রাজনীতি
মানুষের জীবনের সঙ্গে এত গভীরভাবে যুক্ত যে তাকে কেবল ক্ষমতার কৌশল, নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা
কিংবা দলীয় তর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে তার প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যায় না। রাজনীতি
মূলত সেই প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একটি সমাজ তার ভাগ্য, নীতি, অধিকার, উন্নয়ন এবং
ভবিষ্যৎ নির্ধারণ ক’রে দেয়। আর এই রাজনীতির ‘মালিকানা’ বলতে বোঝায়, রাজনীতি কার হাতে
থাকবে, কোন দলের হাতে থাকবে, কার স্বার্থে পরিচালিত হবে, এবং কে এর কেন্দ্রবিন্দুতে
তার আধিপত্য বজায় রাখবে। আদর্শভাবে রাজনীতির মালিকানা জনগণের হাতে থাকার কথা ছিল, কিন্তু
বাস্তবে অনেক সময় দেখা যায়, রাজনীতি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হ’য়ে ক্ষমতালোভী গোষ্ঠী,
দলীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক প্রভাব কিংবা ব্যক্তি-আকাঙ্ক্ষার দখলে চলে যাচ্ছে। আর তখন
সেই রাজনীতি জনকল্যাণের বাহন থাকে না; তা হ’য়ে ওঠে স্বার্থসিদ্ধির নিজস্ব হাতিয়ার।
তাই ‘রাজনীতির মালিকানা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, এটি কেবল তত্ত্বের বিষয় নয়, রাষ্ট্রের
ভবিষ্যৎ, গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব এবং নাগরিক জীবনের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত
বিষয় হ’য়ে দেখা দেয়। রাজনীতির প্রকৃত মালিক জনগণ, এ-কথা একটি সুন্দর স্লোগান মাত্র
নয়; এটি গণতন্ত্রের মৌলিক দর্শন। জনগণই রাষ্ট্র গঠন ক’রে, কর দেয়, আইন মেনে চলে,
ভোট দেয় এবং উন্নয়নের ফল ভোগ ক’রে। সুতরাং রাজনীতির সিদ্ধান্তও তাদের কল্যাণকে কেন্দ্র
ক’রে হওয়া উচিত। কিন্তু যখন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার হাতিয়ার
হ’য়ে ওঠে, তখন জনগণ মালিক থাকে না; তারা হ’য়ে উঠে শুধুমাত্র দর্শক। রাজনীতি যদি জনগণের
অংশগ্রহণে গ’ড়ে না ওঠে, তবে তা ধীরে ধীরে একটি সংকীর্ণ চক্রের অধীনে চলে যায়। এই
চক্র কখনও দলীয় নেতৃত্ব, কখনও পরিবারতন্ত্র, কখনও ব্যবসায়িক প্রভাব, আবার কখনও প্রশাসনিক
জোটের মাধ্যমে রাজনৈতিক মঞ্চকে নিয়ন্ত্রণ ক’রে। ফলে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর চাপা
প’ড়ে যায়, নীতি নির্ধারণে নৈতিকতা দুর্বল হয়, এবং রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত
হয়। রাজনীতির মালিকানার প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হ’য়ে উঠে উন্নয়নশীল সমাজে,
যেখানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো পুরোপুরি শক্তিশালী নয়। এ-ধরনের সমাজে রাজনীতি
প্রায়শই ব্যক্তিনির্ভর হ’য়ে পড়ে। নেতা বা দলকে জনগণের সেবক হিসেবে না দেখে; অনেক
সময় ত্রাণকর্তা, অভিভাবক বা অপরিহার্য শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এ-প্রবণতা বিপজ্জনক,
কারণ এতে রাজনীতির নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হ’য়ে পড়ে। একটি দেশ তখনই কর্মসূচিভিত্তিক রাজনৈতিক
সংস্কৃতি তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। নির্বাচন হয় ব্যক্তি নির্ভর, দল হয় পরিবারকেন্দ্রিক
আর সংসদ হয় বিতর্কের বদলে আনুগত্যের মঞ্চ। রাজনীতির মালিকানা তখন আর নীতির হাতে থাকে
না; থাকে প্রতীক, প্রভাব ও স্বার্থের হাতে। এই পরিস্থিতিতে জনগণের অধিকার বাস্তবে দুর্বল
হ’য়ে পড়ে; যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে গণতন্ত্রের সব চিহ্ন বজায় থাকতে পারে। রাজনীতির মালিকানা
নিয়ে কথা বলতে গেলে নাগরিক সচেতনতার প্রসঙ্গও আসতে হয়। জনগণ যদি রাজনীতির মালিক হতে
চায়, তবে তাকে কেবল ভোটার হ’য়ে থাকলে চলবে না; তাকে হতে হবে সচেতন নাগরিক। কারণ অজ্ঞ,
উদাসীন বা আবেগনির্ভর জনসমাজে রাজনীতি সহজেই দখল হ’য়ে যায় খুব সহজেই। শিক্ষিত ও সচেতন
জনগণ প্রশ্ন করতে জানে, জবাবদিহি দাবি করতে পারে, মিথ্যাকে চিনতে পারে এবং স্বার্থান্ধ
রাজনীতিকে প্রতিরোধ করতে পারে। তাই রাজনৈতিক মালিকানা রক্ষার প্রথম শর্ত হলো জনগণের
সচেতনতা। বিদ্যালয়, পরিবার, গণমাধ্যম, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম,
সবাই মিলে যদি রাজনৈতিক জ্ঞান ও দায়িত্ববোধ তৈরি করতে পারে, তখন রাজনীতিতে কেবল ক্ষমতার
খেলা থাকে না; তা হ’য়ে উঠবে জনকল্যাণের বাস্তব ক্ষেত্র। জনগণ তখন বুঝতে পারবে, রাজনীতি
কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, বরং সবার যৌথ ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি দায়বদ্ধ আশ্রয়।
তবে রাজনীতির মালিকানা কেবল জনগণের হাতে থাকলেই হবে না; তা সুষ্ঠু প্রতিষ্ঠানেও রূপ
পেতে হবে। কারণ, জনগণের ইচ্ছা প্রায়ই প্রতিষ্ঠান ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সংসদ,
নির্বাচন, কমিশন, বিচারব্যবস্থা, স্থানীয়
সরকার, সংবাদমাধ্যম এবং প্রশাসনিক কাঠামো; এই প্রতিষ্ঠানগুলো যদি স্বাধীন, কার্যকর
ও জবাবদিহিমূলক না হ’য়ে উঠে, তবে জনগণের মালিকানা দিন দিন দুর্বল হ’য়ে পড়বে। উদাহরণস্বরূপ
বলা যেতে পারে, যদি নির্বাচনী প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না হয়, তবে জনগণের ভোটের প্রকৃত মূল্য
থাকবে না। যদি বিচারব্যবস্থা নিরপেক্ষ না থাকে, তবে রাজনৈতিক অপরাধের শাস্তি হয় না।
যদি প্রশাসন দলীয় আনুগত্যে পরিচালিত হয়, তবে নীতি নয়, ক্ষমতাই মুখ্য হ’য়ে ওঠে।
অতএব, রাজনীতির মালিকানা নিশ্চিত করতে হলে কেবল আদর্শিক দাবি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন
শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনগত সুরক্ষা এবং নৈতিক সংস্কৃতি। রাজনীতির মালিকানার আরেকটি
দিক হলো অর্থনৈতিক প্রভাব। আধুনিক যুগে রাজনীতি অনেক সময় টাকার জোরে নিয়ন্ত্রিত হয়।
নির্বাচন, প্রচার, সামাজিক প্রভাব, মিডিয়া-নির্ভরতা, সবকিছুতেই অর্থের ভূমিকা বেড়েই
চলছে। ফলে যার অর্থ আছে, তার জন্য রাজনীতিতে প্রবেশ অনেক সহজতর হচ্ছে, যার অর্থ নেই
তার তুলনায়। এ-বাস্তবতা রাজনীতিকে জনগণের চেয়ে
পুঁজির অনুগত করে তুলছে দিনে দিনে। তখন শিল্পপতি, ব্যবসায়ী বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী নিজেদের
স্বার্থে নীতি প্রভাবিত ক’রে। জনসেবার পরিবর্তে তখন অর্থতন্ত্র্য, দুর্নীতি ও সুবিধাবাদ
মাথা তোলে। এই পরিস্থিতিতে রাজনীতির মালিকানা আর জনগণের থাকে না; তা পরিণত হয় অর্থনৈতিক
শ্রেণির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে। তাই রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা, প্রভাব ও প্রচারণায়
নিয়ম, এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা অত্যন্ত জরুরি হ’য়ে প’ড়ে। রাজনীতির মালিকানা
নিয়ে আরও একটি সত্য হলো, এটি একদল মানুষের একক অধিকার নয়। কোনো দল, কোনো পরিবার,
কোনো গোষ্ঠী কিংবা কোনো নেতাই রাজনীতির স্থায়ী মালিক হ’তে পারে না। যা কোন দেশেই কখনও
দেখা দেয়নি। রাজনীতি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা প্রতিনিয়ত রদবদল হচ্ছে। যখন কোনো দল
নিজেকে রাষ্ট্রের সমার্থক মনে করে, তখন গণতন্ত্র দুর্বল হ’য়ে প’ড়ে। যখন বিরোধী কণ্ঠকে
শত্রু হিসেবে দেখা হয়, তখন রাজনৈতিক পরিসর অনেকটা সংকুচিত হ’য়ে প’ড়ে। যখন ভিন্নমতকে
দেশবিরোধী বলা হয়, তখন রাজনীতির প্রাণশক্তি নষ্ট হওয়ার পথে এগিয়ে যায়। প্রকৃত রাজনৈতিক
মালিকানা মানে একচ্ছত্র অধিকার নয়; বরং ক্ষমতার ভারসাম্য, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং
শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা। রাজনীতি তখনই জনগণের হয়, যখন জনগণ বিকল্পের মধ্যে নিজের
পছন্দ বেছে নিতে পারে। প্রশ্ন তুলতে পারে যেকোন বিষয়ে। রাজনীতির মালিকানা শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে
সম্পর্কিত নয়; এটি নৈতিকতার সঙ্গেও যুক্ত। নৈতিকতা ছাড়া রাজনীতি একধরনের হিসাব-নিকাশে
পরিণত হয়। কিন্তু নৈতিকতা রাজনীতিকে মানবিক ক’রে, দায়বদ্ধ ক’রে, এবং সীমারেখা মনে
করিয়ে দেয়। সত্য বলা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা, দুর্নীতিকে না বলা, বিরোধী মতকে সম্মান
করা, এবং ক্ষমতাকে সেবার মাধ্যম হিসেবে দেখা, এগুলোই রাজনৈতিক নৈতিকতার দৃঢ়ভিত্তি।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও এটা সত্য যে, আমাদের দেশে রাজনীতি মানেই কৌশল, প্রতারণা, অর্থের
ছড়াছড়ি, কালো টাকার ব্যবহার, ভণ্ডামি, আধিপত্য বিস্তার, এবং একগুচ্ছ নষ্ট লোকের মুখ
পরিচয়। এই অবক্ষয়কে রোধ না করলে রাজনীতির মালিকানা কেবল কাগজে-কলমে জনগণের থাকবে,
বাস্তবে থাকবে ক্ষমতাবানদের হাতে। তাই নৈতিক রাজনীতির পুনর্গঠন জরুরি; তা না হ’লে গণতন্ত্রের
ভেতরেই স্বৈরতন্ত্র জন্ম নিতে পারে। রাজনৈতিক মালিকানার প্রশ্নে তরুণদের ভূমিকা বিশেষভাবে
গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ প্রজন্ম নতুন চিন্তা, পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এবং ন্যায়বোধের শক্তি
নিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু তরুণরা যদি কেবল স্লোগান, উন্মাদনা কিংবা
দলীয় আবেগে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তারা পুরোনো রাজনীতিরই পুনরাবৃত্তি ঘটাবে, যা আমরা
অতীতে বার-বার দেখেছি। তাদের উচিত রাজনৈতিক জ্ঞান অর্জন, সামাজিক বাস্তবতা বোঝা, ইতিহাস
শেখা এবং যুক্তিনির্ভর অবস্থান গ্রহণ করা। জনগণ তথা রাষ্ট্রের মানুষকে, মানুষ হিসেবে
মূল্যায়ন করা। তরুণদের অংশগ্রহণ রাজনীতিকে প্রাণবন্ত করতে পারে; তবে সে অংশগ্রহণ হতে
হবে নীতিনিষ্ঠ ও দায়িত্ববান। একটি সমাজে তরুণরা যদি প্রশ্ন করতে শেখে, তাহলে রাজনীতি
আর অন্ধ আনুগত্যের ক্ষেত্র থাকে না। তখন তা হ’য়ে ওঠে পরিবর্তনের নতুনশক্তি।
সবশেষে
বলা যায়, রাজনীতির মালিকানা কোনো স্থির সম্পত্তি নয়, এটি একটি নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব।
এই মালিকানা রক্ষার জন্য জনগণের সচেতনতা, সুশাসন, প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক
স্বচ্ছতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচার একান্ত অপরিহার্য। রাজনীতি
যখন জনগণের কথা বলে, জনগণের স্বার্থে কাজ করে এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি করে, তখনই বলা
যায়, রাজনীতির প্রকৃত মালিকানা জনগণের হাতে ফিরে এসেছে। কিন্তু যখন রাজনীতি ক্ষমতার
অন্ধ প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে, তখন সে নিজেই তার উদ্দেশ্য ভুলে যায়। তাই সময় এসেছে
রাজনীতিকে আবার জনগণের কাছে ফিরিয়ে আনার। কারণ রাজনীতির প্রকৃত মূল্য ক্ষমতায় নয়,
সেবায়; দখলে নয়, অংশগ্রহণে; আর মালিকানায় নয়, দায়িত্ববোধে। দেশদ্রোহিতায় নয়, ভালবাসায়।
রাজনীতি
যদি আমাদের সমাজের ভাগ্য নির্ধারণের শক্তিশালী মাধ্যম হয়, তবে তার মালিকানা অবশ্যই
মানুষের হাতে থাকতে হবে। সেই মানুষ, যে কর দেয়; সেই মানুষ, যে শ্রম দেয়; সেই মানুষ,
যে ভোট দেয়; এবং সেই মানুষ, যে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে। রাজনীতির মালিকানা তাই জনগণের
অধিকার, জনগণের দায়, এবং জনগণেরই বিজয়। এটা ভুললে আমাদের চলবে না।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন