সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পোস্টগুলি

ঘাস ফড়িঙের ছায়া-ছোট গল্প

  বর্ষার পরে অজস্র দিন কেটে গেলেও ওই সন্ধ্যেটির কথা আমার মনে এমনভাবে রয়ে গেছে , যেন বৃষ্টির জল শুকিয়ে গেলেও মাটির ভিতর থেকে একটুকরো সোঁদা গন্ধ উ ’ ঠে আসে। শহরের বাইরের পুরনো বাসার জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আমি প্রথম দেখেছিলাম তাকে , একটি অল্পবয়সী মেয়ে , কাঁধে সাদা চাদর , হাতে কিছু বই , আর চোখে এমন এক অস্বচ্ছল উজ্জ্বলতা , যা মানুষের ভিতরের ক্লান্তিকে হঠাৎ অপমান ক ’ রে। তার নাম মীরা। নামটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে হয়েছিল , এই নামের ভিতরে যেন এক ধরনের নরম কাচ আছে ; আলো পড়লে ঝিলমিল ক ’ রে , কিন্তু হাত দিলে আঙুল কাটে। আমার নিজের বয়স তখন চল্লিশ ছুঁইছুঁই। বয়সের এই পর্যায়ে মানুষ হয় দৃঢ় হয়ে ওঠে , না হয় ভেতরে ভেতরে ভেঙে যেতে শুরু ক ’ রে। আমি দ্বিতীয় দলে ছিলাম। বাইরে থেকে আমাকে শান্ত , সুশৃঙ্খল , হয়তো কিছুটা নিরাসক্ত বলেই মনে হত। ভেতরে , সে সময় , এক পুরনো ক্ষত ক্রমাগত জেগে থাকত , সেই ক্ষতটি কোনো প্রেমের সম্পূর্ণ ভাঙন নয় , আবার কেবল বিচ্ছেদও নয় ; বরং এক এমন অসমাপ্ততার যন্ত্রণা , যেখানে হারানোর চেয়ে বেশি কষ্ট থাকে হারানোর আগের দীর্ঘ অনিশ্চয়তায়। এই অসমাপ্ততাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে , আবার ধীরে ...

যে লোকটি নিজের ছায়া হারিয়েছিল-ছোট গল্প

  শহরের পুরোনো রেকর্ডঘরটির জানালা খুব নিচু ছিল , এত নিচু যে দুপুরের রোদ সোজা এসে ফাইলের ধুলোয় গলতে গলতে স্তিমিত হ ’ য়ে পড়ত , আর সেই ধুলোর ভেতর দিয়ে বসে থাকা মানুষটিকে দেখে মনে হতো সে যেন আলো নয় , সময়ের ভেতর বসে আছে ; তার নাম ছিল তাজউদ্দিন , বয়স ষাট ছুঁইছুঁই , জীবনের অর্ধেকেরও বেশি কেটেছে জন্মনিবন্ধন , জমির দলিল , মৃত সনদ , নাগরিক পরিচয় , আর নানান কাগজের মাঝখানে , যেখানে মানুষের কান্না প্রায়ই কালি হয়ে আসে , স্বাক্ষর হয়ে জমে , আর সিলের শব্দে জীবনের গোপন দিকগুলো আরও বেশি নির্জীব হয়ে ওঠে ; তাজউদ্দিনের কাজ ছিল লিখে রাখা , অথচ লিখে রাখতে রাখতে সে এমন এক মানুষ হয়ে উঠেছিল যে বাস্তব আর নকলের মধ্যে পার্থক্য করতে পারত না , কারণ কাগজে যা থাকে তা অনেক সময় মানুষে থাকে না , আর মানুষে যা থাকে তা কাগজে লেখা যায় না। একদিন সকালে , যখন অফিসের দরজায় দাঁড়ানো চৌকিদার জব্বার চা খেতে খেতে একটা ছেঁড়া খবরের কাগজ উল্টাচ্ছিল , তাজউদ্দিন দেখল তার টেবিলের উপর একটি বাদামি খাম পড়ে আছে ; খামের গায়ে কোনো প্রেরকের নাম নেই , প্রাপকের নামও নেই , শুধু একটামাত্র বাক্য লেখা: যদি আপনি এখনো নিজের ছায়া দ...

রবীন্দ্রনাথ- কাদম্বরী দেবী

  কুশারীবংশের জয়রাম ঠাকুরের কনিষ্ঠ সন্তান গোবিন্দরাম ঠাকুর। তাঁর সঙ্গে বিয়ে হয় খুলনার দক্ষিণডিহি গ্রামের নন্দরাম গঙ্গোপাধ্যায়ের মেয়ে রামপ্রিয়া দেবীর। গোবিন্দরামের মৃত্যুর পর; রামপ্রিয়া দেবী তাঁর বিষয়-সম্পত্তি গোবিন্দরামের ভাইদের কাছ থেকে আলাদা করে নেন আইনের আশ্রয়ের মাধ্যমে। রামপ্রিয়া দেবীর ভ্রাতুষ্পুত্র জগন্মোহনকে তিনি লালনপালন করতে শুরু করেন। রামপ্রিয়া দেবী, তাকে কলকাতার ‘হাড়কাটা’ এলাকায় নিজ উদ্যোগে একটি বাড়ী তৈরি করে দেন। তিনি জগন্মোহনকে বিয়ে দেন দ্বারকানাথ ঠাকুরের মামা কেনারাম রায়চৌধুরীর মেয়ে শিরোমণির সাথে। ঠাকুর পরিবারের সাথে রামপ্রিয়া দেবীর সম্পর্ক ছিল পূর্ব থেকেই। কুশারীবংশের পঞ্চানন ঠাকুর ছিলেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরদেরও পূর্ব আদিপুরুষ। এই বিয়ের মাধ্যমে আবার যেন সম্পর্কের প্রাণ পেল। ভোজনরসিক, সুস্বাস্থ্যর অধিকারী জগন্মোহনের সঙ্গীতপ্রীতি ছিল অসাধারণ। সঙ্গীতের একজন যথার্থ সমজদার ব্যক্তি হিসেবে সেকালে তাঁর নাম ফুটে উঠেছিল চতুর্দিকে। জগন্মোহনের পাঁচ সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় রসিকলালের দুই মেয়ের বিয়ে হয় দ্বারকানাথ ঠাকুরের ভাগ্নে ও দাদার পৌত্রের সঙ্গে। ঠনঠনের শশিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের মেয়ে ত্...

আমার কৈশোরঃ ‘হারানো এক রোদনের স্মৃতি’

  আমার কৈশোরটা কিভাবে এসেছিল ? সে কি এসেছিল মেঘে ভর ক’রে কালো রঙে সম্পূর্ণ আকাশটা কেঁপে-কেঁপে;   না, এসেছিল সাদা আকাশের বু’কে নীল রঙ মাখিয়ে। সে রঙ কি ছড়িয়ে দিবে তার মতো ক’রে আমার বুকেও ! আমার রৌদ্রজ্জ্বল বুকের গভীরে , সে-কি জমে রবে আরও নিবিড় আর হিমশীতল হ’য়ে। অনেকগুলো সকালই এসেছিল আমার কৈশোর জীবনে। আমি কি মনে রেখেছি আমার কৈশোর জীবনের সবগুলো সকালের কথা ? সব সকাল কি একইভাবে এসেছিল আমার ওই ক্ষুদ্র জীবনে ! তারা কি একই ভাবে নাড়া দিয়েছিল আমাকে ! আমি, আমার কৈশোরের সব সকালের কথা মনে করতে পারি না; সব সকালের কথা আমার মনে পড়ে না। আমি বেঁড়ে উঠতে থাকি ক্রমান্বয়ে; কৈশোরকে পিছে ফেলে আমি এগিয়ে যাই আরও সামনের দিকে। অনেকগুলো দিন আর সকাল-সন্ধ্যা জড়িয়ে পড়ে আমার জীবনের সাথে। বৈশাখ, আষাঢ় শ্রাবণ গেঁথে থাকে তার অভ্যন্তরে। যেগুলো গেঁথে রয়েছে আমার আঁখিকোণে; তার স্মৃতি আর গভীর সৌন্দর্য, মাঝে মাঝে বিহ্বল ক’রে তোলে আমাকে। আমি কৈশোরে বেঁড়ে উঠি অনেকগুলো অপার সৌন্দর্যের মধ্যে দিয়ে। মাঘের বাতাস থেকেও বেশি কাঁপন জাগায় আমার মধ্যে, সেই কৈশোরে হারানো স্মৃতিগুলো। তাই মাঝে মধ্যে আমি যখন একা থাকি ফিরে যাই মিষ্টি মধু...