সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

রাইটার ব্লক: সৃজনশীলতার নীরব বিপর্যয় -পর্ব ১

 

রাইটার ব্লক এমন এক অভিজ্ঞতা, যা বাইরে থেকে খুব সাধারণ মনে হলেও ভেতরে ভেতরে একজন লেখকের সৃজনশীল সত্তাকে নীরবে নাড়া দিয়ে যায়। এটি কেবল একটি শব্দকে না পাওয়ার সমস্যা নয়, এটি ভাবনা, আত্মবিশ্বাস, মনোযোগ, ভয়, প্রত্যাশা, স্মৃতি, ক্লান্তি এবং আত্মসমালোচনার এক জটিল জাল। যেখানে লেখক নিজেই নিজের জন্য অদৃশ্য এক দেয়াল তৈরি ক’রে ফেলেন এবং সেই দেয়ালের ওপারে থাকা বাক্য, দৃশ্য, চরিত্র, যুক্তি কিংবা আবেগ আর সহজে তার কাছে ফিরে আসে না কোন চেষ্টাতেই। বহু মানুষ মনে করেন লেখক মানেই যার মাথায় সবসময় শব্দের ঝরনা, যার কল্পনা সবসময় উন্মুক্ত, যার কলম বা কীবোর্ডের সামনে বসামাত্রই বাক্য নিজে নিজে এসে ঝড়ে পড়বে বৃষ্টির ফোঁটার মত। কিন্তু বাস্তবতা এত সহজ নয়, কারণ লেখালেখি একদিকে যেমন অনুপ্রেরণার শিল্প, অন্যদিকে তেমনি এটি এক দীর্ঘ ধৈর্যের অনুশীলন। যেখানে সৃষ্টিশীল শক্তি সবসময় সমানভাবে প্রবাহিত হয় না। কখনও লেখক অল্প সময়ে অসাধারণ কিছু লিখে ফেলেন যা আমরা রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে অনেকবার দেখেছি। আবার কখনও তিনি একই কাগজের দিকে তাকিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, রাতের পর রাত  কাটিয়ে দেন, যা আমরা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে অনেকবার দেখেছি। অথচ একটি বাক্যও ঠিকমতো বের হচ্ছে না। আর এই অবস্থা যখন ঘন ঘন ফিরে আসে, তখন সেটিই ‘রাইটার ব্লক’ হিসেবে পরিচিত হ’য়ে ওঠে।  অনেকেই একে অলসতা বলে ভুল করেন, কেউ কেউ ভাবেন এটি কেবল অজুহাত, কিন্তু যারা সত্যি লেখালেখির ভেতরের চাপটাকে জানেন, তারা বোঝেন যে এই অবস্থা কেমন নিঃশব্দ অথচ তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা তৈরি করতে পারে।  কারণ লেখক তখন শুধু লিখতেই ব্যর্থ হন না, নিজের পরিচয় নিয়েও সন্দিহান হ’য়ে পড়েন, তিনি ভাবতে শুরু করেন, আমি কি তবে সত্যিই লেখক, নাকি শুধু লেখার ইচ্ছা-ধারী একজন মানুষ; যে রোগে বুদ্ধদেব বসু ভুগেছিলেন অনেকদিন। এই প্রশ্নই রাইটার ব্লকের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক, কারণ এটি কাজের অচলাবস্থাকে পরিচয়ের সংকটে পরিণত করে। রাইটার ব্লক’কে বুঝতে হলে আগে বুঝতে হবে লেখা কী, লেখা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, এবং কেন ভাষা মানুষের ভেতরের সবচেয়ে নাজুক অথচ সবচেয়ে শক্তিশালী সেতুগুলোর একটি।  মানুষ শুধু লেখার প্রয়োজনে লেখে না, লেখে নিজেকে জানাতে, মানুষ লেখে স্মৃতি ধ’রে রাখতে, ক্ষোভ প্রকাশ করতে, প্রেম জানাতে, প্রতিবাদ জানাতে, সমাজ বদলাতে, ইতিহাস গড়তে, স্বপ্নকে নাম দিতে, আর নিজের নৈঃশব্দ্যকেও একটি সুন্দর আকার দিতে। তাই লেখার পথে বাধা মানে কেবল একটি কাজ বন্ধ হ’য়ে যাওয়া নয়।  এটি এক ধরনের অভ্যন্তরীণ সংযোগ বিচ্ছিন্নতা, যেখানে চিন্তা ও প্রকাশের মাঝের প্রাকৃতিক সেতু দুর্বল হ’য়ে পড়ে। রাইটার ব্লককে অনেক সময় সৃজনশীলতার রোগ বলা হয়, কিন্তু আসলে এটি রোগের চেয়েও বিস্তৃত, কারণ কখনও এটি মানসিক চাপের ফল, কখনও অতিরিক্ত প্রত্যাশার ফল, কখনও বিষণ্নতা বা উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ, কখনও নির্ঘুম রাতের জমে থাকা ক্লান্তি, কখনও আবার জীবনের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারার প্রতিক্রিয়া; একজন লেখক তখন শুধু একটি লেখা লিখতে পারছেন না বলেই থেমে যান না, অনেক সময় তার নিজের ভেতরের জীবনও থমকে যায়, তিনি পড়তে পারেন না, ভাবতে পারেন না, কিছুতে মন বসাতে পারেন না, এমনকি আগে যেসব বিষয় তাকে আনন্দ দিত, সেগুলোও অর্থহীন মনে হতে শুরু করে। এই অবস্থাটি যত গভীরে যায়, ততই লেখক নিজের উপর সন্দেহ করতে থাকেন, আর সন্দেহ একবার বাড়তে শুরু করলে ভাষার দরজা বন্ধ হ’য়ে যায় এমনিতেই। রাইটার ব্লকের আরেকটি বড় দিক হলো, এটি সবসময় এক রকমভাবে আসে না। কারও ক্ষেত্রে এটি হঠাৎ, কারও ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে, আবার কারও ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে, কারও ক্ষেত্রে জীবনের একটি নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে, আবার কারও ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট একটি আবেগের সঙ্গে যুক্ত হয়। যেমন একটি ব্যর্থ সম্পর্ক, একটি কাছের মানুষের মৃত্যু, চাকরির চাপ, হতাশা, দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব, আর্থিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক প্রত্যাশা, প্রকাশকের চাপ বা পাঠকের প্রতিক্রিয়া, এসব কিছুই লেখার প্রবাহকে থামিয়ে দিতে পারে। কারণ লেখক যখন লেখেন, তখন তিনি কেবল টেক্সট তৈরি করেন না, তিনি নিজের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি, ভাষার প্রাজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ, স্মৃতি ও সত্তাকে ভাষার মধ্যে গেঁথে দেন। আর যদি ভেতরের সেই অনুভব টানাপোড়েনে জর্জরিত হয়, তবে বাক্যও টান খায়; বিশেষ ক’রে যারা পারফেকশনিস্ট, তাদের ক্ষেত্রে রাইটার ব্লক আরও তীব্র হয়। তারা প্রথম খসড়াকেই চূড়ান্ত মানের হতে চায়, প্রথম বাক্যেই নিখুঁত সুর খুঁজতে চায়, অথচ লেখার প্রকৃতি এমন নয়; লেখার প্রকৃতি অনেকটা নদীর মতো, প্রথমে তা বাঁক নেয়, আবার পরে প্রশস্ত হয়, কোথাও ধীর, কোথাও গভীর, কোথাও কাদা মিশ্রিত, কোথাও স্বচ্ছ, আবার কোথাও প্রবাহিত ঝরে পড়া ধারার মত।  কিন্তু যারা শুরুতেই সমুদ্রের মতো বিশাল ও নিখুঁত কিছু চায়, তারা প্রাথমিক অস্বচ্ছতাকেই ব্যর্থতা বলে মনে করে। আর সেই মনে করাটাই সৃজনশীলতাকে দমিয়ে দেয়। রাইটার ব্লক বুঝতে গেলে আমাদের মস্তিষ্কের কাজকর্ম সম্পর্কেও ভাবতে হয়, কারণ লেখা কেবল অনুভূতির ব্যাপার নয়, এটি স্নায়বিক প্রক্রিয়ারও বিষয়; মস্তিষ্কের এক অংশ ভাবনা তৈরি ক’রে, আরেক অংশ সেগুলোকে সংগঠিত ক’রে, আবার আরেক অংশ স্ব-সমালোচনা চালায়। এই তিনটি স্তরের ভারসাম্য নষ্ট হ’লে লেখায় জড়তা আসে। কখনও অতিরিক্ত আত্মসমালোচনার কারণে মানুষ কিছুই লিখতে সাহস করে না, কখনও আবার অনেক চিন্তা একসঙ্গে জমে গেলে কোনটি আগে ধরবে বুঝতে পারে না।  ফলে সে স্থবির হ’য়ে প’ড়ে। অনেক লেখক বলেন, রাইটার ব্লক আসলে লিখতে না পারার চেয়ে বেশি হচ্ছে কিছু হারানোর ভয়, ভালো লেখার সম্ভাবনা হারানোর ভয়, নিজের সুনাম হারানোর ভয়, পাঠকের ভালোবাসা হারানোর ভয়, এমনকি নিজের আগের সাফল্যের মর্যাদা হারানোর ভয়। এই ভয় লেখকের হাত বেঁধে দেয়, কারণ সে মনে ক’রে, যা-ই লিখুক না কেন, তা আগের মতো হবে না, আর এই ধারণাই তাকে নতুন কিছু শুরু করতে বাধা দেয়।  এখানে একটি মর্মান্তিক বিষয় হচ্ছে, তা হলো সৃষ্টিশীল মানুষদের কাছে তাদের কাজ শুধু কাজ নয়, এটি আত্মপরিচয়ের অংশ। তাই যখন কাজ ব্যাহত হয়, তখন তারা মনে করেন তাদের অস্তিত্বও ঝুঁকিতে। কিন্তু এই উপলব্ধি সঠিক নয়, বরং ক্ষতিকর; কারণ লেখার জড়তা মানে প্রতিভার মৃত্যু নয়, এটি কেবল একটি সাময়িক বন্ধ; সূর্য যেমন প্রতিদিন সমানভাবে জ্বলে না, তেমনি সৃষ্টিশীলতাও সব সময় একই মাত্রায় থাকে না; কিছুদিন মন উজ্জ্বল থাকে, কিছুদিন মেঘলা, কিছুদিন শব্দে ভরা, কিছুদিন নীরব; কিছুদিন ম্লান, কিছুদিন উজ্জ্বল, কিছুদিন প্রজ্বলিত আলোর মত, এই ওঠানামাকেই স্বাভাবিক বলে মানতে না পারলে রাইটার ব্লক আরও বাড়ে।  রাইটার ব্লকের সঙ্গে সামাজিক চাপও গভীরভাবে যুক্ত, বিশেষ করে ডিজিটাল যুগে; আগে লেখকের কাজ ছিল মূলত লেখা, কিন্তু এখন তাকে নিজের উপস্থিতি বজায় রাখতে হয়, পাঠকের প্রতিক্রিয়া দেখতে হয়, সামাজিক মাধ্যমে নিজেকে উপস্থাপন করতে হয়, অন্যদের সাফল্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করতে হয়; এই তুলনার সংস্কৃতি অনেক সময় সৃজনশীল মনের জন্য বিষের মতো কাজ করে। অন্য কারও বই প্রকাশ, অন্য কারও পুরস্কার, অন্য কারও ভাইরাল লেখা, এসব দেখতে দেখতে লেখক নিজের ভেতরে এক ধরনের অপূর্ণতার অনুভূতিতে ভুগতে থাকেন; মনে হয়, সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, কেবল তিনি স্থির; এই অনুভূতি আসলে স্থিরতার চেয়েও ভয়ংকর, কারণ এটি নিজের কাজের প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয়। আবার অনেক সময় লেখক যে বিষয়টি লিখতে চান, সেটি এত গুরুত্বপূর্ণ বা জটিল লাগে যে তিনি তার কাছে হাতই বাড়াতে পারেন না। তিনি জানেন, এটি লিখতেই হবে, কিন্তু কোথা থেকে শুরু করবেন, কোন সুরে বলবেন, কোন দৃষ্টিকোণ নেবেন, তা ঠিক করতে না পারায় লিখতে পারেন না। এটিও একধরনের রাইটার ব্লক, যাকে বিষয়-অধিক্য ব্লক বলা যায়। এখানে সমস্যা ভাবনার অভাব নয়, বরং ভাবনার অতিরিক্ততা। এত ভাবনা জমে যায় যে লেখার পথ সংকুচিত হ’য়ে প’ড়ে; এ-কারণেই অনেক সময় রাইটার ব্লকের সমাধান নতুন ধারণা খোঁজা নয়। বরং ধারণাগুলোকে ছোট ছোট অংশে ভেঙে ফেলা; কারণ বৃহৎ চিন্তা প্রায়শই ভয়ের জন্ম দেয়, আর ছোট কাজ প্রায়শই গতি তৈরি করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ‘একটি পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ লিখতে হবে’ ভাবলে চাপ বাড়ে, কিন্তু ‘শুধু একটি ভূমিকা লিখব’ ভাবলে কাজ সহজ হয়। এই ছোট সাফল্যই পরবর্তী বড় সাফল্যের দরজা খুলে দেয়। রাইটার ব্লকের সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হলো ক্লান্তি। বিশেষ ক’রে মানসিক ক্লান্তি। মানুষ যখন দীর্ঘদিন বিশ্রামহীন থাকে, তখন তার সৃজনশীল শক্তি শুকিয়ে যেতে থাকে।  কাজের চাপ, পরিবারের দায়, অর্থনৈতিক উদ্বেগ, দুঃচিন্তা, অনিদ্রা, এসবের মধ্যে লেখার জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক প্রশান্তি অনেক সময় হারিয়ে যায়। লেখার জন্য কেবল সময় নয়, এক ধরনের অভ্যন্তরীণ ফাঁকা জায়গাও দরকার। যেখানে চিন্তা বসতে পারে, ভাষা বিশ্রাম নিতে পারে, এবং কল্পনা নিজের মতো ক’রে চলতে পারে। ক্লান্ত মস্তিষ্কে সেই ফাঁকা জায়গা থাকে না। তখন কেবল কাজের চাপের শব্দ শোনা যায়; ফলে লেখক লিখতে গিয়ে অনুভব করেন, প্রতিটি শব্দ যেন অতিরিক্ত ওজন নিয়ে আসছে। এই ভার থেকে মুক্তি পাওয়ার আগ পর্যন্ত রাইটার ব্লক কাটে না। কিছু ক্ষেত্রে আবার রাইটার ব্লক আবেগগত দ্বন্দ্বের ফল; লেখক এমন কিছু লিখতে চান, যা তার নিজের জীবন, বিশ্বাস, নৈতিকতা বা সম্পর্কের সঙ্গে সংঘর্ষে যায়; ফলে ভিতরে এক ধরনের প্রতিরোধ তৈরি হয়। তিনি হয়তো সচেতনভাবে জানেন না, কিন্তু অবচেতন মন তাকে থামিয়ে রাখে। এই অবচেতন বাধাও অনেক সময় তীব্র রূপ নেয়; যেমন কেউ হয়তো পরিবার নিয়ে, শোক নিয়ে, ভয় নিয়ে বা অপরাধবোধ নিয়ে লিখতে চান। কিন্তু লেখার সময় সেই অনুভূতি আবার এত জীবন্ত হ’য়ে ওঠে যে তিনি এড়িয়ে যান। লিখতে না পারার পেছনে তখন শুধুই কৌশলগত সমস্যা নয়, আত্মরক্ষার প্রবণতাও কাজ করে। এই পর্যায়ে রাইটার ব্লককে বোঝা মানে শুধু লেখার পদ্ধতি শেখা নয়, নিজের মানসিক অবস্থাকেও পড়তে শেখা। কারণ প্রতিটি থেমে যাওয়া বাক্যের পিছনে একটি থামা অনুভূতি লুকিয়ে থাকতে পারে। লেখক যদি নিজের সেই অনুভূতিকে চিনতে পারেন, তবে অচিরেই জড়তা কিছুটা হলেও নরম হয়; কিন্তু তিনি যদি বরং নিজেকে দোষ দেন, অলস বলেন, অযোগ্য বলেন, তবে সেই দোষবোধই ব্লককে দীর্ঘস্থায়ী ক’রে। রাইটার ব্লক থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম শর্ত তাই আত্ম-সহানুভূতি; নিজেকে অপমান করলে সৃজনশীলতা ফিরে আসে না। বরং আরও সংকুচিত হয়; লেখক যখন বুঝতে পারেন যে, থেমে যাওয়া মানেই শেষ হ’য়ে যাওয়া নয়। তখনই পুনরায় শুরু করার সাহস জন্মায়; লেখালেখি আসলে প্রতিদিনের একটি অভ্যাস। একটি মনোসংযোগের অনুশীলন, একটি অভ্যন্তরীণ পথচলা। সেখানে কখনও মেঘলা দিন থাকবে, কখনও রোদ, কখনও নদীর স্রোত, কখনও শুকনো পাথর; রাইটার ব্লক সেই পাথরের মত সময়, যখন স্রোত সাময়িক বন্ধ হ’য়ে যায়, কিন্তু নদী হারায় না; নদী তখনও আছে, কেবল তার ওপরের দৃশ্য পাল্টায়। একইভাবে লেখকও থাকে, তার কণ্ঠও থাকে, তার কল্পনাও থাকে, কেবল তাদের প্রকাশের ছন্দ হারিয়ে যায়। আর এই ছন্দ হারানোই আমাদের সামনে প্রশ্ন তোলে, সৃষ্টিশীলতা কি সর্বদা প্রবাহমান কিছু, নাকি তা আসলে বিরতি, সংগ্রাম, পুনরারম্ভ এবং ধৈর্যের মিলিত ফল। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, বড় লেখকরা কখনও রাইটার ব্লককে অস্বীকার করেননি। তারা বরং তাকে স্বীকার করে নিয়েই কাজ চালিয়ে গেছেন। কেউ অল্প লিখেছেন, কেউ দৈনন্দিন রুটিন বানিয়েছেন, কেউ হাঁটতে গিয়ে ভাবনা সঞ্চয় করেছেন। কেউ নোটবুকে ছোট ছোট টুকরো লিখেছেন, কেউ নিজের ওপর চাপ কমিয়েছেন; অর্থাৎ তারা বুঝেছিলেন, সৃজনশীলতার জন্য অনবরত গর্জন নয়।  অনেক সময় ক্ষীণ কিন্তু ধারাবাহিক প্রবাহই যথেষ্ট। রাইটার ব্লক তাই কোনও একক দুর্যোগ নয়, এটি একটি বহুমাত্রিক অবস্থা। যার পেছনে থাকে মন, শরীর, সমাজ, প্রত্যাশা, স্মৃতি, ভয় ও অভ্যাসের জটিল সমন্বয়। এই সমন্বয়কে বোঝা ছাড়া রাইটার ব্লককে পুরোপুরি বোঝা যায় না। আর বোঝা ছাড়া তাকে জয়ও করা যায় না।  


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ অমিয় চক্রবর্তী : ‘বৃষ্টি’ নিয়ে তিনটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ, মেঘ-বরষা বৃষ্টি নিয়ে এতো সংখ্যক কবিতা লিখেছেন যে তাঁর সমান বা সমসংখ্যক কবিতা বাঙলায় কেউ লিখেনি। রবীন্দ্রনাথ, যাঁর কবিতায় বার বার এবং বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে মেঘ, বরষা, বৃষ্টি। বৃষ্টি নামটি নিলেই মনে পড়ে কৈশোর পেড়িয়ে আসা রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটির কথা। ‘দিনের আলো নিবে এল সূর্য্যি ডোবে ডোবে আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।’ বৃষ্টি নিয়ে কবিতা পড়ার কথা মনে পড়লে এটাই চলে আসে আমার মনে। অমিয় চক্রবর্তী বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। বাঙলায় বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেনি এমন কবির সংখ্যা খুব কম বা নেই বললেই চলে। অমিয় চক্রবর্তী, যাঁর কবিতায় পাই ‘বৃষ্টি’ নামক কিছু সৌন্দর্যময় কবিতা। যে কবিতাগুলো আমাকে বিস্ময় বিমুগ্ধ ক’রে। ওই কবিদের কারো কারো কবিতা দ্রুত নিঃশ্বাসে পড়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৃষ্টি নামক প্রথম কবিতাটি পাওয়া যাবে অমিয় চক্রবর্তীর ‘একমুঠোতে’। উন্নিশটি কবিতা নিয়ে গ’ড়ে উঠে ‘একমুঠো’ নামক কাব্য গ্রন্থটি। যেখান থেকে শ্রেষ্ঠ কবিতায় তুলে নেওয়া হয় চারটি কবিতা। আমার আরো ভালোলাগে ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি ওই তালিকায় উঠে আসে। শ্রেষ্ঠ কবিতায় না আসলে আমার যে খুব খারাপ লাগতে তা-ও নয়। ওই কবিতা...