শীতের রাতের কুয়াশাটা সেদিন এতই ঘন ছিল যে হাত
বাড়ালে নিজের আঙুলগুলোকেও আবছা দেখাত। উত্তর দিক থেকে আসা হাড়কাঁপানো বাতাস যেন
চামড়া ভেদ করে হাড়ের মজ্জায় গিয়ে বিঁধছিল। ঘড়িতে তখন রাত এগারোটা বেজে পঁয়তাল্লিশ।
ঢাকা শহরের উত্তরার জসীমউদ্দীন অ্যাভিনিউয়ের মোড়ের পুরনো বাসস্ট্যান্ডটি ফাঁকা,
আলো-আঁধারিতে রহস্যময়। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোটা কুয়াশার চাদরে আটকে গিয়ে
এক অদ্ভুত, ভৌতিক পরিবেশ তৈরি করেছে।
তন্ময় দাঁড়িয়ে ছিল শেডের
নিচে, তার পাতলা জ্যাকেটের পকেটে দুই হাত গুঁজে। তার ঠোঁট দুটো ঠান্ডায় হয়ে গেছে,
আর মুখ থেকে বের হওয়া নিঃশ্বাস জমাট বেঁধে ধোঁয়া হয়ে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। শেডের
টিনের চালে শেষ রাতের বৃষ্টির ফোঁটা টুপটাপ শব্দে ঝরে পড়ছে। সে অপেক্ষা করছিল শেষ
বাসটার জন্য। আজকের রাতটা তার জীবনের অন্যতম এক কঠিন রাত। চারুকলা ইনস্টিটিউটের
শেষ বর্ষের ছাত্র তন্ময়, সারা দিন ধরে ক্যানভাসে একটা সঠিক রঙ মেলাতে না পেরে
ভেতরে গভীর এক হতাশা আর শূন্যতা নিয়ে বাড়ি ফিরছিল। চিত্রশিল্পী হিসেবে তার ভবিষ্যৎ
কী, নিজের অস্তিত্বের অর্থ কী, এসব দোলাচলে তার মনটা তছনছ হয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ করেই কুয়াশার ভেতর
থেকে একজোড়া পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। সেই পরিচিত শব্দটা নীরবতাকে চিরে দিয়ে কাছে
আসছিল। তন্ময় চোখ তুলে তাকাল।
কুয়াশার অন্ধকার চিরে
এসে দাঁড়াল একটি মেয়ে। তার পরনে ছিল গাঢ় রঙের একটা চাদর, আর হাতে একটি লাল রঙের
ফোল্ডিং ছাতা। ছাতার কাপড়ে তখনও তাজা বৃষ্টির জল চকচক করছে। মেয়েটির চুলগুলো কিছুটা
ভিজে কোঁকড়া হয়ে কপালে আটকে ছিল। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় তার মায়াবী মুখটা দেখে
তন্ময়ের মনে হলো, এ যেন কোনো শিল্পীর অনেক যত্ন করে আঁকা এক অনন্য ক্যানভাস। বিশেষ
করে মেয়েটির চোখ দুটো এত গভীর, এত তীক্ষ্ণ আর বিষাদময় যে তন্ময় মুহূর্তের জন্য
নিজের নিঃশ্বাস আটকে ফেলল।
মেয়েটি এসে তন্ময়ের ঠিক
পাশে দাঁড়াল। মাঝখানে মাত্র কয়েক ইঞ্চির দূরত্ব। কোনো ভূমিকা নেই, কোনো পূর্বপরিচয়
নেই, অথচ মেয়েটি নিজের হাতের লাল ছাতাটা একটু বাড়িয়ে দিয়ে তন্ময়ের মাথার ওপর ধরল।
সে সময় ছাতা থেকে বৃষ্টির দুটো ফোঁটা তন্ময়ের গালে এসে পড়েছিল, কিন্তু সেই ফোঁটার
চেয়েও বেশি উষ্ণ ছিল মেয়েটির নীরব সান্নিধ্য।
তন্ময় কিছুটা ইতস্তত করে
বলল, আপনার ভিজতে কষ্ট হচ্ছে। আমি একটু সরে দাঁড়াচ্ছি।
মেয়েটি তন্ময়ের দিকে
তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে অদ্ভুত, রহস্যময় হাসি। অত্যন্ত মিষ্টি
অথচ স্পষ্ট কণ্ঠে বলল, ভাগ করে নিলে বৃষ্টিটাও আর একলা ভিজিয়ে দিয়ে যেতে পারে না।
আমি মায়া।
সেই প্রথম কথা। মায়া ,নামটার
মতোই মেয়েটি সেই রাতে তন্ময়ের জীবনে এক মায়াবী ছায়া নিয়ে এসেছিল। বাস সেদিন আর
আসেনি। পুরো রাতটা তারা দুজন সেই শেডের নিচে দাঁড়িয়ে পার করে দিয়েছিল। কথা হয়েছিল
অল্প, কিন্তু নীরবতা কথা বলেছিল অনেক বেশি। তন্ময় জেনেছিল, মায়া কাছেই এক বাড়িতে
থাকে, একটি লিটল ম্যাগাজিনের জন্য কবিতা লেখে আর বিশ্বসাহিত্যের ছাত্রী। আর মায়া
জেনেছিল, তন্ময়ের ভেতরে আঁকালেখার বাইরেও এক গভীর শূন্যতা লুকিয়ে আছে। ভোরের আলো
যখন কুয়াশা চিরে ফুটে উঠল, ততক্ষণে দুজন দু’জনার আত্মার এত কাছাকাছি চলে এসেছে, যা
মানুষ সারা জীবনেও আসতে পারে না।
এরপরের দু'টি বছর ছিল এক
রূপকথার মতো, আবার একই সাথে এক প্রলয়ঙ্করি ঝড়ের মতো। তাদের ভালোবাসার তীব্রতা
সাধারণ কোনো পরিমাপ দিয়ে মাপা যেত না। সেটা ছিল উন্মাদের মতো ভালোবাসা, যেখানে
কোনো হিসাব-নিকাশ ছিল না, ছিল শুধু চরম সমর্পণ।
তন্ময়ের ধানমন্ডির ছোট
স্টুডিও ঘরটা বদলে যেতে শুরু করল। চারপাশের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রং, তুলি আর
ক্যানভাসের মাঝে একটাই মুখ বারবার ফুটে উঠতে লাগল। তন্ময় দিন-রাত এক করে মায়ার ছবি
আকে। মায়ার হাসির আলো, তার চোখের বিষাদ, তার চুলে বাতাসের খেলা, সবকিছু সে তুলে
আনত তেলরঙের আঁচড়ে। চারুকলার প্রদর্শনীতে তন্ময়ের আঁকা মায়ার ছবিগুলো দেখে
শিল্পবোদ্ধারা হতবাক হয়ে যেতেন। একেকটি ছবিতে যেন প্রাণ মেখানো থাকত।
অন্যদিকে, মায়ার কবিতার
খাতা ভরে যেতে লাগল নতুন এক ছন্দে। তার প্রতিটি লাইনে, প্রতিটি রূপকে ফুটে উঠত তন্ময়।
তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিত শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের সিঁড়িতে বসে,
টিএসসির চা দোকানে, কিংবা চন্দ্রিমা উদ্যানের লেকের পাড়ে। বৃষ্টি নামলে তারা দুজনে
বাইকে করে সারা শহর ঘুরে বেড়াত। মায়া পেছন থেকে তন্ময়কে জড়িয়ে ধরে তার পিঠে মুখ
লুকিয়ে রাখত। তন্ময়ের মনে হতো, এই স্পর্শই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য, বাকি সবকিছু
মিথ্যা।
কিন্তু এই গভীর
ভালোবাসার অপর পিঠেই ছিল এক ভয়াবহ তীব্রতা। তাদের মধ্যে ঝগড়াগুলো হতো ঠিক ঝড়ের
মতো। দুজনের ব্যক্তিত্বই ছিল প্রচণ্ড তীব্র। কেউ কারো কাছে এক চুল ছাড় দিতে রাজি
হতো না। সামান্য কোনো বিষয় নিয়ে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়ে যেত, আর মুহূর্তের মধ্যে তা
আগ্নেয়গিরির লাভার মতো বিষিয়ে উঠত। মায়া রেগে গিয়ে তার কবিতার খাতা ছিঁড়ে ফেলত, তন্ময়
আবেগের মাথায় তার আঁকা ক্যানভাসে কালো রং লেপে দিত।
এক রাতের কথা খুব
স্পষ্ট মনে পড়ে। এক প্রদর্শনীতে এক ধনী সংগ্রাহক মায়ার একটি পোট্রেট চড়া দামে
কিনতে চেয়েছিলেন। তন্ময় সেই ছবি বিক্রি করতে রাজি হয়নি, কারণ তার মনে হয়েছিল মায়ার
সেই হাসির রূপটি কেবল তার নিজের, কোনো অর্থের বিনিময়ে তা অন্যের ড্রয়িংরুমে ঝুলতে
পারে না। মায়া এটাকে তন্ময়ের অতিরিক্ত অধিকারবোধ এবং একগুয়েমি ভেবে ভীষণ রেগে
গিয়েছিল।
তুমি আমাকে তোমার
ক্যানভাসে বন্দী করে রাখতে চাও তন্ময়! মায়া চিৎকার করে উঠেছিল, তার চোখে তখন জল আর
ক্রোধের আগুন। তুমি আমাকে মুক্তভাবে ভালোবাসো না, তুমি তোমার নিজের সৃষ্টিকে
ভালোবাসো!
তন্ময় টেবিল চাপড়ে
দাঁড়িয়ে পড়েছিল, তুমি কিচ্ছু বোঝো না মায়া! তোমার ওই হাসির মান আমি বুঝি! তুমি
আমার রক্তে আছো, আমার নিশ্বাসে আছো! তোমাকে অন্য কারো দেওয়া দামে মাপতে গেলে আমার
জীবন ছিঁড়ে যায়!
তাহলে ধ্বংস করে দাও
আমাকে! মায়া স্টুডিওর এক কোণ থেকে কাঁচের ফ্লাওয়ার ভাসটা তুলে নিয়ে দেয়ালে আছড়ে
ভেঙেছিল।
সেই রাতে রক্তে রাঙা
হয়েছিল পরিস্থিতি। কিন্তু সেই ঝগড়া শেষ হওয়ার ঠিক পরেই যখন দুজনের রাগ ভাঙত, তখন
ভালোবাসা নামত এক পরম প্রশান্তি হয়ে, গাড় আর গভীর হয়ে। ভাঙা কাঁচের টুকরোর ওপর
দাঁড়িয়েই তন্ময় মায়াকে বুকে টেনে নিত। মায়া তন্ময়ের বুকে মাথা রেখে হাউহাউ করে
কাঁদত। রক্তাত্ত হাত দিয়ে তন্ময় মায়ার অশ্রু মুছে দিত, আর মায়া নীলের ক্ষতস্থানে
নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিত। ভালোবাসার এই চরম উন্মাদনা তাদের দুজনকে নিঃশ্বাস বন্ধ করা
এক আবর্তের মধ্যে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। তারা দুজনেই জানত, এই ভালোবাসায় হয় তারা দুজন
বেঁচে থাকবে, না হয় একসাথে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।
কিন্তু জীবনের জটিল হিসাবগুলো
সব সময় মানুষের ইচ্ছামতো চলে না। প্রকৃতি হয়তো এত তীব্র ভালোবাসা সহ্য করতে পারে
না।
দু'বছরের বার্ষিকী
উদযাপনের কিছুদিন পর থেকেই মায়ার মধ্যে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল। সে দ্রুত
ক্লান্ত হয়ে পড়ত। কথা বলতে বলতে তার হাঁপ ধরে যেত। যে মেয়েটি বৃষ্টিতে ভিজতে
ভালোবাসত, সে এখন একটু ঠান্ডা লাগলেই বিছানা নিত। প্রথম দিকে তন্ময় ভেবেছিল
অতিরিক্ত পড়াশোনা আর কবিতার কাজের চাপেই হয়তো এমন হচ্ছে। সে মায়াকে জোর করে
বিশ্রাম নিতে বলত, নিজের হাতে স্যুপ বানিয়ে খাওয়াত।
কিন্তু পরিস্থিতি দিন
দিন খারাপ হতে লাগল। একদিন টিএসসিতে বসে চা খাওয়ার সময় মায়াব মুখ হঠাৎ ধপধপে সাদা
হয়ে গেল। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তন্ময়ের কোলের ওপর ঢলে পড়ল। তার মুখ দিয়ে এক
ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে এলো।
তন্ময়ের পৃথিবীটা যেন
মুহূর্তের মধ্যে থমকে গেল। সে মায়াকে পাঁজাকোলা করে ধরে হাসপাতালে নিয়ে গেল। ল্যাব
টেস্ট, বায়োপসি, বড় বড় বিশেষজ্ঞদের বোর্ড, সবকিছু পেরিয়ে যে সত্যিটা সামনে এলো, তা
তন্ময়ের বুকটা এক নিমেষে গুঁড়ো করে দিল। মায়ার মস্তিষ্কে এক অত্যন্ত জটিল এবং
অগ্রসর পর্যায়ের টিউমার ধরা পড়েছে। ডক্টর সেনগুপ, সোজা তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
ওর হাতে সময় খুব কম তন্ময়। হয়তো কয়েক মাস, হয়তো বা কয়েক সপ্তাহ। অপারেশনের সুযোগও
এখন আর নেই।
ডাক্তারের ঘর থেকে বের
হয়ে তন্ময় করিডোরের ঠাণ্ডা দেয়াল ধরে বসে পড়েছিল। সে চিৎকার করে কাঁদতে চেয়েছিল,
কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হয়নি। তার মনে হয়েছিল, ঈশ্বর যদি তার দুটো চোখ
কেড়ে নিতেন, তার হাত দুটো কেটে দিতেন, তবু ভালো হতো, কিন্তু মায়াকে এভাবে তার কাছ
থেকে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে কেন?
ঘটনাটি মায়াকে জানানো
হয়নি, কিন্তু মায়া জানত। নিজের শরীরের ভেতরের ক্ষয় সে নিজেই টের পাচ্ছিল। হাসপাতাল
থেকে ফিরে সে আর কান্না বা হাহাকার করেনি। বরং সে যেন অদ্ভুত এক শান্তিতে স্থির
হয়ে গিয়েছিল। সে তন্ময়ের হাত ধরে বলত, আমাকে নিয়ে কাঁদা বন্ধ করো তন্ময়। যে কটা
দিন আমি আছি, চলো আমরা বেঁচে নিই। জীবনের দৈর্ঘ্য কত বড় তা দিয়ে ভালোবাসাকে মাপা
যায় না, ভালোবাসার গভীরতা দিয়েই জীবনকে মাপতে হয়।
পরের দুটো মাস তন্ময়,
মায়াকে এক মুহূর্তের জন্যও নিজের কাছ থেকে আড়াল করেনি। চারুকলার পড়া, ছবি আঁকা ,সব
বন্ধ করে সে ২৪ ঘণ্টা মায়ার পাশে থাকত। সে মায়াকে নিয়ে শহরের অলিগলি ঘুরে বেড়াত,
মায়ার পছন্দের গানগুলো গিটারে বাজিয়ে শোনাত, মায়াকে হাত ধরে বারান্দায় নিয়ে গিয়ে
রোদে বসিয়ে রাখত। মায়ার চুলগুলো একে একে ঝরে পড়তে শুরু করেছিল, তার সুন্দর গাল
দুটো বসে গিয়েছিল, চোখের নিচে গভীর কালো দাগ পড়েছিল। কিন্তু তন্ময়ের চোখে সে তখনও
পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারী। তন্ময় প্রতিদিন নতুন করে মায়ার পোট্রেট আঁকত, কিন্তু
এবার আর রঙের ক্যানভাসে নয়, পেন্সিলের হালকা স্কেচে সে ধরে রাখছিল মায়ার জীবনের
শেষ আলোটুকুকে।
মায়ার অসুস্থতার শেষ
দিনগুলো কাটে এক হাসপাতালের আইসিইউতে। দিনটি ছিল ১৪ই ডিসেম্বর। ঠিক দু'বছর আগে এই
ডিসেম্বরের কুয়াশাচ্ছন্ন রাতেই তাদের দেখা হয়েছিল বাসস্ট্যান্ডে।
বাইরে মুষলধারে অকাল
বৃষ্টি হচ্ছিল। জানালার কাঁচ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। ঘরের ভেতরে অক্সিজেনের
সিলিন্ডারের ফুসফুস টানার মৃদু শব্দ আর মনিটরের টিক-টিক আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ
ছিল না। মায়া বিছানায় শুয়ে ছিল, সে এতই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে চোখের পাতা তুলতেও
তার কষ্ট হচ্ছিল।
তন্ময় মায়ার বেডের পাশে
একটি ছোট টুলে বসে ছিল। সে মায়ার শুকনো, ফ্যাকাসে হাত দুটি নিজের দুই হাতের মুঠোয়
শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছিল, যেন হাত ছাড়লেই মায়া শূন্যে মিলিয়ে যাবে। তন্ময়ের চোখ
দিয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছিল।
মায়া খুব কষ্টে তার
বুজে আসা চোখ দুটো খুলল। তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটে সেই দু'বছর আগের চেনা,
মায়াবী হাসিটি আবার ফুটে উঠল, যে হাসি দেখে তন্ময় প্রথম দিন প্রেমে পড়েছিল।
মায়া তার কাপাকাপা ডান
হাতটা আস্তে আস্তে তুলে তন্ময়ের গালে রাখল। তার আঙুলের ছোঁয়ায় ছিল পরম মমতা। সে
গলার শেষ শক্তিটুকু এক জায়গায় করে ফিসফিস করে বলল, কেন কাঁদছ তন্ময়? তুমি তো
জানতে... আমাদের ভালোবাসাটা সাধারণ ছিল না। এটা ছিল ঝড়ের মতো আর ঝড় যখন থামে, তখন
চারপাশ শান্ত হয়ে যায়!
না মায়া, তুমি আমাকে
ছেড়ে যেতে পারো না! তন্ময় মায়ার হাতের ওপর মুখ রেখে ফুঁপিয়ে উঠল। তোমাকে ছাড়া আমি
কীভাবে বাঁচব? কার জন্য ছবি আঁকব? এই পৃথিবীটা আমার কাছে শূন্য হয়ে যাবে মায়া।
মায়া মৃদু মাথা নাড়ল।
সে তন্ময়ের চোখের জল নিজের আঙুল দিয়ে মুছে দিল। বলল, আমি কোথাও যাচ্ছি না। তীব্র
ভালোবাসা কখনো মরে যায় না, তা শুধু রূপ বদলে ফেলে। তুমি যখনই কোনো ক্যানভাসে লাল
আর আমার ভালবাসার রং একসাথে মেশাবে, সেখানে আমি থাকব। যখনই শীতের রাতে প্রথম
বৃষ্টির ফোঁটা তোমার গালে পড়বে, জানবে সেটা আমার চুম্বন। আমি থাকব তোমার প্রতিটা
নিঃশ্বাসে, তোমার আঁকা প্রতিটি রঙের গভীরতায়।
মায়ার কথাগুলো আস্তে
আস্তে অস্পষ্ট হয়ে আসছিল। তার মনিটরের হৃৎস্পন্দনের রেখাটি সোজা হতে শুরু করল।
মায়া তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো নিঃশ্বাস নিল, তার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা
জল গড়িয়ে কান বেয়ে বালিশে মিশে গেল।
আমি তোমাকে ভালোবাসি তন্ময়,
চিরকাল একইভাবে। এই শেষ শব্দ দুটো বাতাসের সাথে মিলিয়ে গেল।
মনিটরে এক টানা বিওওওপ শব্দ
বেজে উঠল। মায়ার হাতটা তন্ময়ের মুঠো থেকে শিথিল হয়ে ঢুলে পড়ল বেডের ওপর।
বাইরে তখন বৃষ্টির গতি
আরও অনেক বেশি। তন্ময় চিৎকার করে মায়াকে ডাকতে চেয়েছিল, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো
শব্দ বের হলো না। সে শুধু মায়ার বুকের ওপর নিজের মাথাটা রেখে নিথর হয়ে পড়ে রইল।
ঘরের ভেতরের আলোটা যেন এক মুহূর্তে নিভে গিয়ে এক অসীম অন্ধকারের সৃষ্টি করল। পাঁচ
বছর কেটে গেছে।
ঢাকা শহর অনেক বদলে গেছে। পুরনো জসীমউদ্দীন
অ্যাভিনিউয়ের মোড়টি এখন অনেক বেশি আধুনিক, চারপাশে নতুন নতুন স্কাইস্ক্রেপার
উঠেছে, ঝকঝকে ল্যাম্পপোস্ট বসেছে। কিন্তু সেই পুরনো বাসস্ট্যান্ডের শেডটা এখনও
আগের মতোই রয়ে গেছে, একটু পুরনো, একটু জীর্ণ।
আজও ১৪ই ডিসেম্বর। আকাশে
মেঘ জমেছে, আর উত্তর দিক থেকে ধেয়ে আসছে হাড়কাঁপানো কনকনে শীতের বাতাস। রাত প্রায়
বারোটা বাজে।
বাসস্ট্যান্ডের সেই
শেডের নিচে একাকী দাঁড়িয়ে আছে তন্ময়। তার চুলগুলোতে কিছু পাক ধরেছে, চোখের কোণে
বয়সের ছাপ আর গভীর বিষাদ। সে এখন দেশের একজন অত্যন্ত সফল চিত্রশিল্পী। অনেক
নামডাক, কোন কোন মাসে তার দুটি কি তিনটি প্রদর্শনী হয়। তার একক প্রদর্শনীগুলোতে
মায়ার পোট্রেট দেখে মানুষ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তন্ময় মায়াকে ছাড়া অন্য কাউকে
আর কোনোদিন ভালোবাসেনি, কোনোদিন বিয়েও করেনি। তার জীবনটা এখন কেবল মায়ার স্মৃতির
এক বিশাল সম্ভর।
হঠাৎ করেই শীতের কুয়াশা
ভেদ করে টিপটিপ করে বৃষ্টি নামতে শুরু করল। ঠিক পাঁচ বছর আগের সেই রাতের মতো।
তন্ময় তার হাত থেকে
একটি লাল রঙের ফোল্ডিং ছাতা খুলল। ছাতাটা মায়ার। ছাতাটা নিজের মাথার ওপর ধরে সে
কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তার দিকে তাকাল। তার গালে একটা বৃষ্টির ফোঁটা এসে পড়ল, উষ্ণ,
পরিচিত এক অনুভূতি।
তন্ময় চোখ দুটো বুজল।
তার মনে হলো, কুয়াশার ভেতর থেকে কোন এক শব্দ ভেসে আসছে। তার পাশে যেন কেউ এসে
দাঁড়িয়েছে, তার চাদরের মিষ্টি সুবাস যেন বাতাসে ভাসছে। কেউ যেন তার কানে কানে ফিসফিস
করে বলছে, ‘ভাগ করে নিলে বৃষ্টিটাও আর একলা ভিজিয়ে দিয়ে যেতে পারে না’
তন্ময় চোখ খুলল। পাশে
কেউ নেই, কেবল অঝোর ধারায় ঝরে পড়া শীতের বৃষ্টি আর গাঢ় কুয়াশা। কিন্তু তন্ময়ের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক পরম তৃপ্তির হাসি। সে
জানে, মায়া হারিয়ে যায়নি। মায়া ছড়িয়ে আছে এই শীতল বাতাসে, এই ঝরে পড়া বৃষ্টির
ফোঁটায়, আর তার বুকের ভেতরে জ্বলতে থাকা ভালোবাসার সেই একই রকম তীব্র আগুনে। এই
ভালোবাসা অমর, এই ভালোবাসা ক্ষয়হীন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন