বাংলাদেশের
গল্প কেবল সাফল্যের গল্প নয়; এ গল্পের ভেতরে অসংখ্য অপূর্ণতার দীর্ঘ ছায়াও মিশে আছে।
একটি দেশ যখন যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে নিজের পরিচয় নির্মাণ করে, তখন তার প্রতিটি
অগ্রগতি যেমন গর্বের, তেমনি প্রতিটি ব্যর্থতাও আত্মসমালোচনার দাবি রাখে। আমরা স্বাধীনতার
পর বহু পথ পেরিয়েছি অর্থনীতি বেড়েছে, নগরায়ণ
হয়েছে, শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, অবকাঠামো বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে।
কিন্তু উন্নয়নের দৃশ্যমান ভবনের আড়ালে এমন কিছু ভাঙাচোরা জায়গা রয়ে গেছে, যেখানে দাঁড়িয়ে
প্রশ্ন করতে হয় আমরা কি সত্যিই এগিয়েছি, নাকি
কেবল এগিয়ে যাওয়ার চেহারাটি নির্মাণ করেছি? আমাদের ব্যর্থতাগুলো তাই কেবল কোনো সরকারের,
কোনো প্রতিষ্ঠানের কিংবা কোনো ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়; এগুলো আমাদের সামষ্টিক চরিত্র,
রাষ্ট্রচিন্তা, সামাজিক অভ্যাস এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের আয়না। সর্বোপরি এগুলো আমাদের
নিজস্ব ব্যর্থতা।
আমাদের
সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হয়তো এই যে, আমরা অনেক সময় সমস্যাকে সমাধান করার চেয়ে সমস্যার সঙ্গে
বসবাস করতে শিখে যাই। রাস্তায় যানজট, নদীতে দূষণ, ফুটপাতে দখল, ঘুষ, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা,
বিচার পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, সরকারি সেবায় হয়রানি এসব একসময় আমাদের কাছে অস্বাভাবিক থাকার
কথা ছিল। অথচ ধীরে ধীরে এগুলো দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক দৃশ্য হয়ে উঠেছে। যে সমাজ
অন্যায়কে প্রথম দিন প্রতিবাদ করে, দ্বিতীয় দিন প্রশ্ন করে, তৃতীয় দিন অভ্যস্ত হয়ে যায় সেই সমাজের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো তার বিবেকের ক্লান্তি।
বাংলাদেশে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই সেই ক্লান্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। আমরা অন্যায়কে
ঘৃণা করি, কিন্তু সুবিধা পেলে অন্যায়ের সঙ্গে আপস করি; দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলি,
কিন্তু নিজের কাজ দ্রুত করানোর জন্য অনৈতিক পথের আশ্রয় নিই। ফলে যে ব্যবস্থাকে আমরা
প্রতিদিন অভিশাপ দিই, কোনো না কোনোভাবে সেই ব্যবস্থারই অংশ হয়ে যাই। তার সাথে গড়ে তুলি
আপন স্বপ্ন।
আমাদের
রাজনৈতিক ব্যর্থতার কথাও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন, মিছিল, বক্তৃতা
কিংবা ক্ষমতার পরিবর্তনের নাম নয়; গণতন্ত্র হলো ভিন্নমতকে সহ্য করার সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠানের
স্বাধীনতা, জবাবদিহি, আইনের সমতা এবং নাগরিকের মর্যাদা। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক পরিসরে
বহু সময় মতের চেয়ে পরিচয় বড় হয়ে ওঠে, যুক্তির চেয়ে আনুগত্য শক্তিশালী হয় এবং রাষ্ট্রের
দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের চেয়ে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। ফলে রাষ্ট্রের
প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় এমন এক চাপের মধ্যে থাকে, যেখানে পেশাদারিত্বের চেয়ে ক্ষমতার
সমীকরণ বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। একটি দেশ তখন ব্যক্তির ওপর নির্ভর করতে শুরু করে,
প্রতিষ্ঠানের ওপর নয়। অথচ রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব ব্যক্তির শক্তিতে নয়, প্রতিষ্ঠানের শক্তিতে।
আমাদের
প্রশাসনিক ব্যর্থতাও কম গভীর নয়। বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসংখ্য
মানুষ নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, এ
সত্য অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু সামগ্রিক ব্যবস্থার কোথাও কোথাও এমন জটিলতা
তৈরি হয়েছে, যেখানে নাগরিকের একটি সাধারণ সেবা পেতে অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র, দীর্ঘ অপেক্ষা,
এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘোরাঘুরি এবং কখনো কখনো অনানুষ্ঠানিক অর্থ প্রদানের প্রয়োজন
পড়ে। ডিজিটাল বাংলাদেশ, স্মার্ট বাংলাদেশ কিংবা আধুনিক প্রশাসনের স্বপ্ন তখন কেবল প্রযুক্তি
দিয়ে পূর্ণ হয় না; প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। একটি কম্পিউটার পুরোনো আমলাতন্ত্রকে
আধুনিক করে না, যদি সেই কম্পিউটারের পেছনে থাকা চিন্তাটি পুরোনোই থেকে যায়।
দুর্নীতি
আমাদের ব্যর্থতার সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর একটি। দুর্নীতি কেবল রাষ্ট্রের অর্থ চুরি
করে না; এটি মানুষের আস্থা চুরি করে। একটি সেতু নির্মাণে অনিয়ম হলে শুধু টাকা নষ্ট
হয় না নিরাপত্তা নষ্ট হয়। একটি হাসপাতালের
যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় দুর্নীতি হলে শুধু সরকারি অর্থের ক্ষতি হয় না; কোনো এক অচেনা মানুষের চিকিৎসার সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত
হয়। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়ম হলে শুধু একটি পদ বা একটি সুযোগ অন্যায়ভাবে বণ্টিত
হয় না, যোগ্যতার ওপর মানুষের বিশ্বাসও ক্ষয়ে যায়। দুর্নীতির সবচেয়ে ভয়ংকর ফল অর্থনৈতিক
নয়, নৈতিক। যখন একজন মেধাবী তরুণ মনে করে যোগ্যতার চেয়ে পরিচয়, দক্ষতার চেয়ে অর্থ এবং
সততার চেয়ে যোগাযোগ বেশি মূল্যবান, তখন একটি দেশের ভবিষ্যৎ তারুণ্যের চোখেই পরাজিত
হয়।
শিক্ষাক্ষেত্রে
আমাদের অগ্রগতি আছে, কিন্তু শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের ব্যর্থতা গভীর। আমরা
পরীক্ষার ফলকে শিক্ষার মানের প্রধান মাপকাঠি বানিয়েছি। সন্তান জিপিএ কত পেল, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে
পড়ল, কোন চাকরি পেল, এসব নিয়ে আমাদের উদ্বেগ আছে; কিন্তু সে সত্য কথা বলতে শেখে কি
না, অন্যের অধিকারকে সম্মান করে কি না, নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে কি না, সমাজের
প্রতি তার দায়িত্ববোধ আছে কি না, এসব প্রশ্ন অনেক সময় পেছনে পড়ে যায়। শিক্ষা যদি কেবল
চাকরির প্রস্তুতি হয়, তাহলে আমরা শিক্ষিত মানুষ তৈরি করতে পারি, কিন্তু আলোকিত নাগরিক
তৈরি করতে পারি না। বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন শিক্ষা, যা মানুষকে শুধু পরীক্ষায় সফল করবে
না; তাকে জীবনের কঠিন সিদ্ধান্তে সৎ, যুক্তিবাদী ও মানবিক হতে শেখাবে।
আমাদের
স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতা আরও নির্মম, কারণ এখানে ব্যর্থতার মূল্য অনেক সময় মানুষের
জীবন। বড় শহরের কিছু হাসপাতাল ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে আধুনিক সুবিধা থাকলেও দেশের বিশাল
জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত, সাশ্রয়ী এবং সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
চিকিৎসা ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য ভয়াবহ বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। দরিদ্র মানুষ অসুস্থ হলে শুধু
রোগের সঙ্গে লড়াই করে না; তাকে অর্থের অভাব, দূরত্ব, হাসপাতালের ভিড় এবং নানা প্রশাসনিক
জটিলতার সঙ্গেও লড়তে হয়। অথচ একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের সাফল্যের অন্যতম মাপকাঠি হওয়া
উচিত তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষটি বিপদের সময় কতটা নিরাপদ বোধ করে।
কৃষকের
কথাও আমাদের ব্যর্থতার আলোচনায় আসতেই হবে। যে মানুষটি আমাদের খাদ্যের জোগান দেয়, তার
জীবন যদি অনিশ্চয়তায় ভরা থাকে, তাহলে আমাদের উন্নয়ন অসম্পূর্ণ। কৃষক উৎপাদন করে, কিন্তু
বাজারের অস্থিরতা, মধ্যস্বত্বভোগী, উৎপাদন ব্যয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সংরক্ষণব্যবস্থার
সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য পায় না। শহরের মানুষ যখন বাজারে
পণ্যের উচ্চমূল্যে অসন্তুষ্ট হয়, তখন কৃষকও একই বাজারব্যবস্থার অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে
নিজের উৎপাদনের কম দামে বিক্রির কষ্ট বহন করে। এই দ্বৈত সংকট প্রমাণ করে আমাদের কৃষি ও বাজারনীতি এখনো মানুষের উৎপাদক ও
ভোক্তা দুই পরিচয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করতে পারেনি।
শ্রমজীবী
মানুষের ক্ষেত্রেও আমাদের দায় আছে। পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তি,
প্রবাসী শ্রমিকেরা বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা এনে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেন, নির্মাণশ্রমিক
থেকে পরিবহনশ্রমিক অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন শহর ও গ্রামের অর্থনীতিকে সচল রাখেন। কিন্তু
শ্রমের মর্যাদা কি আমরা যথেষ্ট দিতে পেরেছি? একজন শ্রমিকের ঘাম দিয়ে যে শহর দাঁড়িয়ে
থাকে, সেই শহর কি তার জন্য নিরাপদ বাসস্থান, ন্যায্য মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেরেছে? উন্নয়নের আলো যদি কেবল কিছু মানুষের ঘরে পৌঁছায়, আর
অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষের ঘর অন্ধকারে থাকে, তাহলে সেই আলোকে পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন বলা যায়
না।
আমাদের
পরিবেশগত ব্যর্থতাগুলো ভবিষ্যতের প্রতি এক ধরনের ঋণ। নদী আমাদের সভ্যতার জন্ম দিয়েছে,
অথচ আমরা নদীকে বর্জ্যের পথে পরিণত করেছি। জলাভূমি ভরাট করেছি, গাছ কেটেছি, খাল দখল
করেছি, বায়ুকে দূষিত করেছি। শহরের উন্নয়ন করতে গিয়ে আমরা অনেক সময় শহরের প্রাণটাই নষ্ট
করেছি। একটি নগর শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক ও শপিংমলের সমষ্টি নয়; সেখানে বাতাস থাকতে
হয়, জলাধার থাকতে হয়, হাঁটার জায়গা থাকতে হয়, গাছ থাকতে হয়, মানুষের জন্য খোলা আকাশ
থাকতে হয়। আমরা যদি আজকের অর্থনৈতিক লাভের জন্য আগামী প্রজন্মের শ্বাস নেওয়ার অধিকার
কেড়ে নিই, তবে সেটি উন্নয়ন নয় ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে ঋণ।
ঢাকা
আমাদের সাফল্য ও ব্যর্থতার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক। এই শহর একই সঙ্গে স্বপ্নের শহর
এবং ক্লান্তির শহর। এখানে গ্রামের তরুণ চাকরির আশায় আসে, উদ্যোক্তা ব্যবসার সম্ভাবনা
খোঁজে, শিক্ষার্থী ভবিষ্যৎ গড়তে আসে, পরিবার নিরাপদ জীবনের স্বপ্ন দেখে। কিন্তু একই
শহর তাকে যানজট, শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ, অপরিকল্পিত নির্মাণ, আবাসন ব্যয় এবং সময়ের অপচয়ের
মধ্যে আটকে ফেলে। একজন মানুষ যদি প্রতিদিন জীবনের কয়েক ঘণ্টা শুধু রাস্তায় বসে কাটায়,
তাহলে তার উৎপাদনশীলতা, পারিবারিক জীবন, মানসিক প্রশান্তি সবকিছু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা
শহর বানিয়েছি, কিন্তু শহরকে মানুষের জন্য কতটা বাসযোগ্য করতে পেরেছি ? এই প্রশ্নের
উত্তর এখনো সন্তোষজনক নয়।
আমাদের
বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতাও রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাকে দুর্বল করে। বিচার শুধু
রায় ঘোষণার নাম নয়; সময়মতো ন্যায়বিচার পাওয়াও ন্যায়ের অংশ। একটি মামলা বছরের পর বছর
চলতে থাকলে কাগজে আইন বিদ্যমান থাকে, কিন্তু মানুষের জীবনে ন্যায়বিচার অনুপস্থিত হয়ে
যেতে পারে। আদালতের ওপর চাপ, মামলার জট, প্রক্রিয়াগত জটিলতা এবং দীর্ঘ অপেক্ষা এসব
সমস্যার সমাধান শুধু বিচার বিভাগের নয়; এটি পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার দায়িত্ব। কারণ বিচারব্যবস্থার
ওপর মানুষের আস্থা কমে গেলে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হয়।
অর্থনীতিতেও
আমাদের সাফল্য ও ব্যর্থতা পাশাপাশি হাঁটে। আমরা প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি, রপ্তানি বাড়িয়েছি,
অবকাঠামো নির্মাণ করেছি, বৈদেশিক শ্রমবাজারে বিস্তৃত হয়েছি। কিন্তু প্রবৃদ্ধির সুফল
কতটা সমানভাবে মানুষের জীবনে পৌঁছেছে, এ প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। আয়বৈষম্য, কর্মসংস্থানের
মান, দক্ষতার ঘাটতি, তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নানা
বাধা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শুধু মোট দেশজ উৎপাদনের সংখ্যা দিয়ে একটি দেশের সুখ
মাপা যায় না। অর্থনীতি তখনই অর্থবহ, যখন তার সুফল মানুষের জীবনের নিরাপত্তা, মর্যাদা
ও সম্ভাবনায় রূপান্তরিত হয়।
আমাদের
করব্যবস্থার ক্ষেত্রেও আত্মসমালোচনার জায়গা আছে। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য রাজস্ব প্রয়োজন;
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা সবকিছুর পেছনে প্রয়োজন জনসম্পদ। কিন্তু
করদাতার সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক যদি কেবল আদায়কারী ও প্রদানকারীর সম্পর্ক হয়, তাহলে
কর সংস্কৃতি শক্তিশালী হয় না। করদাতা যেন অনুভব করেন তিনি শুধু অর্থ দিচ্ছেন না, রাষ্ট্র
নির্মাণে অংশ নিচ্ছেন। একই সঙ্গে কর প্রশাসনকে হতে হবে স্বচ্ছ, পেশাদার, প্রযুক্তিনির্ভর
এবং হয়রানিমুক্ত। করের ভিত্তি সম্প্রসারণ, সহজ নিয়ম, কার্যকর আপিলব্যবস্থা এবং নাগরিক
আস্থার উন্নয়ন ছাড়া টেকসই রাজস্ব সংগ্রহ সম্ভব নয়। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের কাছ থেকে কর
চায়, তবে নাগরিকও রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি চাইবে এটাই স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক সম্পর্ক।
আমাদের
সামাজিক ব্যর্থতার একটি দিক হলো আমরা অনেক সময় মানুষকে তার অবস্থান দিয়ে বিচার করি,
তার মানবিকতা দিয়ে নয়। ধনী মানুষকে সম্মান, দরিদ্র মানুষকে অবহেলা; বড় চাকরিকে মর্যাদা,
শ্রমকে ছোট করে দেখা; ইংরেজি বলতে পারাকে যোগ্যতার প্রতীক এবং বাংলা বলতে পারাকে পিছিয়ে
থাকা মনে করা এই মানসিক বিভাজন সমাজকে ভেতর
থেকে দুর্বল করে। একজন রিকশাচালক, একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী, একজন কৃষক, একজন নার্স, একজন
শিক্ষক কিংবা একজন বিজ্ঞানী বা একজন কবি, একজন লেখক প্রত্যেকের শ্রমই সমাজের জন্য প্রয়োজনীয়।
সম্মানের শ্রেণিবিন্যাস যতদিন থাকবে, সমতার সমাজ ততদিন অসম্পূর্ণ থাকবে।
নারীর
ক্ষেত্রেও আমাদের অগ্রগতি যেমন সত্য, তেমনি অসম্পূর্ণতাও সত্য। মেয়েরা শিক্ষা, কর্মসংস্থান,
প্রশাসন, ব্যবসা, রাজনীতি ও নানা পেশায় এগিয়ে এসেছে। কিন্তু নিরাপত্তাহীনতা, বাল্যবিবাহ,
পারিবারিক সহিংসতা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এবং সামাজিক কুসংস্কার এখনো অনেক নারীর সম্ভাবনাকে
আটকে দেয়। একটি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পূর্ণ স্বাধীনতা ও সমান সুযোগ না দিয়ে সেই
দেশ পূর্ণ শক্তিতে এগোতে পারে না।
তরুণদের
ব্যর্থতা বলা সহজ, কিন্তু তাদের জন্য আমরা কী তৈরি করেছি সেই প্রশ্ন করা কঠিন। আমরা
তরুণদের বলি পরিশ্রম করতে, দক্ষ হতে, প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে; কিন্তু পর্যাপ্ত মানসম্মত
কর্মসংস্থান, গবেষণার সুযোগ, উদ্ভাবনের পরিবেশ এবং উদ্যোক্তা হওয়ার নিরাপদ কাঠামো কি
তৈরি করেছি? একজন তরুণ যখন দীর্ঘদিন চাকরি খুঁজে হতাশ হয়, তখন তাকে শুধু অলস বা অযোগ্য
বলে দায়মুক্ত হওয়া যায় না। তার ব্যর্থতার পেছনে রাষ্ট্র, শিক্ষা ব্যবস্থা, অর্থনীতি
ও সমাজের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও থাকে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী;
সেই সম্পদকে যদি আমরা কাজে লাগাতে না পারি, তবে জনসংখ্যার শক্তি একসময় বোঝায় পরিণত
হতে পারে।
তবু
আমাদের গল্প হতাশার গল্প নয়। কারণ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার মানুষ। বন্যায়
মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ায়, দুর্যোগে স্বেচ্ছাসেবকেরা ছুটে যায়, বিদেশে থাকা শ্রমিক
ঘামের অর্থ দেশে পাঠায়, কৃষক মাঠে দাঁড়ায়, শিক্ষক অল্প সুবিধায় শিক্ষার্থীদের পড়ান,
চিকিৎসক রাত জেগে রোগী দেখেন, উদ্যোক্তা ঝুঁকি নিয়ে নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। এই
দেশ বহুবার প্রমাণ করেছে রাষ্ট্রের কাঠামো যেখানে দুর্বল, সেখানে মানুষের মানবিকতা
অনেক সময় শক্তির শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠে। আমাদের ব্যর্থতার মাঝেও তাই সাফল্যের বীজ লুকিয়ে
আছে।
প্রশ্ন
হলো, আমরা কি আমাদের ব্যর্থতাগুলো স্বীকার করতে প্রস্তুত? একটি জাতির পরিপক্বতার পরিচয়
কেবল তার বিজয়গাথায় নয়; নিজের ভুলের দিকে তাকানোর সাহসেও। আমরা যদি প্রতিটি ব্যর্থতার
দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দিই, তাহলে কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। সরকার বদলালেই সব বদলে যাবে
এই ধারণা যেমন সরলীকৃত, তেমনি নাগরিকের কোনো দায় নেই এই ধারণাও ভুল। রাষ্ট্র ও নাগরিক
পরস্পরের আয়না। আমরা যেমন নাগরিক, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোও ধীরে ধীরে তেমনই হয়ে ওঠে।
তাই পরিবর্তন চাইলে আইন পরিবর্তনের পাশাপাশি অভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে; প্রতিষ্ঠান
সংস্কারের পাশাপাশি মূল্যবোধের সংস্কার করতে হবে।
বাংলাদেশকে
নতুন করে গড়ে তোলার জন্য আমাদের প্রয়োজন আত্মপ্রবঞ্চনা নয়, আত্মসমালোচনা। আমাদের প্রয়োজন
এমন রাজনীতি, যেখানে প্রতিপক্ষ শত্রু নয়; এমন প্রশাসন, যেখানে নাগরিক বোঝা নয়; এমন
বিচারব্যবস্থা, যেখানে সময়মতো ন্যায়বিচার পাওয়া যায়; এমন শিক্ষা, যা মানুষকে শুধু চাকরিপ্রার্থী
নয়, চিন্তাশীল নাগরিক করে; এমন অর্থনীতি, যেখানে উন্নয়নের সুফল সমাজের বিস্তৃত অংশে
পৌঁছায়; এমন করব্যবস্থা, যেখানে রাজস্ব সংগ্রহের সঙ্গে আস্থা ও জবাবদিহি যুক্ত থাকে;
এমন নগরনীতি, যেখানে মানুষ অনেক গুরুত্বপূর্ণ; এমন পরিবেশনীতি, যেখানে নদী ও গাছ উন্নয়নের
শত্রু নয়, বরং উন্নয়নের শর্ত।
আমাদের
ব্যর্থতাগুলো তাই লজ্জার তালিকা নয়; এগুলো আমাদের ভবিষ্যতের নকশা। যে ব্যর্থতাকে আমরা
চিনতে পারি, সেটিকে অতিক্রম করার সম্ভাবনা তৈরি হয়। যে ভুলকে আমরা স্বীকার করি, সেটি
থেকে শিক্ষা নেওয়া সম্ভব। যে অন্যায়কে আমরা অন্যায় বলতে সাহস করি, তার বিরুদ্ধে একদিন
প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো যায়। বাংলাদেশের সামনে আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয়তো নতুন কোনো
স্লোগান নয়, বরং একটি নতুন নাগরিক বিবেক যে বিবেক উন্নয়নকে শুধু সেতু, সড়ক, ভবন ও সংখ্যায়
মাপবে না; মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও ভবিষ্যতের স্বপ্নেও মাপবে।
একদিন
হয়তো বাংলাদেশের শিশুরা আমাদের সময়ের দিকে ফিরে তাকাবে। তারা দেখবে আমরা ভুল করেছি, অনেক জায়গায় ব্যর্থ হয়েছি, কখনো
নিজেদের স্বার্থকে দেশের স্বার্থের ওপরে রেখেছি, কখনো সত্য জেনেও নীরব থেকেছি। কিন্তু
তারা যদি একই সঙ্গে দেখতে পায় যে আমরা সেই ব্যর্থতাগুলোকে অস্বীকার করিনি, বরং সেগুলোর
মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি; যদি দেখতে পায় যে আমরা প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির ওপরে, আইনের শাসনকে
ক্ষমতার ওপরে, মানবিকতাকে স্বার্থের ওপরে এবং ভবিষ্যৎকে বর্তমানের ক্ষণিক লাভের ওপরে
স্থান দিয়েছি, তাহলে আমাদের ব্যর্থতার ইতিহাসও একদিন সাফল্যের সূচনাপর্ব হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশ
এখনো শেষ হয়ে যায়নি; বরং বাংলাদেশ এখনো নির্মাণাধীন। এই নির্মাণ শুধু ইট, বালু, সিমেন্ট
আর লোহার নয় এটি বিবেকের নির্মাণ, ন্যায়ের নির্মাণ, আস্থার নির্মাণ, মানুষের মর্যাদার
নির্মাণ। আমাদের ব্যর্থতাগুলো আমাদের থামিয়ে দেওয়ার জন্য নয়; এগুলো আমাদের জাগিয়ে দেওয়ার
জন্য। কারণ একটি জাতির সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যর্থতা ভুল করা নয়, ভুলকে সাফল্য বলে বিশ্বাস
করা। আর সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নির্ভয়ে বলা হ্যাঁ, আমরা ব্যর্থ
হয়েছি; কিন্তু আমরা এখানেই থেমে থাকব না।
বাংলাদেশের
ভবিষ্যৎ সেই মানুষের হাতে, যে নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করতে পারে এবং তবুও আগামী সকালের
জন্য স্বপ্ন দেখতে পারে। আমাদের ব্যর্থতাগুলোর ভেতরেই তাই লুকিয়ে আছে নতুন বাংলাদেশের
সম্ভাবনা। আমাদের কাজ শুধু অতীতের হিসাব করা নয়; সেই হিসাব থেকে ভবিষ্যতের পথ তৈরি
করা। কারণ বাংলাদেশ কোনো সমাপ্ত গল্প নয়; এটি প্রতিদিন লেখা হচ্ছে। আর সেই লেখার পরবর্তী
অধ্যায়ে আমরা কী লিখব, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন