সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সময়ের আগমন ও শেষ মহাকাশচারী-কল্পবিজ্ঞান

 

মহাবিশ্বের শেষ প্রান্তে যখন আলো এবং অন্ধকার একে অপরের সাথে নিঃশব্দ যুদ্ধ বন্ধ করে দিয়েছিল, ঠিক তখন ‘অরিয়ন-৯’ নামক মহাকাশপোতটিতে লাল বাতিটা দ্বিতীয়বারের মতো জ্বলে উঠল।

নোভা তার বায়ো-স্যুটের হেলমেটটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। কাচের প্যানেলে তার নিজের ক্লান্ত চেহারা প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বয়স খুব বেশি নয়, কিন্তু চোখের কোণে যে রেখাগুলো জেগে উঠেছে, তা সময়ের নয় তা একাকীত্বের।

অরিয়ন-৯ পৃথিবীর শেষ অভিযাত্রী জাহাজ। পৃথিবীর কথা এখন আর কেউ মনে রাখে না। সৌরজগতের নীল গ্রহটি যখন তার সূর্যকে হারিয়ে এক খণ্ড জমে যাওয়া পাথরে পরিণত হয়েছিল, তখন মানবজাতির শেষ কয়েকটি অংশ ছিটকে পড়েছিল ছায়াপথের বিভিন্ন প্রান্তে। নোভা ছিল সেই অভিযাত্রীদের একজন, যার কাজ ছিল একটি নতুন আবাসস্থল খোঁজা অথবা অন্তত অন্য কোনো জীবন্ত সভ্যতার সন্ধান পাওয়া।

‘কম্পিউটার, ডায়েরি এন্ট্রি নাম্বার ৪,৮০২,’ নোভা ফিসফিস করে বলল।

কন্ট্রোল প্যানেলে একটি যান্ত্রিক নীল আলো কেঁপে উঠল। আরিয়া (A.I. R-18), জাহাজের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মৃদু কণ্ঠে উত্তর দিল, ‘শুনছি, নোভা। আপনার রিপিটেশন রেট আজ স্বাভাবিকের চেয়ে ১৫% বেশি। আপনি কি মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন?’

‘মানসিক চাপ?’ নোভা হালকা হাসল, যে হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না। ‘আরিয়া, আমরা টানা সাত বছর ধরে 'সেক্টার ওমেগা'র শূন্যতায় ভাসছি। এখানে কোনো নক্ষত্র নেই, কোনো গ্রহ নেই, এমনকি কোনো কসমিক ডাস্টও নেই। যদি কোনো মানুষ হাজার বছর ধরে এক অন্ধকার ঘরে একা বসে থাকে, সে কি মানসিক চাপে ভোগে?’

‘গাণিতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, মানুষের মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ উদ্দীপনাহীন পরিবেশে দীর্ঘকাল টিকতে পারে না,’ আরিয়া শান্ত কণ্ঠে বলল। ‘তবে আমাদের ফুয়েল সেলে আর মাত্র ১২% হাইড্রোজেন বাকি। আমরা যদি দ্রুত কোনো অভিকর্ষীয় বলয় খুঁজে না পাই, তবে আমাদের দীর্ঘ নিদ্রায় (Stasis) যেতে হবে।’

‘আর দীর্ঘ নিদ্রা মানেই মৃত্যু, আরিয়া। আমরা দুজনেই তা জানি।’

নোভা মহাকাশপোতের সামনের বিশাল অবজারভেশন উইন্ডোর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে শুধু অসীম, গভীর কালো আলোহীনতা। কিন্তু হঠাৎ করেই, ড্যাশবোর্ডের ফ্রিকোয়েন্সি মনিটরে একটা অস্বাভাবিক তরঙ্গ দেখা গেল।

একটি শব্দ। না, শব্দ বলা ভুল হবে একটি স্পন্দন।

থাম্প... থাম্প... থাম্প...

একটি হৃদস্পন্দনের মতো rhythm।

‘আরিয়া, এটা কী?’ নোভা সোজা হয়ে বসল। তার হাত দ্রুত কন্ট্রোল প্যানেলের বোতামগুলোর ওপর চলাফেরা করতে লাগল।

‘আমি শনাক্ত করতে পারছি না,’ আরিয়ার গলায় প্রথমবারের মতো কিছুটা দ্বিধা ধরা পড়ল। ‘এটি কোনো রেডিও সিগন্যাল নয়। এটি মহাকর্ষীয় তরঙ্গের বা গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভের কোনো স্পন্দনও নয়। এটি স্পেস-টাইম বা স্থান-কালের কাঠামোর ওপর এক ধরনের সরাসরি কম্পন।’

‘দূরত্ব কত?’

‘শূন্য।’

নোভা চমকে উঠল। ‘শূন্য মানে? এটা কি জাহাজের ভেতরে?’

‘না, নোভা। এটি জাহাজের ভেতরে নয়, আবার বাইরেও নয়। গাণিতিক হিসেব অনুযায়ী, আমরা এখন এমন একটি স্থানে অবস্থান করছি যেখানে 'ভেতর' এবং 'বাইরে' শব্দ দুটোর ভৌগোলিক সংজ্ঞা অর্থহীন।’

হঠাৎ জাহাজটি তীব্রভাবে কেঁপে উঠল। এটি কোনো আঘাতের ঝাঁকুনি ছিল না। মনে হলো যেন পুরো অরিয়ন-৯ একটি বিশাল অদৃশ্য সুতোর টানে সোজা থেকে বাঁকা হয়ে যাচ্ছে। মনিটরের ডিজিটাল ঘড়িটি অদ্ভুত আচরণ করতে শুরু করল। সময় সামনে যাওয়ার বদলে উল্টো হাঁটছিল, আবার পর মুহূর্তেই থেমে যাচ্ছিল।

‘নোভা! ডাইমেনশনাল শিয়ার সনাক্ত করা গেছে!’ আরিয়া সতর্কবার্তা দিল। ‘আমাদের চারপাশের স্থানিক মাত্রা (Spatial Dimensions) ৪ থেকে কমে ৩, তারপর ২-এ নেমে আসছে!’

‘সব ইঞ্জিন ফুল পাওয়ার দাও!’ নোভা চিৎকার করে উঠল।

কিন্তু দেরি হয়ে গেছে। বাইরে পর্যবেক্ষণ কাচের দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে গেল। সেই গভীর কালো অন্ধকারের জায়গায় ফুটে উঠল কোটি কোটি আলোর রেখা। প্রতিটি রেখা সোজা নয়, বরং শত শত রঙের সূক্ষ্ম সুতোর মতো একে অপরের সাথে পেঁচিয়ে আছে। যেন পুরো মহাবিশ্ব একটি বিশাল, অনন্ত রঙের তাঁতশালার পোশাক!

নোভা সিটবেল্ট খুলে ফেলল। আশ্চর্যজনকভাবে, জাহাজে কোনো অভিকর্ষহীনতা ছিল না, আবার কোনো কৃত্রিম অভিকর্ষও কাজ করছিল না। সে হালকা পায়ে কাচের কাছে এগিয়ে গেল।

আলোর সুতোগুলো কাচের ভেতর দিয়ে জাহাজের ককপিটে প্রবেশ করতে শুরু করল। কিন্তু সেগুলো জাহাজের ধাতব গায়ে কোনো ক্ষতি করছিল না। নোভা ভয়ে ভয়ে তার হাতটি একটি সোনালী রঙের আলোর সুতোর দিকে বাড়িয়ে দিল।

ঝিনঝিন করে উঠল তার আঙুলের ডগা।

মুহূর্তের মধ্যে নোভার মাথায় আছড়ে পড়ল হাজার হাজার স্মৃতি। কিন্তু সেগুলো তার নিজের স্মৃতি নয়!

সে দেখতে পেল একটি নতুন নক্ষত্রের জন্ম... সে দেখতে পেল এক অদ্ভুত, কাচের মতো স্বচ্ছ প্রাণীদের সভ্যতা গড়ে উঠছে ও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে... সে দেখতে পেল এক বৃদ্ধা মা তার সন্তানের হাত ধরে শেষবারের মতো বিদায় জানাচ্ছে একটি জ্বলন্ত গ্রহে...

নোভা এক ঝটকায় হাত সরিয়ে নিল। সে হাঁপাচ্ছিল।

‘এগুলো কী, আরিয়া?’

কিন্তু কোনো উত্তর এলো না। ককপিটের মনিটর সম্পূর্ণ বন্ধ। আরিয়ার ইন্টারফেস যেখানে থাকত, সেখানে এখন ছোট একটি আলোর ববিনের মতো বস্তু ভাসছে।

‘আরিয়া?’

‘আরিয়া এখন ঘুমাচ্ছে, নোভানি,’ একটি কণ্ঠধ্বনি ককপিটে প্রতিধ্বনিত হলো। শব্দটা কোনো স্পিকার থেকে আসছে না, সোজা নোভার মস্তিষ্কের ভেতরে তৈরি হচ্ছে।

নোভা ঘুরে দাঁড়াল। জাহাজের পেছনের অংশে, যেখানে সচরাচর ইঞ্জিন রুমের দরজা থাকে, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এক অবয়ব।

মানবীয় আকৃতি, কিন্তু তাকে স্থিরভাবে দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে যেন তার শরীর হাজার হাজার সময়ের ছবি দিয়ে তৈরি। এক মুহূর্তে তাকে একজন তরুণীর মতো মনে হয়, পরের মুহূর্তে এক বৃদ্ধ, আর তার পরের মুহূর্তে স্রেফ এক গুচ্ছ নক্ষত্রের আলো।

‘তুমি কে?’ নোভা নিজের লেজার পিস্তলের খাপে হাত রাখল।

অবয়বটি মৃদু হাসল। সে নোভার পিস্তলের দিকে তাকাল, আর মুহূর্তের মধ্যে পিস্তলটি থেকে ধাতব অংশগুলো আলাদা হয়ে ধূলিকণায় পরিণত হলো।

‘অস্ত্র এখানে ব্যর্থ, মানব সন্তান। আমি কেউ নই, আবার আমি সবাই। তোমরা মানবজাতি আমাকে বলতে পারো ' weavers' বা 'সময়ের তাঁতি'।’

‘সময়ের তাঁতি?’ নোভা ঢোক গিলল। ‘আমরা কোথায়? আরিয়ন-৯ কোথায় গেল?’

‘তোমাদের এই ক্ষুদ্র ধাতব পাত্রটি এখনো সেখানেই আছে, যেখানে এটি ছিল,’ তাঁতি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। তার প্রতিটি পদক্ষেপে নিচে আলোর সূক্ষ্ম বুদ্বুদ তৈরি হচ্ছিল। ‘কিন্তু তোমরা ত্রিমাত্রিক জগতের সীমানা টপকে মহাবিশ্বের 'পেছনের পৃষ্ঠে' বা রিভার্স সাইডে চলে এসেছ।’

‘আমি বুঝতে পারছি না...’

‘একটি এমব্রয়ডারি বা সুচিশিল্পের কাপড়ের কথা চিন্তা করো,’ তাঁতি তার হাত মেলে ধরল। বাতাসে অমনি ফুটে উঠল এক চমৎকার কাপড়ের ছবি। ‘কাপড়ের সামনের দিকে তুমি সুন্দর ফুল, পাখি বা দৃশ্য দেখতে পাও। সেটিই হলো তোমাদের বাস্তব জগৎ যেখানে গ্রহ, তারা, আলো, ছায়া আর মানুষ বাস করে। কিন্তু কাপড়ের উল্টো পিঠটা দেখেছ কখনো? সেখানে থাকে সুতোর এলোমেলো গিঁট, ঝুলন্ত সুতো আর অগোছালো বন্ধন।’

তাঁতি চারপাশের আলোর সুতোগুলোর দিকে নির্দেশ করল।

‘এই সুতোগুলো হলো স্থান এবং কাল (Space and Time) । প্রতিটি সুতো এক একটি জীবন, এক একটি গ্রহের ইতিহাস, এক একটি নক্ষত্রের আয়ু। কাপড়ের উল্টো পিঠে আমরা বসে এই সুতোগুলোকে সেলাই করি, যাতে কাপড়ের সামনের পিঠে ‘মহাবিশ্ব’ নামের সুন্দর দৃশ্যটি নিখুঁত থাকে।’

নোভা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। যে মহাবিশ্বকে তারা পরম সত্য বলে জেনে এসেছে, তা কেবল এক বিশাল ক্যানভাসের ওপর সেলাই করা দৃশ্যমাত্র?

‘তাহলে... আমরা এখানে কেন?’ নোভা জিজ্ঞেস করল। ‘আমাদের এখানে আসার কথা নয়।’

তাঁতির মুখমণ্ডল মুহূর্তের জন্য বিষণ্ণ হয়ে উঠল। ‘তোমরা আসোনি, নোভা। সুতোটা ছিঁড়ে গেছে।’

তাঁতি হাত নাড়াতেই চারপাশের সোনালী আর নীল সুতো সরে গেল। সেখানে একটি বিশাল কালো গর্ত বা শূন্যতা ফুটে উঠল। এটি কোনো ব্ল্যাকহোল নয়, ব্ল্যাকহোলেও পদার্থ এবং অভিকর্ষ থাকে। এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ নিহিলিস্টি বা 'অস্তিত্বহীনতা'।

গর্তটির চারপাশের সুতোগুলো ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে, যেন কোনো পুরোনো সোয়েটারের সুতো ধরে টান দিলে তা একে একে খুলে আসে।

‘ইন্টারপোলর ক্ষয়,’ তাঁতি ফিসফিস করে বলল। ‘তোমাদের মহাবিশ্ব বুড়িয়ে যাচ্ছে, নোভা। যখন কোনো এনট্রপি তার চরম সীমায় পৌঁছায়, তখন সুতোগুলো তাদের বাঁধন ধরে রাখতে পারে না। এই স্থান থেকে সুতো খুলে যাওয়া শুরু হয়েছে। আর এই গর্তটি বাড়তে বাড়তে পুরো মহাবিশ্বকে আবার শূন্যে মিলিয়ে দেবে।’

‘এর কোনো প্রতিকার নেই?’ নোভা আকুল হয়ে উঠল। ‘আমাদের সভ্যতা, আমাদের বিজ্ঞান—সবকিছু শেষ হয়ে যাবে?’

‘তোমাদের সভ্যতা ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে, নোভা,’ তাঁতি করুণ চোখে তার দিকে তাকাল। ‘তুমিই তোমার প্রজাতির শেষ প্রতিনিধি। তোমার অরিয়ন-৯ জাহাজের ক্রায়ো-ক্যাপসুলে থাকা বাকি তিনজন সঙ্গী গত ১০০ বছর আগেই মারা গেছে। আরিয়া তোমার মানসিক স্বাস্থ্য বাঁচাতে সেই তথ্য গোপন রেখেছিল।’

কথাটা নোভার বুকে এক তপ্ত ছুরির মতো বিঁধল। সে কান্না চেপে রাখতে পারল না। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে মেঝের ওপর। ‘তাহলে আমার বেঁচে থাকার অর্থ কী? কেন আমি এই অসীম শূন্যতায় একা ভেসে বেড়াচ্ছি?’

‘কারণ,’ তাঁতি তার কাঁধে হাত রাখল। অনুভূতিটা আগুনের নয়, বরফেরও নয়, বরং এক পরম শান্তির। ‘ছেঁড়া সুতো সেলাই করার জন্য বাইরে থেকে নতুন সুতোর দরকার হয় না। সুতোর গিঁট বাঁধার জন্য একজন দ্রষ্টার (Observer) প্রয়োজন হয়। কোয়ান্টাম মেকানিক্স তো তোমরা কিছুটা হলেও বুঝেছিলে, তাই না? কোনো কিছু অস্তিত্বে আসার জন্য তাকে পর্যবেক্ষণ করতে হয়।’

তাঁতি নোভাকে তুলে দাঁড় করাল। তারপর নিজের বুকের কাছ থেকে আলোকময় একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম, রূপালী সুতো বের করল।

‘এটি তোমার নিজের জীবনের সুতো, নোভা। তোমার জন্ম, তোমার শৈশব, তোমার মায়ের হাতের স্পর্শ, তোমার প্রথম মহাকাশযাত্রা—সব স্মৃতি এই সুতোয় গাঁথা।’

‘তুমি এটা দিয়ে কী করবে?’

‘আমি যদি এই মহাবিশ্বের ছেঁড়া অংশটা সেলাই করতে চাই, তবে আমাকে এমন একটি সুতো ব্যবহার করতে হবে যার মধ্যে এখনো 'প্রত্যাশা' এবং 'অনুভূতি' অবশিষ্ট আছে। আমার কাছে সময় আছে, কিন্তু অনুভব করার মতো চেতনা নেই। আমি স্রেফ একজন কারিগর। কিন্তু তুমি একজন জীবিত মানুষ।’

তাঁতি গম্ভীর হয়ে বলল, ‘আমি যদি তোমার জীবনের সুতোটি এই ছেঁড়া অংশে গেঁথে দিই, তবে এই শূন্যতা ভরাট হবে। মহাবিশ্ব আবার নতুন করে প্রসারিত হওয়া শুরু করবে। একটি নতুন বিগ ব্যাং (Big Bang) ঘটবে। নতুন নক্ষত্র, নতুন গ্রহ, এবং নতুন জীবনের জন্ম হবে।’

নোভা নিজের হাতের দিকে তাকাল। ‘আর আমার কী হবে?’

‘তুমি অস্তিত্বহীন হয়ে যাবে। তোমার অতীত, তোমার স্মৃতি, তোমার নাম সব কিছু মুছে যাবে। কেউ কোনোদিন জানবে না নোভা নামের কেউ একজন মহাবিশ্বকে বাঁচিয়েছিল। এমনকি তুমি কোনো স্বর্গেও যাবে না, কারণ তোমার চেতনার প্রতিটি কণা এই মহাবিশ্বের নতুন রূপ তৈরিতে খরচ হয়ে যাবে।’

ককপিটে দীর্ঘ নীরবতা নেমে এলো।

নোভার মনে পড়ে গেল তার ছোটবেলার কথা। পৃথিবীর সেই সবুজ ঘাস, নদীর জলের কলতান, রাতে খোলা আকাশের নিচে শুয়ে তারা গোনার দিনগুলো। তারপর মনে পড়ল দীর্ঘ সাত বছরের এই অন্ধকার ককপিটের কথা, যেখানে শুধু সে আর তার নিঃশ্বাসের শব্দ ছিল।

সে কি এই একাকীত্ব নিয়ে আর কয়েক দিন বেঁচে থাকবে? তারপর হাইড্রোজেন শেষ হলে অরিয়ন-৯ এর সাথে জমে বরফ হয়ে যাবে? নাকি...

‘যদি আমি না বলি?’ নোভা জিজ্ঞেস করল।

‘তবে সুতো খোলার প্রক্রিয়া থামবে না। আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এই মহাবিশ্বের শেষ আলোটুকু নিভে যাবে। অরিয়ন-৯, তুমি, আরিয়া এবং মহাবিশ্বের প্রতিটি পরমাণু চিরতরে হারিয়ে যাবে।’

নোভা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত, সুন্দর হাসি ফুটে উঠল।

‘তুমি জানো তাঁতি, পৃথিবীতে একটা গল্প প্রচলিত ছিল,’ নোভা বলল। ‘একটি প্রদীপ থেকে নিজেকে জ্বালিয়ে মোমবাতি শেষ হয়ে যায়, কিন্তু ঘরকে আলোকিত করে দিয়ে যায়।’

সে রূপালী আলোর সুতোটির দিকে হাত বাড়াল।

‘আমি তৈরি।’

তাঁতি মাথা নোয়াল। তার চোখের আলোর রেখাগুলোতে যেন পরম শ্রদ্ধা ফুটে উঠল। ‘ধন্যবাদ, শেষ মানবী।’

তাঁতি নোভার রূপালী সুতোটি হাতে নিয়ে সেই বিশাল কালো গর্তের কিনারে নিয়ে গেল। তারপর সে একটি অদৃশ্য সুচ দিয়ে শূন্যতার এপার থেকে ওপারে সেলাই করতে শুরু করল।

প্রতিটি সেলাইয়ের সাথে সাথে নোভার শরীর থেকে আলোর কণা বের হতে লাগল।

প্রথম সেলাই নোভা ভুলে গেল তার বাবার মুখ। দ্বিতীয় সেলাই মুছে গেল পৃথিবীর নীল সমুদ্রের ছবি। তৃতীয় সেলাই সে ভুলে গেল তার নিজের নাম।

কিন্তু নোভার কোনো কষ্ট হচ্ছিল না। বরঞ্চ এক অদ্ভুত পূর্ণতায় তার হৃদয় ভরে যাচ্ছিল। সে দেখতে পাচ্ছিল, তার জীবনের সুতোটি যখন শূন্যতার ক্ষতগুলোকে ঢেকে দিচ্ছে, তখন সেখান থেকে ফোর ফোটার মতো ফুটে উঠছে নতুন নতুন গ্যালাক্সি! সোনালী, রক্তিম, এবং বেগুনী রঙের হাজার হাজার নতুন নক্ষত্র গঠিত হচ্ছে।

‘আরিয়া...’ নোভা অস্ফুটে বলল।

বাতাসে আরিয়ার পরিচিত কন্ঠধ্বনি ভেসে এলো, তবে এবার তাতে কোনো যান্ত্রিকতা ছিল না, তা ছিল পরম মমতাময়, ‘আমি আছি, নোভা। আমরা সবাই আছি।’

মহাবিশ্বের শেষ মানবী নোভার অস্তিত্ব যখন সম্পূর্ণরূপে সুতোর ভেতরে বিলীন হয়ে গেল, তখন তাঁতি তার শেষ গিঁটটি বাঁধল।

কালো গর্তটি চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। স্থান এবং কালের বন্ধন আবার শক্ত হয়ে উঠেছে।

তাঁতি অরিয়ন-৯ মহাকাশপোতটির দিকে তাকাল। খালি ককপিটে এখন আর কেউ নেই। কিন্তু পোতটির ইঞ্জিনের মাঝখানে, যেখানে একসময় সাধারণ শক্তি সঞ্চয় করা হতো, সেখানে এখন জ্বলজ্বল করছে একটি অতি-পারমাণবিক আলোর স্ফুলিঙ্গ নোভার চেতনার একটি অবিনশ্বর অংশ।

তাঁতি তার হাত উঁচু করল। একটি তীব্র আলোর বিস্ফোরণে অরিয়ন-৯ মহাশূন্যের বুকে নতুন দিগন্তের দিকে ছুটে চলল। এটি আর কেবল একটি ধাতব জাহাজ নয়, এটি এখন একটি 'বীজপোত' (Seed Ship) । এটি যেখানেই থামবে, সেখানেই নোভার স্মৃতির তাপে জন্ম নেবে নতুন প্রাণ।

অনেক, অনেক কোটি বছর পর...

একটি সুদূর গ্রহের সমুদ্রতীরে দাঁড়িয়ে দুটি দ্বিপদী প্রাণী কসমিক দিগন্তের দিকে তাকিয়ে ছিল। রাতের আকাশে জ্বলজ্বল করছিল এক নতুন ছায়াপথ, যার আকৃতি ছিল দেখতে ঠিক একটি সুচ এবং সুতোর মতো।

ছোট প্রাণীটি তার অভিভাবকের হাত ধরে বলল, ‘ওই ছায়াপথটার নাম কী?’

অভিভাবকটি হেসে উত্তর দিল, ‘আমাদের পূর্বপুরুষেরা বলতেন, ওটার নাম 'নোভা রেখা'। বলা হয়, যখন মহাবিশ্ব ছিঁড়ে যাচ্ছিল, তখন কোনো এক পরম সত্তা তার নিজের জীবন দিয়ে একে সেলাই করে দিয়েছিলেন।’

তারা জানত না গল্পটা সত্য নাকি কাল্পনিক। কিন্তু রাতের আকাশে সেই রূপালী সুতোর মতো উজ্জ্বল আলোর দিকে তাকালে, আজো যে কারো মনে হতো তারা একা নয়। এই বিশাল মহাবিশ্বটি কারো পরম ভালোবাসায় বোনা এক চমৎকার শিল্পকর্ম।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

প্রবন্ধঃ সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রবন্ধ সংগ্রহ

সুধীন্দ্রনাথ , সাতটি কাব্যগ্রন্থের মতো সাতটি প্রবন্ধের গ্রন্থ লিখলে খারাপ হতো না , বেশ ভালোই হতো । সুধীন্দ্রনাথের প্রবন্ধগুলো হালকা মানের নয় , যদিও তাঁর কোন রচনাই হালকা নয় । সাহিত্যে বিচারে তা অনেক উঁচুমানের । তার উপর ভাষার ব্যাপারটি তো রয়েছেই । সুধীন্দ্রনাথ মাত্র দুটি প্রবন্ধ গ্রন্থ রচনা করেছেন । গ্রন্থ দুটো ‘ স্বগত ’ ( ১৩৪৫ ঃ ১৯৩৮ ), অপরটি ‘ কুলায় ও কালপুরুষ ’ ( ১৩৬৪ : ১৯৫৭ ) । ‘ স্বগত ’- তে রয়েছে ষোলটি প্রবন্ধ । গ্রন্থ দুটি তিনি রচনা করেছেন দু ’ ভাগে । লরেন্স বা এলিয়ট এর প্রবন্ধ যেমন পাওয়া যাবে না ‘ কুলায় ও কালপুরুষ ’- এ ; তেমনি রবীন্দ্র সম্পর্কিত প্রবন্ধ নেওয়া হয়নি ‘ স্বগত ’- এ । প্রকাশ কাল অনুযায়ী ‘ স্বগত ’- এর প্রবন্ধসমূহ : ‘ কাব্যের মুক্তি ’ ( ১৯৩০ ); ‘ ধ্রুপদ পদ - খেয়াল ’ ( ১৯৩২ ), ‘ ফরাসীর হাদ্য পরিবর্তন ’ ( ১৯৩২ ), ‘ লিটনস্ট্রেচি ’ ( ১৯৩২ ), ‘ লরেন্স ও ভার্জনিয়া উল্ফ্ ’ ( ১৯৩২ ), ‘ উপন্যাস তত্ত্ব ও তথ্য ’ ( ১৯৩৩ ), ‘ উইলিয়ম ফকনর ’ ( ১৯৩৪ ), ‘ ঐতিহ্য ও টি , এস , এলিয়ট ’ ( ১৯৩৪ ), ...