সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

তৃতীয় জানালার আলো

 

বৃষ্টির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক খুব অদ্ভুত। কেউ বৃষ্টিকে ভালোবাসে কারণ সে পৃথিবীকে ধুয়ে দেয়, কেউ বৃষ্টিকে ঘৃণা করে কারণ সে পুরোনো স্মৃতিগুলোকে ভিজিয়ে আবার জীবন্ত করে তোলে। নীরা বৃষ্টি ভালোবাসত না, অথচ তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ দুজনই এসেছিল বৃষ্টির দিনে। একজন এসেছিল তাকে ভালোবাসতে শেখাতে, আর অন্যজন এসেছিল তাকে বুঝিয়ে দিতে যে ভালোবাসার সবচেয়ে গভীর রূপটি কখনো কখনো উচ্চারণ করা যায় না। সেই দুজনের নাম ছিল অর্ক ও রুদ্র। আর নীরা জানত না, মানুষের হৃদয় কখন কোন নামে নিজের দরজা খুলে দেয়। ঢাকার আকাশে সেদিন দুপুর থেকেই কালো মেঘ জমেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ ক্লাস শেষ হওয়ার আগেই বৃষ্টি শুরু হলো। সবাই ছুটে বেরিয়ে গেল, কেউ ছাতা খুলল, কেউ ব্যাগ মাথায় দিয়ে দৌড়াল, কেউ করিডোরে দাঁড়িয়ে মোবাইলে বৃষ্টির ছবি তুলতে লাগল। নীরা দাঁড়িয়ে ছিল পুরোনো কলাভবনের বারান্দায়। তার হাতে একটি বই, বইটির ভেতরে শুকনো কৃষ্ণচূড়ার পাপড়ি। সে জানত না কেন সেদিন তার মনে হচ্ছিল, জীবনে খুব শিগগিরই কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। মানুষের মন কখনো কখনো ভবিষ্যতের গন্ধ পায়, যদিও সে ভবিষ্যৎ দেখতে পারে না। ঠিক তখনই তার পাশে এসে দাঁড়াল একটি ছেলে। ছেলেটির চুল ভিজে গেছে, শার্টের কাঁধে বৃষ্টির ছোঁয়া, হাতে কোনো ছাতা নেই। সে নীরার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি কি বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করছেন? নীরা তাকিয়ে বলল, আর আপনি? ছেলেটি হেসে বলল, আমি বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করছি না, আমি শুধু দেখছি কতক্ষণে মানুষ বৃষ্টির কাছে হার মানে। নীরা ভ্রু কুঁচকে বলল, কথাটা কী ধরনের? ছেলেটি বলল, মানুষ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, কিন্তু বৃষ্টি নামলে সবাইকে থেমে যেতে হয়। ভালোবাসাও অনেকটা বৃষ্টির মতো। নীরা বলল, আপনি কি সব অপরিচিত মেয়ের সঙ্গে এমন অদ্ভুত কথা বলেন? ছেলেটি হাসল। সেই হাসিটা ছিল নির্ভার, অথচ তার চোখের মধ্যে ছিল এক ধরনের গোপন বিষণ্নতা। সে বলল, না, সব মেয়ের সঙ্গে নয়। আজকে মনে হলো আপনাকে বলা যায়। নীরা তখনও জানত না ছেলেটির নাম অর্ক। সে তখনও জানত না এই ছেলেটি একদিন তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি এবং সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন হয়ে উঠবে। বৃষ্টি থামার পর তারা একই পথে হাঁটতে হাঁটতে ক্যাম্পাসের বাইরে এসেছিল। রাস্তার পাশে জমে থাকা পানিতে আকাশের ভাঙা ছবি দেখা যাচ্ছিল। অর্ক বলেছিল, আপনার নাম কী? নীরা বলেছিল, নাম জেনে কী করবেন? অর্ক বলেছিল, মানুষকে দ্বিতীয়বার দেখা হলে ডাকতে সুবিধা হবে। নীরা একটু হেসেছিল। তারপর বলেছিল, নীরা। অর্ক বলেছিল, আপনার নামের সঙ্গে বৃষ্টির সম্পর্ক আছে? নীরা বলেছিল, নেই। অর্ক বলেছিল, আজ থেকে থাকবে। সেই ছিল শুরু। এরপর তাদের দেখা হতে লাগল। কখনো পরিকল্পনা করে, কখনো কাকতালীয়ভাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি, পুরোনো চায়ের দোকান, চারুকলার সামনে, বইমেলার ভিড়ে, ধানমন্ডি লেকের পাশে। অর্ক কথা বলতে ভালোবাসত। সে পৃথিবীর সবকিছু নিয়ে কথা বলতে পারত। সিনেমা, গান, রাজনীতি, বই, আকাশ, পুরোনো বাড়ি, মানুষের একাকীত্ব, এমনকি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা নিঃসঙ্গ মানুষের মুখ নিয়েও। নীরা শুনতে ভালোবাসত। সে কম কথা বলত, কিন্তু অর্কের কথা শুনতে শুনতে তার মনে হতো, পৃথিবীকে হয়তো এতদিন সে ভুলভাবে দেখেছে। অর্কের চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখলে সাধারণ জিনিসও অসাধারণ হয়ে ওঠে। একদিন নীরা অর্ককে বলেছিল, তুমি এত কথা বলো কেন? অর্ক বলেছিল, কারণ আমি ভয় পাই। নীরা বলেছিল, কিসের ভয়? অর্ক উত্তর দিয়েছিল, একদিন হয়তো বলার মতো কাউকে পাব না। নীরা তখন বলেছিল, আমি থাকব। অর্ক কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। তারপর বলেছিল, এই কথাটা আরেকবার বলবে? নীরা বলেছিল, কেন? অর্ক বলেছিল, কিছু কথা মানুষ একবার শুনে বিশ্বাস করতে পারে না। সেই দিন থেকেই তাদের সম্পর্কের মধ্যে অন্যরকম একটি আলো জন্ম নিতে শুরু করল। কেউ কাউকে ভালোবাসি বলেনি, কিন্তু দুজনেই বুঝতে শুরু করেছিল, কিছু মানুষের উপস্থিতি ছাড়া দিন অসম্পূর্ণ লাগে। অর্ক সকালে ঘুম থেকে উঠে নীরাকে মেসেজ দিত। রাতে ঘুমানোর আগে শেষ কথাটাও নীরার সঙ্গে বলত। নীরা নতুন কোনো বই কিনলে প্রথমে অর্ককে জানাত। কোনো গান ভালো লাগলে তাকে পাঠাত। কোনোদিন মন খারাপ হলে অর্ককে না বলে থাকতে পারত না। ভালোবাসা সম্ভবত এভাবেই শুরু হয় ,একদিন হঠাৎ মানুষ বুঝতে পারে, পৃথিবীতে এমন একজন আছে যার সঙ্গে কথা না বললে নিজের ভেতরের শব্দগুলো জমে জমে অসহ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু অর্কের জীবনে আরেকজন ছিল। সেই মানুষটির নাম রুদ্র। রুদ্র ছিল অর্কের শৈশবের বন্ধু। একই স্কুল, একই মাঠ, একই শহর, একই ধরনের স্বপ্ন। তারা দুজন একে অপরের জীবনের এমন সব ঘটনা জানত, যেগুলো তাদের পরিবারের মানুষও জানত না। অর্ক যখন প্রথম নীরার কথা রুদ্রকে বলেছিল, তখন রুদ্র শুধু হেসেছিল। অর্ক বলেছিল, জানিস, মেয়েটা খুব অদ্ভুত। রুদ্র বলেছিল, তুই তো পৃথিবীর সব মেয়েকেই প্রথমে অদ্ভুত বলিস। অর্ক বলেছিল, না, নীরা আলাদা। রুদ্র বলেছিল, তাহলে সাবধানে থাকিস। অর্ক বলেছিল, কেন? রুদ্র বলেছিল, আলাদা মানুষদের হারালে কষ্টও আলাদা হয়। অর্ক তখন হেসেছিল, কিন্তু রুদ্র হাসেনি। কারণ সে জানত না কেন নিজের বুকের মধ্যে হঠাৎ একটা অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। নীরার সঙ্গে রুদ্রের প্রথম দেখা হয়েছিল একটি শীতের বিকেলে। অর্ক তাকে নিয়ে এসেছিল পুরোনো একটি ক্যাফেতে। রুদ্র জানালার পাশে বসে বই পড়ছিল। অর্ক বলেছিল, এই হচ্ছে নীরা। নীরা বলেছিল, আর আপনি নিশ্চয়ই রুদ্র? রুদ্র তাকিয়েছিল। সে খুব ধীরে বলেছিল, নিশ্চয়ই হওয়ার মতো আমি কি এত বিখ্যাত? নীরা হেসেছিল। অর্ক বলেছিল, এই লোকটা এমনই। কথা কম বলে, কিন্তু ভাব বেশি নেয়। রুদ্র বলেছিল, আর তুই কথা বেশি বলিস, ভাব কম। নীরা আবার হেসেছিল। সেই হাসির মুহূর্তটিই রুদ্র পরে বহুবার মনে করার চেষ্টা করেছিল। কারণ সে জানত না, মানুষের জীবন কখন কোন ছোট্ট মুহূর্তে বদলে যায়। রুদ্র, নীরাকে প্রথম দেখেই প্রেমে পড়েনি। প্রেম এত সহজ কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু নীরা তার জীবনে ঢুকে পড়েছিল ধীরে ধীরে। প্রথমে অর্কের গল্পে। তারপর অর্কের ফোনে। তারপর তাদের একসঙ্গে ঘোরাঘুরিতে। এরপর একদিন রুদ্র বুঝতে পারল, নীরা না থাকলে তাদের তিনজনের কোনো পরিকল্পনাই যেন সম্পূর্ণ হয় না। তারা তিনজন একসঙ্গে অনেক জায়গায় ঘুরেছিল। নদীর ধারে গিয়েছিল, পুরোনো সিনেমা দেখেছিল, বইমেলায় ঘুরেছিল, রাতের শহরে চা খেয়েছিল। বাইরে থেকে দেখলে তারা ছিল তিনজন বন্ধু। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনটি আলাদা নদী তিনটি ভিন্ন দিকে বইছিল। অর্ক নীরাকে ভালোবাসছিল প্রকাশ্য আলোয়। নীরা অর্ককে ভালোবাসছিল বিশ্বাসের মতো। আর রুদ্র নীরাকে ভালোবাসছিল এমন এক নীরবতায়, যার কোনো শব্দ নেই। সবচেয়ে কঠিন বিষয় ছিল, রুদ্র অর্ককে নিজের ভাইয়ের মতো ভালোবাসত। সে জানত, অর্ক সুখী। নীরার সঙ্গে অর্কের সম্পর্ক তাকে বদলে দিয়েছে। আগে যে ছেলেটি সবসময় নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকত, এখন সে অন্য একজন মানুষের জন্য চিন্তা করে। আগে যে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় পেত, এখন সে ভবিষ্যতের মধ্যে নীরাকে দেখতে চায়। রুদ্র এই পরিবর্তন দেখে খুশি হওয়ার চেষ্টা করত। কিন্তু মানুষের হৃদয় কখনো কখনো মানুষের সবচেয়ে ভালো গুণগুলোকেও শাস্তি দেয়। সে যত বেশি অর্ককে সুখী দেখত, তত বেশি নিজের ভেতরের ভালোবাসাটিকে হত্যা করার চেষ্টা করত। এক রাতে রুদ্র নিজের ডায়েরিতে লিখেছিল, আমি এমন একজন মানুষকে ভালোবাসি, যাকে ভালোবাসার অধিকার আমার নেই। কারণ সে আমার বন্ধুর পৃথিবী। আর আমি যদি সেই পৃথিবীতে আগুন লাগাই, তাহলে শুধু একজন মানুষকে নয়, নিজেকেও পুড়িয়ে ফেলব। তারপর সে ডায়েরিটি বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু ভালোবাসা ডায়েরির পাতার মতো নয়, বন্ধ করলেই বন্ধ থাকে না। নীরা ধীরে ধীরে রুদ্রকে অন্যভাবে চিনতে শুরু করেছিল। অর্ক তাকে আনন্দ দিত, উত্তেজনা দিত, ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাত। কিন্তু রুদ্র তাকে শান্তি দিত। নীরা কোনোদিন রুদ্রের কাছে নিজের কথা সাজিয়ে বলতে হতো না। সে কাঁদলে রুদ্র কারণ জিজ্ঞেস করত না, শুধু পাশে বসে থাকত। সে চুপ থাকলে রুদ্র নীরবতাকে ভাঙতে চাইত না। একদিন নীরা রুদ্রকে বলেছিল, তুমি এত কম কথা বলো কেন? রুদ্র বলেছিল, সব কথা বলার দরকার হয় না। নীরা বলেছিল, কিন্তু না বললে মানুষ বুঝবে কীভাবে? রুদ্র বলেছিল, যে সত্যিই বুঝতে চায়, তাকে সবকিছু বলতে হয় না। নীরা সেদিন দীর্ঘক্ষণ রুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার মনে হয়েছিল, এই মানুষটিকে সে হয়তো কখনো পুরোপুরি চিনতে পারবে না। আর মানুষ সাধারণত সেই মানুষটির প্রতিই বেশি আকৃষ্ট হয়, যার ভেতরে কিছু অজানা অন্ধকার থাকে। কিন্তু নীরা তখনও নিজের অনুভূতির কোনো নাম দেয়নি। সে অর্ককে ভালোবাসত। এই সত্য নিয়ে তার কোনো সন্দেহ ছিল না। অথচ রুদ্রের কাছে থাকলে তার বুকের মধ্যে এক ধরনের অদ্ভুত প্রশান্তি তৈরি হতো। সে ভেবেছিল, হয়তো বন্ধুত্বও এমন হয়। মানুষের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো ,সে সব অনুভূতিকে নাম দিতে চায়। অথচ কিছু অনুভূতি নাম পাওয়ার আগেই জীবনের অংশ হয়ে যায়। বিপর্যয় শুরু হয়েছিল একটি সাধারণ সন্ধ্যায়। অর্কের সঙ্গে নীরার ঝগড়া হয়েছিল। কারণ অর্ক বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করেছিল, কিন্তু নীরাকে কিছু বলেনি। নীরা জানতে পেরেছিল অন্যের কাছ থেকে। তার মনে হয়েছিল, অর্ক তাকে বিশ্বাস করেনি। অর্ক বলেছিল, আমি নিশ্চিত ছিলাম না। নীরা বলেছিল, তুমি নিশ্চিত না হলেও আমাকে বলতে পারতে। অর্ক বলেছিল, যদি না হয়? নীরা বলেছিল, তাহলে কী হতো? আমি কি তোমার ব্যর্থতার সঙ্গে থাকতে পারতাম না? অর্ক রাগ করেছিল। সে বলেছিল, সবকিছু এত সহজ নয়, নীরা। নীরা বলেছিল, ভালোবাসাও কি সহজ নয়? অর্ক কোনো উত্তর দেয়নি। তারপর সে চলে গিয়েছিল। নীরা সেদিন রুদ্রকে ফোন করেছিল। বলেছিল, তুমি কি একটু আসতে পারবে? রুদ্র কোনো প্রশ্ন করেনি। সে এসেছিল। রাত তখন প্রায় দশটা। শহরের রাস্তায় আলো, মানুষের ভিড় কমে গেছে। নীরা একটি লেকের ধারে বসে ছিল। রুদ্র তার পাশে এসে বসেছিল। অনেকক্ষণ কেউ কথা বলেনি। তারপর নীরা বলেছিল, মানুষ কি সত্যিই অন্য মানুষকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারে? রুদ্র বলেছিল, পারে না। নীরা তাকাল। রুদ্র বলল, কিন্তু চেষ্টা করতে পারে। নীরা বলল, অর্ক আমাকে সব কথা বলে না। রুদ্র বলল, হয়তো সে ভয় পায়। নীরা বলল, আমি কি এত ভয়ংকর? রুদ্র মৃদু হেসেছিল। তারপর বলেছিল, কখনো কখনো যাকে সবচেয়ে বেশি হারাতে ভয় পাই, তার কাছেই সবচেয়ে বেশি সত্য লুকাই। নীরা হঠাৎ কেঁদে ফেলেছিল। রুদ্র তার দিকে তাকিয়ে ছিল। তারপর নীরা নিজের অজান্তেই তার কাঁধে মাথা রাখল। সেই মুহূর্তে পৃথিবী যেন থেমে গিয়েছিল। রুদ্রের বুকের ভেতর বহু বছরের নীরবতা একসঙ্গে চিৎকার করতে চেয়েছিল। সে চেয়েছিল নীরার মাথায় হাত রাখতে। চেয়েছিল বলতে, আমি আছি, আমি সবসময় ছিলাম। কিন্তু সে কিছুই করেনি। কারণ সে জানত, এই মুহূর্তটি তার পাওয়ার নয়। এই মুহূর্ত নীরার দুর্বলতার। মানুষ যখন ভেঙে পড়ে, তখন তাকে ভালোবাসা আর আশ্রয়ের পার্থক্য বুঝতে হয়। রুদ্র চোখ বন্ধ করেছিল। আর ঠিক সেই সময় দূরে দাঁড়িয়ে থাকা অর্ক সবকিছু দেখেছিল। সে তাদের কাছে আসেনি। কোনো কথা বলেনি। শুধু কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে চলে গিয়েছিল। কিন্তু কখনো কখনো কয়েক সেকেন্ডই একটি জীবন ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। পরদিন অর্কের ফোন বন্ধ। বাড়িতে নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়নি। নীরা শতবার ফোন করেছে। কোনো উত্তর নেই। রুদ্রও খুঁজেছে। তিন দিন পর একটি চিঠি এসেছিল নীরার কাছে। সেখানে লেখা ছিল, আমি তোমাকে ভালোবাসি, নীরা। হয়তো এখনও পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসি। কিন্তু আমি জানি না ভালোবাসা মানে কী। কাউকে ধরে রাখা, নাকি তাকে তার সত্যের কাছে ছেড়ে দেওয়া? আমি রুদ্রকে চিনি। সে কখনো আমার কাছ থেকে কিছু নিতে চাইবে না। আর এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভয় দেখায়। কারণ যে মানুষ কিছু চায় না, সে হয়তো সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। নীরা চিঠি পড়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে রুদ্রের দিকে তাকিয়েছিল। রুদ্র তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে। নীরা বলেছিল, তুমি কি আমাকে ভালোবাসো? রুদ্রের মুখ সাদা হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ সময় সে কোনো উত্তর দেয়নি। তারপর বলেছিল, এই প্রশ্নটা আজ না করলেই হতো। নীরা বলেছিল, আমি জানতে চাই। রুদ্র বলেছিল, কিছু সত্য জানলে মানুষ সুখী হয় না। নীরা বলেছিল, তবু জানতে চাই। রুদ্র চোখ বন্ধ করেছিল। তারপর বলেছিল, হ্যাঁ। আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু আমি কখনো তোমাকে চাইনি। নীরা কেঁপে উঠেছিল। রুদ্র বলেছিল, কারণ তুমি অর্ককে ভালোবাসো। আর অর্ক আমার জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ। আমি যদি তোমাকে চাইতাম, তাহলে প্রতিদিন নিজেকে ঘৃণা করতে হতো। নীরা বলেছিল, তাহলে এতদিন বলোনি কেন? রুদ্র বলেছিল, কারণ ভালোবাসা সবসময় বলা হয় না। নীরা বলেছিল, কিন্তু তুমি আমাকে কঠিন অবস্থায় ফেলে দিলে। রুদ্র বলেছিল, আমি জানি। তাই আমি চলে যাচ্ছি। নীরা বলেছিল, কোথায়? রুদ্র বলেছিল, যেখানে তোমাদের দুজনের গল্পের মধ্যে আমার নাম থাকবে না। সেই রাতেই রুদ্র শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল। নীরা একা হয়ে গেল। অর্ক নেই। রুদ্র নেই। আর তার চারপাশে শুধু প্রশ্ন। সে অর্ককে ভালোবাসে, এতে কোনো সন্দেহ ছিল না। কিন্তু রুদ্রকে সে কী অনুভব করত? কৃতজ্ঞতা? বন্ধুত্ব? নাকি এমন কোনো ভালোবাসা যার ভাষা আলাদা? সময় চলে গেল। অর্ক বিদেশে চলে গেছে ,এই খবর পরে সে জানতে পারে। রুদ্র কোথায় আছে, কেউ জানত না। নীরা নিজের জীবনের দিকে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। সে চাকরি করল, নতুন মানুষদের সঙ্গে পরিচিত হলো, পরিবার তাকে বিয়ের কথা বলল। কিন্তু তার হৃদয় যেন তিনটি অসমাপ্ত বাক্যের মধ্যে আটকে রইল। পাঁচ বছর পরে একদিন নীরা একটি বই পেল। বইটির নাম ছিল ‘তৃতীয় জানালার আলো’। লেখকের নাম অজানা। বইটি তার অফিসে সম্পাদনার জন্য পাঠানো হয়েছিল। প্রথম পাতায় লেখা ছিল, এই গল্প সেই মেয়েটির জন্য, যে জানত না দুটি মানুষ তাকে ভালোবেসেছিল দুই ধরনের আকাশ দিয়ে। নীরার হাত কাঁপতে লাগল। সে পড়তে শুরু করল। গল্পে একটি ছেলে ছিল, যে কথা বলতে পারত না। আরেকটি ছেলে ছিল, যে অতিরিক্ত কথা বলত। তাদের জীবনে একটি মেয়ে এসেছিল। মেয়েটি একজনকে ভালোবাসত কারণ সে তাকে স্বপ্ন দেখাত। আর অন্যজনকে হারাতে পারত না কারণ সে তাকে নিজের ভেতরের মানুষটির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। শেষ পাতায় লেখা ছিল, যদি কোনোদিন তুমি জানতে চাও তৃতীয় জানালার আলো কোথা থেকে আসে, তাহলে সেই লেকের বেঞ্চে এসো যেখানে তুমি একদিন বলেছিলে ,তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না তো? নীরা বইটি বন্ধ করেছিল। তার চোখে জল ছিল। সে জানত, রুদ্র ফিরে এসেছে। অথবা হয়তো কোনোদিন যায়নি। সেদিন রাতেই সে লেকের পাশে গেল। আকাশে পূর্ণিমা ছিল না। কিন্তু শহরের আলো পানির ওপর পড়ে এক ধরনের নীল অন্ধকার তৈরি করেছিল। পুরোনো বেঞ্চটিতে একজন বসে ছিল। নীরা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। রুদ্র মাথা তুলে তাকাল। পাঁচ বছর সময় মানুষের মুখ বদলে দেয়, কিন্তু কিছু চোখ কখনো বদলায় না। নীরা দাঁড়িয়ে রইল। রুদ্র বলল, তুমি এসেছ। নীরা বলল, তুমি কি ভেবেছিলে আসব? রুদ্র বলল, না। আশা করেছিলাম। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। নীরা বলল, তুমি আমাকে কেন বই লিখে ডাকলে? রুদ্র বলল, কারণ পাঁচ বছর আগে কথা বলে আমি সবকিছু নষ্ট করেছিলাম। এবার লিখে দেখতে চেয়েছিলাম। নীরা বলল, তুমি কিছু নষ্ট করোনি। রুদ্র তাকাল। নীরা বলল, আমরা সবাই নষ্ট করেছিলাম। অর্ক পালিয়ে গিয়েছিল। তুমি পালিয়ে গিয়েছিলে। আর আমি সত্যের সামনে দাঁড়াতে পারিনি। রুদ্র বলল, তুমি কি এখন সত্য জানো? নীরা বলল, জানি না। রুদ্র মৃদু হাসল। নীরা বলল, তুমি কি এখনও আমাকে ভালোবাসো? রুদ্র এবার দ্রুত উত্তর দিল না। সে লেকের দিকে তাকিয়ে বলল, কিছু প্রশ্নের উত্তর সময়ের সঙ্গে বদলায় না। নীরা বলল, আর অর্ক? রুদ্রের চোখে এক অদ্ভুত ছায়া নেমে এলো। সে বলল, অর্ক ঢাকায় এসেছে। নীরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেলল। রুদ্র বলল, সে অসুস্থ। নীরা সেদিন বুঝতে পারল, জীবন কখনো গল্পের মতো মানুষকে সময় দেয় না। সে ছুটে গিয়েছিল অর্কের কাছে। শহরের একটি ছোট্ট হাসপাতালে অর্ক শুয়ে ছিল। তাকে দেখে অর্ক দীর্ঘক্ষণ কিছু বলেনি। তারপর হেসেছিল। সেই পুরোনো হাসি। কিন্তু এবার তার মধ্যে ক্লান্তি। নীরা তার পাশে বসে বলেছিল, তুমি আমাকে একবারও জানাওনি? অর্ক বলেছিল, কী বলতাম? নীরা বলেছিল, যে তুমি ফিরে এসেছ। অর্ক বলেছিল, আমি জানতাম না আমার ফিরে আসার অধিকার আছে কি না। নীরা কেঁদে ফেলেছিল। অর্ক তার হাত ধরেছিল। বলেছিল, তুমি কি সুখী? নীরা কোনো উত্তর দিতে পারেনি। অর্ক বলেছিল, এই পাঁচ বছরে আমি অনেক কিছু বুঝেছি। ভালোবাসা কাউকে জিজ্ঞেস করে না, তুমি শুধু আমাকে ভালোবাসবে কি না। মানুষ অনেক সময় একজনকে ভালোবাসে, আর আরেকজনের কাছে নিজের সবচেয়ে সত্য রূপটি খুঁজে পায়। নীরা বলেছিল, তুমি কি আমাকে ক্ষমা করেছ? অর্ক চোখ বন্ধ করেছিল। বলেছিল, তোমাকে ক্ষমা করার মতো কিছু তুমি করোনি। আমি নিজেই নিজের ভয় থেকে পালিয়েছিলাম। কয়েকদিন পর অর্ক হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলো। রুদ্র তাকে দেখতে গিয়েছিল। বহু বছর পর দুই বন্ধু মুখোমুখি হয়েছিল। কেউ কাউকে জড়িয়ে ধরেনি প্রথমে। শুধু দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর অর্ক বলেছিল, তুই আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছিলি। রুদ্র বলেছিল, জানি। অর্ক বলেছিল, আমিও তোকে কষ্ট দিয়েছি। রুদ্র বলেছিল, জানি। অর্ক হেসেছিল। তারপর বলেছিল, তাহলে সমান সমান। নীরা দূর থেকে তাদের দেখছিল। তার মনে হচ্ছিল, মানুষের জীবনে ভালোবাসার চেয়েও কঠিন হয় বন্ধুত্ব। কারণ প্রেম ভেঙে গেলে মানুষ কাঁদে, কিন্তু বন্ধুত্ব ভেঙে গেলে মানুষ নিজের অতীত হারায়। দিনগুলো আবার চলতে শুরু করল। কিন্তু আগের মতো নয়। কারণ এবার তিনজনই সত্য জানত। আর সত্য জানার পর মানুষ আগের জায়গায় ফিরে যেতে পারে না। অর্ক নীরাকে আবার ভালোবাসার কথা বলেনি। রুদ্রও কোনো দাবি করেনি। নীরা তাদের দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বুঝতে চেষ্টা করছিল, হৃদয়ের বিচার কীভাবে হয়। একদিন তিনজন সেই পুরোনো জায়গায় গেল যেখানে তাদের প্রথম একসঙ্গে দেখা হয়েছিল। অর্ক বলল, আমাদের গল্পটা খুব বাজে হয়েছে। নীরা হেসে বলল, কেন? অর্ক বলল, কারণ কোনো পরিষ্কার শেষ নেই। রুদ্র বলল, সব গল্পের পরিষ্কার শেষ থাকা দরকার? অর্ক বলল, পাঠক কী বুঝবে? নীরা বলল, পাঠক সবসময় শেষ জানতে চায়। কিন্তু জীবন তো শেষ জানে না। রুদ্র বলল, তাহলে আমরা কী করব? নীরা দুজনের দিকে তাকাল। তারপর বলল, আমরা কেউ কাউকে বেছে নেব না। অর্ক অবাক হলো। রুদ্র চুপ করে রইল। নীরা বলল, কারণ ভালোবাসাকে পুরস্কারের মতো দেওয়া যায় না। একজন জিতবে আর একজন হারবে ,এটা কোনো ভালোবাসা নয়। অর্ক বলল, তাহলে? নীরা বলল, আমি এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নেব না। প্রথমবারের মতো আমি নিজের জন্য বাঁচব। তোমাদের ভালোবাসা আমার জীবনের অংশ, কিন্তু আমার জীবন শুধু তোমাদের সিদ্ধান্তে তৈরি হবে না। অর্কের চোখে জল এসে গেল। রুদ্র ধীরে মাথা নত করল। সেদিন তিনজন তিনদিকে হাঁটতে শুরু করেছিল। কিন্তু এবার কেউ পালিয়ে যাচ্ছিল না। অর্ক নিজের জীবনের দিকে যাচ্ছিল। রুদ্র নিজের নীরবতার দিকে। আর নীরা নিজের অজানা ভবিষ্যতের দিকে। অনেক বছর পরে নীরা একটি উপন্যাস লিখেছিল। উপন্যাসের নাম ছিল ‘তৃতীয় জানালার আলো’। বইটির শেষ পাতায় সে লিখেছিল ,মানুষ ভালোবাসাকে সবসময় একটি প্রশ্নের মধ্যে বন্দি করতে চায়, তুমি কাকে ভালোবাসো? অথচ কখনো কখনো প্রশ্নটি ভুল হয়। কারণ হৃদয়ের ভেতরে ভালোবাসার ঘর একটিই নয়। একজন মানুষ আমাদের হাসতে শেখায়, একজন মানুষ আমাদের কাঁদতে শেখায়, আর একজন মানুষ আমাদের নিজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। এর মধ্যে কে বেশি প্রিয়, সেই হিসাব হৃদয় জানে না। হৃদয় শুধু জানে, কাউকে হারালে কোথায় ব্যথা হয়। অর্ক ছিল নীরার জীবনের প্রথম আকাশ, রুদ্র ছিল তার সবচেয়ে নীরব সমুদ্র, আর নীরা ছিল সেই তীর যেখানে দুজনের সমস্ত ঢেউ এসে ভেঙে পড়েছিল। তারা কেউ কাউকে পুরোপুরি পায়নি। কিন্তু কেউ কাউকে পুরোপুরি হারায়ওনি। কারণ কিছু সম্পর্কের শেষ বিচ্ছেদে হয় না, কিছু সম্পর্কের শেষ হয় না, কিছু সম্পর্ক শুধু মানুষের ভেতরে একটি আলো হয়ে থেকে যায়। সেই আলো দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না, কিন্তু অন্ধকার নামলে মানুষ বুঝতে পারে ,তার জীবনে কোনো একদিন কেউ একজন এসে সত্যিই একটি জানালা খুলে দিয়েছিল। আর সেই জানালার আলো কখনো নিভে যায় না। হয়তো এটাই ভালোবাসার সবচেয়ে অদ্ভুত সত্য ,সব ভালোবাসার গন্তব্য এক নয়, সব ভালোবাসার নাম এক নয়, আর সব ভালোবাসার মানুষকে পাওয়া যায় না। তবু মানুষ ভালোবাসে। কারণ ভালোবাসা পাওয়ার প্রতিশ্রুতি নয়, ভালোবাসা কখনো কখনো শুধু একজন মানুষের অস্তিত্বের কাছে নিজের হৃদয় সমর্পণ করা। সেই সমর্পণের কোনো জয় নেই, কোনো পরাজয় নেই, কোনো নির্দিষ্ট শেষ নেই। আছে শুধু তিনটি মানুষ, তিনটি অসমাপ্ত জীবন, তিনটি ভিন্ন ভালোবাসা এবং একটি জানালা ,যেখান দিয়ে প্রতিরাতে নীল আলো এসে বলে যায়, কিছু গল্প শেষ হওয়ার জন্য জন্মায় না, কিছু গল্প সারাজীবন মানুষের ভেতরে বেঁচে থাকার জন্য জন্মায়।

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...

আমাদের ব্যর্থতাগুলো

  বাংলাদেশের গল্প কেবল সাফল্যের গল্প নয়; এ গল্পের ভেতরে অসংখ্য অপূর্ণতার দীর্ঘ ছায়াও মিশে আছে। একটি দেশ যখন যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে নিজের পরিচয় নির্মাণ করে, তখন তার প্রতিটি অগ্রগতি যেমন গর্বের, তেমনি প্রতিটি ব্যর্থতাও আত্মসমালোচনার দাবি রাখে। আমরা স্বাধীনতার পর বহু পথ পেরিয়েছি   অর্থনীতি বেড়েছে, নগরায়ণ হয়েছে, শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, অবকাঠামো বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু উন্নয়নের দৃশ্যমান ভবনের আড়ালে এমন কিছু ভাঙাচোরা জায়গা রয়ে গেছে, যেখানে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে হয়   আমরা কি সত্যিই এগিয়েছি, নাকি কেবল এগিয়ে যাওয়ার চেহারাটি নির্মাণ করেছি? আমাদের ব্যর্থতাগুলো তাই কেবল কোনো সরকারের, কোনো প্রতিষ্ঠানের কিংবা কোনো ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়; এগুলো আমাদের সামষ্টিক চরিত্র, রাষ্ট্রচিন্তা, সামাজিক অভ্যাস এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের আয়না। সর্বোপরি এগুলো আমাদের নিজস্ব ব্যর্থতা। আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হয়তো এই যে, আমরা অনেক সময় সমস্যাকে সমাধান করার চেয়ে সমস্যার সঙ্গে বসবাস করতে শিখে যাই। রাস্তায় যানজট, নদীতে দূষণ, ফুটপাতে দখল, ঘুষ, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, বিচার পেতে...