সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পোস্টগুলি

জানুয়ারি, ২০২৬ থেকে পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে

নষ্ট স্মৃতি

                                    শীতল হাওয়ার দিনে ভেসে আসে পথ চলার নীরব গান , আমি ছুঁই সেই বাতাস যেখানে কেউ নেই , তবুও তার উপস্থিতি আছে আমার স্মৃতিতে , চোখের সেই আড়ালে, রাতের আকাশে মেঘেরা ঘুরে বেড়ায় , ঠিক যেন স্মৃতিগুলোর আনন্দ-উদ্বেগ , সবুজ গাছের গায়ে জমে থাকা শিশির বিন্দুতে, কিছু নষ্ট স্মৃতি আমি দেখি তার হাসি , এক ফালি চাঁদের আলোর মতো ম্লান, আমার শহরের সারি সারি বাতি আলো জ্বেলে যেমন অপেক্ষা ক’রে আমি অপেক্ষায় থাকি, কোন এক অজানা মানুষের জন্য, ছায়ার জন্য কিন্তু সময় থামে না , সেই মানুষের মুখের চিত্র আঁকতে, আমার ফ্রেমে   হাতে সময়ের ঘড়ি থাকলেও সে নিজেই বেদনাদায়ক ভাবে এগিয়ে যায়, আজ আমি বলি , তার জন্য লিখেছি কথাগুলো , জানি শুনবে না, যেমন ছোট্ট নদী লিখে দেয় একাকিত্বের গহ্বরে নিজের ছায়া, যদি তা শুনে থাকো, তাহলে বলি , আমি এখানে আছি দাঁড়িয়ে বাতাসের ছোঁয়ায় , পাতার গন্ধে, আলো ও ছায়ার মাঝেই, যদি তা না শুনে থেকো , তখনও আমি বলব , আমি অন্য কেউ নই ! আমার ভালোবাসা ছিল চুপচাপ , তবে তা মিথ্যা ন...

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল বক্তৃতা

  নোবেল বিজয়ীর তালিকায় তিনি শুধু প্রথম বাঙালি বা প্রথম ভারতীয়ই নন , তিনি প্রথম এশীয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতিকবিতাগ্রন্থ ‘ গীতাঞ্জলি ’ প্রকাশ হয় ১৯১০ সালে। বছর দুয়েক পর , এই বইয়ের বেশ কিছু কবিতা এবং এর বাইরেরও অনেকগুলি কবিতার অনুবাদ নিয়ে প্রকাশিত হয় ইংরেজি গ্রন্থ ‘ সং অফারিংস ’ (Song Offerings) । এই বইয়ের জন্যই ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পান রবীন্দ্রনাথ। ওই বছর ১০ ডিসেম্বর স্টকহলমের নোবেল পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ সশরীরে উপস্থিত থাকতে পারেননি। টেলিগ্রামে লিখে পাঠানো তাঁর বার্তা সেখানে পাঠ করা হয়। তিনি লিখেছিলেন — “ সুইডিশ অ্যাকাডেমির অনুভবের কাছে আমি আমার কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করছি। তাঁরা দূরকে নিকট করেছেন এবং এক অপরিচিতকে ভ্রাতৃত্বে বরণ করে নিয়েছেন। ” ১৯২১ সালে রবীন্দ্রনাথ সুইডেন যান। ২৬ মে স্টকহলমে রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমিতে নোবেল সম্মানকে স্মরণ এবং গ্রহণ করে তিনি দীর্ঘ বক্তৃতা দেন। সেই বক্তৃতার একাংশের অনুবাদ এখানে প্রকাশ করা হল — তাঁরই উত্তরসূরী বাঙালি অভিজিত্ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নোবেল প্রাপ্তির দিনে।সেই মুহূর্তে আমি একটি দল নিয়ে কাছাকাছি এক জঙ্গলে বেড়াতে যাচ্ছি। ডাক ও ...

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে সামাজিক চিত্র কতটুকু পাওয়া যায়

  মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৯০৮-১৯৫৬) উপন্যাসে সামাজিক চিত্র কতটুকু পাওয়া যায়, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আসলে বলতে হয়, তাঁর উপন্যাসসমগ্রই সমাজের এক বিস্তৃত, নির্মম ও গভীর বিশ্লেষণ। যেখানে ব্যক্তি কখনোই সমাজের বাইরে কোনো স্বতন্ত্র নায়ক হ’য়ে উঠতে পারে না। বরং ব্যক্তি সর্বদা সমাজের অর্থনৈতিক, শ্রেণিগত, যৌন ও মানসিক কাঠামোর দ্বারা নির্মিত ও নিয়ন্ত্রিত এক সত্তা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা উপন্যাসকে যে নতুন দিশা দিয়েছেন, তার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো সমাজকে রোমান্টিক কল্পনার আবরণে ঢেকে না রেখে নগ্ন বাস্তবতায় উপস্থাপন করা। যেখানে দারিদ্র্য, ক্ষুধা, রোগ, কামনা, শোষণ ও ক্ষমতার সম্পর্ক একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাঁর সমাজচিত্র কোনো নৈতিক আদর্শের প্রচার নয়, বরং সমাজ কীভাবে মানুষের চরিত্র, চিন্তা ও সম্পর্ককে গ’ড়ে তোলে এবং ধ্বংস করে, তার এক অন্তর্গত অনুসন্ধান। ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসে যে সমাজচিত্র পাওয়া যায়, তা কেবল জেলে সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার বিবরণ নয়, বরং উপনিবেশিক বাংলার প্রান্তিক অর্থনীতির এক নির্মম প্রতিফলন। যেখানে নদী জীবনের অবলম্বন হয়েও মৃত্যুর সমার্থক, আর জীবিকা ও জীবনের মধ্যে ক...

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ কতটুকু সার্থক !

  বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৯৪-১৯৫০) ‘পথের পাঁচালী’ কতটুকু সার্থক,এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করতে গেলে প্রথমেই বোঝা প্রয়োজন যে এই উপন্যাসের সার্থকতা কোনো একক সাহিত্যিক মানদণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি জীবন, প্রকৃতি, মানুষ ও সময়,এই চারটির এক গভীর সহাবস্থানের শিল্পিত প্রকাশ। ‘পথের পাঁচালী’ কেবল একটি উপন্যাস নয়, এটি এক ধরনের জীবনবীক্ষা, যেখানে দারিদ্র্য, বঞ্চনা, আনন্দ, মৃত্যু ও স্বপ্ন একই সুতোয় গাঁথা হ’য়ে মানব অস্তিত্বের দীর্ঘ যাত্রাকে চিহ্নিত ক’রে। বিভূতিভূষণ এখানে কোনো মহান নায়ক বা ব্যতিক্রমী ঘটনার আশ্রয় নেননি; বরং একেবারে সাধারণ, প্রায় অবহেলিত এক গ্রামীণ পরিবারের দৈনন্দিন জীবনকে কেন্দ্র ক’রে এমন এক সাহিত্যিক মহাকাব্য নির্মাণ করেছেন, যা তার সরলতার মধ্য দিয়েই অসাধারণ হ’য়ে উঠেছে। এই সরলতাই পথের পাঁচালী -র প্রথম ও প্রধান সার্থকতা, কারণ এতে জীবনকে রঙিন ক’রে দেখানোর কোনো প্রয়াস নেই, আছে শুধু জীবন যেমন, তেমন করেই তাকে অনুভব করার সততা। হরিহর রায়ের পরিবার যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে বাস ক’রে, তা ঔপনিবেশিক বাংলার গ্রামীণ সমাজের এক প্রামাণ্য দলিল। এই সমাজে দারিদ্র্য কোনো আকস্ম...

সাদা স্মৃতি

  ফিনিক্সের পাখির মতো মানুষের স্মৃতিগুলো জ্বলে ওঠে , প্রথম অগ্নিতলে আগুন নয়, শুধু স্নিগ্ধ ধোঁয়া,   অস্তিত্বের প্রথম সুরে নব জীবনের সুর , পৃথিবীর ঘাটে দাঁড়িয়ে আমি   শুধু   নীরবতার পানে   তাকিয়ে থাকি , গভীর বাতাসের ভিতর   ভেসে আসে শব্দহীন প্রশ্ন আমি কি কখনও   স্বপ্নে ছিলাম , আদিম মানুষের মত আর আকাশ আসে ,    অস্থির,   অচেনা, নির্ঘণ্টের মতো বিস্ময়ের রেখা আঁকি আমার অন্তরালে   শব্দেরা নাও বেয়ে আসে নীরবতার রঙে আঁকা ক্ষুদ্রতম আলোর খণ্ড: একটি চিহ্ন,   একটি নিঃশ্বাস,   জীবনের একটি নীরব সমাধি চাঁদের মুখে বয়ে আসে   অসীম এক শান্তি , যেন ক্ষুদ্রতম অশ্রুতে   অলৌকিক বর্ণের জলরঙে আঁকা এক অলস রাতের ছবি ;   তার মাঝে শুরু হয় এক ধ্বনি অজানা গল্পের বীণায়   করুণ সুর বেজে উঠে , তুমি যদি অন্তরালের দিকে তাকাও, শব্দেরা তখন চেনা পথ হারিয়ে অচেনা সুরে প্রতিধ্বনিত হয় , প্রশ্ন করে সময়ের বুকের খোঁজে: এই নিঃশব্দ কি প্রেম   ! না শুধুই নিষ্ক্রিয়তা ,   একটি ক্ষুদ্র আলো , অবিচল ধারায় ভেসে আসে; হঠাৎ কাঁপে, ...

শহর ও মানুষের প্রতিচ্ছবি

  শহরের ভিড়ে আমার চোখ গেঁথে যায় কোন রঙ্গিন বিলবোর্ডে যেখানে আর কেউ নেই , শুধু আন্দোলন এবং অপেক্ষা বাতাসে মেশেছে ট্রাফিক হর্ণ , রেল লাইনের ফিসপ্লেটে, আমার মন হয় ওদের সুরের অংশ , কখনও হয়তো ছায়া, তারপর তুমি এসেছো হঠাৎ একদিন আমার শহরে, হাতের আঙুলে তুলে নিলে আমার শহরের মানচিত্র এখানে ছিলাম আমি , বললে যেন কাকে ! আমি বললাম এখানে ছিলাম আমি ও আমার অপেক্ষা স্মৃতিতে ফুটছে পুরনো রাস্তার বাঁকে ধূসর একটি রোদ্দুর , পাশাপাশি একটি শিশুর হাসি , ভুলে যাওয়ার ডাকে, আমরা হয়তো একসাথে ছিলাম না , কিন্তু   সমস্তপথ একসাথে ছিল অজানার গন্তব্যের দিকে ! তা নিখুঁত নয়, তবে বিশ্বাস ছিল মনের গভীরে আজ আমি শহরের একটি কোণায় দাঁড়িয়ে বলি , আমার ভালোবাসা চিৎকার করে না , শুধু ছায়ার মতো তোমার পেছনে হাঁটতে থাকে; হাওয়ার বিকট সঙ্গীত , বাতি নিভে যাওয়া পাথর , সব মিলিয়ে দিয়ে গেছে একটি বার্তা: মানুষ একা নয় , তার সাথে অনেকগুলো স্বপ্ন থাকে, তবে মানুষের মাঝেও একা থাকা যায়, তাহলে আমি বলব ,  চল তুমি আমাতে, হাতে হাত ধ'রে, আমরা একসাথে উঠব শহরের সবচেয়ে ব্যস্ত রাস্তায় , যেখানে প্রতিটি পাথর আমাদের হয়ে কথ...

রবীন্দ্রনাথের ‘চার অধ্যায়’ উপন্যাসের ‘এলা’ চরিত্রের রাজনৈতিক রূপধারা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) ‘চার অধ্যায়’ উপন্যাসে ‘এলা’ চরিত্রটি কেবল একটি কাহিনির কেন্দ্রীয় নারীচরিত্র নয়, বরং এটি রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক চিন্তা, মানবতাবাদ, নৈতিক দ্বন্দ্ব এবং আধুনিক নারীর আত্মসচেতনতার এক গভীর শিল্পরূপ।   যেখানে ব্যক্তি ও আদর্শ, প্রেম ও কর্তব্য, বিপ্লব ও মানবিকতা এই সবকটি শক্তি একসঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে একটি জটিল অথচ অত্যন্ত অর্থবহ চরিত্ররূপ সৃষ্টি করেছে। ‘এলা’ উপন্যাসে প্রথমে আবির্ভূত হয় এক শিক্ষিত, সংবেদনশীল, চিন্তাশীল তরুণী হিসেবে, যার মনে দেশপ্রেম আছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ আছে, কিন্তু সেই ক্ষোভ কখনোই অন্ধ উন্মাদনায় রূপ নেয় না; তার দেশপ্রেম প্রশ্নবোধক, অনুসন্ধানী এবং নৈতিক দায়বদ্ধতায় পূর্ণ। রবীন্দ্রনাথ, এখানে ইচ্ছাকৃতভাবেই ‘এলা’কে বিপ্লবী আন্দোলনের কেন্দ্রস্থলে স্থাপন করেছেন, যাতে বিপ্লবের বাহ্যিক রোমান্টিকতা নয়, তার অন্তর্গত নৈতিক সংকট উন্মোচিত হয়, এবং এই উন্মোচনের প্রধান মাধ্যম হ’য়ে ওঠে ‘এলা’র চেতনা। ‘ইন্দ্রনাথে’র সঙ্গে ‘এলা’র সম্পর্ক প্রথমে প্রেমের মতো মনে হলেও ধীরে ধীরে তা এক ধরনের নৈতিক সংলাপে পরিণত হয়, যেখানে ‘এলা’ কেবল প্রেমিকা নয়, বরং বিচারক, প্র...

রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতার ‘লাবণ্য’ চরিত্রের রূপধারা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১)   ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে ‘লাবণ্য’ চরিত্রটি কেবল একটি নারীমুখী প্রেমকাহিনির নায়িকা নয়, সে আধুনিক বাঙালি নারীর আত্মসচেতনতার একটি নান্দনিক ও দার্শনিক রূপ। যেখানে প্রেম, বুদ্ধিবৃত্তি, আত্মসম্মান ও স্বাধীন সত্তার সংঘাত ও সমন্বয় একত্রে প্রবাহিত হয়েছে এবং এই প্রবাহের মধ্য দিয়েই ‘লাবণ্য’ রবীন্দ্র-উপন্যাসের নারীচরিত্রের বিবর্তনে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁচেছে। ‘লাবণ্য’কে বিশ্লেষণ করতে গেলে প্রথমেই যে বিষয়টি সামনে আসে তা হলো তার ভাষা ও চিন্তার স্বাতন্ত্র্য;   কারণ রবীন্দ্রনাথ এখানে নারীকে কেবল অনুভূতির আধার হিসেবে নয়, বরং চিন্তার সহযাত্রী হিসেবে নির্মাণ করেছেন। যেখানে ‘লাবণ্য’ নিজের অনুভবকে ভাষায় রূপ দিতে পারে, যুক্তির আলোয় নিজের অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে এবং প্রেমকে অন্ধ আত্মসমর্পণ না করে একটি বৌদ্ধিক অভিজ্ঞতায় উত্তীর্ণ করতে সক্ষম হয়। ‘শেষের কবিতা’ মূলত প্রেমের উপন্যাস হলেও এই প্রেম কোনো সহজ আবেগপ্রবণ রোমান্টিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা আত্মমর্যাদা ও আত্মপরিচয়ের পরীক্ষাক্ষেত্র, আর এই পরীক্ষার কেন্দ্রে অবস্থান করে ‘লাবণ্য’ চরিত্রটি, যে নিজের ভালোবাসাকে নিজে...

রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসে ‘নারী চরিত্রের’ উপস্থিতি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) উপন্যাসে নারীর উপস্থিতি কেবল চরিত্রগত নয়, তা একটি দার্শনিক ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া, যেখানে ঔপনিবেশিক বাংলার সমাজ, পিতৃতান্ত্রিক নৈতিকতা, ব্যক্তিসত্তার জাগরণ এবং আধুনিকতার দ্বন্দ্ব একত্রে নারীর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। রবীন্দ্রনাথের নারী কখনো গৃহের কেন্দ্র, কখনো সমাজের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা নীরব সাক্ষী, কখনো আবার বিদ্রোহী চেতনার বাহক, যে নিজের অস্তিত্বকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। তাঁর উপন্যাসজগতে নারী পুরুষের পরিপূরক নয়, বরং সমান্তরাল এক মানবসত্তা, যে প্রেম, কর্তব্য, আত্মসম্মান ও স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে ফেরে। এই নারীরা কখনো আদর্শের মূর্ত প্রতীক, কখনো সেই আদর্শের ভাঙন, আবার কখনো আদর্শ ও বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক জটিল মানবিক সত্তা। ‘চোখের বালি’র বিনোদিনী, ‘গোরা’র সুচরিতা ও ললিতা, ‘ঘরে বাইরে’র বিমলা, ‘শেষের কবিতা’র লাবণ্য, ‘যোগাযোগ’-এর কুমুদিনী বা ‘চার অধ্যায়’-এর এলা, এরা সবাই এক একটি সময়ের সামাজিক-মানসিক সংকটকে ধারণ করে নারীর অবস্থানকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। রবীন্দ্রনাথ, নারীর শরীরী উপস্থিতিকে কখনোই কেবল সৌন্দর্যের উপাদান হিসেবে দে...

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’

  আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের(১৯৪৩-১৯৯৭) ‘চিলেকোঠার সেপাই’ বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে এমন একটি রচনা যেখানে রাজনৈতিক আন্দোলন কেবল ঘটনাপঞ্জি হিসেবে নয় , বরং মানুষের চেতনার ভেতরকার দীর্ঘ , জটিল ও দ্বিধাপূর্ণ রূপান্তরের প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে এবং এই কারণেই উপন্যাসটির মূল বিষয় কোনো একক রাজনৈতিক ঘটনা নয় , বরং ইতিহাস , শ্রেণি , ব্যক্তিসত্তা , ভয় , সংশয় , আদর্শ এবং আত্মপরিচয়ের সংঘর্ষে নির্মিত এক বহুমাত্রিক বাস্তবতা। এই উপন্যাসে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান একটি দৃশ্যমান পটভূমি হলেও প্রকৃত অর্থে ইলিয়াস দেখাতে চেয়েছেন, একটি সমাজ কীভাবে ভেতর থেকে ফেটে পড়ে এবং সেই ফাটলের শব্দ একজন সাধারণ মানুষের অন্তর্জগতে কীভাবে প্রতিধ্বনিত হয়। ওসমান গণি বা রঞ্জু নামের যে চরিত্রটিকে উপন্যাসের কেন্দ্রস্থলে রাখা হয়েছে , সে কোনো ঘোষিত বিপ্লবী নয় , কোনো সংগঠিত রাজনৈতিক কর্মীও নয় , বরং সে সেই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি ; যারা ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে অথচ ইতিহাসের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি তাদের থাকে না। এই দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থানই ‘ চিলেকোঠার সেপাই ’- এর মূল বিষয়ের কেন্দ্রে অবস্থান করে , কা...

শামসুর রাহমানের কবিতায় নগর-ভাবনা

  শামসুর রাহমানের (১৯২৯-২০০৬) কবিতায় নগর-ভাবনা, আধুনিক বাঙলা কাব্যচর্চার ইতিহাসে এক গভীর, বিস্তৃত ও তাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই নগর কেবল একটি ভৌগোলিক পরিসর নয়, এটি একটি দার্শনিক অবস্থা, একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা এবং একটি নান্দনিক নির্মাণ। শামসুর রাহমানের কবিতায় নগর প্রথমত আধুনিক মানুষের আবাসভূমি, যেখানে ব্যক্তির অস্তিত্ব প্রতিনিয়ত রাষ্ট্র, ইতিহাস, শ্রেণি ও ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ে। তিনি এমন এক সময় কবিতা লিখেছেন, যখন বাংলা কবিতা গ্রামকেন্দ্রিক প্রকৃতি-রোমান্টিসিজম থেকে বেরিয়ে ধীরে ধীরে নাগরিক চেতনার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই রূপান্তরের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ধারাবাহিক কণ্ঠস্বর ছিলেন শামসুর রাহমান। তাঁর কবিতায় ঢাকা শহর একটি প্রতীকী ও বাস্তব সত্তা হিসেবে হাজির হয়, যেখানে ফুটপাত, ট্রামলাইন, অফিসপাড়া, বস্তি, মিছিল, কারফিউ, পোস্টার, রাতের নির্জনতা এবং প্রেমিকার শরীর একে অপরের সঙ্গে জটিলভাবে সংযুক্ত। এই নগর-ভাবনা নির্মিত হয়েছে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার, পাকিস্তানি শাসনামলের রাজনৈতিক দমন, ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার পরবর্তী ভাঙা স্বপ্নের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে। ফলে শ...

রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলী’

  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলী বাংলা সাহিত্যের এমন এক গ্রন্থ, যা কবিতার সীমা অতিক্রম করে প্রার্থনা চিন্তা সংগীত দর্শন ও মানবিক আত্মোপলব্ধির এক দীর্ঘ সমন্বিত অভিযাত্রায় রূপ নিয়েছে এবং এই গ্রন্থকে পাঠ করা মানে কেবল ভাষার সৌন্দর্য বা কাব্যিক অলংকার অনুধাবন নয় বরং নিজের অস্তিত্বকে এক গভীর অন্তর্মুখী যাত্রায় সঁপে দেওয়া, যেখানে আত্মা ধীরে ধীরে নিজের আবরণ ঝরিয়ে ফেলে গীতাঞ্জলী কোনো একক মুহূর্তের রচনা নয়। এটি বহু বছরের সাধনা অনুভব সংশয় বিশ্বাস ভাঙা ও গড়ার মধ্য দিয়ে নির্মিত এক আধ্যাত্মিক আত্মজীবনী। যেখানে কবি নিজেই নিজের প্রধান চরিত্র এবং সেই চরিত্রের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানব আত্মার সার্বজনীন রূপটি উন্মোচিত হয়। এখানে কবি কখনো প্রশ্নকারী কখনো প্রার্থী কখনো প্রেমিক কখনো বিদ্রোহী আবার কখনো নিঃশব্দ শ্রোতা। এই বহুমাত্রিক অবস্থানই গীতাঞ্জলীকে একমাত্রিক। ভক্তিকাব্যের গণ্ডি থেকে মুক্ত করে এনে এক বিস্তৃত মানবিক দর্শনের স্তরে উন্নীত করেছে। গীতাঞ্জলীর কবিতাগুলি বিচ্ছিন্ন পাঠ্য হিসেবে নয়, বরং একটি অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ হিসেবে পড়তে হয়। যেখানে প্রতিটি কবিতা আগেরটির সঙ্গে নীরব সংলাপে যুক্ত এবং পরবর্তীটির জন্য...

হুমায়ুন আজাদের ‘নারী’

  হুমায়ুন আজাদের ‘নারী’ বইটিকে তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, এটি মূলত পিতৃতান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থার গঠন, উৎপত্তি, ভাষ্য এবং পুনরুৎপাদনের একটি সমালোচনামূলক ডিসকোর্স, যেখানে নারীকে কেন্দ্র ক’রে তৈরি হওয়া সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বয়ানগুলোকে কঠোর যুক্তি, ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং সমাজবিজ্ঞানের কাঠামোতে নিরীক্ষণ করা হয়েছে। লেখক হুমায়ুন আজাদ, নারীর অবস্থানকে ব্যাখ্যা করার জন্য কোনো আবেগিক বা নৈতিক আহ্বানের আশ্রয় নেননি, বরং জ্ঞানতাত্ত্বিক স্তর থেকে দেখতে চান কিভাবে ‘নারী’ নামক ধারণাটি সামাজিক ক্ষমতার বিন্যাসের অংশ হিসেবে গ’ড়ে উঠেছে এবং কিভাবে সেই ধারণা সভ্যতার প্রতিটি স্তরে পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য বজায় রাখার উপকরণে পরিণত হয়েছে; তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী নারীর নিপীড়ন কোনো আকস্মিক সামাজিক অসংগতি নয়, বরং দীর্ঘকাল ধ’রে গ’ড়ে ওঠা ‘সাংস্কৃতিক কোড’-এর ফল, যেখানে নারীকে জীববৈজ্ঞানিক পার্থক্যকে কেন্দ্র ক’রে ‘দ্বিতীয় সত্তা’ বা ‘অধস্তন সত্তা’ হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছে এবং এই নির্মাণ শুধু পরিবার, সমাজ বা ধর্মেই সীমাবদ্ধ নয়, ভাষার কাঠামোতেও তা উপস্থিত, ফলে নারী সবসময়ই প্রতিনিধিত্বের সংকটে থাক...