সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

তোমার কাছে পৌঁছানোর আগে

 

আমি যেদিন প্রথম তোমার দিকে তাকিয়েছিলাম,

সেদিন পৃথিবীর সমস্ত পরিচিত দৃশ্য হঠাৎ এমনভাবে অপরিচিত হ’য়ে উঠেছিল যে

বহু বছরের চেনা আকাশকেও আমার মনে হয়েছিল

নতুন কোনো ভাষায় লেখা এক বিস্ময়কর পাণ্ডুলিপি,

যার প্রতিটি অক্ষরের ভেতরে তোমার মুখের অদৃশ্য প্রতিধ্বনি নিঃশব্দে জেগে আছে;

সেদিন আমি বুঝেছিলাম,

মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে,

যখন হৃদয়ের সমস্ত পুরোনো মানচিত্র একসঙ্গে বিলুপ্ত হ’য়ে যায়,

আর একটি মাত্র মানুষের উপস্থিতি সমস্ত দিকনির্দেশকে নতুন অর্থে সাজিয়ে দেয়,

যেন দীর্ঘদিনের শুষ্ক মরুভূমির ওপর হঠাৎ

অচেনা কোনো নদী তার প্রথম স্বচ্ছ জলরেখা টেনে দেয়,

তুমি কখনও আমাকে ভালোবাসার সংজ্ঞা শেখাওনি,

কখনও কোনো প্রতিশ্রুতির উজ্জ্বল শব্দও উচ্চারণ করোনি,

অথচ তোমার নীরবতার গভীরে আমার এমন এক অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল,

যার কাছে আমার সমস্ত যুক্তি, তর্ক আর বিশ্লেষণ ,

এবং সমস্ত একাকিত্ব ধীরে ধীরে মাথা নত ক’রে দিয়েছিল

আমি যতবার নিজেকে বলেছি,

আজ আর তোমার কথা ভাবব না,

আজ থেকে হৃদয়কে অন্য কোনো ব্যস্ততার হাতে সমর্পণ করব,

ততবার দেখেছি, আমার সমস্ত সিদ্ধান্ত তোমার স্মৃতির দরজায় এসে

নীরবে ভেঙে পড়েছে, নিস্তব্ধ  হ’য়ে ধরা দিছে তোমার হাতে

যেমন সমুদ্রের প্রতিটি ঢেউ শেষ পর্যন্ত তীরের কাছেই ফিরে আসতে বাধ্য হয়;

তোমার চোখের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকলে আমার মনে হয়,

সেখানে অসংখ্য অপ্রকাশিত ঋতুর ইতিহাস স্তরে স্তরে জমে আছে;

এমন কিছু বৃষ্টি সেখানে আজও অপেক্ষা ক’রে আছে,

যা পৃথিবীর কোনো নদীতে নামেনি,

অথচ আমার বুকের গভীরতম প্রান্তরে প্রতিদিন নতুন ক’রে বৃষ্টি ঝরে,

তুমি হয়তো কোনো দিন জানবে না,

কত শত সন্ধ্যা আমি একা কাটিয়েছি;

শুধু এই আশায় যে, বাতাস হঠাৎ তোমার ব্যবহৃত কোনো সুগন্ধ

বহন ক’রে আমার জানালার কাছে এসে দাঁড়াবে,

আর আমি বিশ্বাস করতে পারব,

দূরত্ব সবসময় বিচ্ছেদের আরেক নাম নয়

আমার হৃদয়ের ভেতরে যে অস্থিরতা প্রতিদিন জন্ম নেয়,

তার কোনো ভাষা নেই, কোনো যুক্তিও নেই;

আছে শুধু তোমার নামের দিকে

নিরবচ্ছিন্নভাবে ছুটে চলা এক অন্তহীন আকাঙ্ক্ষা,

যা প্রতিটি ভোর নতুন হ’য়ে জন্মায়

এবং প্রতিটি গভীর রাতে আরও পরিণত হ’য়ে ওঠে

আমি কখনও তোমাকে নিজের ক’রে পাওয়ার স্বপ্ন দেখিনি,

শুধু চেয়েছি তোমার সমস্ত আনন্দের পাশে একটি নীরব ছায়া হ’য়ে দাঁড়াতে,

তোমার সমস্ত ক্লান্তির ভেতরে এক বিন্দু শিশির হ’য়ে থাকতে,

আর তোমার সমস্ত অদৃশ্য ভাষাকে

নিজের হৃদয়ের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে লুকিয়ে রাখতে;

যদি কোনো দিন পৃথিবীর সমস্ত আলো নিভে যায়,

যদি সময় তার সমস্ত সম্পর্ক ভেঙে ফেলে,

যদি মানুষের সমস্ত ভাষা একে একে হারিয়ে যায়,

তবুও আমি বিশ্বাস করি,

আমার হৃদয় তোমার নাম উচ্চারণ করার জন্য নতুন একটি ভাষা সৃষ্টি করে নেবে,

কারণ আমাদের প্রেম কখনও শব্দের ওপর নির্ভর করে না;

সে আত্মার ভেতরে নিজের ব্যাকরণ নিজেই লিখে নেয়

আমি আজও জানি না,

তোমার কাছে কোনদিন পৌঁছাতে পারব কি না ?

কিংবা কোনো দিন তোমার হাতের উষ্ণতা আমার জীবনের দীর্ঘ শীতকে

সত্যিই শেষ করবে কি না;

কিন্তু এটুকু আমি নিশ্চিত জানি,

তোমাকে ভালোবেসে আমি আমার নিজের ভেতরে

এমন এক মানুষকে আবিষ্কার করেছি,

যার সৌন্দর্য, যার কোমলতা এবং যার অসীম অপেক্ষা

সম্পর্কে আমি আগে কিছুই জানতাম না,

যদি কোনো দিন তুমি ফিরে তাকাও,

তবে আমাকে বিজয়ী কোনো মানুষের মতো নয়,

বরং এমন এক শুভ্র আলোকের মতো দেখতে পাবে,

যে তার সমস্ত অহংকার, সমস্ত ভাষা,

সমস্ত স্বপ্ন এবং সমস্ত জীবন একটি

মানুষের নীরব হাসির কাছে স্বেচ্ছায় সমর্পণ ক’রে দিয়েও

নিজেকে নিঃস্ব মনে করেনি;

কারণ সত্যিকারের সম্পর্ক হারিয়ে গিয়েও পরাজিত হয় না,

বরং মানুষের আত্মাকে তার সবচেয়ে নির্মল রূপে জাগিয়ে তোলে;

আর যদি কোনো দিন আমার সমস্ত কবিতার পাণ্ডুলিপি বিলুপ্ত হ’য়ে যায়,

যদি পৃথিবীর সমস্ত সম্পর্ক ভেঙে প’ড়ে,   

সমস্ত সৌন্দর্য তার শুভ্রতা হারিয়ে ফেলে,

তবুও আমার হৃদস্পন্দনের প্রতিটি ধ্বনি তোমার নামের

একটি পঙতি হ’য়ে অনন্তকাল ধ’রে উচ্চারিত হ’তে থাকবে,

আমার কাছে তোমার ভালোবাসা কোনো ক্ষণস্থায়ী অনুভূতির নাম নয়;

তা যেন এক অনির্বাণ আলো,

যা মৃত্যুরও অনেক পরেও মানুষের অস্তিত্বের ভেতরে নীরবে জ্বলতে থাকে।

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

আমাদের ব্যর্থতাগুলো

  বাংলাদেশের গল্প কেবল সাফল্যের গল্প নয়; এ গল্পের ভেতরে অসংখ্য অপূর্ণতার দীর্ঘ ছায়াও মিশে আছে। একটি দেশ যখন যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে নিজের পরিচয় নির্মাণ করে, তখন তার প্রতিটি অগ্রগতি যেমন গর্বের, তেমনি প্রতিটি ব্যর্থতাও আত্মসমালোচনার দাবি রাখে। আমরা স্বাধীনতার পর বহু পথ পেরিয়েছি   অর্থনীতি বেড়েছে, নগরায়ণ হয়েছে, শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, অবকাঠামো বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু উন্নয়নের দৃশ্যমান ভবনের আড়ালে এমন কিছু ভাঙাচোরা জায়গা রয়ে গেছে, যেখানে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে হয়   আমরা কি সত্যিই এগিয়েছি, নাকি কেবল এগিয়ে যাওয়ার চেহারাটি নির্মাণ করেছি? আমাদের ব্যর্থতাগুলো তাই কেবল কোনো সরকারের, কোনো প্রতিষ্ঠানের কিংবা কোনো ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়; এগুলো আমাদের সামষ্টিক চরিত্র, রাষ্ট্রচিন্তা, সামাজিক অভ্যাস এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের আয়না। সর্বোপরি এগুলো আমাদের নিজস্ব ব্যর্থতা। আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হয়তো এই যে, আমরা অনেক সময় সমস্যাকে সমাধান করার চেয়ে সমস্যার সঙ্গে বসবাস করতে শিখে যাই। রাস্তায় যানজট, নদীতে দূষণ, ফুটপাতে দখল, ঘুষ, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, বিচার পেতে...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...