সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

যে ঘরে আয়না ছিল না- গল্প

 

সন্ধ্যার পর শহরটিকে নিলয়ের প্রায়ই এমন একটি মানুষের মতো মনে হতো, যে সারাদিন অন্যের সঙ্গে কথা বলে বাড়ি ফিরে নিজের মুখের দিকে তাকাতে ভয় পায়। দিনের আলোয় তার ব্যস্ততা ছিল, পরিচিত মানুষ ছিল, প্রকাশকের ফোন ছিল, সাহিত্যসভায় যাওয়ার আমন্ত্রণ ছিল, এমনকি এমন কয়েকজন তরুণ লেখকও ছিল যারা তাকে গুরু বলে সম্বোধন করত; অথচ সন্ধ্যা নামলে সমস্ত পরিচয়ের নিচ থেকে একটি অদ্ভুত শূন্যতা বেরিয়ে আসত, যেন তার জীবনটি বাইরে থেকে যতটা সুসংহত, ভেতরে ততটাই অগোছালো। সেদিনও সে লেখার টেবিলে বসেছিল। জানালার বাইরে শীতের শেষ দিকের বাতাসে কৃষ্ণচূড়ার শুকনো পাতাগুলো নড়ছিল, দূরের একটি বাড়ির ছাদে কাপড় শুকোতে দেওয়া, আর রাস্তার মোড়ে বাদামওয়ালা লোকটি তার টিনের কৌটায় বারবার হাত ঢুকিয়ে বাদাম ভাজছিল। নিলয়ের সামনে সাদা কাগজ, কালো কলম, পাশে এক কাপ ঠান্ডা চা। প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে সে একটি বাক্য লিখতে চেষ্টা করছিল। বাক্যটি ছিল ,‘মানুষ তার ভালোবাসার মানুষটিকে যতটা চেনে, তার চেয়ে বেশি চেনে নিজের ভালোবাসার প্রয়োজনটিকে।’ প্রথমে বাক্যটি তার ভালো লেগেছিল। পরে মনে হলো, কথাটি খুব বেশি স্পষ্ট, যেন কোনো প্রবন্ধের উপসংহার। সে চেয়েছিল এমন একটি বাক্য, যার অর্থ পাঠক একবারে বুঝতে পারবে না, অথচ অনেকক্ষণ পরেও ভুলতে পারবে না। কিন্তু যতবার সে শব্দ সাজাচ্ছিল, ততবার মনে হচ্ছিল, সে জীবনের কথা লিখছে না, জীবনের ওপর নিজের বুদ্ধিমত্তার একটি পর্দা টানছে। লেখকের এই অসুখটি সে বহুদিন ধরে জানত। কোনো দুঃখ ঘটলে প্রথমে তার কষ্ট হতো, তারপর সে কষ্টটিকে বুঝতে চাইত, তারপর বুঝতে চাওয়ার ভেতর থেকে একটি সুন্দর বাক্য তৈরি করার লোভ জন্মাত। শেষ পর্যন্ত এমনও হয়েছে, যে মানুষটি তার জীবনে সত্যিকারভাবে কষ্টের কারণ হয়েছে, সেই মানুষটির কাছেই সে একদিন নিজের লেখা পড়ে শুনিয়েছে, আর মানুষটি তার দুঃখের সাহিত্যিক সৌন্দর্যের প্রশংসা করেছে। নিলয় তখন আনন্দ পেয়েছে। পরে একা হয়ে বুঝেছে, সে হয়তো কষ্ট থেকে মুক্তি পায়নি, কষ্টের ওপর নিজের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করেছে মাত্র। তার বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে। মেঘলার সঙ্গে বিবাহের সাত বছর। প্রথম পরিচয়ের সময় তাদের বয়স কম ছিল, পৃথিবীকে বদলে ফেলার মতো কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল না, কিন্তু দুজনেরই মনে হয়েছিল, নিজেদের একাকিত্বকে পাশাপাশি রাখলে তার আকৃতি বদলে যাবে। মেঘলা তখন একটি ছোট প্রকাশনা সংস্থায় সম্পাদনার কাজ করত। সে কবিতা লিখত না, গল্পও নয়; মাঝে মাঝে ডায়েরিতে কিছু বাক্য লিখে রাখত, যেগুলোকে সাহিত্য বলে দাবি করার কোনো আগ্রহ তার ছিল না। নিলয়ের  কাছে এই অনাগ্রহ আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল। তার মনে হয়েছিল, মেঘলা এমন একজন নারী, যে সাহিত্যের কাছে নিজের জীবনকে সমর্পণ করবে না, অথচ সাহিত্যকে বুঝতে পারবে। পরে সে বুঝেছিল, মেঘলাএই বৈশিষ্ট্যটির মধ্যেই তার আকর্ষণের পাশাপাশি তার ভয়ও লুকিয়ে ছিল। যে মানুষ সাহিত্যকে জীবনের চেয়ে বড় বলে মানে না, সে একদিন সাহিত্যিকের অহংকারকেও জীবনের চেয়ে বড় বলে মেনে নেবে না। কিন্তু প্রেমের শুরুতে মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ বিপদের লক্ষণগুলোকে চরিত্রের সৌন্দর্য বলে ভুল করে। মেঘলা দরজা খুলে ঘরে ঢুকল রাত দশটা বত্রিশে। নিলয় ঘড়ির দিকে তাকিয়েছিল, যদিও সে তখনও জানত না যে সময়টি তার মনে থেকে যাবে। মেঘলা হাতে একটি কালো ব্যাগ, অন্য হাতে ভাঁজ করা ছাতা। বাইরে বৃষ্টি হয়নি, কিন্তু বিকেলে হয়েছিল বলে ছাতার কাপড় ভেজা। সে ছাতাটি বারান্দায় রেখে জুতো খুলল, তারপর কোনো কথা না বলে বাথরুমে চলে গেল। নিলয় প্রথমে অপেক্ষা করল, তারপর বলল, ‘আজ এত দেরি হলো কেন?’ বাথরুমের ভেতর থেকে উত্তর এল, ‘কাজ ছিল।’ ‘কী কাজ?’ ‘অফিসের।’ নিলয় কলম নামিয়ে রাখল। এই সংক্ষিপ্ত কথোপকথন তাকে বিরক্ত করল, কারণ এর মধ্যে এমন একটি দেয়াল ছিল, যেটি সে নিজে তৈরি করেনি বলে বিশ্বাস করতে চাইছিল। অথচ তার মনে পড়ল, গত সপ্তাহে মেঘলা যখন তার অফিসের একটি সমস্যার কথা বলতে শুরু করেছিল, সে তখন নিজের নতুন গল্পের একটি চরিত্র নিয়ে এতটাই উত্তেজিত ছিল যে মেঘলা বাক্যের মাঝখানে বলেছিল, ‘এক মিনিট, একটা কথা মনে এসেছে।’ তারপর সে প্রায় পঁচিশ মিনিট ধরে নিজের গল্পের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে কথা বলেছিল। মেঘলা শেষ পর্যন্ত আর তার অফিসের কথায় ফিরে যায়নি। নিলয় ঘটনাটি মনে করতে পারল, কিন্তু তখনও তার মনে হলো, দুটি ঘটনা এক নয়। নিজের কথায় ডুবে যাওয়া আর অন্যের কাছ থেকে কথা গোপন করা নিশ্চয়ই একই অপরাধ নয়। মানুষ নিজের ভুলকে আলাদা শ্রেণিতে সাজাতে ভালোবাসে; তাতে ভুলগুলোকে সহ্য করা সহজ হয়। মেঘলা পোশাক বদলে আয়নার সামনে দাঁড়াল। আয়নাটি তাদের বিয়ের পর কেনা। কাঠের ফ্রেমে সামান্য খোদাই, নিচের কোণে একটি পুরোনো দাগ, কাচের ওপর সময়ের অস্পষ্ট ছোপ। মেঘলা চুল আঁচড়াচ্ছিল, আর নিলয়তার দিকে তাকিয়ে ছিল। একসময় এই তাকিয়ে থাকার মধ্যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, বিস্ময় ছিল, এমনকি মেঘলার মুখের অতি সামান্য পরিবর্তনেও তার মনে হতো, সে যেন কোনো অদেখা ভাষা শিখছে। এখন তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে বুঝতে পারছিল না, কী দেখতে চাইছে। মেঘলার মুখে ক্লান্তি ছিল, কিন্তু সেই ক্লান্তির কারণ সে জানত না। ঠোঁটে কোনো প্রসাধন ছিল না, চোখের নিচে সামান্য কালচে ছায়া। সে কি অসুস্থ? কোনো সমস্যায় আছে? নাকি কেবল নিজের জীবনের এমন একটি অংশে প্রবেশ করেছে, যেখানে নিলয়ের  উপস্থিতি প্রয়োজনীয় নয়? এই শেষ সম্ভাবনাটি তার কাছে অসহনীয় মনে হলো। ‘আগামী মাসে তুমি কোথাও যাচ্ছ?’ সে জিজ্ঞাসা করল। মেঘলা আয়নায় তার দিকে তাকাল। ‘হ্যাঁ।’ ‘কোথায়?’ ‘শান্তিনিকেতন।’ ‘কেন?’ ‘একটি সম্পাদনার প্রকল্প পেয়েছি।’ ‘কত দিনের?’ ‘প্রথমে দুই সপ্তাহ। তারপর প্রয়োজন হলে আরও থাকতে পারি।’ নিলয়ের  মনে হলো, কথাগুলো সে যেন কোনো সহকর্মীকে বলছে, স্বামীকে নয়। সে বলল, ‘আমাকে আগে জানালে না কেন?’ মেঘলা চুলের ক্লিপটি খুলে আবার লাগাল। ‘আজ বললাম তো।’ ‘আজ বলার মানে কী? সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বললে না কেন?’ ‘কারণ সিদ্ধান্তটা আমার কাজ নিয়ে।’ নিলয় কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। কথাটি খুব সাধারণ, কিন্তু তার মধ্যে এমন একটি স্বাধীনতার দাবি ছিল, যা নিলয়ের  পরিচিত দাম্পত্যের সঙ্গে মেলানো কঠিন। সে নিজেকে আধুনিক মানুষ বলে জানে। সে বিশ্বাস করে, স্ত্রী কোনো সম্পত্তি নয়, বিবাহ কোনো কারাগার নয়, ভালোবাসার মধ্যে স্বাধীনতা থাকা উচিত। কিন্তু স্বাধীনতা যখন একটি ধারণা না থেকে তার নিজের জীবনে বাস্তব ঘটনা হয়ে ওঠে, তখন তার শরীরের ভেতরে যে অস্বস্তি তৈরি হয়, তার ব্যাখ্যা সে দিতে পারে না। সে বুঝতে পারছিল, মেঘলা তার অনুমতি চাইছে না। আর এই অনুমতি না চাওয়ার মধ্যে এমন কোনো অন্যায় নেই, যেটি সে যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে পারবে। ফলে সে যুক্তির বদলে বিরক্তিকে আশ্রয় করল। ‘তুমি আজকাল সবকিছু নিজের মতো করে ঠিক করছ।’ মেঘলা বলল, ‘আগেও করতাম। শুধু তোমাকে জানাতাম, তুমি যেন মনে করতে পারো, সিদ্ধান্তে তোমারও অংশ আছে।’ নিলয় তার দিকে তাকিয়ে রইল। কথাটির মধ্যে নিষ্ঠুরতা ছিল, কিন্তু সেই নিষ্ঠুরতার একটি অংশ নিলয়ের  নিজের কাছেও পরিচিত। তাদের বিবাহের প্রথম দিকে মেঘলা অনেক সিদ্ধান্ত তার সঙ্গে আলোচনা করত। কোথায় চাকরি করবে, কোন বই কিনবে, কোন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করবে, এমনকি কোনো একটি বাক্য কীভাবে সম্পাদনা করা যায় ,এসব বিষয়েও তার মতামত চাইত। নিলয় ভেবেছিল, সে একজন বিশ্বস্ত সঙ্গী। পরে সে লক্ষ করেনি, মতামত চাওয়া কখনো কখনো অভ্যাস হয়ে যায়, আর অভ্যাসের মধ্যে ধীরে ধীরে অধিকার জন্ম নেয়। মেঘলা যখন নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে শুরু করল, তখন নিলয়ের  মনে হলো, সে বদলে গেছে। হয়তো বদলায়নি। হয়তো তার আগের নির্ভরশীলতার মধ্যেই স্বাধীনতার একটি বীজ ছিল, যেটি নিলয় দেখতে পায়নি। রাতের খাবার তারা একসঙ্গে খেল, কিন্তু কথাবার্তা হলো না। নিলয় প্লেটে হাত রেখে বসে রইল। তার মনে পড়ল, একসময় মেঘলা খাওয়ার টেবিলে গল্প করত। অফিসের কোনো সহকর্মীর অদ্ভুত আচরণ, বাসে দেখা কোনো বৃদ্ধার মুখ, বইয়ের দোকানে শোনা কোনো কথোপকথন ,সবকিছুই তার কাছে গল্প হয়ে উঠত। নিলয় মন দিয়ে শুনত, অন্তত সে তাই মনে করত। এখন সে সন্দেহ করল, হয়তো শুনত না; বরং তার নিজের কথার ফাঁকে যতটুকু সময় পাওয়া যেত, ততটুকু সময় মেঘলাকে দিত। মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতা সবসময় নিজের প্রশংসা চায় না। কখনো কখনো সে কেবল অন্যের জীবনকে নিজের জীবনের বিরতিতে জায়গা দেয়। রাত এগারোটার দিকে নিলয় শোবার ঘরে গেল। মেঘলা বই পড়ছিল। বিছানার পাশে হলুদ আলো জ্বলছে। বইটির মলাট সে চিনতে পারল না। ‘কী পড়ছ?’ মেঘলা বই বন্ধ করল না। ‘একটা উপন্যাস।’ ‘কার?’ ‘একজন নতুন লেখকের।’ নিলয়ের  মনে ঈর্ষার মতো কিছু একটা জেগে উঠল। ‘নতুন লেখক? কেমন লিখছে?’ মেঘলা এবার বই বন্ধ করল। ‘ভালো।’ ‘কী ভালো?’ ‘সে এমন মানুষদের নিয়ে লিখেছে, যাদের সে পুরোপুরি বোঝে না। কিন্তু না-বোঝাটাকে লুকিয়ে রাখেনি।’ নিলয়ের মুখ শক্ত হয়ে গেল। সে বুঝল, কথাটি তার উদ্দেশেই বলা। অথচ মেঘলা তার দিকে তাকিয়ে হাসল না, কোনো তির্যক মন্তব্যও করল না। সেই অনুপস্থিত বিদ্রূপ নিলয়কে আরও অস্বস্তিতে ফেলল। সে বলল, ‘তুমি কি মনে করো, আমি মানুষকে বুঝি না?’ মেঘলা বইটি টেবিলে রাখল। ‘আমি মনে করি, তুমি মানুষকে বোঝার আগে তাদের ব্যাখ্যা করতে শুরু করো।’ নিলয় কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু মেঘলা তাকে থামিয়ে দিল না, বরং অপেক্ষা করল। তার এই অপেক্ষা নিলয়ের  কাছে অপরিচিত। আগে সে আপত্তি করলে মেঘলা পাল্টা যুক্তি দিত, রাগ করত, কখনো কেঁদেও ফেলত। এখন সে যেন নিলয়ের উত্তর শোনার প্রয়োজনটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। ‘তুমি কি অন্য কাউকে ভালোবাসো?’ নিলয় হঠাৎ প্রশ্ন করল। প্রশ্নটি করার আগে সে নিজেকে বোঝাতে পারেনি কেন করছে। হয়তো সে একটি নির্দিষ্ট কারণ চেয়েছিল, যাতে মেঘলার আচরণকে একটি পরিচিত অপরাধের মধ্যে ফেলা যায়। বিশ্বাসঘাতকতা থাকলে রাগ করা যায়, অভিযোগ করা যায়, এমনকি বিচ্ছেদও একটি নৈতিক ব্যাখ্যা পায়। কিন্তু যদি কোনো অপরাধ না থাকে, যদি শুধু একজন মানুষ আরেকজন মানুষের সঙ্গে থাকতে থাকতে বুঝতে পারে যে সে নিজের জীবনকে অন্যের প্রত্যাশার মধ্যে হারিয়ে ফেলেছে, তাহলে তার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা যায়? মেঘলা দীর্ঘক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল। ‘তুমি কি সত্যিই উত্তরটা জানতে চাও?’ নিলয় বলল, ‘হ্যাঁ।’ ‘নাকি তুমি চাও আমি এমন একটা উত্তর দিই, যেটা তোমার কষ্টের একটা কারণ তৈরি করবে?’ নিলয় চুপ করে গেল। মেঘলা বলল, ‘আমি একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলি। তার নাম কৌশিক। সে আমার অফিসের পরিচিত ছিল। এখন আমরা মাঝে মাঝে দেখা করি।’ ‘কতদিন ধরে?’ ‘প্রায় আট মাস।’ আট মাস। নিলয়ের মনে হলো, ঘরের সবকিছু হঠাৎ নতুন অর্থ পেয়ে গেছে। গত শীতে মেঘলা যে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতে দেরি করেছিল, যে শুক্রবার বলেছিল অফিসের কাজ আছে, যে রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ ফোনে কথা বলেছিল, প্রতিটি ঘটনাই যেন একটি অদৃশ্য সূত্রে বাঁধা পড়ল। সে জানত না এই সূত্রগুলো সত্যিই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত কি না, কিন্তু তার মস্তিষ্ক ইতিমধ্যে তাদের একটি কাহিনি বানিয়ে ফেলেছে। সে জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমাদের মধ্যে কী আছে?’ মেঘলা বলল, ‘আমি জানি না।’ নিলয় প্রায় চিৎকার করে উঠল, ‘আট মাস ধরে একজন মানুষের সঙ্গে দেখা করছ, অথচ জানো না তোমাদের মধ্যে কী আছে?’ মেঘলা এবার রেগে গেল। ‘তুমি কি প্রত্যেকটি অনুভূতির একটা নাম চাও? ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, আকর্ষণ, কামনা, একাকিত্ব ,এগুলো আলাদা আলাদা বাক্সে রেখে তারপর ঠিক করবে কোনটার জন্য কতটা রাগ করতে হবে? আমি কৌশিককে দেখলে ভালো বোধ করি। তার সঙ্গে কথা বলতে আমার ভালো লাগে। কখনো তাকে দেখতে ইচ্ছে করে। কখনো তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মনে হয়, আমি এমন কিছু বলছি, যা তোমাকে বলতে পারতাম না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমি তাকে বিয়ে করতে চাই, অথবা তোমাকে ছেড়ে তার কাছে চলে যাব। আমি জানি না ভবিষ্যতে কী হবে। আমি শুধু জানি, তার সঙ্গে কথা বলার সময় আমাকে নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে হয় না।’ নিলয় বলল, ‘আমার সঙ্গে তোমার এমন হয় কেন?’ মেঘলা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল, ‘কারণ তুমি আমার কথা শোনো, কিন্তু তুমি একই সঙ্গে আমার কথার অর্থও ঠিক করে দাও। আমি যদি বলি, আমি ক্লান্ত, তুমি বলো, তুমি আসলে নিজের কাজ নিয়ে অসন্তুষ্ট। আমি যদি বলি, আমার কোনো কিছু ভালো লাগছে না, তুমি বলো, এটা বয়সের একটা পর্যায়। আমি যদি বলি, তোমার কোনো কথা আমাকে আঘাত করেছে, তুমি বোঝাও, তোমার উদ্দেশ্য আঘাত করা ছিল না। যেন আমার অনুভূতির সত্যতা তোমার ব্যাখ্যার অনুমোদন না পেলে সম্পূর্ণ হয় না।’ নিলয় বলল, ‘আমি কি তোমার অনুভূতিকে অস্বীকার করেছি?’ মেঘলা বলল, ‘সবসময় নয়। কিন্তু তুমি সবসময়ই তার চেয়ে বেশি কিছু করতে চেয়েছ। তুমি আমাকে বুঝতে চাও, অথচ আমাকে আমার নিজের কাছে রেখে দিতে পারো না।’ কথাটি নিলয়ের মনে দীর্ঘক্ষণ প্রতিধ্বনিত হলো। সে জানত, তার মধ্যে এই প্রবণতা আছে। সে মানুষের আচরণের কারণ খুঁজতে ভালোবাসে। কেউ রেগে গেলে সে তার শৈশব নিয়ে ভাবে, কেউ চুপ করে থাকলে তার মানসিক গঠন নিয়ে, কেউ চলে গেলে তার স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। এই বিশ্লেষণ তাকে বুদ্ধিমান বলে পরিচিত করেছে। কিন্তু মেঘলার কথায় সে প্রথমবার বুঝল, বোঝার আকাঙ্ক্ষাও কখনো কখনো ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা হতে পারে। যে মানুষ অন্যের অনুভূতির ব্যাখ্যা দেয়, সে অজান্তেই সেই অনুভূতির ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। সে বলল, ‘তাহলে তুমি কী চাও?’ মেঘলা উত্তর দিল, ‘আমি চাই, তুমি আমাকে এমন একজন মানুষ হিসেবে দেখো, যার জীবনের সব অর্থ তোমাকে ঘিরে তৈরি হয়নি।’ তারপর সে বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। নিলয় অনেকক্ষণ জেগে ছিল। তার মনে হচ্ছিল, সে একটি বিবাহের মধ্যে আছে, অথচ সেই বিবাহের নিয়মগুলো সে কখনো সত্যিকারভাবে জানত না। সে মেঘলাকে হারানোর ভয় পাচ্ছিল, কিন্তু সেই ভয়টির মধ্যে ভালোবাসা কতখানি, অভ্যাস কতখানি, সামাজিক অপমানের আশঙ্কা কতখানি, আর নিজের জীবনের গল্পের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর আতঙ্ক কতখানি তা আলাদা করতে পারছিল না। রাতের শেষদিকে তার ঘুম এল। স্বপ্নে সে দেখল, একটি দীর্ঘ করিডরের শেষে মেঘলা দাঁড়িয়ে আছে। করিডরের দুই পাশে অসংখ্য দরজা, প্রতিটি দরজায় একটি করে আয়না। মেঘলা তাকে ডাকছে না, পালিয়েও যাচ্ছে না। সে শুধু দাঁড়িয়ে আছে, আর নিলয় একেকটি দরজার সামনে গিয়ে নিজের মুখ দেখতে পাচ্ছে। কোনো মুখ তরুণ, কোনো মুখ বৃদ্ধ, কোনো মুখে ক্রোধ, কোনো মুখে অসহায়তা। কিন্তু কোনো আয়নাতেই মেঘলামুখ নেই। ঘুম ভাঙার পর স্বপ্নটি তার মনে রইল। সে জানত, স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা খুব সহজ; বিশেষত নিজের স্বপ্নের। তাই সে ব্যাখ্যা করতে চাইল না। সকালে মেঘলা চা বানিয়েছিল। নিলয় রান্নাঘরে গিয়ে দেখল, তার জন্য একটি কাপ রাখা আছে। সে কাপটি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। মেঘলা অন্য একটি কাপ ধুচ্ছিল। এই সামান্য ঘটনাটি তাকে অদ্ভুতভাবে স্পর্শ করল। এতকিছুর পরও মেঘলা তার জন্য চা বানিয়েছে। এর অর্থ কি সে এখনও তাকে ভালোবাসে? নাকি সাত বছরের অভ্যাসে হাত নিজে থেকেই কাজটি করেছে? নাকি ভালোবাসা ও অভ্যাসের মধ্যে এমন কোনো স্পষ্ট সীমানা নেই, যা নিলয় এতদিন ধরে কল্পনা করে এসেছে? সে প্রশ্নটি করল না। চা খেতে খেতে মেঘলা জানাল, সে পরের সপ্তাহে শান্তিনিকেতনে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করবে। নিলয় বলল, ‘তুমি চাইলে যেতে পারো।’ কথাটি বলার পর সে বুঝতে পারল, বাক্যটির মধ্যে অনুমতি দেওয়ার ভঙ্গি আছে। সে দ্রুত যোগ করল, ‘মানে, সিদ্ধান্তটা তোমার।’ মেঘলা তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি জানি।’ এই দুটি শব্দের মধ্যে কোনো কৃতজ্ঞতা ছিল না। নিলয়ের মনে হলো, সে এমন একটি উদারতা প্রদর্শন করেছে, যার জন্য অন্যজনের কাছ থেকে ধন্যবাদ পাওয়ার আশা সে গোপনে করে রেখেছিল। দুপুরে নিলয় তার বন্ধু অর্কের সঙ্গে দেখা করতে গেল। অর্ক বিশ্ববিদ্যালয়জীবন থেকে তার বন্ধু, এখন একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করে। নিলয় তাকে সব কথা বলল না, কিন্তু যথেষ্ট বলল যাতে অর্ক পরিস্থিতিটি বুঝতে পারে। অর্ক মন দিয়ে শুনে বলল, ‘তুই কী চাস?’ নিলয় বলল, ‘আমি চাই ও ফিরে আসুক।’ অর্ক বলল, ‘ও কোথায় গেছে?’ ‘মানসিকভাবে, বুঝলি।’ অর্ক হাসল না। সে বলল, ‘তাহলে তুই চাইছিস, ও যেন আবার তোর মতো করে ভাবে।’ নিলয় প্রতিবাদ করল, ‘আমি কি ওকে বদলাতে বলেছি?’ অর্ক বলল, ‘না। তুই শুধু চাইছিস, ওর বদলটা যেন তোর জন্য সমস্যা না হয়।’ কথাটি শুনে নিলয়ের  রাগ হলো। বন্ধুদের কাছ থেকে মানুষ সাধারণত সমর্থন চায়, সত্য নয়। বিশেষ করে যখন নিজের জীবনের সংকট নিয়ে কথা বলে, তখন সে চায় কেউ তার যন্ত্রণাকে স্বীকৃতি দিক, তার ভুলগুলোকে নয়। নিলয় বলল, ‘তুই ব্যাপারটা খুব সহজ করে দেখছিস।’ অর্ক উত্তর দিল, ‘হতে পারে। কিন্তু তোর একটা সমস্যা আছে। তুই সবকিছুকে এত জটিল করে ভাবিস যে, শেষ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তের দায় নিতে হয় না।’ নিলয় উঠে দাঁড়াতে চেয়েছিল, কিন্তু বসে রইল। অর্ক বলল, ‘তুই কি মেঘলাকে ভালোবাসিস?’ ‘ভালোবাসি।’ ‘ওকে স্বাধীন মানুষ হিসেবে ভালোবাসিস, নাকি তোর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হিসেবে?’ নিলয় বলল, ‘দুটো কি আলাদা?’ অর্ক বলল, ‘সবসময় নয়। কিন্তু কখনো কখনো একজন মানুষকে নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ বানাতে গিয়ে আমরা তাকে এত বড় জায়গায় বসাই যে, সে আর স্বাভাবিক মানুষ থাকতে পারে না। তার ভুল করার অধিকার থাকে না, অন্য কাউকে পছন্দ করার অধিকার থাকে না, এমনকি আমাদের ছেড়ে যাওয়ার অধিকারও থাকে না। তখন ভালোবাসা একটা সুন্দর কারাগার হয়ে যায়।’ নিলয় এই কথাটি পছন্দ করল না। হয়তো কথাটি ভুল বলে নয়, বরং তার নিজের চিন্তার সঙ্গে খুব বেশি মিলে যাচ্ছিল বলে। সে বাড়ি ফিরল সন্ধ্যার আগে। ঘরে ঢুকে দেখল, মেঘলা আলমারি থেকে বই নামাচ্ছে। বিছানার ওপর কয়েকটি বইয়ের স্তূপ, পাশে একটি খোলা স্যুটকেস। এই দৃশ্যটি তাকে এমনভাবে আঘাত করল, যেন কোনো অদৃশ্য সিদ্ধান্ত হঠাৎ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। সে বলল, ‘তুমি কি সত্যিই চলে যাচ্ছ?’ মেঘলা বই হাতে থেমে গেল। ‘হ্যাঁ।’ ‘আমাদের মধ্যে যা হয়েছে, তার কোনো সমাধান নেই?’ মেঘলা বলল, ‘সমাধান বলতে তুমি কী বোঝো?’ ‘আমরা আবার চেষ্টা করতে পারি।’ ‘কিসের চেষ্টা?’ ‘আমাদের সম্পর্কটা বাঁচানোর।’ মেঘলা বইটি স্যুটকেসে রাখল। ‘তুমি কি সম্পর্কটা বাঁচাতে চাও, নাকি তুমি চাও না তোমার জীবনটা ব্যর্থ বলে মনে হোক?’ নিলয়ের মুখে রক্ত উঠে গেল। ‘তুমি কি মনে করো, আমি শুধু নিজের কথা ভাবি?’ মেঘলা বলল, ‘না। আমি মনে করি, তুমি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো। কিন্তু তুমি নিজের ভালোবাসার ধারণাটিকেও ভালোবাসো। তুমি চাও, আমাদের সম্পর্ক এমন একটি গল্প হোক, যেখানে সব ভুল বোঝাবুঝির পরও দুজন মানুষ একে অপরকে বেছে নেয়। তুমি চাও, আমি ফিরে এসে বলি, এতদিন দূরে থেকে বুঝেছি, তোমার মতো কেউ নেই। তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরবে, আমরা কাঁদব, তারপর তুমি এই অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখবে। হয়তো বইটির নাম দেবে ‘ফিরে আসার আগে’। মানুষ পড়বে, বলবে কী গভীর প্রেম! কিন্তু আমি যদি ফিরে এসে বলি, আমি তোমাকে ভালোবাসি, তবু তোমার সঙ্গে থাকতে পারছি না, তাহলে তুমি কী করবে?’ নিলয় কোনো উত্তর দিতে পারল না। কারণ মেঘলা তার এমন একটি গোপন ইচ্ছাকে প্রকাশ করে দিয়েছে, যেটি সে নিজেও নিজের কাছে স্বীকার করেনি। সে সত্যিই চেয়েছিল, এই সংকটের একটি সুন্দর পরিণতি হোক। সে চেয়েছিল, তাদের বিচ্ছেদ যদি ঘটেও, তবে সেই বিচ্ছেদ যেন এমন কিছু জন্ম দেয়, যার মধ্যে তার নিজের জীবনের ব্যর্থতা শিল্পের সাফল্যে রূপান্তরিত হতে পারে। একজন লেখকের পক্ষে এটি অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু একজন স্বামীর পক্ষে এটি কতখানি ন্যায্য? সে বলল, ‘তুমি আমাকে খুব নিষ্ঠুরভাবে বিচার করছ।’ মেঘলা উত্তর দিল, ‘হয়তো। আমিও তোমাকে ব্যবহার করেছি।’ নিলয় অবাক হয়ে তাকাল। মেঘলা এবার বিছানায় বসে পড়ল। ‘তুমি কি মনে করো, আমি সবসময় তোমার সঙ্গে ছিলাম শুধু তোমাকে ভালোবাসতাম বলে? না। তোমার পরিচিতি আমাকে নিরাপত্তা দিয়েছে। তোমার বন্ধুদের সঙ্গে মিশে আমার ভালো লাগত। তুমি যখন আমার লেখা বা সম্পাদনার প্রশংসা করতে, তখন নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হতো। তোমার সাফল্যের অংশ হতে পেরে আমি গর্ব অনুভব করতাম। কখনো কখনো তোমার পরিচয়ের আড়ালে নিজের অনিশ্চয়তা লুকিয়েছি। আমি তোমাকে শুধু ভালোবাসিনি, তোমাকে ব্যবহারও করেছি। তোমার কাছ থেকে যে সম্মান পেয়েছি, তার ওপর নিজের আত্মসম্মানের একটি অংশ দাঁড় করিয়েছি। তুমি যখন আমাকে বুঝতে পারোনি, আমি শুধু কষ্ট পাইনি; আমি রাগও করেছি, কারণ আমি ভেবেছিলাম, এত বছর তোমার পাশে থাকার বিনিময়ে তুমি আমাকে বুঝতে বাধ্য।’ সে একটু থামল। ‘তাহলে বলো, আমাদের মধ্যে কে বেশি অপরাধী?’ নিলয় বুঝতে পারল, প্রশ্নটির কোনো উত্তর নেই। মেঘলা তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে এক মুহূর্তে মুক্তি দেয়নি; বরং নিজের অপরাধ স্বীকার করে তাকে আরও কঠিন জায়গায় নিয়ে গেছে। যদি মেঘলা শুধু অভিযোগ করত, তাহলে নিলয় আত্মপক্ষসমর্থন করতে পারত। যদি সে নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ বলত, নিলয় তার কথার দুর্বলতা খুঁজে বের করতে পারত। কিন্তু মেঘলা নিজের স্বার্থপরতাও স্বীকার করায় নিলয়ের  আর কোনো সহজ অবস্থান রইল না। সে বলল, ‘তাহলে কৌশিকের ব্যাপারটা কী?’ মেঘলা বলল, ‘কৌশিক আমাকে উদ্ধার করতে আসেনি। সে আমার জীবনের সমস্যার সমাধানও নয়। তার সঙ্গে থাকলে আমার ভালো লাগে, কিন্তু আমি জানি না, সেই ভালো লাগা কোথায় গিয়ে শেষ হবে। আমি যদি তার কাছে চলে যাই, তাতেও হয়তো কিছুদিন পর আমাদের মধ্যে একই সমস্যা তৈরি হবে। হয়তো সে-ও আমাকে নিজের মতো করে বুঝতে চাইবে, হয়তো আমিও তার কাছ থেকে এমন কিছু আশা করব, যা কোনো মানুষ দিতে পারে না। আমি তাকে নিয়ে কোনো রোমান্টিক সিদ্ধান্ত নিইনি। আমি শুধু নিজের জীবনে একটি জায়গা তৈরি করেছি, যেখানে আমি এখনও নিশ্চিত নই।’ নিলয় বলল, ‘তাহলে তুমি আমাদের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ না জেনেই চলে যাচ্ছ?’ মেঘলা বলল, ‘হ্যাঁ। কারণ আমি থাকতে থাকতে বুঝেছি, শুধু ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য বর্তমানকে মিথ্যা বলা যায় না।’ কথাটি বলার পর সে আবার বই গোছাতে শুরু করল। নিলয় ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় দাঁড়াল। তার মনে হলো, সে যেন কোনো আদালতে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বিচারক নেই, আইন নেই, এমনকি কোনো নির্দিষ্ট অপরাধও নেই; শুধু দুটি মানুষ নিজেদের অসম্পূর্ণতা নিয়ে পরস্পরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের কেউই সম্পূর্ণ নির্দোষ নয়, কিন্তু সেই কারণে কারও কষ্ট কম সত্যি হয়ে যায় না। সন্ধ্যার আলো নিভে আসছিল। দূরে একটি বাসের হর্ন শোনা গেল। নিলয়ের মনে পড়ল, বিয়ের প্রথম বছরে মেঘলা একদিন বলেছিল, ‘আমরা যদি কোনোদিন আলাদা হয়ে যাই, তুমি কি আমাকে নিয়ে গল্প লিখবে?’ সে তখন হেসে বলেছিল, ‘অবশ্যই। তুমি তো আমার জীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় চরিত্র।’ মেঘলাও হেসেছিল, কিন্তু পরে বলেছিল, ‘আমি চাই না, আমার জীবন তোমার গল্পে সুন্দর হয়ে উঠুক, যদি আমার জীবনে সেটা সুন্দর না হয়।’ নিলয় কথাটিকে তখন রসিকতা ভেবেছিল। এখন সে বুঝতে পারল, মেঘলা হয়তো অনেক আগেই তাকে নিজের ভয়টি জানিয়েছিল। সে শুনেছিল, কিন্তু কথাটির গুরুত্ব বোঝেনি। কারণ সে ভেবেছিল, শিল্পের মধ্যে সবকিছু সুন্দর হয়ে উঠতে পারে। সে জানত না, শিল্পের সৌন্দর্য কখনো কখনো জীবনের ওপর আরেকটি অন্যায়। সেই রাতে মেঘলা আলাদা ঘরে ঘুমাল। নিলয় নিজের ঘরে শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। সে ভাবল, আগামীকাল সকালে সে কী করবে। মেঘলাকে অনুরোধ করবে? কৌশিকের সঙ্গে দেখা করবে? তাদের বন্ধুবান্ধবকে কিছু জানাবে? নাকি একেবারেই নীরব থাকবে? প্রতিটি সম্ভাবনার মধ্যে নিজের অহংকারের একটি আলাদা মুখ সে দেখতে পেল। অনুরোধ করলে সে নিজের ভালোবাসার কথা বলবে, কিন্তু সেই ভালোবাসার সঙ্গে নিজের প্রয়োজনও জড়িয়ে থাকবে। কৌশিকের সঙ্গে দেখা করলে সে নিজের আঘাতকে ন্যায়বিচারের ভাষা দিতে চাইবে। বন্ধুদের জানালে সে তাদের কাছ থেকে সমর্থন চাইবে, যেন নিজের সিদ্ধান্তকে সামাজিক অনুমোদন দিয়ে শক্ত করতে পারে। আর নীরব থাকলে হয়তো সে উদার মানুষের পরিচয় রক্ষা করবে, যদিও সেই নীরবতার নিচে ক্ষোভ জমে থাকবে। সে বুঝতে পারল, কোনো পথই সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ নয়। মানুষের সিদ্ধান্তের মধ্যে উদ্দেশ্য মিশে থাকে, আর উদ্দেশ্যকে যতই পরীক্ষা করা হোক, তার গভীরে আরেকটি উদ্দেশ্য বেরিয়ে আসে। ভোরের দিকে সে ঘুমিয়ে পড়ল। সকালে উঠে দেখল, মেঘলা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে কফি বানাচ্ছে। নিলয়ের জন্যও একটি কাপ রাখা। সে কাপটি হাতে নিয়ে বলল, ‘তুমি কি আজই যাচ্ছ?’ মেঘলা বলল, ‘আগামীকাল সকালে।’ নিলয়ের বুকের ভেতর একটি স্বস্তি জন্ম নিল, তারপর সঙ্গে সঙ্গে সেই স্বস্তির জন্য তার লজ্জা হলো। আরও একদিন সময় আছে। সে কী করবে? মেঘলা কি তার জন্য একদিন বেশি থাকছে, নাকি যাত্রার প্রস্তুতি শেষ হয়নি? নিলয় তা জানত না। সে কফি নিয়ে টেবিলে বসল। কিছুক্ষণ পর বলল, ‘আমি চাই না তুমি আমার জন্য কোনো সিদ্ধান্ত নাও।’ মেঘলা তার দিকে তাকাল। ‘তুমি কি সত্যিই তা চাও?’ নিলয় বলল, ‘আমি চেষ্টা করতে চাই।’ মেঘলা বলল, ‘এটা আলাদা কথা।’ নিলয় মাথা নিচু করল। সে জানত, মেঘলা ঠিক বলেছে। চাওয়া আর চেষ্টা করা এক নয়। চেষ্টা করার মধ্যে ব্যর্থতার সম্ভাবনা থাকে, আর সেই সম্ভাবনাকে মেনে নেওয়াই হয়তো পরিবর্তনের প্রথম শর্ত। সে বলল, ‘আমি জানি না, কীভাবে তোমাকে ভালোবাসব, যাতে তোমাকে নিজের মতো করে থাকতে দিতে পারি। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি, এতদিন আমি তোমাকে বুঝতে চাওয়ার নামে তোমার জীবনের ওপর আমার ব্যাখ্যা চাপিয়ে দিয়েছি।’ মেঘলা কোনো উত্তর দিল না। নিলয় বলল, ‘আমি তোমাকে ফিরে আসতে বলতে চাই। কিন্তু আমি জানি না, সেই চাওয়াটা কতটা ভালোবাসা, কতটা ভয়। তাই আজ তোমাকে কিছু বলছি না।’ মেঘলা কাপটি নামিয়ে রাখল। ‘তুমি আমাকে কিছু না বললেও তোমার চাওয়া বদলে যাবে না।’ ‘জানি।’ ‘তাহলে?’ নিলয় দীর্ঘক্ষণ ভেবে বলল, ‘তাহলে আমাকে সেই চাওয়ার সঙ্গে থাকতে শিখতে হবে।’ মেঘলা এবার প্রথমবারের মতো একটু নরম হলো। কিন্তু সেই কোমলতা নিলয়কে আশ্বস্ত করল না। কারণ সে জানত, একটি সৎ কথোপকথন বহু বছরের অভ্যাসকে মুছে দিতে পারে না। মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করলেই অন্য মানুষটি তাকে আবার বিশ্বাস করতে বাধ্য নয়। ক্ষমা কোনো পুরস্কার নয়, যা আত্মসমালোচনার বিনিময়ে পাওয়া যায়। মেঘলা বলল, ‘আমি তোমার এই কথাগুলো শুনতে চেয়েছিলাম। কিন্তু শুধু শুনলেই হবে না। তোমাকে এমনভাবে বাঁচতে হবে, যাতে কথাগুলো তোমার নিজের কাছেও সত্যি থাকে।’ নিলয় মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। সে জানত, এর কোনো তাৎক্ষণিক প্রমাণ নেই। পরের দিন মেঘলা চলে গেল। সকালে আকাশ পরিষ্কার ছিল। সে একটি নীল শাড়ি পরেছিল, কাঁধে ব্যাগ, হাতে স্যুটকেস। দরজার কাছে এসে একবার ঘরের দিকে তাকাল। নিলয় ভাবল, সে হয়তো কিছু বলবে, হয়তো তাকে জড়িয়ে ধরবে। কিন্তু মেঘলা শুধু বলল, ‘গাছগুলোতে পানি দিও। বিশেষ করে জানালার পাশের মানিপ্ল্যান্টটা।’ নিলয় বলল, ‘দেব।’ মেঘলা চলে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ খুব সামান্য, প্রায় শোনা যায় না। অথচ নিলয়ের মনে হলো, ঘরের ভেতরে একটি দীর্ঘ করিডর তৈরি হয়েছে, যার শেষ দেখা যায় না। সে দরজার কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর জানালার পাশের মানিপ্ল্যান্টে পানি দিতে গেল। গাছটির কয়েকটি পাতা হলুদ হয়ে গেছে। সে আগে কখনো লক্ষ করেনি। মেঘলা প্রতিদিন পানি দিত কি না, সে জানত না। সে শুধু জানত, গাছটি এতদিন বেঁচে ছিল। একটি সম্পর্কের মতোই, হয়তো যত্ন পেয়েছে, হয়তো অভ্যাসের কারণে টিকে থেকেছে, হয়তো দুই-ই। গাছের শুকনো পাতাগুলো সরাতে গিয়ে নিলয় দেখল, মাটির ভেতর একটি ছোট্ট নতুন পাতা বেরিয়েছে। সে হাত বাড়িয়ে পাতাটি ছুঁতে গিয়েও থেমে গেল। তার মনে হলো, নতুন পাতা দেখে আশার গল্প তৈরি করা খুব সহজ। কিন্তু গাছটির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সে কিছুই জানে না। হয়তো এটি বেঁচে থাকবে, হয়তো শুকিয়ে যাবে। তাকে পানি দেওয়া তার কাজ; ফলাফল নির্ধারণ করা নয়। এই সামান্য উপলব্ধি তাকে কিছুটা শান্ত করল, যদিও সে জানত না, সেই শান্তি কতক্ষণ থাকবে। প্রথম কয়েক দিন নিলয় নিয়মিত মেঘলাকে ফোন করেনি। সে নিজের কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করল। সকালে কলেজে যেত, বিকেলে বাড়ি ফিরত, রাতে লিখতে বসত। কিন্তু তার লেখার ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলো। সে কোনো চরিত্রের আচরণকে সহজে ব্যাখ্যা করতে পারছিল না। আগে সে জানত, একটি চরিত্র কেন ভালোবাসে, কেন বিশ্বাসঘাতকতা করে, কেন চলে যায়। এখন সে বুঝতে পারছিল, মানুষ নিজের কারণও সবসময় জানে না। কোনো নারী হয়তো স্বামীকে ভালোবাসে, তবু তার কাছ থেকে দূরে থাকতে চায়। কোনো পুরুষ হয়তো স্ত্রীকে স্বাধীনতা দিতে চায়, তবু তার স্বাধীনতার বাস্তব রূপ দেখে ঈর্ষান্বিত হয়। কোনো সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে, অথচ তার মধ্যে ভালোবাসার সত্যতা মিথ্যা হয়ে যায় না। আবার ভালোবাসা সত্যি হলেই সম্পর্ক টিকে থাকবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই। এই জটিলতাগুলোকে সে আগে তত্ত্ব হিসেবে জানত; এখন সেগুলো তার দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার অংশ। একদিন একটি সাহিত্যসভায় তাকে প্রেমের ওপর বক্তৃতা দিতে বলা হলো। সে আগে থেকেই একটি বক্তৃতা লিখে রেখেছিল ,ভালোবাসা, স্বাধীনতা, আধুনিক সম্পর্ক, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য নিয়ে কিছু সুন্দর বাক্য। মঞ্চে উঠে কাগজ খুলে সে দেখল, বাক্যগুলো তার কাছে কৃত্রিম মনে হচ্ছে। সে কাগজ ভাঁজ করে রেখে বলল, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে ভেবেছি, প্রেম সম্পর্কে আমার কিছু বলার আছে। এখন বুঝতে পারছি, আমি আসলে প্রেম সম্পর্কে অনেক কথা জানি, কিন্তু সেই জ্ঞান আমাকে সবসময় ভালো প্রেমিক করেনি।’ হলঘরে নীরবতা নেমে এল। সে বলল, ‘আমরা প্রায়ই বলি, ভালোবাসার মানুষকে স্বাধীনতা দিতে হয়। কথাটি শুনতে খুব সুন্দর। কিন্তু সেই স্বাধীনতার ফলে যদি মানুষটি এমন একটি জীবন বেছে নেয়, যেখানে আমাদের প্রয়োজন নেই, তখন আমরা কি একই কথা বলতে পারি? আমি জানি না। আমি শুধু বুঝতে পারছি, স্বাধীনতাকে সমর্থন করা সহজ, যখন তার ফলাফল আমাদের পছন্দমতো হয়। কঠিন হলো, যখন সেই স্বাধীনতা আমাদের নিজের জীবনকে বদলে দেয়।’ বক্তৃতা শেষ হলে কয়েকজন তার কাছে এসে প্রশংসা করল। কেউ বলল, কথাগুলো গভীর, কেউ বলল, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে এসেছে বলে এত সত্যি মনে হয়েছে। নিলয় হাসল, কিন্তু তার ভেতরে আনন্দ হলো না। সে বুঝতে পারছিল, মানুষের ব্যক্তিগত যন্ত্রণা অন্য মানুষের কাছে জ্ঞান হয়ে উঠতে পারে। এতে কোনো অন্যায় নেই; কিন্তু যন্ত্রণার মধ্যে থাকা মানুষটি যদি সেই জ্ঞানকে নিজের মুক্তির প্রমাণ মনে করে, তবে সে হয়তো আবার নিজের সঙ্গে প্রতারণা করছে। সেদিন রাতে মেঘলাকে একটি বার্তা লিখল ,‘আজ প্রেম নিয়ে কথা বলেছি। মনে হলো, আমি যা বলছি, তার সবকিছু এখনও শিখিনি।’ অনেকক্ষণ পরে মেঘলা উত্তর দিল, ‘শেখা শেষ হয়ে গেছে মনে করলেই বিপদ।’ নিলয় বার্তাটি বারবার পড়ল। উত্তরটির মধ্যে কোনো আবেগপ্রবণতা ছিল না, কিন্তু তাতে তাদের পুরোনো পরিচিত বুদ্ধির ঝিলিক ছিল। সে বুঝতে পারল, মেঘলা এখনও তার সঙ্গে কথা বলতে পারে। কিন্তু কথা বলতে পারা মানে ফিরে আসতে চাওয়া নয়। এই পার্থক্যটি মেনে নেওয়া তার জন্য কঠিন ছিল। সে নিজেকে বারবার বোঝাল, যোগাযোগ বজায় রাখা ভালো, কিন্তু তার ভেতরে একটি গোপন প্রত্যাশা ছিল, মেঘলা একদিন বুঝবে, সে বদলাচ্ছে, তারপর ফিরে আসবে। প্রত্যাশাটি জন্ম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সে নিজের ওপর রাগ করত। কিন্তু রাগ করলেই প্রত্যাশা দূর হতো না। বরং সে যত বেশি নিজেকে উদার প্রমাণ করতে চাইত, তত বেশি সে মেঘলার সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে থাকত। এক মাস পরে সে শান্তিনিকেতনে গেল। যাওয়ার আগে মেঘলাকে জানায়নি, কারণ সে জানত না, তার যাওয়াটা দেখা করার ইচ্ছা, নাকি নিজের অস্থিরতা কমানোর চেষ্টা। সে একটি সাহিত্যিক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিল, কিন্তু অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর শহরের ছোট রাস্তাগুলো দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হলো, সে আসলে মেঘলাকে দেখতে এসেছে। বিকেলের আলো তখন লালচে, গাছের ছায়া মাটির ওপর লম্বা হয়ে পড়েছে। একটি চায়ের দোকানে বসে সে মেঘলাকে ফোন করল। মেঘলা ফোন ধরল। ‘তুমি এখানে?’ তার কণ্ঠে বিস্ময় ছিল, কিন্তু বিরক্তি ছিল কি না বোঝা গেল না। নিলয় বলল, ‘একটা অনুষ্ঠানে এসেছি।’ ‘কোথায়?’ সে জায়গার নাম বলল। মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘আমি কাছেই আছি।’ তারা দেখা করার সিদ্ধান্ত নিল। একটি পুরোনো বাড়ির সামনে, যেখানে লাল মাটির পথ এসে শেষ হয়েছে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে। মেঘলাকে দেখে নিলয়ের  মনে হলো, সে বদলে গেছে। তার চুল সামান্য ছোট, মুখে আগের চেয়ে কম ক্লান্তি, হাঁটার ভঙ্গিতে একটি নতুন নিশ্চিন্ততা। কিন্তু হয়তো বদলটি মেঘলার মধ্যে নয়; নিলয়ের  দেখার মধ্যে। সে এখন মেঘলাকে এমন একজন মানুষ হিসেবে দেখতে চেষ্টা করছে, যার প্রতিটি পরিবর্তন তার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। তারা পাশাপাশি হাঁটল। প্রথমে কাজের কথা, শহরের কথা, পরিচিত মানুষের কথা হলো। তারপর মেঘলা জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি কেমন আছ?’ নিলয় বলতে চাইল, ভালো নেই। কিন্তু কথাটি বললে মেঘলার ওপর আবার নিজের কষ্টের দায়িত্ব চাপানো হবে কি না, সে ভেবে থেমে গেল। সে বলল, ‘কখনো ভালো, কখনো খারাপ। তোমাকে না দেখে দিন কাটাতে শিখছি।’ মেঘলা বলল, ‘আমিও তোমাকে মিস করি।’ নিলয়ের বুকের মধ্যে হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল। সে দ্রুত সেই আলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইল, কিন্তু ততক্ষণে তার মুখে আনন্দের ছাপ পড়ে গেছে। মেঘলা তা লক্ষ করল। ‘তুমি কি ভাবছ, আমি ফিরে আসতে চাইছি?’ নিলয় লজ্জা পেল। ‘হয়তো।’ মেঘলা বলল, ‘আমি তোমাকে মিস করি, কারণ তুমি আমার জীবনের অংশ। তোমার সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি আছে, অনেক অভ্যাস আছে, অনেক ভালোবাসাও আছে। কিন্তু তোমাকে মিস করা আর তোমার সঙ্গে আবার থাকতে চাওয়া এক নয়।’ নিলয় মাথা নেড়ে বলল, ‘জানি।’ কিন্তু সে জানত না। অন্তত তার শরীর জানত না। তার মনে হলো, মেঘলা যদি তাকে মিস করে, তবে সম্পর্কটির মধ্যে এখনও কিছু বাকি আছে। সে সেই অবশিষ্টাংশকে ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি হিসেবে ধরতে চাইছিল। মানুষ যখন কাউকে হারানোর ভয় পায়, তখন সামান্য কোমলতাকেও ফিরে আসার সংকেত বলে মনে করে। তারা একটি ছোট রেস্তোরাঁয় বসে চা খেল। মেঘলা বলল, কৌশিকের সঙ্গে তার সম্পর্ক এখনও স্পষ্ট নয়। তারা একে অপরকে পছন্দ করে, কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। নিলয়ের  ঈর্ষা হলো, তবু সে প্রশ্ন করল না। মেঘলা নিজেই বলল, ‘তুমি নিশ্চয়ই জানতে চাও, তার সঙ্গে আমার শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে কি না।’ নিলয়ের মুখ গরম হয়ে উঠল। সে বলল, ‘আমি জানি না, জানতে চাই কি না।’ মেঘলা বলল, ‘আমি তোমাকে মিথ্যা বলব না। হ্যাঁ, হয়েছে।’ কথাটি শুনে নিলয়ের মনে হলো, তার চারপাশের শব্দগুলো দূরে সরে গেছে। সে মেঘলার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে পড়ল, এই মুখের ওপর সে কতবার হাত রেখেছে, কতবার চুমু খেয়েছে, কতবার ঘুমন্ত অবস্থায় দেখেছে। সে কখনো কল্পনা করেনি, এই মুখ অন্য একজন মানুষের এত কাছে থাকবে। তার ভেতরে রাগ, অপমান, দুঃখ এবং এমন এক ধরনের শারীরিক ঈর্ষা জন্ম নিল, যার সঙ্গে তার আধুনিক চিন্তার কোনো সম্পর্ক নেই। সে বলতে চাইল, তুমি কীভাবে পারলে? কিন্তু প্রশ্নটির মধ্যে এমন একটি দাবি ছিল, যা সে আর করতে চায় না বলে নিজেকে বোঝাচ্ছিল। মেঘলা তার নীরবতা দেখে বলল, ‘তুমি চাইলে আমাকে ঘৃণা করতে পারো। আমি তোমাকে এটা বোঝাতে চাই না যে, আমার সিদ্ধান্তে তোমার কষ্ট পাওয়ার কোনো কারণ নেই। তোমার কষ্ট সত্যি। কিন্তু সেই কষ্টের কারণে আমার সিদ্ধান্ত মিথ্যা হয়ে যায় না।’ নিলয় বলল, ‘তুমি কি তাকে ভালোবাসো?’ মেঘলা উত্তর দিল, ‘আমি জানি না। তার সঙ্গে আমার আকর্ষণ আছে, ভালো লাগা আছে। কখনো মনে হয়, আমি তাকে ভালোবাসি। আবার কখনো মনে হয়, আমি এমন একটি জায়গা খুঁজছিলাম, যেখানে আমার জীবনকে নতুন করে অনুভব করতে পারি। আমি জানি না, এই অনুভূতির কতটা তার জন্য, কতটা আমার নিজের জন্য।’ নিলয়ের মনে হলো, এই উত্তরটি তার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। সে একটি স্পষ্ট সত্য চেয়েছিল, মেঘলা তাকে আর ভালোবাসে না, অথবা কৌশিককে ভালোবাসে। তাহলে তার রাগের একটি নির্দিষ্ট ঠিকানা থাকত। কিন্তু মেঘলা এমন একটি জটিল সত্য বলছে, যেখানে সে নিজেও নিশ্চিত নয়। নিলয় বুঝতে পারল, সে শুধু মেঘলার স্বাধীনতা নয়, তার অনুভূতির ওপরও একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞা আরোপ করতে চায়। সে বলল, ‘তাহলে আমাদের সাত বছরের সম্পর্কের মানে কী?’ মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘সেটা কি আজকের সিদ্ধান্ত দিয়ে মুছে যায়? আমি তোমাকে ভালোবেসেছি। তোমার সঙ্গে সুখীও হয়েছি। তোমার সঙ্গে অসুখীও হয়েছি। তোমার কাছ থেকে অনেক কিছু পেয়েছি, অনেক কিছু হারিয়েছি। তুমি আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। কিন্তু এই সত্যগুলো থেকে এমন কোনো নিয়ম তৈরি হয় না যে, আমাকে তোমার সঙ্গেই থাকতে হবে।’ নিলয় বলল, ‘তাহলে ভালোবাসার কোনো নিশ্চয়তা নেই।’ মেঘলা বলল, ‘ছিল কবে?’ তারা আর বেশি কথা বলল না। ফেরার সময় মেঘলা তাকে জড়িয়ে ধরল। আলিঙ্গনটি দীর্ঘ ছিল না, কিন্তু তাতে এমন একটি পরিচিত উষ্ণতা ছিল, যা নিলয়ের সমস্ত যুক্তিকে মুহূর্তের জন্য অসহায় করে দিল। সে মেঘলার কাঁধে মুখ রাখতে চাইল, কিন্তু নিজেকে সামলে নিল। মেঘলা তাকে ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘নিজের যত্ন নিও।’ তারপর চলে গেল। নিলয় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, এই আলিঙ্গন কি বিদায়, নাকি সম্পর্কের এমন একটি রূপ, যার জন্য সে প্রস্তুত নয়? সে জানত না। কিন্তু এবার সে সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য মেঘলাকে অনুসরণ করল না। সে শহরের দিকে ফিরে গেল, আর পথে যেতে যেতে বুঝতে পারল, কাউকে ভালোবাসা থেকে মুক্তি পাওয়া মানে তাকে আর ভালো না বাসা নয়। কখনো কখনো তার অর্থ, নিজের ভালোবাসার দাবি থেকে অন্য মানুষটিকে মুক্ত করা, অথচ সেই মুক্তির ব্যথা নিজের শরীরে বহন করা। বাড়ি ফিরে সে লেখার টেবিলে বসে নতুন একটি গল্প শুরু করল। প্রথম লাইন লিখল, ‘একজন মানুষ তার স্ত্রীকে হারিয়েছিল, কিন্তু হারানোর আগে সে বুঝতে পারেনি যে স্ত্রীটি কখনো পুরোপুরি তার ছিল না।’ বাক্যটি পড়ে তার মনে হলো, এখানে এখনও একটি সমস্যা আছে। ‘তার স্ত্রী’ কথাটির মধ্যে মালিকানার একটি সূক্ষ্ম ছায়া রয়ে গেছে। সে বাক্যটি মুছে লিখল, ‘একজন মানুষ এমন একজন নারীকে ভালোবেসেছিল, যার জীবন তার ভালোবাসার মধ্যে সম্পূর্ণ হয়ে উঠত না।’ এবারও সে সন্তুষ্ট হলো না। কারণ বাক্যটি যেন মেঘলাকে তার ধারণার মধ্যে আটকে ফেলছে। সে কাগজটি সরিয়ে রাখল। অনেকক্ষণ পরে নতুন পাতায় লিখল, ‘সে জানত না, অন্য মানুষটির জীবন কোথায় শেষ হয় আর তার নিজের কল্পনা কোথায় শুরু হয়।’ এই বাক্যটির দিকে তাকিয়ে সে আর কিছু লিখল না। কয়েক মাস কেটে গেল। মেঘলা মাঝে মাঝে ফোন করত, কখনো নিলয় করত। তাদের কথাবার্তা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলো, কিন্তু সেই স্বাভাবিকতার ভেতরে একটি নতুন দূরত্ব রয়ে গেল। তারা একে অপরের খবর নিত, কাজের কথা বলত, কোনো বই ভালো লাগলে জানাত। তবু নিলয় জানত, তাদের সম্পর্ক আগের অবস্থায় নেই। কখনো কখনো সে ভাবত, হয়তো এই দূরত্বই তাদের নতুন সম্পর্কের ভিত্তি হতে পারে। আবার কোনো দিন মনে হতো, সে শুধু বিচ্ছেদের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। মানুষ সবকিছুর সঙ্গে অভ্যস্ত হতে পারে, এমনকি নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতির সঙ্গেও। কিন্তু অভ্যস্ত হয়ে ওঠা মানে কি সেই ক্ষতি অতিক্রম করা? নাকি ক্ষতটি শরীরের অংশ হয়ে গেছে বলে আর আলাদা করে বোঝা যায় না? একদিন মেঘলা তাকে জানাল, সে ঢাকায় আসছে। কয়েক দিনের কাজ আছে। তারা দেখা করল একটি পুরোনো বইয়ের দোকানের সামনে, যেখানে তাদের পরিচয়ের প্রথম দিকে প্রায়ই যেত। দোকানটি বদলে গেছে। আগের মালিক নেই, কাঠের তাকগুলো নতুন করে রং করা, দরজার পাশে কাচের ভেতর নতুন বই সাজানো। মেঘলা একটি বই হাতে নিয়ে বলল, ‘মনে আছে, এখানে তুমি একবার বলেছিলে, মানুষের জীবনে এমন একটি বই থাকা উচিত, যা সে কখনো শেষ করবে না?’ নিলয় হেসে বলল, ‘আমি এমন অনেক কথাই বলতাম।’ মেঘলা বলল, ‘এখনও বলো?’ নিলয় একটু ভেবে বলল, ‘এখন বলার আগে ভাবি, কথাটা সত্যি কি না।’ মেঘলা হাসল। সেই হাসিতে পুরোনো দিনের কিছুটা ফিরে এল, কিন্তু পুরোটা নয়। তারা চা খেতে গেল। মেঘলা জানাল, কৌশিকের সঙ্গে তার সম্পর্ক শেষ হয়েছে। কথাটি বলার সময় তার মুখে বিশেষ কোনো দুঃখ ছিল না। নিলয়ের মনে এক মুহূর্তের জন্য আনন্দ হলো, তারপর সে সেই আনন্দের জন্য লজ্জিত হলো। সে বুঝতে পারছিল, মেঘলার জীবনে অন্য একটি সম্পর্কের সমাপ্তি তার নিজের জীবনের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে বলে সে স্বস্তি পাচ্ছে। সে কি সত্যিই মেঘলাকে স্বাধীন দেখতে চায়, নাকি এমন স্বাধীনতা চায়, যার শেষে সে আবার তার কাছে ফিরে আসে? মেঘলা বলল, ‘তুমি কিছু ভাবছ?’ নিলয় বলল, ‘ভাবছি, তুমি এখন কেমন আছ।’ মেঘলা উত্তর দিল, ‘ভালো। আবার কখনো খারাপ। কিন্তু এখন নিজের খারাপ থাকার জন্য কাউকে দায়ী করতে হয় না।’ নিলয় বলল, ‘এটা কি ভালো?’ মেঘলা একটু হেসে বলল, ‘সবসময় নয়। কখনো কাউকে দায়ী করতে পারলে নিজের কষ্টটা সহজ হয়।’ কথাটি শুনে নিলয়ের  মনে হলো, মেঘলা তার চেয়ে অনেক বেশি সৎ হতে শিখেছে, অথবা সে এখন তার অসততাগুলোকে অন্যভাবে দেখতে পাচ্ছে। সে বলল, ‘তুমি কি কখনো আমাদের কথা ভাবো?’ মেঘলা বলল, ‘প্রতিদিন নয়। কিন্তু মাঝে মাঝে ভাবি।’ ‘কী ভাবো?’ ‘ভাবি, আমরা যদি তখন আরও একটু কম নিশ্চিত হতাম, তাহলে হয়তো একে অপরকে আরও ভালোভাবে দেখতে পারতাম।’ নিলয় বলল, ‘আমরা কি আবার চেষ্টা করতে পারি?’ প্রশ্নটি তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল খুব স্বাভাবিকভাবে, যেন বহুদিন ধরে অপেক্ষা করছিল। মেঘলা দীর্ঘক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, ‘আমি জানি না।’ নিলয় এবার হাসল। ‘তুমি এখনও কিছু জানো না।’ মেঘলাও হাসল, কিন্তু তার হাসির মধ্যে বিষণ্নতা ছিল। ‘হয়তো এটাই আমার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। আগে আমি সবকিছুর উত্তর দিতে চাইতাম। এখন বুঝি, কিছু প্রশ্নের উত্তর না থাকলেও জীবন থেমে থাকে না।’ তারা বিদায় নেওয়ার সময় কোনো প্রতিশ্রুতি দিল না। নিলয় জানত না, মেঘলা আবার তার কাছে ফিরে আসবে কি না। কিন্তু এবার সে প্রশ্নটিকে আগের মতো নিজের জীবনের কেন্দ্র করে তুলল না। সে বুঝতে শুরু করেছে, একজন মানুষকে ভালোবাসার অর্থ তার ভবিষ্যৎকে নিজের ভবিষ্যতের সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করা নয়। তবু সেই উপলব্ধি তাকে ঈর্ষা, ভয় বা আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্ত করেনি। কোনো কোনো রাতে সে এখনও মেঘলার কথা ভাবতে গিয়ে কৌশিকের মুখ কল্পনা করে, যদিও তাকে কখনো দেখেনি। কখনো মনে হয়, মেঘলা ফিরে এলে সে তাকে আগের চেয়ে ভালোবাসতে পারবে। আবার কখনো মনে হয়, সে শুধু নিজের জীবনের পরিচিত ছন্দটি ফিরে পেতে চাইছে। এই দ্বন্দ্বের কোনো সমাধান নেই। আর হয়তো সমাধান না থাকাটাই তাকে প্রথমবার নিজের সঙ্গে সৎ হতে সাহায্য করছে। এক বর্ষার সন্ধ্যায় নিলয় জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। বহুদিন পর বৃষ্টি হচ্ছে। কৃষ্ণচূড়ার পাতাগুলো ভিজে চকচক করছে, রাস্তার আলোয় জল জমে ছোট ছোট আয়না তৈরি হয়েছে। সে টেবিলে ফিরে এসে পুরোনো খাতাটি খুলল। প্রথম পাতায় একসময় লেখা ছিল, ‘আজ থেকে আমি আমার স্ত্রীর অনুপস্থিতি নিয়ে লিখব না।’ বাক্যটির ওপর সে বহুদিন আগে দাগ টেনেছিল। তার নিচে লেখা ছিল, ‘আমি জানি না, কী নিয়ে লিখব। এই না-জানাটুকু অন্তত আজ সত্যি।’ সে বাক্যটি পড়ল। তারপর নতুন করে লিখল, ‘মানুষের জীবনে এমন কিছু ঘর থাকে, যেখানে আয়না নেই। সেখানে দাঁড়ালে নিজের মুখ দেখা যায় না; শুধু বোঝা যায়, কেউ একজন একসময় সেখানে ছিল, আর তার অনুপস্থিতি ঘরের আকৃতি বদলে দিয়েছে।’ লিখে সে কলম নামিয়ে রাখল। বাক্যটি তার ভালো লাগল, কিন্তু এবার সে তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নিল না যে এটি ভালো সাহিত্য হয়েছে। সে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। তার মনে পড়ল, মেঘলা বৃষ্টি পছন্দ করত, কিন্তু ভিজতে পছন্দ করত না। বৃষ্টির দিনে সে জানালা খুলে বসে থাকত, আর নিলয় তাকে নিয়ে মজা করত, প্রকৃতিকে ভালোবাসে, কিন্তু প্রকৃতির সংস্পর্শে যেতে ভয় পায়। মেঘলা বলত, ‘সবকিছুকে ছুঁতে হয় না। কিছু জিনিস দূর থেকে দেখলেও ভালোবাসা যায়।’ তখন নিলয় কথাটির অর্থ বুঝতে পারেনি। এখন সে জানে না, বুঝেছে কি না। শুধু এটুকু জানে, মেঘলা তার জীবনে আছে কি নেই, সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তাদের সম্পর্কের সমস্ত সত্য নির্ধারণ করা যায় না। তাদের মধ্যে ভালোবাসা ছিল, ছিল আকর্ষণ, অভ্যাস, ব্যবহার, ভুল বোঝাবুঝি, অহংকার, ক্ষমা এবং এমন কিছু ক্ষত, যার কোনো একক মালিক নেই। তারা একে অপরকে কষ্ট দিয়েছে, আবার একে অপরের জীবনকে সমৃদ্ধও করেছে। কোনো একটি সত্য অন্য সত্যগুলোকে বাতিল করে না। নিলয় বাতি নিভিয়ে বিছানায় গেল। পাশে মেঘলার বালিশটি আর নেই; সে সেটি অনেক আগে আলমারিতে তুলে রেখেছে। তবু কখনো কখনো ঘুমের মধ্যে হাত বাড়ালে তার মনে হয়, পাশে কেউ শুয়ে আছে। ঘুম ভেঙে গেলে সে আর আগের মতো আতঙ্কিত হয় না। শূন্যতা এখনও আছে, কিন্তু শূন্যতাকে সে আর কোনো মহৎ নাম দিতে চায় না। সে জানে, মেঘলা ফিরে আসতে পারে, নাও পারে। সে আবার ভালোবাসতে পারে, নাও পারে। তার লেখা ভালো হতে পারে, নাও পারে। জীবন তাকে কোনো নিশ্চিত পরিণতি দেয়নি। শুধু তাকে এমন একটি জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে নিজের ইচ্ছাকে সত্য বলে দাবি করার আগে তাকে তার ভেতরের ভয়গুলোকে চিনতে হয়। জানালার বাইরে বৃষ্টি থেমে গেল। রাস্তার জমা জলে একটি গাড়ির আলো এসে পড়ল, তারপর সরে গেল। নিলয় চোখ বন্ধ করল। তার মনে হলো, যে-ঘরে আয়না ছিল না, সেখানে সে এতদিন অন্য একজনের মুখ খুঁজেছে। এখন সে জানে, সেই ঘরে অন্যের মুখ দেখার জন্য নয়, নিজের অন্ধকারের সঙ্গে থাকার জন্যই প্রবেশ করতে হয়। তবু এই উপলব্ধির মধ্যে কোনো বিজয় নেই। সে এখনও অসম্পূর্ণ, এখনও ঈর্ষান্বিত হতে পারে, এখনও নিজের কষ্টকে সুন্দর বাক্যে রূপান্তর করার প্রলোভনে পড়তে পারে। পার্থক্য শুধু এই যে, এখন সে নিজের দুর্বলতাকে আবিষ্কার করলেই তাকে মহৎ কোনো ব্যাখ্যার মধ্যে লুকিয়ে ফেলতে পারে না। অন্ধকারে শুয়ে সে ভাবল, ভালোবাসা হয়তো এমন কোনো দরজা নয়, যা একবার খুলে দিলে চিরদিন খোলা থাকে। বরং এটি এমন একটি ঘর, যেখানে দুজন মানুষ কিছুদিন পাশাপাশি বাস করে, তারপর একদিন আবিষ্কার করে, তাদের প্রত্যেকেরই এমন কিছু দরজা আছে, যার চাবি অন্যজনের হাতে নেই। কেউ সেই দরজা খুলে বাইরে চলে যায়, কেউ ভেতরে থেকে যায়, কেউ আবার ফিরে আসে। কিন্তু যে-ঘর একবার শূন্য হয়েছে, সেখানে ফিরে এলেও আগের মতো করে থাকা যায় না। নিলয় এই কথাটিকে গল্পের শেষ বাক্য করতে চাইল না। কারণ সে বুঝেছিল, জীবনের শেষ বাক্য লিখে ফেলতে পারার আকাঙ্ক্ষার মধ্যেও এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা আছে। মানুষ বেঁচে থাকে, কারণ তার গল্পের শেষ সে জানে না। আর অন্য একজন মানুষকে ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন দিক সম্ভবত এই যে, তার গল্পের শেষও আমাদের অজানা থেকে যায়। মেঘলা কোথাও আছে, নিজের কাজে, নিজের বন্ধুত্বে, নিজের একাকিত্বে, হয়তো কোনো নতুন আকর্ষণের সম্ভাবনার মধ্যে। কৌশিকও আছে, নিজের লেখার টেবিলে, নিজের ভুলের সঙ্গে, নিজের অসমাপ্ত বাক্যগুলোর মধ্যে। তাদের জীবন আর একই ছাদের নিচে মিলিত হচ্ছে না, তবু একে অপরের জীবনের সত্য থেকে তারা মুছে যায়নি। রাত আরও গভীর হলো। নিলয় ঘুমিয়ে পড়ল। জানালার কাচে বৃষ্টির শেষ কয়েকটি ফোঁটা তখনও লেগে ছিল; ভোর হলে সেগুলো শুকিয়ে যাবে, কিন্তু কাচে তাদের রেখে যাওয়া ক্ষীণ দাগ কিছুদিন থেকে যাবে। কে জানে, কোনোদিন সেগুলোও মুছে যাবে। কিংবা মুছে গেলেও জানালাটি থেকে যাবে, যে জানালা দিয়ে একসময় দুজন মানুষ একই বৃষ্টি দেখেছিল, অথচ বৃষ্টির অর্থ তাদের কাছে কখনো এক ছিল না।

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রবন্ধঃ বিষ্ণু দে : ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘চোরাবালি’

বিষ্ণু দে , তিরিশি কবিদের অন্যতম । কবিতা রচনাই যাঁর কাছে এক এবং অদ্বিতীয় হ ’ য়ে দেখা দেয় । কাব্যে সংখ্যার দিক থেকে অতিক্রম করেছেন সতীর্থদের । বিষ্ণু দে , যাঁর কবিতা রচনার সূচনা পর্বটিও শুরু হয় খুব দ্রুততম সময়ে । কবিতা সৃষ্টির পর্বটি অব্যাহত রেখেছেন সর্বদা । পঁচিশটি কবিতা নিয়ে ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এ নিজেকে প্রকাশ করেন স্ব - মহিমায় । যে কবিতাগুলা বিস্ময়বিমুগ্ধ ক ’ রে অন্যেদেরকেও । ওই কবিতা শুধু বিষ্ণু দে ’ কে নয় , বরং নতুনতর হ ’ য়ে দেখা দেয় বাঙলা কবিতা । বিষ্ণু দে ’ র ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছিল দু ’ বার । ‘ উর্বশী ও আর্টেমিস ’- এর কবিতাগুলির রচনাকালের ব্যাপ্তি দেওয়া আছে ( ১৯২৮ - ১৯৩৩ ) সময়ের মধ্যে , এবং গ্রন্থকারে প্রকাশ পায় ওই একই বছরে অর্থাৎ , ১৯৩৩ - এ । কিন্তু রচনাকালের ব্যাপ্তি ১৯২৮ দেওয়া থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এ সকল কবিতাগুলো রচনা পর্ব শুরু হয় আরো দু ’ বছর পূর্বে অর্থাৎ , ১৯২৬ - এ । যখন কবি হিশেবে বিষ্ণু দে একেবারেই নতুন এবং নবীন । ১৯৩৩ - এ ...

আমাদের ব্যর্থতাগুলো

  বাংলাদেশের গল্প কেবল সাফল্যের গল্প নয়; এ গল্পের ভেতরে অসংখ্য অপূর্ণতার দীর্ঘ ছায়াও মিশে আছে। একটি দেশ যখন যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে নিজের পরিচয় নির্মাণ করে, তখন তার প্রতিটি অগ্রগতি যেমন গর্বের, তেমনি প্রতিটি ব্যর্থতাও আত্মসমালোচনার দাবি রাখে। আমরা স্বাধীনতার পর বহু পথ পেরিয়েছি   অর্থনীতি বেড়েছে, নগরায়ণ হয়েছে, শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, অবকাঠামো বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু উন্নয়নের দৃশ্যমান ভবনের আড়ালে এমন কিছু ভাঙাচোরা জায়গা রয়ে গেছে, যেখানে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে হয়   আমরা কি সত্যিই এগিয়েছি, নাকি কেবল এগিয়ে যাওয়ার চেহারাটি নির্মাণ করেছি? আমাদের ব্যর্থতাগুলো তাই কেবল কোনো সরকারের, কোনো প্রতিষ্ঠানের কিংবা কোনো ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়; এগুলো আমাদের সামষ্টিক চরিত্র, রাষ্ট্রচিন্তা, সামাজিক অভ্যাস এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের আয়না। সর্বোপরি এগুলো আমাদের নিজস্ব ব্যর্থতা। আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হয়তো এই যে, আমরা অনেক সময় সমস্যাকে সমাধান করার চেয়ে সমস্যার সঙ্গে বসবাস করতে শিখে যাই। রাস্তায় যানজট, নদীতে দূষণ, ফুটপাতে দখল, ঘুষ, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, বিচার পেতে...

প্রবন্ধঃ বুদ্ধদেব বসু ও ‘কঙ্কাবতী’

বুদ্ধদেব বসু প্রেমের অজস্র কবিতা রচনা করেছেন । অন্য অনেকের মতো তিনিও বেছে নেন একজন প্রেমিকাকে , যে হ ’ য়ে উঠে বুদ্ধদেবের অতুল্য প্রেমিকা হিশেবে । ‘ কঙ্কাবতী ’ অনিন্দ্য প্রেমিকা হ ’ য়ে বুদ্ধদেবের কাব্যতে বিচরণ ক ’ রে স্বচ্ছন্দে । স্থির হয়ে বসে পড়ে কঙ্কাবতী ’ কাব্যগ্রন্থে । যে কাব্যগ্রন্থে ‘ কঙ্কাবতী ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে ‘ কঙ্কাবতীকে ’ দেখা দেয় অনৈসর্গিক হয়ে । ‘ কঙ্কাবতী ’ কাব্য রচনার পূর্বে কঙ্কাবতীকে আমরা দেখতে পাই অন্য কোনো কবিতায় । যেখানে সে প্রেমিকার কাছে হয়ে ওঠে কুৎসিত কঙ্কাল ব্যতীত অন্য কিছু নয় । প্রগাঢ় ভাবে প্রাপ্তির জন্যে সমস্ত কবিতা জুঁড়ে দেখতে পাই কবির অপরিবর্তনীয় আবেদন । কঙ্কাবতী , যাঁর সাথে কিছু বাক্য বিনিময়ের জন্যে রক্তের হিমবাহে দেখা দেয় চঞ্চলতা । সুপ্রিয়া প্রেমিকা মুখ তোলা মাত্র কবি হাঁরিয়ে ফেলেন ওই সৌন্দর্যময় বাক্যগুলো , যা বলার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন কবি দীর্ঘদিন । প্রেমিকা যখন খুব কাছাকাছি হয়ে এগিয়ে আসেন , ওই ব্যর্থ ...