রাইটার ব্লকের ইতিহাস মূলত
লেখালেখির ইতিহাসের সমান প্রাচীন, যদিও ‘Writer's Block’ শব্দটি আধুনিক যুগে
জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। মানুষ যখন প্রথম নিজের অভিজ্ঞতাকে ভাষায় রূপ দিতে শুরু করেছিল,
তখন থেকেই সৃষ্টির আনন্দের পাশাপাশি সৃষ্টি-অক্ষমতার বেদনাও তার সঙ্গী হয়েছে। প্রাচীন
গ্রিসের দার্শনিকেরা বিশ্বাস করতেন, সৃজনশীলতা দেবতাদের আশীর্বাদস্বরূপ এক বিশেষ অনুপ্রেরণা,
যা কখনও মানুষের উপর নেমে আসে, আবার কখনও তাকে একেবারে পরিত্যাগ ক’রে। এই ধারণা বহু
শতাব্দী ধরে সাহিত্যজগতে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। পরবর্তীকালে রেনেসাঁ যুগে মানুষ
যখন শিল্পী ও লেখকের ব্যক্তিসত্তাকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করল, তখন বোঝা গেল যে সৃজনশীলতার
উত্থান-পতন কোনো অলৌকিক বিষয় নয়। এটি মানুষের মন, অভিজ্ঞতা, পরিবেশ এবং জীবনযাত্রার
সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত বিষয় হ’য়ে দেখা দেয়। তবুও সেই সময়েও বহু কবি ও সাহিত্যিক
নিজেদের সৃজনশীল নীরবতার কথা ডায়েরি, চিঠি কিংবা স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন। তারা
হয়তো ‘রাইটার ব্লক’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। কিন্তু তাদের বর্ণনা আজকের মনোবিজ্ঞানের
আলোকে এই অবস্থারই পরিচয় বহন ক’রে। ইতিহাসে এমন বহু সময় এসেছে যখন একজন লেখক বছরের
পর বছর কোনো উল্লেখযোগ্য রচনা প্রকাশ করতে পারেননি। অথচ সেই দীর্ঘ নীরবতার পর তিনি
সৃষ্টি করেছেন এমন একটি সাহিত্যকর্ম, যা পরবর্তী শতাব্দীগুলোর পাঠককে মুগ্ধ করেছে।
এই ঘটনাগুলো আমাদের শেখায় যে, সৃজনশীলতার বিরতি সবসময় পতনের লক্ষণ নয়। অনেক সময়
এটি গভীর প্রস্তুতির সময়ও হ’তে পারে। একজন শিল্পীর ভেতরে অসংখ্য অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি
এবং পর্যবেক্ষণ দীর্ঘদিন ধ’রে নীরবে জমা হতে থাকে। তারপর একসময় তা বিস্ফোরণের মতো
প্রকাশিত হয়। কিন্তু সেই অপেক্ষার সময়টিই লেখকের কাছে সবচেয়ে কঠিন, কারণ বাইরের
মানুষ শুধু তার নীরবতা দেখে, ভেতরের প্রস্তুতিকে নয়। এই কারণেই রাইটার ব্লককে অনেক
গবেষক ‘অদৃশ্য শ্রমের সময়’ বলেও উল্লেখ করেছেন। বাইরে কিছুই ঘটছে না বলে মনে হলেও
ভেতরে মস্তিষ্ক নতুন সংযোগ তৈরি করছে। পুরোনো অভিজ্ঞতাকে নতুন অর্থ দিচ্ছে, ভাষাকে
নতুন রূপে সাজানোর চেষ্টা করছে। তবে এই প্রক্রিয়া সবসময় সুখকর নয়; বরং অনেক সময়
এটি ভয়, হতাশা এবং আত্মসন্দেহে পরিপূর্ণ থাকে। একজন লেখক যখন টেবিলের সামনে বসে শূন্য
পাতার দিকে তাকিয়ে থাকেন, তখন সেই শূন্যতা কেবল কাগজে নয়, বরং মনেও প্রতিফলিত হয়।
তিনি অনুভব করেন, যেন নিজের ভেতরের ভাষা কোথাও হারিয়ে গেছে। অথচ বাস্তবে ভাষা হারিয়ে
যায় না; হারিয়ে যায় তার প্রতি আস্থা। আত্মবিশ্বাস যখন কমে যায়, তখন সবচেয়ে সহজ
বাক্যটিও কঠিন মনে হয়। এই আত্মবিশ্বাসের সংকটকে মনোবিজ্ঞানীরা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ
হিসেবে বিবেচনা করেন। মানুষের মস্তিষ্কে সৃজনশীলতা এবং আত্মসমালোচনার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম
ভারসাম্য থাকে। যখন সৃজনশীল অংশ সক্রিয় থাকে, তখন নতুন ধারণা জন্ম নেয়; কিন্তু যখন
সমালোচনামূলক অংশ অতিরিক্ত সক্রিয় হ’য়ে ওঠে, তখন প্রতিটি ধারণাকেই তা প্রত্যাখ্যান
করতে থাকে। ফলে মানুষ লেখার আগেই নিজের চিন্তাকে বাতিল ক’রে দেয়। এই প্রক্রিয়া এত
দ্রুত ঘটে যে অনেক সময় লেখক নিজেও বুঝতে পারেন না, তিনি কেন লিখতে পারছেন না। তিনি
কেবল অনুভব করেন যে কোনো বাক্যই যথেষ্ট ভালো নয়। বাস্তবে সমস্যাটি বাক্যে নয়, বরং
সেই বাক্যের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গিতে। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান দেখিয়েছে যে, সৃষ্টিশীল
কাজের সময় মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চল একসঙ্গে কাজ করে। কল্পনা, স্মৃতি, ভাষা, আবেগ,
পরিকল্পনা এবং বিচার, সবগুলোই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, উদ্বেগ
কিংবা অনিদ্রা এই সমন্বয়কে দুর্বল ক’রে দেয়। তখন চিন্তা আসে, কিন্তু ভাষা আসে না;
ভাষা আসে, কিন্তু গঠন আসে না; গঠন আসে, কিন্তু আবেগ অনুপস্থিত থাকে। ফলে দেখা যায় লেখা
যান্ত্রিক হ’য়ে যায় অথবা একেবারেই শুরু হয় না। এই অবস্থায় অনেক লেখক ভুল ক’রে ভাবেন
যে তাদের প্রতিভা শেষ হ’য়ে গেছে। অথচ গবেষণা বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি সাময়িক।
বরং যারা দীর্ঘদিন ধ’রে সৃজনশীল কাজ করেন, তাদের জীবনে এমন পর্যায় আসার সম্ভাবনাই
বেশি, কারণ তাদের উপর প্রত্যাশার চাপও বেশি থাকে। প্রথম বই সফল হলে দ্বিতীয় বই লেখার
সময় ভয় কাজ ক’রে। প্রথম কবিতাগ্রন্থ প্রশংসিত হলে পরবর্তী গ্রন্থে সেই মান ধরে রাখার
দায় তৈরি হয়। একটি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলে পরবর্তী গবেষণাকে আরও উন্নত
করার চাপ আসে। অর্থাৎ সাফল্য যেমন আনন্দ দেয়, তেমনি নতুন ধরনের রাইটার ব্লকেরও জন্ম
দিতে পারে। একে অনেক গবেষক ‘সাফল্যজনিত সৃজনশীল সংকোচ’ বলে ব্যাখ্যা করেন। এখানে ব্যর্থতার
ভয়ের পাশাপাশি সাফল্য ধ’রে রাখার ভয়ও কাজ ক’রে। আবার এমন লেখকও আছেন, যারা কোনো নির্দিষ্ট
বিষয়ে এত গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন যে বিষয়টির আবেগ তাদের ভাষাকে অবরুদ্ধ ক’রে দেয়।
যেমন যুদ্ধ, গণহত্যা, প্রিয়জনের মৃত্যু, শৈশবের নির্যাতন, নির্বাসন, দেশত্যাগ কিংবা
ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নিয়ে লিখতে গিয়ে অনেকেই দীর্ঘ সময় থেমে যান। কারণ লেখার অর্থ
তখন কেবল ঘটনা বর্ণনা নয়, সেই ঘটনার ভেতরে আবার প্রবেশ করা এবং বার বার চোখ রাখা।
অবচেতন মন অনেক সময় এই পুনঃঅভিজ্ঞতাকে এড়াতে চায়। ফলে লেখক বাহ্যিকভাবে লেখার টেবিলে
বসলেও ভেতরের মন তাকে থামিয়ে রাখে। এই ধরনের রাইটার ব্লককে আবেগগত প্রতিরক্ষা হিসেবেও
দেখা যায়। অর্থাৎ, লেখা থেকে বিরত থাকা অনেক সময় মনের আত্মরক্ষার একটি কৌশল। তবে
দীর্ঘদিন এই অবস্থা চলতে থাকলে তা ব্যক্তির আত্মবিশ্বাসে আঘাত হানে। লেখক তখন অন্যদের
সঙ্গে নিজের তুলনা শুরু করেন। তিনি ভাবেন, অন্য সবাই লিখছে, কেবল তিনিই পারছেন না।
প্রতিদিন অসংখ্য নতুন বই, নতুন নিবন্ধ, নতুন কবিতা, নতুন পুরস্কার, নতুন ঘোষণা চোখের
সামনে ভেসে ওঠে। মানুষ তখন অন্যের সমাপ্ত কাজের সঙ্গে নিজের অসমাপ্ত খসড়ার তুলনা করতে
থাকে। এই তুলনা অত্যন্ত অন্যায়, কারণ একটি প্রকাশিত বইয়ের পেছনে বছরের পর বছর পরিশ্রম
থাকে, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে আমরা কেবল ফলাফল দেখি, প্রক্রিয়া
দেখি না। ফলে নিজের ধীরগতিকে ব্যর্থতা মনে হয়। এই মনোভাব রাইটার ব্লককে আরও গভীর ক’রে
তোলে। অথচ সৃজনশীলতার প্রকৃতি প্রতিযোগিতামূলক নয়; এটি ব্যক্তিগত। একজন লেখকের সময়,
অভিজ্ঞতা, ভাষা এবং পথ আরেকজনের মতো হতে পারে না। যে লেখক নিজের গতিকে সম্মান করতে
শেখেন, তিনি তুলনামূলকভাবে দ্রুত এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেন। ইতিহাসের বহু বিখ্যাত
সাহিত্যিক তাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের মাধ্যমে এই শিক্ষা দিয়েছেন। কেউ প্রতিদিন নির্দিষ্ট
সংখ্যক শব্দ লিখতেন, কেউ নির্দিষ্ট সময় টেবিলে বসতেন, কেউ আবার লিখতে না পারলেও পড়তেন
বা নোট নিতেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সৃজনশীলতার সঙ্গে সম্পর্কটি অটুট রাখা। কারণ লেখা
না হলেও লেখকের জীবন যেন লেখালেখি থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনেকেই মনে করেন, অনুপ্রেরণা এলে তবেই লিখবেন। কিন্তু বাস্তবে নিয়মিত চর্চাই অনুপ্রেরণাকে
আমন্ত্রণ জানায়। একজন সংগীতশিল্পী যেমন প্রতিদিন রেওয়াজ করেন, একজন চিত্রশিল্পী যেমন
প্রতিদিন আঁকার অভ্যাস বজায় রাখেন, তেমনি লেখকেরও প্রতিদিন ভাষার সঙ্গে সময় কাটানো
দরকার। এমনকি লেখা না হলেও শব্দ নিয়ে ভাবা, একটি বাক্য নোট করা, কোনো দৃশ্য পর্যবেক্ষণ
করা বা একটি সংলাপ লিখে রাখা, এসবই সৃজনশীল ধারাবাহিকতার স্তর। রাইটার ব্লকের সবচেয়ে
বড় বিপদ হলো এটি মানুষকে লেখালেখি থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তিনি ভাবেন, আজ লিখতে পারছি
না, কাল লিখব; তারপর সেই কাল আর আসে না। দিনের পর দিন দূরত্ব বাড়তে থাকে। ফলে ব্লক
আরও শক্তিশালী হয়। তাই অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন, ব্লকের সঙ্গে যুদ্ধ নয়, বরং সংলাপ করা
উচিত। অর্থাৎ নিজেকে জোর করে নিখুঁত লেখা লিখতে বাধ্য না ক’রে, কেবল উপস্থিত থাকার
অভ্যাস গ’ড়ে তোলা উচিত। একটি খারাপ বাক্য লেখা একটি না-লেখার চেয়েও মূল্যবান। কারণ
খারাপ বাক্য সম্পাদনা করা যায়, কিন্তু শূন্য পৃষ্ঠা সম্পাদনা করা যায় না। এই সরল
সত্যটি যত দ্রুত একজন লেখক উপলব্ধি করেন, তত দ্রুত তিনি রাইটার ব্লকের মানসিক শৃঙ্খল
থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেন। সৃজনশীলতা কখনও অবিরাম প্রবাহ নয়; এটি জোয়ার-ভাটার
মতো। কখনও চিন্তা উথলে ওঠে, কখনও নীরবতা নেমে আসে। কিন্তু নীরবতাও সৃষ্টির অংশ। সেই
নীরবতাকে যদি আমরা ব্যর্থতা না ভেবে প্রস্তুতি হিসেবে দেখতে শিখি, তবে রাইটার ব্লক
আর কেবল অন্ধকার মনে হবে না; বরং নতুন ভাষা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং নতুন আত্ম-আবিষ্কারের
একটি অন্তর্বর্তী সময় বলে মনে হবে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন