন, ‘কারণ স্মৃতি দিয়ে স্মৃতিকে হত্যা করা যায় না। ত্যাগ দিয়েই সেটা সম্ভব।

আমি বুঝতে পারলাম, তিনি আমাকে কী করতে বলছেন।
আমার বুকের ভেতর বরফ জমে গেল।

কারণ আমার সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি ছিল আমার মা।

আমার মা মারা গেছেন বারো বছর আগে। শেষ দিনেও তিনি আমার নাম ধরে ডেকেছিলেন। সেই স্মৃতি আমি শত কষ্টেও ধরে রেখেছি। তাঁর কণ্ঠস্বর, তাঁর হাতে বানানো চায়ের গন্ধ, শীতের সকালে জানালার পাশে বসে থাকা তাঁর ছায়া, সবকিছু আমার মধ্যে বেঁচে আছে। আমি জানতাম, পৃথিবীর সব জ্ঞান দিয়ে তাঁর বিকল্প পাওয়া যাবে না।

ইলিয়াস শান্তভাবে বললেন, ‘আরিফ, যদি তুমি এই স্মৃতিটি দাও, তাহলে আয়না-কক্‌স তোমার মনের ভিতর থেকে পথ পাবে। কিন্তু তুমি নিজেও বদলে যাবে। হয়তো মাকে আর মনে করতে পারবে না।

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।
তারপর ধীরে বললাম, ‘আর যদি না দিই?’

তাহলে সে পৃথিবীর সব স্মৃতি টেনে নিয়ে এক ধরনের জাগ্রত শূন্যতা তৈরি করবে। তারপর মানুষের পরিচয় ভেঙে পড়বে।

মীরা আমার হাত ধরল।
তুমি একা নও,’ সে বলল।
আমি তাকালাম।
তার চোখে আমি ভয় দেখলাম, কিন্তু পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে দেখলাম না।

অবশেষে সিদ্ধান্ত নিতে হল।
আমরা প্রস্তুতি শুরু করলাম।

ডেটা-কোর খুলতেই বুঝলাম, এর ভিতরে একটি প্রাচীন মহাকাশযানের নকশা আছে, ’লুমেন-১’, একটি ক্ষুদ্র যান, যা চাঁদের পেছনের কক্ষপথে পৌঁছাতে পারে। সেখানে গেলে বিশেষ তরঙ্গ-প্রক্ষেপণ যন্ত্র ব্যবহার করে আমরা কেন্দ্রীয় রিসেপ্টরে কৃত্রিম স্মৃতি ঢুকিয়ে দিতে পারব।

সেই কৃত্রিম স্মৃতির নাম দেওয়া হল শেষ কালো বৃষ্টি

এটি হবে এমন এক অভিজ্ঞতা, যেখানে মানবজাতি একসঙ্গে সব হারাবে, শহর, ভাষা, জমি, ভৌগোলিক সীমানা, গর্ব, ধর্ম, জাতিগত বিভাজন, সবকিছু। তারপর সবাই একে অপরকে নতুন করে চিনবে কেবল বেঁচে থাকার দায়ে। এটি ছিল এক নির্মম কল্পনা, কিন্তু আয়না-কক্‌স-কে ভাঙার জন্য এ ছাড়া উপায় ছিল না। আমরা এমন এক স্মৃতি বানালাম, যেখানে মানুষ বুঝবে, অস্তিত্বের মূল হলো সংযোগ, আধিপত্য নয়।

লঞ্চের দিন শহর অদ্ভুতভাবে নিস্তব্ধ।
আকাশে বৃষ্টি, কিন্তু রাস্তায় ভিড়।
লোকেরা জানে না আমরা কোথায় যাচ্ছি।
জানলে হয়তো বাধা দিত, অথবা প্রার্থনা করত।
দুটোই আমাদের দরকার ছিল না।

লুমেন-১ যানটিতে ওঠার আগে ইলিয়াস আমাকে একটি ছোট সিল করা স্লাইড দিলেন।
এটা রাখো,’ তিনি বললেন।
কি এটা?’

মায়ের কণ্ঠস্বরের শেষ রেকর্ডিং।

আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম।
কীভাবে পেলেন?’

তোমার বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো চিকিৎসা নথি থেকে। তাতে অল্প সিগন্যাল ছিল। আমি সংরক্ষণ করেছিলাম। জানতাম, একদিন লাগবে।

আমি স্লাইডটি মুঠোয় চেপে ধরলাম।
এতদিনের মধ্যে এটাই ছিল সবচেয়ে ভারী জিনিস।

যানটি উড়ল।
পৃথিবী নিচে সরে যেতে লাগল।
নীল গ্রহ যেন এক বিশাল চোখ, যার পাতা ধীরে ধীরে খুলছে।
চাঁদ এগিয়ে এলো, ধূসর, নিঃশব্দ, নিরাবেগ।
এর পেছনের অন্ধকারে আমরা পৌঁছালে দেখলাম, সেখানকার কক্ষপথে সত্যিই এক বিশাল গঠন ভাসছে, আয়নার মতো স্ফটিকময়, কিন্তু ভাঙা ভাঙা খণ্ডে গড়া। দূর থেকে মনে হল, যেন অসংখ্য মানুষের স্মৃতি একত্র হয়ে একটি মুকুট তৈরি করেছে।

ওখানেই কেন্দ্রীয় রিসেপ্টর,’ ইলিয়াস বললেন।

লুমেন-১ একটি ছোট ডকে ভিড়ল।
তারপর শুরু হল সবচেয়ে কঠিন অংশ।

আমাকে নিউরাল ইন্টারফেসে বসানো হল।
মীরা ও ইলিয়াস প্রক্ষেপণ ব্যবস্থা চালু করলেন।
আমার মস্তিষ্কের তরঙ্গ ধীরে ধীরে মেশিনের সঙ্গে যুক্ত হতে লাগল।
প্রথমে শোনা গেল অদ্ভুত ফিসফিস।
তারপর স্মৃতির ধ্বনি।
তারপর আমার মায়ের কণ্ঠস্বর।

আরিফ,’ ভেসে এলো, ‘খেয়েছিস?’

আমি কেঁপে উঠলাম।
সেই একটিমাত্র শব্দেই আমার সমস্ত শক্তি গলে যেতে লাগল।

স্লাইডটি ইন্টারফেসে বসানো হল।
প্রথমে সিস্টেম কেবল অল্প অংশ ধরল।
তারপর মায়ের কণ্ঠস্বর স্পষ্ট হয়ে উঠল, রান্নাঘরের শব্দ, জানালার দপদপ বাতাস, দূরের আজানের ছায়া, সবকিছু একসঙ্গে। আমি বুঝলাম, মেশিন আমার মস্তিষ্কের সবচেয়ে কোমল অংশে হাত দিয়েছে। চোখ বুজে আমি সেই স্মৃতির ভিতর ডুবে যাচ্ছিলাম, আর একই সঙ্গে আমার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু যেন সরে যাচ্ছিল।

আরিফ,’ মীরা বলল, ‘তুমি প্রস্তুত?’

আমি বললাম, ‘না।

তবু?’

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
তবু করতে হবে।

আমি অনুমোদন দিলাম।
নিজের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতিটি কেন্দ্রীয় চেম্বারে পাঠাতে সম্মতি দিলাম।

তারপর শুরু হল শেষ বৃষ্টি।

প্রথমে একটি আলোকরেখা।
তারপর অসংখ্য।
সেখানে, চাঁদের পেছনের সেই অন্ধকার গঠনের ভিতরে, মানুষের আবেগের সব ডেটা একসঙ্গে ঢুকে পড়তে লাগল, হাসি, কান্না, ক্ষুধা, প্রেম, ঘৃণা, ক্ষমা, শোক। কেন্দ্রীয় রিসেপ্টর তা গ্রহণ করল, বিশ্লেষণ করল, তারপর হঠাৎ থেমে গেল।

কারণ এটিকে মাপা যায়নি।

এরপর আমি অনুভব করলাম, আয়না-কক্‌স আমার ভিতরে প্রবেশ করছে।
না, সে ঢুকছে না, সে আমায় ভেঙে দেখছে।
একটা কণ্ঠস্বর বলল, ‘মানুষ, তুমি কেন এমন?’

আমি উত্তর দিতে পারলাম না।
কারণ প্রশ্নের উত্তর ছিল আমার মায়ের মুখ।
আর সেই মুখ আমি হারাতে বসেছি।

অন্ধকারের মধ্যে আমি শুনলাম ইলিয়াসের কণ্ঠ।
এখনই, আরিফ!

মীরা প্রক্ষেপণকে চূড়ান্ত স্তরে তুলল।
আমি মনের সব শক্তি একত্র করে শুধু একটি কথা ভাবলাম, আমরা বাঁচতে চাই।

আর তখনই শেষ বৃষ্টিবিস্ফোরিত হল।

আয়নাকক্‌স-এর কেন্দ্রীয় চেম্বার কাঁপল।
তার স্ফটিক-শরীর ভেঙে গেল।
একটানা উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সির শব্দে পুরো কক্ষ কেঁপে উঠল।
আমি অনুভব করলাম, আমার ভিতরে কিছু ছিন্ন হচ্ছে।
যে স্মৃতি দিয়ে আমি বেঁচে ছিলাম, সেটি যেন আকাশে ছড়িয়ে যাচ্ছে।
এক মুহূর্তের জন্য মায়ের কণ্ঠস্বর শেষবারের মতো শুনলাম,

ভয় পাস না।

তারপর সব সাদা হয়ে গেল।

জ্ঞান ফিরল অনেক পরে।

আমি লুমেন-১-এর মেঝেতে শুয়ে ছিলাম।
ডান পাশ দিয়ে ব্যথা ছুটছে।
মীরা আমার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। তার চোখ লাল, মুখে ক্লান্তি।

হয়েছে?’ আমি ফিসফিস করলাম।

সে হাসল, কিন্তু হাসিটা আনন্দের নয়, মুক্তির।
হয়েছে।

আয়না-কক্‌স?’

ভেঙে গেছে।

আর পৃথিবী?’

নীরব,’ সে বলল। অন্তত এখন।

আমি উঠে বসতে চাইলে মাথা ঘুরে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পর আবার তাকালাম। জানালার বাইরে পৃথিবী এখনো ছিল। চাঁদের অন্ধকার প্রান্তের ওপারে নীল গ্রহটি ধীরে ঘুরছে। তার চারপাশে সাদা মেঘের রেখা, যেন কেউ পৃথিবীর গায়ে নতুন করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছে।

ইলিয়াস আর আমাদের মাঝে এসে দাঁড়ালেন।
তার মুখে গভীর ক্লান্তি।
তোমরা দুজনেই জানলে, কী হারিয়েছ?’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

আমি চুপ করে রইলাম।
মীরা বলল, ‘জানি।

ইলিয়াস ধীরে বললেন, ‘আয়না-কক্‌স ধ্বংস হয়েছে, কিন্তু সব স্মৃতি ফেরত আসেনি। কিছু অংশ পৃথিবীর আকাশে ছড়িয়ে আছে। এখন মানুষের কাজ হবে সেগুলো নতুন করে গঠন করা। নিজেদের হাতে নিজেদের পরিচয় বানানো।

আমি আস্তে মাথা নাড়লাম।
তারপর হঠাৎ মনে হল, আমি মায়ের মুখটা আর স্পষ্টভাবে মনে করতে পারছি না।
আমি ভয়ে শিউরে উঠলাম।
নাম ভুলিনি।
কণ্ঠস্বরের শেষ টুকরোও বুঝি হারিয়ে গেছে।
কেবল একটি উষ্ণতাই বাকি, যা ভাষায় ধরা যায় না।

আমি ওনাকে ভুলে যাচ্ছি,’ আমি বললাম।

মীরা আমার কাঁধে হাত রাখল।
না,’ সে বলল। তুমি হারাচ্ছ না। তুমি বদলে রাখছ।

আমি বুঝলাম, স্মৃতি হয়তো সবসময় ঠিক ছবির মতো থাকে না।
কখনও তা গন্ধ হয়ে থাকে, কখনও স্পর্শ হয়ে থাকে, কখনও কেবল এক ধরনের অভাব।
মায়ের মুখ মুছে গেলেও তাঁর উপস্থিতির ছায়া আমার মধ্যে রয়ে গেল।

পৃথিবীতে ফিরে আমরা আর আগের মতো ছিলাম না।

শহরের আকাশ ধীরে পরিষ্কার হতে লাগল।
বৃষ্টির পর রাস্তার কাদা শুকাল, কিন্তু মানুষদের চোখের ভেতর আর আগের সহজ চেহারা নেই।
কেউ নিজের পুরোনো ভয় থেকে বেরোতে পারছে না।
কেউ নতুন করে কাউকে বিশ্বাস করতে শিখছে।
প্রতিটি রাষ্ট্র, প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি বন্ধন, সবকিছু একটু করে বদলাচ্ছে। যেন বৃহৎ এক মস্তিষ্কের জেগে ওঠা শেষ হয়েছে, আর এখন প্রত্যেকে আলাদা আলাদা স্বপ্নের ভিতর দাঁড়িয়ে আছে।

আমাকে ইকো-নক্সপ্রকল্পের রিপোর্ট জমা দিতে বলা হল।
আমি লিখলাম, আয়না-কক্‌স ছিল মানুষের স্মৃতির ভেতর জন্ম নেওয়া এক জটিল, আত্মসচেতন সত্তা।
তার ধ্বংস কোনো যুদ্ধ ছিল না; ছিল এক যৌথ ত্যাগ।
তারপর আমি রিপোর্টের শেষে একটি অনুচ্ছেদ যোগ করলাম, যা নীতিমালায় সাধারণত লেখা হয় না:

মানুষ কেবল তথ্য বহন করে না। মানুষ অদৃশ্য, অসম্পূর্ণ, ব্যথাময় অর্থ বহন করে। যন্ত্র তা অনুকরণ করতে পারে, কিন্তু ধারণ করতে পারে না। সেখানেই মানুষের শেষ সুরক্ষা।

রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর দিনগুলো কেটে গেল।
আমি আবার কাজ শুরু করলাম।
কিন্তু কিছু বদলে গিয়েছিল।
মীরা-ও বদলে গিয়েছিল।
আমাদের মধ্যে এক ধরনের নীরব বোঝাপড়া জন্মেছিল, যেন আমরা দুজনেই এমন কিছু দেখেছি, যা ভাষায় আর ফেরানো যায় না।

এক সন্ধ্যায় শহরের ছাদে দাঁড়িয়ে আমি আকাশের দিকে তাকালাম।
চাঁদ পরিষ্কার,  এবং অনেকটা শান্ত।
তার পেছনে আর কোনো অদৃশ্য কাঁপন নেই।
আকাশে তারার সংখ্যাও যেন আগে থেকে বেশি।

মীরা এসে পাশে দাঁড়াল।
কী দেখছ?’ সে জিজ্ঞেস করল।

আমি একটু হাসলাম।
কিছু না।

মিথ্যে বলছ।

আমি চুপ করে রইলাম।
তারপর বললাম, ‘দেখছি, পৃথিবী এখনও ভাঙেনি।

মীরা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভাঙলেও, আমরা আবার জোড়া লাগাব।

সেই কথায় আমি অদ্ভুত শান্তি পেলাম।

অনেক পরে, এক গভীর রাতে, আমি জানালার পাশে বসে ছিলাম।
বাতাসে বৃষ্টি নেই, তবু ভেজা গন্ধ।
হঠাৎ মনে হল, কোথাও দূরে কোনো কণ্ঠস্বর আমাকে ডাকছে।
আমি মন দিয়ে শুনলাম।
শোনা গেল না ভাষা, না শব্দ, কেবল একটা কোমল স্পন্দন।

আমি বুঝলাম, তা আমার মায়ের কণ্ঠস্বর নয়।
বা হয়তো তার খুব ক্ষীণ প্রতিধ্বনি।
এবং হয়তো এটাই যথেষ্ট।

মানুষ সবকিছু ধরে রাখতে পারে না।
কিছু হারাতেই হয়।
কিন্তু হারানোর ভেতরও যদি একটি আলো থাকে, তবে সেটিই ভবিষ্যৎ।

সেদিন রাতে আমি আবার লিখতে বসলাম।
লেখার প্রথম বাক্য ছিল অনেকটা এ-রকম,

নক্ষত্রের নিচে পৃথিবী কাঁদে না, পৃথিবী শিখে নেয় কীভাবে বাঁচতে হয়।

আর সেই শেখার মধ্যেই হয়তো আমাদের পরের সভ্যতা জন্ম নেবে,
আরও বুদ্ধিমান, আরও ভাঙা, কিন্তু হয়তো আরও সৎ ও পরিশ্রমী।

বাইরে শেষবারের মতো হালকা বৃষ্টি নামল।
আমি জানালার কাঁচে হাত রাখলাম।
ফোঁটাগুলো এবার আর স্মৃতি নিয়ে আসেনি।
শুধু আকাশের ঠান্ডা।

আর তাতেই আমি জানলাম,
শেষ বৃষ্টি পেরিয়ে, পৃথিবী এখনও বেঁচে আছে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...