তোমাকে ভালোবাসার পর
আমি আর আগের মানুষটি নেই ,
আমার ভেতরের যে মানুষটি
একদিন খুব হিসেব করে বেঁচে থাকত,
সে এখন প্রতিদিন তোমার নামের কাছে
নিজের সমস্ত যুক্তি রেখে আসে
তোমাকে ভালোবাসার পর
রাত আর শুধু রাত থাকে না,
অন্ধকারের ভেতরেও আমি তোমার মুখের আলো খুঁজি,
জানালার কাচে জমে থাকা শিশিরে
তোমার আঙুলের স্পর্শ কল্পনা করি,
আর দূরের কোনো অচেনা পাখি ডাকলে
মনে হয়, তুমি বুঝি আমাকে ডাকছো
অন্য কোনো শহর থেকে, অন্য কোনো জন্মের ভেতর
থেকে
তোমাকে ভালোবাসার আগে আমি জানতাম না
একটি মানুষের অনুপস্থিতিও এত ভারী হতে পারে।
তুমি পাশে না থাকলে ঘরের চেয়ারগুলোও যেন
আমার দিকে তাকিয়ে থাকে, বিছানার একপাশ
অকারণে শীতল হয়ে যায়, চায়ের কাপের ধোঁয়া
কেমন একা একা ওপরে ওঠে, আর আমার হাত
অভ্যাসবশত তোমাকে খুঁজতে গিয়ে
শূন্যতাকে ছুঁয়ে ফিরে আসে, আমি তখন বুঝি
,
ভালোবাসা আসলে কাছে থাকার নাম নয়,
ভালোবাসা হলো কাউকে না পেয়েও
প্রতিটি মুহূর্তে তাকে পেয়ে যাওয়ার
এক অসম্ভব ব্যাধি, তুমি জানো না,
কতবার তোমাকে না বলেও আমি তোমার সঙ্গে কথা বলেছি।
ভোরের আগে যখন পৃথিবী সবচেয়ে নিঃশব্দ,
আমি তোমার নাম ধরে বলেছি ,
শোনো, তুমি কি এখনও আমাকে ভালোবাসো?
কোনো উত্তর আসেনি, শুধু দূরে কোথাও
একটি ডাহুক ডেকেছে, একটি
ট্রেন চলে গেছে,
কোনো অচেনা জানালায় হঠাৎ আলো জ্বলে উঠেছে।
আমি সেই আলোকে তোমার উত্তর ভেবে
আরেকটু বেঁচে থেকেছি, তোমাকে
আমি
ফুলের মতো ভালোবাসিনি, ফুল তো একদিন ঝরে যায়
তোমাকে ভালোবেসেছি মাটির গভীরে থাকা
একটি শিকড়ের মতো, যাকে দেখা যায় না,
তবু যার ওপর দাঁড়িয়ে একটি সম্পূর্ণ বৃক্ষ
আকাশের দিকে উঠে যায়, তোমাকে ভালোবেসেছি
বর্ষার নদীর মতো, কোনো বাঁধ মানিনি,
কোনো তীরের অনুমতি নিইনি,
নিজের ভাঙনকে নিজেরই উৎসব ভেবেছি
তোমাকে ভালোবেসেছি এমনভাবে
যেন পৃথিবীতে আর কোনো সকাল নেই,
যেন এই রাতের পর সূর্য উঠবে না কখনো,
যেন তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে
শেষবারের মতো আমার সমস্ত জীবন
এক মুহূর্তে শেষ করে দিতে পারি,
তোমার চোখ, আমি কীভাবে বলি তাদের কথা?
সেখানে আমি একটি অদ্ভুত অন্ধকার দেখেছি,
যে অন্ধকার আমাকে ভয় দেখায়নি,
বরং নিজের ভেতরে টেনে নিয়েছে
তোমার চোখের কাছে গিয়ে
আমি আমার সমস্ত অহংকার খুলে রেখেছি,
যে মানুষটি পৃথিবীর সামনে কখনো মাথা নত করেনি,
সে তোমার একটুখানি অভিমানের কাছে
শিশুর মতো অসহায় হয়ে গেছে, তুমি যখন চুপ করে থাকো,
আমি সেই নীরবতারও শব্দ শুনি, তোমার নীরবতার ভেতর
কত কথা জমে থাকে,
কোথায় ছিলে?
আমাকে কি মনে পড়েছিল?
তুমি কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো?
নাকি শুধু একাকিত্বের সময়ে আমাকে প্রয়োজন হয়?
আমি প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিতে চাই,
কিন্তু ভালোবাসার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো ,
সত্যি কথা বলতে গেলেই কণ্ঠ কেঁপে ওঠে,
তাই বলি, হ্যাঁ,
আমি তোমাকে ভালোবাসি
এমন ভালোবাসি যে তোমার সুখের মধ্যে
আমার নিজের নাম না থাকলেও আমি দূর থেকে দাঁড়িয়ে
তোমার হাসির শব্দ শুনতে চাই,
কিন্তু সত্যিটা আরও কঠিন ,
আমি তোমাকে এমনও ভালোবাসি
যে তোমাকে অন্য কারও পাশে দেখলে
আমার ভেতরে একটি সম্পূর্ণ শহর পুড়ে যায়,
আমি স্বীকার করি, আমার প্রেম নিখুঁত নয়
আমার প্রেমের ভেতর
ঈর্ষা আছে, অভিমান আছে,
অধিকারবোধ আছে, অসংখ্য অপ্রকাশিত ভয় আছে
তোমাকে হারানোর ভয়, আমাকে কখনো কখনো
নিজের কাছেই অপরাধী করে তোলে,
আমি জানি, কাউকে ভালোবাসা মানে
তাকে নিজের সম্পত্তি ভাবা নয়
তবু হৃদয় কি সবসময় দর্শনের ভাষা বোঝে?
হৃদয় তো শুধু জানে, তুমি আমার প্রিয়
এই একটি বাক্যের কাছে আমার সমস্ত যুক্তি
প্রতিদিন পরাজিত হয়, তোমার
চুলে হাত রাখার ইচ্ছেটা
আমি কতদিন ধরে আমার আঙুলের ভেতর লুকিয়ে রেখেছি,
তুমি তা হয়তো জানো না, তোমার
কপালের কাছে গিয়ে
একটি দীর্ঘ চুম্বন রেখে চুপ করে থাকার যে স্বপ্ন ,
তার কোনো ভাষা নেই, তোমার পাশে বসে
কোনো কথা না বলে শুধু তোমার শ্বাসের ওঠানামা শোনার
যে আকাঙ্ক্ষা, সেটাও কি প্রেম নয়?
আমি তোমাকে শুধু পেতে চাই না,
আমি তোমার ক্লান্তি হতে চাই, যেখানে তুমি এসে
নিঃশব্দে বসে থাকতে পারবে, আমার সমস্ত ব্যর্থতার পাশে,
তোমার চোখে জল এলে কারণ জিজ্ঞেস করার আগে
তোমার হাতটা ধরতে চাই, তুমি যখন পৃথিবীর কাছে
নিজেকে শক্ত করে তুলবে, আমি তখন তোমার কাছে
এসে
বলতে চাই , আমার কাছে তোমাকে শক্ত হতে হবে না
তুমি কাঁদতে পারো, আমার বুকের ওপর
তোমার সমস্ত দুঃখ রেখে তুমি ঘুমিয়ে পড়তে পারো
আমি জেগে থাকব তোমার ঘুমের ভেতর
যে স্বপ্নগুলো তোমাকে ভয় দেখায়,
আমি তাদের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকব
কারণ ভালোবাসা মানে শুধু
কারও হাসির অংশীদার হওয়া নয়,
ভালোবাসা মানে কারও অন্ধকারেরও পাহারাদার হওয়া,
তুমি যদি একদিন বলো, আমি আর তোমাকে ভালোবাসি না,
আমি হয়তো সেদিন পৃথিবীর সামনে হাসব,
স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করব,
চায়ের কাপ হাতে অন্যদের সঙ্গে কথা বলব
কিন্তু রাতে, নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে
তোমার নামটি একবার খুব আস্তে বলব
তারপর হয়তো, দেয়ালের দিকে তাকিয়ে
অনেকক্ষণ বসে থাকব, কারণ মানুষ
ভালোবাসা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে,
কিন্তু ভালোবাসা মানুষের ভেতর থেকে
সবসময় বেরিয়ে আসে না,
তুমি চলে গেলে
তোমার রেখে যাওয়া জিনিসগুলো
আমি হয়তো সরিয়ে ফেলব ,
ছবিগুলো, পুরোনো কথাগুলো,
তোমার দেওয়া ছোট্ট উপহার,
তোমার নাম লেখা কোনো কাগজ
কিন্তু কীভাবে সরাব, বৃষ্টির শব্দ থেকে
তোমাকে?
কীভাবে সরাব, শীতের সকালে তোমার স্মৃতি?
কীভাবে সরাব, কোনো গানের মাঝখান থেকে
হঠাৎ উঠে আসা তোমার মুখ?
কীভাবে সরাব, আমার নিজের হৃদয় থেকে
সেই মানুষটিকে, যে একদিন
আমার সমস্ত পৃথিবী হয়ে উঠেছিল?
তুমি কি জানো, কিছু মানুষ জীবনে আসে
ঘরের মতো, তারা চলে গেলেও
তাদের অনুপস্থিতি ঘরের দেয়ালে থেকে যায়
তুমিও তেমন, তুমি চলে গেলে
আমি হয়তো অন্য কোথাও থাকব,
অন্য কারও সঙ্গে কথা বলব,
হয়তো আবার হাসবও , কিন্তু আমার ভেতরে
একটি ঘর চিরকাল তোমার জন্য খালি থাকবে
সেখানে কেউ ঢুকবে না,
সেখানে তোমার পুরোনো হাসি থাকবে,
তোমার চোখের জল থাকবে,
তোমার রাগ থাকবে,
তোমার অসমাপ্ত কথাগুলো থাকবে,
আর থাকবে একজন নিঃসঙ্গ মানুষ ,
যে এখনও বিশ্বাস করে তুমি কোনো এক বৃষ্টির সন্ধ্যায়
হঠাৎ ফিরে আসবে
আমি জানি, তুমি হয়তো ফিরবে না
তবু অপেক্ষা করব, কারণ অপেক্ষারও তো
একটি নিজস্ব রঙ আছে, সে জানে না
তার প্রার্থনা পূর্ণ হবে কি না,
তবু সে প্রার্থনা করে, আমিও তেমন
তোমার জন্য আমার এই অপেক্ষা
কোনো প্রতিশ্রুতির ওপর দাঁড়িয়ে নেই
এটি দাঁড়িয়ে আছে শুধু ভালোবাসার ওপর,
আর ভালোবাসা, সে বড় অদ্ভুত
সে মানুষকে ভাঙে, আবার সেই ভাঙা মানুষকেই
নিজের হাতে তুলে নেয়, সে কাঁদায়,
আবার সেই কান্নার মধ্যেই একটি অদ্ভুত সৌন্দর্য রেখে যায়
সে মানুষকে একা করে, আবার সেই একাকিত্বের মধ্যেই
কাউকে সবচেয়ে গভীরভাবে অনুভব করতে শেখায়
তাই তোমাকে হারালেও আমি তোমাকে অভিশাপ
দেব না,
শুধু একদিন নিঃশব্দে আকাশের দিকে তাকিয়ে
বলব ,
যে মানুষটিকে আমি এত ভালোবেসেছিলাম, সে যেন ভালো থাকে
তারপর একটু থেমে খুব আস্তে বলব ,
আর যদি কোনোদিন তার খুব মন খারাপ হয়,
তাকে বলো, একজন মানুষ এখনও তাকে মনে রেখেছে
হ্যাঁ, আমি তোমাকে মনে রাখব, গভীর থেকে বলছি,
যেদিন আমার চুলে শীতের প্রথম সাদা রং
আসবে,
সেদিনও, যেদিন আয়নায়
নিজের চোখের নিচে অসংখ্য ক্লান্তির রেখা দেখব,
সেদিনও, যেদিন শহর বদলে যাবে,
পুরোনো রাস্তা ভেঙে নতুন রাস্তা তৈরি হবে,
সেদিনও, যেদিন আমাদের দেখা হওয়ার
সেই পুরোনো জায়গাটিতে আর কোনো চায়ের দোকান থাকবে না,
সেদিনও,
কারণ মানুষ জায়গা ভুলে যায়,
তারিখ ভুলে যায়, কথাও ভুলে যায় ,
কিন্তু কোনো কোনো মুখ হৃদয়ের এমন এক
জায়গায়
গিয়ে বসে থাকে যেখান থেকে তাকে
মৃত্যুও সরাতে পারে না,
তুমি সেই মুখ, তুমি আমার
অপূর্ণতার সবচেয়ে সুন্দর নাম
আমার সমস্ত কবিতার অলিখিত প্রথম পঙ্ক্তি
আমার সমস্ত রাতের অদৃশ্য চাঁদ
আমার সমস্ত একাকিত্বের গোপন ঠিকানা
তোমার কাছে আমি কিছুই চাই না,
শুধু যদি কখনো আমার কথা মনে পড়ে,
তাহলে একবার চোখ বন্ধ করো
হয়তো অনুভব করবে, দূরে কোথাও
একজন মানুষ এখনও তোমাকে ভালোবাসছে
সে হয়তো তোমার কাছে নেই,
তোমার হাত ধরতে পারছে না,
তোমার চোখের জল মুছতে পারছে না,
তোমার কপালে চুমু দিতে পারছে না ,
তবু সে আছে, তোমার বুকের ভিতর
তার হৃদয়ের সবচেয়ে নির্জন ঘরে
তুমি এখনও জেগে আছো আর যদি কোনোদিন
জীবন তোমাকে খুব ক্লান্ত করে দেয়,
যদি পৃথিবী তোমার দিকে সব দরজা বন্ধ করে দেয়,
যদি মনে হয় তোমাকে বোঝার মতো
কেউ আর নেই, তাহলে ফিরে এসো
আমি কোনো প্রশ্ন করব না!
কোথায় ছিলে,
কেন গেলে,
কার সঙ্গে ছিলে,
কেন আমাকে ভুলে গেলে ,
কিছুই জিজ্ঞেস করব না, প্রতিজ্ঞা করছি
শুধু দরজা খুলে বলব ,
এসো, আমার ভিতর
তুমি হয়তো অবাক হয়ে বলবে ,
এতদিন পরেও?
আমি তখন হাসব
আর বলব, ভালোবাসা যদি সত্যি হয়,
তাহলে সময় শুধু দূরত্ব বাড়ায়,
অপেক্ষা নয়, তারপর তোমাকে পাশে বসিয়ে
এক কাপ চা বানাব, জানালার বাইরে
হয়তো তখন অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামবে,
শহরের বাতিগুলো জলের ভেতর কেঁপে উঠবে
নিঃসঙ্গ ভাবে,
তুমি চুপ করে থাকবে, আমিও কিছু বলব না
শুধু তোমার হাতের ওপর আমার হাতটা রাখব
আর মনে মনে বলব, এই তো জীবন
এতদিনের সমস্ত কষ্ট, সমস্ত অভিমান,
সমস্ত অপেক্ষা, সমস্ত হারিয়ে যাওয়া রাত
,
সবকিছুর শেষে আমি আবার তোমার পাশে বসে
আছি,
তখন হয়তো বুঝব, কিছু প্রেমের কোনো শেষ নেই
কিছু দূরত্বের শেষ হয় না, মৃত্যুতেও শেষ হয় না
তারা শুধু মানুষের শরীর ছেড়ে স্মৃতির
ভেতর চলে যায়
আর স্মৃতি, সে তো মৃত্যুরও ওপারে
একটি দীর্ঘ নদী,
সেই নদীর ধারে আমি একদিন দাঁড়িয়ে থাকব
বয়স তখন অনেক হয়ে যাবে, হাত কাঁপবে,
চোখ ঝাপসা হবে, শ্বাস নিতে কষ্ট হবে
তবু নদীর ওপারে যদি তোমার কোনো ছায়া দেখি,
আমি হয়তো আবার সেই যুবকের মতো
তোমার দিকে ছুটে যাব, যে একদিন
তোমাকে প্রথম দেখেছিল আর বুঝতেই পারেনি
একটি মানুষকে দেখা কীভাবে একটি সম্পূর্ণ জীবনকে
বদলে দিতে পারে,
তুমি ছিলে আমার সেই পরিবর্তন।
তুমি ছিলে আমার সমস্ত অস্থিরতার শান্তি,
সমস্ত অন্ধকারের আলো, সমস্ত পরাজয়ের পর
শেষ আশ্রয়,
আর তাই ,
যদি আমাকে কখনো জিজ্ঞেস করা হয়,
তুমি জীবনে সবচেয়ে বেশি
কী চেয়েছিলে?
আমি কোনো সম্পদ, কোনো সাফল্য,
কোনো শহর, কোনো রাজত্বের নাম বলব না।
শুধু বলব, আমি একজন মানুষকে
এত গভীরভাবে ভালোবাসতে চেয়েছিলাম
যে তার অনুপস্থিতিতেও
সে আমার ভেতরে বেঁচে থাকবে !
আমি পেরেছি, কারণ তুমি এখনও আছো
আমার রক্তে, আমার নিঃশ্বাসে,
আমার ঘুমহীন রাতে, আমার একাকী বিকেলে,
আমার অসমাপ্ত কবিতায়, আমার বুকের গভীরতম
ব্যথায় ,
তুমি আছো, আর যতদিন
আমার ভেতরে একটি হৃদস্পন্দন থাকবে,
ততদিন এই পৃথিবীর কোনো শক্তি
আমাকে তোমাকে ভালোবাসা থেকে
বিরত রাখতে পারবে না,
কারণ, আমি তোমাকে ভালোবাসিনি শুধু !
আমি তোমার মধ্যে আমার একটি জীবন রেখে
এসেছি
আর মানুষ নিজের জীবন থেকে
কখনো ফিরে আসে না,
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন