বর্ষার পরে অজস্র দিন কেটে গেলেও ওই সন্ধ্যেটির কথা আমার মনে এমনভাবে রয়ে গেছে , যেন বৃষ্টির জল শুকিয়ে গেলেও মাটির ভিতর থেকে একটুকরো সোঁদা গন্ধ উ ’ ঠে আসে। শহরের বাইরের পুরনো বাসার জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আমি প্রথম দেখেছিলাম তাকে , একটি অল্পবয়সী মেয়ে , কাঁধে সাদা চাদর , হাতে কিছু বই , আর চোখে এমন এক অস্বচ্ছল উজ্জ্বলতা , যা মানুষের ভিতরের ক্লান্তিকে হঠাৎ অপমান ক ’ রে। তার নাম মীরা। নামটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে হয়েছিল , এই নামের ভিতরে যেন এক ধরনের নরম কাচ আছে ; আলো পড়লে ঝিলমিল ক ’ রে , কিন্তু হাত দিলে আঙুল কাটে। আমার নিজের বয়স তখন চল্লিশ ছুঁইছুঁই। বয়সের এই পর্যায়ে মানুষ হয় দৃঢ় হয়ে ওঠে , না হয় ভেতরে ভেতরে ভেঙে যেতে শুরু ক ’ রে। আমি দ্বিতীয় দলে ছিলাম। বাইরে থেকে আমাকে শান্ত , সুশৃঙ্খল , হয়তো কিছুটা নিরাসক্ত বলেই মনে হত। ভেতরে , সে সময় , এক পুরনো ক্ষত ক্রমাগত জেগে থাকত , সেই ক্ষতটি কোনো প্রেমের সম্পূর্ণ ভাঙন নয় , আবার কেবল বিচ্ছেদও নয় ; বরং এক এমন অসমাপ্ততার যন্ত্রণা , যেখানে হারানোর চেয়ে বেশি কষ্ট থাকে হারানোর আগের দীর্ঘ অনিশ্চয়তায়। এই অসমাপ্ততাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে , আবার ধীরে ...
মামুনুর রহমান, সমকালীন বাংলা সাহিত্যের এক অদ্বিতীয় সংবেদনশীল কণ্ঠ। তাঁর লেখায় জীবনের সাধারণ মুহূর্তগুলোও নতুন এক আলোর আভায় ফু’টে ওঠে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, কবিতা কেবল শব্দের খেলায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি সেই নীরব ভাষা, যা অন্তরের গভীরে বাস ক’রে, পাঠকের অভ্যন্তরীণ অনুভূতির সঙ্গে মিশে এক অনন্য প্রতিধ্বনি সৃষ্টি ক’রে। তেমনি তাঁর গদ্য রচনা পাঠককে শুধু ভাবায় না, বরং অনুভব করায়, জীবনের ক্ষুদ্রতম ছোঁয়ায়ও গভীর মানসিক ধ্বনিতে স্পন্দিত ক’রে। তিনি খেয়াল রাখেন পাঠকের মন ও মননশীল দিকটি।